Wednesday, March 23, 2016

হোলি হ্যায়


সব জানোয়ারের দল।
অসভ্য ইতর কোথাকার, শার্ট টা দিল নষ্ট করে।  এত দামি শার্ট টা। ঐ ছোকরা ছেলেটাই আসল ক্রিমিনাল।  আরে হোলির দিন অফিস এসেছি বলে কি ছেড়া ন্যাকরা গায়ে দিয়ে আসতে হবে নাকি?

সকাল ছটার সময় বাড়ি থেকে অফিস এসেছে দেবাশিস।  দক্ষিণ কলকাতার এই পাড়ায় তখনও রঙ খেলা চালু হয়নি।  আর সেক্টর ফাইভের অফিস চত্বরে হোলি খেলার চল নেই।কিন্তু ঐ নতুন ছেলেটা স্যার স্যার বলে দিল রঙ ঘষে।  যত্ত সব  বেলেল্লাপনা!  আর DGM অব্দি কিনা হাসতে হাসতে বলে   “ Looking funny Dutta " " Let's celebrate the festive.... "

দাঁতে দাঁত চেপে শুভাশিস নিজের কিউবিকলে ফিরে গেছিল। অপলার ফোন এসেছিল, বার বার করে বলে দিয়েছে খেলা থামলে তবে অফিস থেকে ফিরতে।  দুধ সাদা ফোক্সভাগেন গাড়িটা তিন মাসও হয়নি, কেউ রঙ দিয়ে দিলেই সর্বনাশ।  চারটের সময় অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছিল শুভাশিস।  দু তিনটে বেলুন অ্যাটাকের শিকার হয়েছে গাড়িটা।  গ্যারাজে জল দিয়ে মুছতে মুছতে বার বার শার্টের দিকে চোখ পড়ছিল।  ইশশ্, গেল পুরো।  লিফ্টের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সাত তলার ঋতম আর সুমির সাথে দেখা। হুল্লোরবাজ ছেলে। একটা জার্মান কোম্পানির রিজিওনাল হেড।  সামনে পেয়েই 'হ্যাপি হোলি শুভাশিস দা' বলে দিল আর এক পোচ রঙ লাগিয়ে ।  আদিখ্যেতা কাকে বলে!

বেল বাজাতেই অপলা এসে দরজা খুলল। শুভাশিস অপরাধীর মতো দাড়িয়ে ছিল,  শুভাশিসের মুখ দেখে অপলার হাসি আর থামে না। 

শুভাশিস একটু ঘাবড়ে গিয়ে বলল 'আমি তো ভাবলাম তুমি হোলি খেলা পছন্দ কর না'। 

কে বলল?

তুমি তো কোনদিন বলনি?

আরে আমাদের বিয়ে হল দুবছর। আগের বছর তুমি শিমলা ঘুরতে যাবে বলেছিলে তাই আর কিছু বললাম না।  আমার তো ছোটবেলা থেকেই দারুণ লাগে হোলি খেলতে। 

সত্যি! 

না তো কি মিথ্যে বলব নাকি?  বছরে তো একটা দিন।

শুভাশিস তাড়াতাড়ি করে ঘর থেকে বেরিয়ে লিফটের দিকে দৌড়তে শুরু করল। অপলা কিছু বুঝতে না পেরে পেছন পেছন আসতে আসতে 'কোথায় চললে? '  

আসছি।  দু মিনিট দাড়াও।

(পাড়ার মোড়ে সিগারেটের দোকানদার জোর করে একটা আবিরের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল 'এক প্যাকেট নিন দাদা, রঙ এর দোকান দিয়েছি।' শুভাশিস না করেনি। জোর করে গছানো আবিরের প্যাকেটটা গাড়িতেই ছেড়ে এসেছিল। )

লিফটে নামতে নামতে অফিসের নতুন ছেলেটাকে তিনবার থ্যাংকস জানাল। ছোটবেলায় শুভাশিসেরও রঙ খেলতে খুব ভালো লাগতো।  অপলাকে রঙ লাগিয়ে দুজনে মিলে একবার সাততলায় যেতে হবে, ঋতমদের ফ্ল্যাটে..........

— অভিষেক বোস

Tuesday, March 22, 2016

রঙহীন বনাম রঙীন




আজ যখন এই লেখাটা পোস্ট হবে তখন কলকাতায় বসন্তোত্সব শুরু হয়ে গেছে আর উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকা আর বাকি ভারতবর্ষ অপেক্ষা করে থাকবে আরও একদিন।  আমার শহর মালদাতে আজ দেব দোল। মানে আজ শুধু দেবতাদের মূর্তিতে আবির দেওয়া যেতে পারে পাবলিকের গায়ে রঙ দিলে ফাউল।খুব ছোটবেলায় একবার নিয়ম ভেঙ্গে উত্তম ক্যালানি খেয়েছিলাম। বয়সের ধার বোঝাতে লোকে বলে ' পঁচিশটা বসন্ত দেখেছি'।  বসন্ত এসে গেছে আর সাথে এসেছে সরস্বতী পুজো, ভ্যালেন্টাইনস ডে, ছোটবেলায় সকালবেলা পড়তে বসে কোকিলের ডাক শুনতে পেতাম এখন কলকাতায় আর শুনতে পাই না।  এর দুটো সম্ভাব্য কারন এক কোকিল নাই, দুই বহুকাল সকাল দেখি নাই।  তাতে কি হয়েছে!  বসন্ত এসে গেছে।  তবে বসন্ত রোগ এখনও আসেনি। এক রাউন্ড বৃষ্টিও হয়ে গেছে কিন্তু বসন্তের আসল শো স্টপার হল হোলি।  

হিরণ্যকশিপুর বোন হোলিকা প্রহ্লাদকে শাস্তি দেবে বলে পূর্ণিমার রাতে দমকল এর ইউনিফর্ম পড়ে শিশু প্রহ্লাদকে কোলে নিয়ে আগুনে প্রবেশ করেছিল। সম্ভবত আগুনে ঢোকার মুখে ফাগুনের হাওয়ায় দমকল বস্ত্র উড়ে গিয়ে প্রহ্লাদের গায়ে গিয়ে পড়ে আর হোলিকা পুড়ে কালিকা হয়ে গেছিল । এই  দিনটাই হোলিকা দহন। পরদিন সকালে আগুন নিভে গেলে রাজ্যের লোকজন এসে এ ওর কপালে ভস্ম টীকা দিতে শুরু করল। বসন্তের টীকার মতই এই ভস্ম টীকা প্রদান বছরের পর বছর  ধরে চালু রয়েছে যার এখনকার সংস্করণ হল গিয়ে ধূলেঁটি বা রঙওয়ালি হোলি (মানে মালদার দেব দোল একদম ISI মান্যতা প্রাপ্ত! )। 
মোদ্দা কথা হল ঘটনাটা দুদিন ধরে চলেছিল আর যেহেতু আমি একটু সংস্কারী গোছের তাই একদিন কলকাতায় রঙ খেলি আর একদিন মালদাতে।  

হোলির তিন তিনটে সুপারহিট গান অমিতাভের আর একটাভিক্টর ব্যানার্জির মানে রেজাল্ট 3:1 আর সাথে অজস্র ভোজপুরি ফ্রি কিক। আর দুটো স্লোগান হোলি হ্যায়, বুঢ়া না মানো হোলি হ্যায়। 
তবে দল হচ্ছে পাঁচটা : হোলি খেলব না, রঙ খেলব না, আবির খেলব না, লোককে রঙ দিব নিজে নিব না আর সব খেলব। 

আমি কোন দলে পড়ি নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না।  যাবৎ হোলি তাবৎ খেলি।তবে বেলুন টা আজকাল যোগাড় করা সমস্যা হয়ে উঠছে , এর ওর ঝেড়েই চালাতে হচ্ছে। আর চারিদিকে এত রঙ্গ হলেও রঙের বড় অভাব।  খুদে বাচ্চা গুলো অবধি পিচকিরিতে করে খালি জল ছিটিয়ে দিচ্ছে ।  এর মধ্যেও কিছু লোক মুখে নারকেল তেল মেখে ঘুরে বেড়ায়।এদের মুখে সাধারণত কেউ রঙ মাখায় না (দাঁতে ঘষে দিয়ে যায়)। গত বেশ কয়েক বছর ধরে আমার উপলব্ধি রঙ খেলার পর স্নান করতে গিয়ে চামড়া তুলে ফেলার কোনো দরকার নেই।  উঠলে উঠল, না উঠলে থাকুক দু দিন।  এরপরে বাড়িতে বাসন্তী পোলাও আর খাসির মাংস। হাত লাগাতেই হাতের রঙ সোজা পাতে।  লাল হলুদ ইস্টবেঙ্গল পোলাও খেয়ে একটা সিনেমা,  এরপরে আবার বিকেল থেকে আবির খেলা।  ছোটবেলায় বড়দের বাড়ি গিয়ে প্রনাম করে আসতাম।  আজও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারব পাড়ার কোন বাড়িতে মাংসের ঘুগনি হয় আর কোন বাড়িতে জালি মালপোয়া।  আবির যত না গায়ে পড়ে তার থেকে বেশি বাতাসে ওড়ে। বিকেলের নরম আলোতে বাতাসে আবিরের রঙ আকাশে পুরো ক্যানভাস এঁকে দেয়।  এরপর রাত বাড়তে থাকে,  এর ওর বাড়িতে গুছিয়ে আড্ডা আর খাওয়া দাওয়া।  শেষে মাথা ঝাড়তে ঝাড়তে একটা রঙহীন জীবনকে রঙ্গীন করে বাড়ি ফেরা।  আরও একটা বছর আরও একটা বসন্ত পেরিয়ে যায়।  

— অভিষেক বোস

Saturday, March 19, 2016

অঙ্ক সাহিত্যের গন্ডগোল

     ছবিটি সংগৃহীত। আপত্তি থাকলে সরিয়ে দেওয়া হবে।


 
গরু মহিষের অঙ্ক মনে আছে ? বেশ শাসালো অঙ্ক। ঐ কচি বয়সে শেষমেষ X আর Y দুজনকে এনে মীমাংসা করতে হয়েছিল।  ঠিক মনে নেই তবে মনে হয় পয়ঁতাল্লিশ টা গরু আর ছাপ্পান্ন টা মোষ বেরিয়েছিল ।  এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই যে শ'খানেক গরু মোষের খাটালে অঙ্ক কষে গুনতি করতে হল কেন?  গরু গরুর মতো দেখতে হয় আর মোষ মোষের মতো, এমনকি সাথে আরও দু চার ডজন ছাগল ভেড়া মিশিয়ে দিলেও কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয় কিন্তু গনিত তোমাকে দিয়ে গুনতি করিয়েই ছাড়বে।  অথবা চৌবাচ্চার অঙ্ক, একদিকে তোমার মেজকাকা পাম্প চালিয়ে জল তুলল আর অন্য প্রান্তে ভাঙা পাইপ দিয়ে জল বিগলিত হয়ে পড়তে থাকল ।  এবার তুমি বসে বসে জল মাপতে থাক।  কেন? তোমাদের কাজের দিদিও তো চৌবাচ্চার কলটা খুলে দিয়ে ভুলে যেতে পারতো!  তাতে করে আচ্ছা করে গুছিয়ে গালাগালি করা যেত।  কিন্তু না, জল ভাঙা নল দিয়েই বেরোবে আর কেউ মেরামতও করাবে না।  এদিকে এই দৈন্য দশা তবু আটচল্লিশ খানা তরমুজ বাজার করে তোমার জেঠুকে বাড়ি ফিরতে হবে,  আর এদিকে বাড়িতে গন্ডা দেড়েক লোক। প্রত্যেকে কতটা তরমুজ পাবে?  আচ্ছা! এমনও তো হতে পারত যে সেজ কাকিমা তরমুজ খায়না, পেট গরম হয়ে যাবে বলে, আর মা!  মা তো নিজের থেকে দু পিস তোমার জন্যে সরিয়ে রাখবেই রাখবে।  আর সবার জন্য সমান ভাগই বা হবে কেন?  মেজ কাকুও ছ পিস আর ভুতোও ছ পিস?  আর ছোট কাকুর পরিবার !  সে তো কোনো টাকায় দেয় না সংসারে, তারাও ছ'পিস !  মামদোবাজি নাকি? আর সবথেকে বড় কথা আটচল্লিশ খানায় যখন কেনাল তখন আম কেনাত ! আনতেও সুবিধে আর খেতেও। 

মোদ্দা কথা হচ্ছে অঙ্ক সমস্যা দিবে কিন্তু সাহিত্যের সমাধান হবে না। আমাদের স্কুলের অঙ্কের জাহাজ কুমারেন্দ্র স্যার অবশ্য এইসব প্রশ্নের জটিলতা নিয়ে মাথা ঘামাতেন না।  উনি মুখে মুখে অঙ্ক করাতেন তবে সাহিত্যের সুরাহাও করে ছাড়তেন।  ট্রাক্টর, ধান চাষ, গোবর সার নিয়ে অঙ্ক শুরুর আগে আমাদের ক্লাসের একটি ছেলেকে বলতেন 'কি হে!  গ্রামের ছেলে! ট্রাক্টর বুঝিয়ে দাও!  অথবা বলতেন গোবর সার টা বলে দাও!   সে ব্যাটা খানিকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকত তারপর বসতে বললে বসে পড়ত।  আসলে সে না তো গ্রামে থাকত না কোনোদিন ট্রাক্টর চালিয়েছে।  তবে গ্রাম বাংলার অঙ্ক হলে তাকেই আমাদের বুঝিয়ে দিতে হত আমগাছ কেমন দেখতে হয় আর বাঁশ গাছ কত লম্বা হয় । 

এতক্ষণ ধরে যারা মনে করার চেষ্টা করছেন গল্পের নামটা কোথায় পড়েছেন তাদেরকে বলে রাখি নামটা শিব্রাম চক্রবর্তীর অঙ্ক সাহিত্যের যোগফল থেকে অনুপ্রাণিত (বাকি গল্পটা কিন্তু কপির পেস্ট নয় ) ।  যেখানে গুরুদেব (শিব+রাম) অঙ্ক-সাহিত্য ভাষার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। 

তো গুরুদেব তার অন্য একটি গল্প 'নকুড় বাবুর অনিদ্রা দূর' - এ অঙ্কের সবথেকে বড় সমস্যা দেখিয়েছিলেন । ইনসমনিয়ার রুগী নকুড় বাবুকে কেউ ভেড়া গোনার দাওয়াই দিয়েছিলেন কিন্তু দেখা গেল নকুড় বাবু রাত পিছু প্রায় পনেরো ষোলো হাজার ভেড়া গুনে ফেললেও ঘুম আসত না। এদিকে রাতের পর রাত ভেড়া গুনতে গুনতে শরীরের অবস্থা একসা । তার উপরে ভেড়া গুলো বড্ড বেয়াড়া, কিছুতেই গেট দিয়ে লাইন করে বেরোবে না।  একটা কান কাটা দুম্বা যেটাকে নকুড় বাবু দুতিনবার নোটিশ করেছেন সে ব্যাটা শুধু বেঁড়ার তলা দিয়ে গলে যেতে চায়।  ঐ কান কাটাকে দেখেই শেষে সন্দেহ হল ব্যাটারা বার বার ঘুরে ঘুরে আসছে। অতএব বন্ধুগন গরু ভেড়াকে অযথা মাথায় না তুলে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে পড় । ও ব্যাটারা গন্ডগোল করবেই ।  

—  অভিষেক বোস

Friday, March 18, 2016

আয়না

 

শোওয়ার ঘরে  বিছানার ঠিক সামনেই রয়েছে আয়নাটা।  রোজ ঘুমোতে যাওয়ার আগে চোখে পড়ত।  বেডসুইচ টিপে আলো নেভানোর আগে  একবার দেখে নিত নিজের প্রতিবিম্বকে।  এক একদিন তাকিয়ে থাকত নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে আর ভাবত কি নিখুঁত অনুকরণ!  অন্ধকার   যখন জমাট বেঁধে আসত আর বাইরের রাস্তার আওয়াজ নিঝুম হয়ে আসত তখন কেন জানি একটু একটু ভয়ও লাগত।  এখনও কি সামনের অবয়বটা নকল করে চলেছে?  ঘুটঘুটে অন্ধকার না হলে দীপক সমাদ্দারের ঘুম আসত না।  একদিন দুম করে ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল, বেডসুইচ টা অন্ করতে গিয়ে মনে হল সামনের আয়নার আলোটা আগে জ্বলে উঠেছে।  দরদর করে ঘেমে উঠেছিল দীপক , দমবন্ধ লাগছিল।  আবার আলো নেভাতেই সেই আগের মতো জমাট অন্ধকার। কাঁচা ঘুমে হয়তো ভুল বুঝেছিল। রাতে আলো নেভানোর পর দীপক কোনো কথা  বলত না কিন্তু একদিন মনে হয়েছিল কাঁচের ওপারে আওয়াজ হচ্ছে, কেমন একটা গোঙানির শব্দ, ঘুমের মধ্যে বোবা লেগে গেলে যেমন হয়। নিশির ডাক নয়তো?  একা একাই থাকত দীপক ।  

একদিন রাতে আবার সামনের আলোটা আগে জ্বলে উঠেছিল,  প্রতিবিম্বটা বুকে হাত দিয়ে কাতরাচ্ছিল, নিজের দিকে তাকিয়ে বুঝল দীপকের কিছুই হয়নি। সামনেই দীপক সমাদ্দারের ছায়ামানব তখনও কাতরে চলেছে, একটা অস্ফুট শব্দ করে কাঁচের ওপারের লোকটা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল । ভয়ে হাত পা সিটিয়ে যাচ্ছিল গলার কাছটা কেমন দলা পাকিয়ে আসছিল জলের বোতলটা তুলতে গিয়ে কিছুতেই ছুঁতে পারছিল না।  বেডসুইচটার দিকে হাত বাড়িয়ে বারবার চেষ্টা করেও আলো নিভল না।  তাহলে কি ওপারের লোকটাই  .................   !!  

— অভিষেক বোস

Thursday, March 17, 2016

উচ্চ যেথা শির

শতাব্দীতে ওড়িশা যাচ্ছি ।  না গল্পটা আমার ওড়িশা যাওয়া নিয়ে নয়, ফি সপ্তাহে ভারতের কোনও না কোনও অঙ্গরাজ্যে যায় ।  এই গল্পটা গল্পের বইয়ের। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে, এই সময় এক বইবিক্রেতা উঠল।  সাধারণত এদের কাছে সাপ্তাহিক, মাসিক ম্যাগাজিন থাকে কিন্তু এনার হাতে রয়েছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখ্যোপাধ্যায়,  সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, শিব্রাম চক্রবর্তী, লীলা মজুমদার। ভদ্রলোক সবার কাছে যাচ্ছে না,  বেছে বেছে দু একজনের সামনে যাচ্ছে আর বইগুলো মেলে ধরছে।  আমার সামনে দাঁড়াবে কিনা ভাবছিলাম।  দেখা গেল আমিও একজন ভাগ্যবান ক্রেতা মনোনীত হয়েছি।  একটা শিব্রাম তুলে নিলাম।  টাকা মিটিয়ে দিতেই আবার ভদ্রলোক কানামাছি ভো ভো, যাকে পারিস তাকে ছো়ঁ খেলতে খেলতে কামরার অন্যপ্রান্তে। আজব মানুষ, মুখ দেখেই চিনে ফেলছে নাকি কে বাঙালি আর কে ওড়িয়া !?  আবার ফিরে আসার সময় জিজ্ঞেস করেই বসলাম।  দাদা কি বেছে বেছে বাঙালিদের সামনে যাচ্ছেন নাকি?   একগাল হেসে উত্তর দিল  'যাদের মাথা উঁচু, তাদের কাছেই যাচ্ছি'। 
মানিকচাঁদ গুটখার তত্ত্বে বিশ্বাসী মনে হয় ' উঁচি লোগ, উঁচি পসন্দ! '

ভদ্রলোক নেমে গেছে আর আর আমি মাথা উঁচু তত্ত্ব নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি হঠাৎ পাশের সিটের ভদ্রলোককে দেখলাম এত কান্ড ঘটে গেল আর উনি স্মার্টফোনের স্ক্রিনে মাথা ঢুকিয়ে বসে আছেন !

— অভিষেক বোস

Saturday, March 12, 2016

ফটোগ্রাফি

চঞ্চু প্রদর্শনের আদি প্রেরনা 



“আগে লোকে টেলিফোন কানে লাগিয়ে ঘাড়  বাঁকিয়ে ফোটো তুলত আর এখন ফোন হাতে নিয়ে মুখ বাঁকিয়ে ফোটো তুলে "

১৯৯২
ইস্কুল থেকে ফিরে এসে কোথায় খেলতে যাব তা না, মা বলল তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে চল ফোটো তুলতে যেতে হবে, ইস্কুলের পাসপোর্ট সাইজের ছবি..... অতএব চল ।বাড়িতে ইয়াশিকার ক্যামেরা ছিল বটে কিন্তু ভালো ফটোগ্রাফার ছিল না অগত্যা গন্তব্য হলো ষ্টুডিও   । সাথে যোগদান করল মামাতো , মাসতুতো ভাই বোন  ফোটো যখন তুলতে যাচ্ছি বেশ কয়েকটা তুলে রাখাই ভাল ।এরপরে যেটা হল সেটাকে ফটোগ্রাফি না বলে সিনেমাটোগ্রাফি বলা ভালো । ফটোগ্রাফার ভদ্রলোক একজন রাশভারী লোক সে আমাকে গর্দান সোজা করিযে ভ্রু কুঁচকে নীল পর্দার সামনে কিছু ফোটো তুলল এরপর নীল পর্দা সরিয়ে পাহাড়, নদীর সামনে আমাদের সমবেত ফোটোগ্রাফ, শেষে আইসক্রিম খেতে খেতে বাড়ি ফেরা, ডেলিভারি ৩ দিন পর । ৯ এর দশকের ফোটোগ্রাফি সীমিত ছিল বিয়ে বাড়িতে, পিকনিক স্পটে, ঘুরতে বেরিয়ে, অফিসের কাজে । ব্যাতিক্রম কিছু শৌখিন মানুষ যারা বাবরি চুল কাটিয়ে, কোট্ পড়ে ফোটো তুলত, মেয়েদের মধ্যে চালু ছিল জয়াপ্রদা সানগ্লাস  আর ভ্যানিটি ব্যাগ ঝুলিয়ে পোস্ দেওয়া ।

১৯৯৮
Open Market Globalization এর হাওয়া লেগেছে ভারতের ছোট বড় শহরে, সস্তার ক্যামেরা, সস্তা ফটোগ্রাফার এখন ঘরে ঘরে.... অতএব বন্ধুগন তুলে ফেলুন যতখুশি ফোটো । এখন মাসে গড়পড়তা ১৮ টি ছবি তোলা যেতেই পারে... বাড়িতে বাড়িতে এখন একাধিক Album (যেগুলো বিশেষ অতিথিদের সামনে খুলে দেখাতে পারলে আলাদাই আনন্দ) আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ফটো নেগেটিভ এর সংগ্রহ । মধ্যবিত্ত বাঙালি এখনও ঋণে জর্জরিত না হলেও ঋণাত্মক চিত্রে জর্জরিত । আমার বয়সী যারা নাকি আবার ভালো ফোটো তুলি অনুষ্ঠান বাড়িতে ক্যামেরা তাদের দখলে । Assault অথবা Kalashnikov বন্দুক হাতে নেওয়ার মত অনুভূতি আর হাবভাব টাও সেরকম.......
২০০৩
মোবাইল ফোন না হয় হলো তাই বলে মোবাইল ক্যামেরা?
ধু‌ৎ!
আমি এখন কলকাতায় থাকি, বছর খানেক ধরে Trium এর মোবাইল ব্যবহার করছি কিন্তু মোবাইল ক্যামেরা চোখে দেখিনি । আমার বান্ধবী এসে বলল কোন এক ছেলে নাকি মোবাইল -এ ওর ফোটো তুলেছে , সুন্দরী খুশিতে আত্মহারা । Megapixel আর VGA camera তর্ক শুরু হয়নি সুতরাং মোবাইলে ক্যামেরা মানেই ইজ্জত দুগুনা ... ( ইতিমধ্যেই আমি একটা Sony Mobile পেয়েছি যাতে Camera Module লাগানো যায়... 32 MB data storage capability র মোবাইলে আর Camera Attachment লাগানোর সাহস দেখায়নি)
আমার বন্ধুদের অনেকের মোবাইল এ ক্যামেরা আছে, টুকটাক ছবি আমিও তুলেছি, সবথেকে ভাল লাগল Delete অপশন ... পছন্দ না হলেই Delete..
২০১৪
এতক্ষণ ধরে যারা ধৈর্য্য ধরে পড়লে তারা যদি একজনকেও চেনো যে মানুষটির মোবাইল এ ক্যামেরা নেই অথবা সাপ্তাহিক অন্তত ৭ টি ফোটো তুলেন না আমাকে জানিও, ১টা প্রণাম বাকি রইলো । আমি ২৫ জনকে চিনি যারা গড়ে ২৫০ টা দৈনিক ফোটো তুলে থাকে আনন্দ বাজার পত্রিকার ভাষায় যাকে বলে নিজস্বী,.... আর যাই হোক বস ... জনগণ এখন আত্মনির্ভর , পিঠ চুলকোতেই হোক আর ফোটো তুলতে.... ইচ্ছেটাই আসল ।
আমি এখন ১৭৮ টা প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার কে চিনি যারা Watermarks আর Copyright © symbol লাগিয়ে ফটো আপলোড  করে... কে যে Copyright দিল কে জানে ? (এদের মধ্যে যারা সত্যি ভালো ফটোগ্রাফার তারা একটু চুপে চাপে চলে).... বাকিরা Aperture, ISO, Frame Rate, Color, Balance, 13 - 32 - 40 Megapixel... কমপ্লান  এর সাথে গুলিয়ে খেয়েছে । বাড়ন্ত ফটোগ্রাফারের দুরন্ত পছন্দ ।
“যারা ফোটো হয়ে গেছেন, তারা যদি এই ফোটো দেখতে পেতেন , তবে তাদের ফোটো দেখার মত হত " ।

-  অভিষেক বোস

Friday, March 11, 2016

দীপু দা' 

ছবিটি মেঘালয়ে তোলা 

আচ্ছা কোথায় যাওয়া যায় বলুন তো,  সিকিম না দার্জিলিং ?

- আরে দার্জিলিং তো পুরো ঘিঞ্জি,  সিকিমে যাবেন পুরো বিদেশ ।

আচ্ছা দার্জিলিঙে ঝর্না আছে?  

- দার্জিলিঙে ঝর্নাটা নেই,  সিকিম গেলে রাস্তাতে অনেক গুলো ঝর্না পাবেন। আমি তো থাকতাম দার্জিলিং,  ২২ দিন ছিলাম আর নেপালিটাও ভাল বলতে পারি........

ওম্মা!  তাই নাকি?  (বরের দিকে তাকিয়ে) শোনো না,  দাদার কাছ থেকে তাহলে হোটেল টোটেল গুলো জেনে নাও না।

-হোটেল  । আপনারা   “        "  হোটেলে থাকবেন,  পুরো বাঙালি হোটেল,  ম্যানেজার বাঙালি,  কোনও অসুবিধে হবে না।  আর সবথেকে ভাল কি বলুন তো বৌদি? একদম সহজ খাবার পাবেন,  ভাত, ডাল, আলু ভাজা,  মাছ ভাজা যা চাইবেন। 

আমরা পুরীতে গিয়েও জানেন তো এইরকম বাঙালি হোটেলে ছিলাম,  কি সস্তা আর একদম সমুদ্রের সামনে,  হেটে গেলে ১৫ মিনিট,  আমরা সকাল বেলা হলেই সমুদ্র চলে যেতাম আপনার দাদা তেল মেখে গামছা নিয়ে স্নান করে নিত,  দুপুর বেলা ফিরে এসে একদম বাড়ির মতো খাওয়ার।  বিকেলে আবার সমুদ্র তীরে চা নিয়ে বেঞ্চিতে বসে যেতাম,  কি ভালোই যে লাগত..... 

-আমরাও তো অনেকবার গেছি,  তবে কি  বলুন তো পাহাড়ের মজাটাই আলাদা।  আপনাদের একটা জায়গা বলে দিব ওখান থেকে পুরো ২৭০ ডিগ্রি কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় 

দার্জিলিং এর জল নাকি খুব ভাল? 

- দারুন, আমি তো ২২ দিন ছিলাম ঐ জল খেয়ে আমার গ্যাস,  পেটে ব্যাথা,  ব্লাড প্রেসার,  ব্লাড সুগার সব সেরে গেছে।

ওম্মা,  তাহলে তো খেতেই হবে

- তবে কি বলুন তো বউদি!  জিওলিন দিয়ে খাবেন,  পাহাড়ি জল তো,  পাহাড়ি ব্যাক্টেরিয়া থাকতে পারে।

সেকি তাহলে মামন খাবে কি,  তাহলে কি এখান থেকে জল কিনে নিয়ে যাব? আপনি যে খেতেন?

ওই যে বললাম,  জিওলিন দিয়ে খাবেন,  আর আমরা তো ঝরনার ডিরেক্ট জল নিয়ে খেতাম।

(মহিলার স্বামী বেশ গম্ভীর হয়ে বললেন ওখানেও বিসলেরি পাওয়া যায়)

শুনছ তাহলে এবার গরমের ছুটিতে দার্জিলিং টায় ঘুরে আসি বুঝলে.......

- অভিষেক বোস

বাকী কথা : দীপু দা গল্পের নাম নয় । দীঘা, পুরী, দার্জিলিং এর ইনিশিয়াল ।

Wednesday, March 9, 2016

United we Jump, divided we fall


দাদা এই ট্রেন টা হাবড়া দাঁড়াবে?
এটা অল্ স্টপেজ ।
আর দুটো কামরা পেরিয়ে....
দাদা এটা অল স্টপেজ্?
হুমম্
নিশ্চিন্ত হয়ে আমি আর অপূর্ব ট্রেনে উঠলাম ...
'দাদা একটু চেপে বসুন না, '
.......
' ও দাদা, এটাতো ৪ জনের '
...
যাকে উদ্দেশ্য করা বলা লেই ভদ্রলোকের অভিব্যক্তির ক‌োনো পরিবর্তন হল না ।
অগত্যা পাশেই দাঁড়িয়ে পড়লাম , এরপর ডজন খানেক গুঁতো , সবুজ মটর এল , চকোলেট ওয়ালা হুমকি দিয়ে গেল উনি নেমে গেলে আর এই দুর্লভ জিনিষ আর কোথাও পাওয়া যাবে না , খানকতক লোক তাতে ভীষন ভয় পেয়ে কিছু চকোলেট সংগ্রহ করে নিল , আর এক ডাক্তার এলেন উনি ১৯ বছর ধরে চিকিৎসা করছেন , জনস্বার্থে উনি একটি চটি বই লিখেছেন , পুরনো ঘা থেকে লিভার ক্যান্সার সবকিছুর ঘরোয়া পথ্য আছে ৷
উল্টোডাঙ্গা ঢোকার আগে আমি ৪ ইঞ্চি বসার জায়গা ম্যানেজ করে ফেললাম , অপূর্ব তখনও শ্রেনী সংগ্রামের বিরুদ্ধে লড়ে চড়েছে , লোকাল ট্রেনে না উঠলে কোনওদিনও জানা যাবে না পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া আসলে কি বস্তু?
উল্টোডাঙ্গাতে একজন গায়ক উঠলেন , সম্ভবত ওনার দন্তে কোনও অসুবিধা রয়েছে, উনি 'দন্ত্য স' বলতে পারেন না, অগত্যা 'শ' দিয়ে কাজ চালিয়ে নেন।
" আজ আমি আপনাদের শামনে একটা শংগিত শোনাতে চাই, শামনের দিকের দাদারা একটু শোরে বশবেন "
উনি ' নয়ন শরোষী ' গাইলেন
দমদম ছাড়বার সাথে সাথে পাশের ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম " দাদা হাবরা কতক্ষন লাগবে? '
হাবরা ! আরে এটা তো ডানকুনি যাবে!
কি বলেন কি? আমাকে যে বলল হাবড়া যাবে!
আরে দাদা এটা দমদম থেকে কেটে ডানকুনি যাবে।
খেয়েছে, এমনিতেই দেরী করে বেরিয়েছি তারপর ভুল ট্রেন! শুভ্রর বাড়ির খাওয়াটা বুঝি আর হল না।
পেছন থেকে এক সহৃদয় ব্যক্তি বললেন "বেশী তাড়া থাকলে লাফ দিয়ে নেমে যান , এখনও ট্রেন আস্তে আস্তে চলছে "
বলছেন না দাবী করছেন ?
'আরে নেমে পড়ুন , জোরে চললে আর পারবেন না ৷ '
এতো দেখছি রীতিমত দাবি , যাকে বলে ' পথের দাবি '
অপূর্বর সহমত পেয়ে দিলাম লাফ , ভূপৃষ্ঠে অবতরনের পর দেখলাম , সেই সহৃদয় ব্যক্তিও মাটিতে দাঁড়িয়ে দন্ত বিকশিত করতে করতে এগিয়ে আসছেন ৷ কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই বলে উঠলেন
হেঁ হেঁ হেঁ ! ইয়ে মানে আমিও তো ভুল ট্রেনে উঠেছিলাম ৷ একা একা লাফ দেব , দেখলাম আপনারাও ভুল করেছেন , তাই ভাবলাম .......
বুঝলাম , সমবেত লাফ ৷

- অভিষেক বোস