Saturday, December 21, 2019

জামিয়া

জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, নামটা শুনেই কেমন বোম বাঁধার কারখানা মনে হচ্ছে না?  মনে হবে নাই বা কেন! উর্দুতে 'জামিয়া' শব্দের অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় আর 'মিলিয়া' মানে জাতীয়। তাতে কি হলো! আরে ইসলামিয়া তো আছে, ওটাতেই তো যতো গন্ডগোল।
না হে আমি এখানে ইসলাম আর সনাতন ধর্মের তুলনা করতে আসিনি, এটা বরং একটু সময় কাটানোর জন্য পড়ুন।

জামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গড়ে ওঠার জন্য যারা সমর্থন করেছেন তাদের মধ্যে গান্ধীজি (নাম শুনেই কেমন গা জ্বালা জ্বালা করছে না?) আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্যতম। এনারা মনে করতেন জামিয়া হাজার হাজার শিক্ষার্থীর সংস্কৃতি আদান প্রদানের কেন্দ্র হওয়ার উপযুক্ত। ঐ যে দু হাত ছড়িয়ে কোমরটা এলিয়ে দিয়ে যে পোস টা জীবনে অন্ততঃ একবার দিয়েছেন সেই শাহরুখ খান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ( হজম হলো না তো? কেমন একটা চোঁয়া ঢেকুর উঠছে, হাজার হোক মুসলমান), আচ্ছা ছাড়ুন, ভক্তকুলের আরাধ্যা অঞ্জনা ওম কাশ্যপ ( আজ তক চ্যানেলের) এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। কিরন রাও, গগন অজিত সিং (হকি), বীরেন্দ্র সেহ্ বাগ (উফফ্ কি পাকিস্তান কে পেটায় মাইরি!), অনশু গুপ্তা ( Senior DGM L&T),  রীতু কাপুর ও এখানকার ছাত্র ছাত্রী। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর নাজমা হেপতুল্লা বিজেপির প্রাক্তন সহসভাপতি আর ছ ছ'বার রাজ্যসভার সাংসদ (বিজেপি)। উনি আবার আমির খানের তুতো আত্মীয় আর মৌলানা আবুল কালাম আজাদ এর নাতনি। তাতে কে কিছু এসে যায়!? আচ্ছা দেখুন তো এটা শুনে ভালো লাগে কি না? জামিয়া তে ইঞ্জিয়ারিং আর ন্যানো সায়েন্স, ন্যানো টেকনোলজির সাথে সাথে বিভিন্ন ভাষার শাখা রয়েছে যার মধ্যে অন্যতম হলো সংস্কৃত।

আসুন এবার দেখে নিই বিভিন্ন দেশি বিদেশি সংস্থা কি বলছে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে।

Jamia Millia Islamia (JMI) has been ranked at 3rd position among the top 25 Central Universities and at 17th rank among top 100 universities by Outlook-I Care India University Rankings 2019,

Jamia Millia Islamia (JMI) is among the very few academic institutions from India which has improved its position in Times Higher Education World University Rankings (THE) 2020 .

It was ranked 19 in India overall by the National Institutional Ranking Framework (NIRF) in 2019

The Faculty of Law was ranked sixth in India by Outlook India's "Top 25 Law Colleges in 2017"[44] and 20th in India by The Week's "Top Law Colleges 2017

কিস্যু বোঝা গেল?  আরো একটা অভিযোগ আছে জামিয়া তে 50% ইসলাম ধর্মের লোকেদের সংরক্ষণ রয়েছে, কালকেই আমার এক খুব ভালো বন্ধুর পোস্টে পড়লাম। দেখলেন তো কেমন টুটি চিপে ধরা গেল। কথাটা অর্ধেক সত্যি। 30% মুসলিমদের জন্য, 10% মুসলিম মহিলাদের জন্য, 10% তফসিলি জাতি আর অন্য অনগ্রসর জাতির জন্য যারা ইসলাম ধর্মাবলম্বী। এছাড়াও স্বল্প দৃষ্টি, অন্ধ, প্রতিবন্ধী আর কাশ্মীরি পন্ডিতদের (একদম ঠিক পড়েছেন) জন্যেও সংরক্ষণ আছে। মোদ্দা কথা ইসলামিয়া নাম শুনে যদি গাত্রদাহ হয়, সেটা বোঝা যায় , কিন্তু তার জন্য ক্যাম্পাসে পুলিশের এইরকম অমানবিক মুখ দেখে আনন্দ হলে জেনে রাখুন একদিন শুধু নিধিরাম সর্দার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কিছু থাকবে না। জামিয়া কিম্বা JNU র কৃতিত্ব তাতে এক নয়া পয়সাও কম হয় না। আপনার পরবর্তী প্রজন্মকে উচ্চ শিক্ষার জন্য নিশ্চয়ই কোনো পার্টি অফিসে নয়, কলেজ ইউনিভার্সিটিতেই পাঠাবেন, তাই না। একের পর এক ইউনিভার্সিটিকে দেশবিরোধী তকমা দিলে হাতে থাকবে শুধু Whatsapp আর গুড মর্নিং মেসেজ। ছাত্ররা আন্দোলন করলে আপত্তি?  প্রয়াত অরুন জেটলিজি কে মনে আছে? ইমার্জেন্সির সময় ইন্দিরা গান্ধীর একনায়কতন্ত্রের সামনে বুক চিতিয়ে  দাঁড়িয়ে ছিল যে ছাত্রনেতা, শুধু জেটলিজি কেন ভারতবর্ষ আর গোটা বিশ্বের সব থেকে বড় বড় তাবর নেতারা ছাত্র আন্দোলন করেই উঠে এসেছে।  নিশ্চয়ই প্রতিবাদের ধরন হবে সংযত এবং গঠনমূলক তার মানে এই না যে দেশের সরকারের সব কথায় সমর্থন জানাতে হবে। দেশকে ভালোবাসার জন্য দেশের সরকারকে ভালোবাসতেই হবে এরকম কোনো সূত্র কেউ আবিস্কার করে যায়নি । আর মনে রাখবেন 10 জন ধৃতদের মধ্যে একজন ও ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়।  জামিয়ার ঘটনার প্রতিবাদ করেছেন বিজেপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ( নাম বলব না, খুঁজে নিন)

34-35  বয়সে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ছে বলে হাসি পাচ্ছে, রাগ উঠছে যে আপনার পয়সা ধ্বংস হয়ে গেল।  জেনে রাখুন PHD করতে গড়ে প্রায় আট বছর সময় আর অন্ততঃ তেত্রিশ বছর বয়স হয়ে যায়। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী আঠাশ বছরে B.A আর 33 বছর বয়সে M.A পাশ করার দাবি করেছেন।

আজ যদি আপনি মনে মনে হর্ষিত হয়ে থাকেন, সরকার যা করেছে ভালো করেছে তাহলেও চিন্তার কোনো কারণ নেই। একটা একটা করে সব ভালো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে বিরুদ্ধ কথা শুনলেই যদি দেশ বিরোধী তকমা দিয়ে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয় তাতেও অন্ততঃ হাতের কাছে একটা ইউনিভার্সিটি থাকবেই থাকবে Whatsapp University.

- অভিষেক

Tuesday, December 3, 2019

❤️'মাফিন' ❤️


নভেম্বরের ২০ তারিখের দিকে 'মাফিন' এর আসার কথা, কিন্তু মাফিন আমার মতোই অধৈর্য। অত রয়ে সয়ে কাজ করার সময় ওর নেই। অক্টোবরের শেষদিকে হঠাৎ জানিয়ে দিল নভেম্বরের প্রথম দিকে ঐ ৭ তারিখ নাগাদ ও আসবে। এদিকে আমার তো অফিসে ছুটি আগে থেকেই প্ল্যান করে রেখেছি, এখন মাফিন এর আসার দিনটা এগিয়ে এসে সব প্ল্যান এর দফারফা। প্রিয়াঙ্কার তো চিন্তার শেষ নেই, কোথায় থাকতে দিবে, কোন ঘরে ঘুমোবে, কতবার খেতে দিতে হবে। মোদ্দা কথা মাফিন এর মেজাজ মর্জি কিছুই আমাদের জানা নেই! ঐ তিন চারটে প্রায় অস্পষ্ট সাদা কালো ছবিতে যতটুকু দেখেছি, এবারে প্রথম সামনে থেকে দেখব।

নভেম্বরের ৬ তারিখে সবাই মিলে মাফিন কে আনতে গেলাম, সবাই মানে মোটামোটি সব্বাই, আমি- প্রিয়াঙ্কা, আমার আর প্রিয়াঙ্কার মা বাবা, আমার পিসতুতো মাসতুতো ভাই দাদা বোন সব্বাই।

একেবারে ভিতরের গেট অব্দি শুধু প্রিয়াঙ্কাকেই যেতে দিল, আর আমাকে লবি অব্দি। প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশ মিনিট কেটে গেছে, এদিকে না প্রিয়াঙ্কা বেরিয়ে আসছে, না মাফিন।  আরো কিছুটা সময় কেটে যাওয়ার পর আমার সত্যিই প্রিয়াঙ্কা আর মাফিন এর জন্য চিন্তা শুরু হয়ে গেছিল, এক একটা সেকেন্ড এমন ভাবে কাটছিল যেন চোখ বন্ধ করে কপালের উপর একফোটা একফোটা করে জল। এদিকে কতজনের পরিচিতরা দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসছে আর তাদের দেখে বাইরের মানুষগুলোর আনন্দ একটা দেখার মত দৃশ্য। শেষমেষ আমার সব দুশ্চিন্তা  কাটিয়ে একজন পরিচিত মুখ এসে জানালো মাফিন চলে এসেছে, জিজ্ঞেস করলাম প্রিয়াঙ্কা!?  বলল প্রিয়াঙ্কাও আসছে, দুজনের দেখা হয়েছে একটু পরেই বেরিয়ে আসবে।

ফুটবল খেলতে ভালোবাসতাম, এতটাই ভালোবাসতাম যে মাধ্যমিক পরীক্ষা না দিয়ে S.A.I এর টুর্নামেন্ট খেলতে যাবো ঠিক করেছিলাম, সিলেকশনের হওয়ার মূহুর্তেও এতটা আনন্দ হয়নি, সত্যি কথা বলতে পৃথিবীতে আর যা কিছু, প্রথমবার ভোরবেলা কাঞ্চনজঙ্ঘার উপর সূর্যের প্রথম ছটা, প্রথমবার তাজমহল চোখের সামনে দেখা,  কোনো বুনো ঝর্ণার নীচে কোনকিছু না ভেবে নেমে যাওয়া, প্রথমবার কোনো পাহাড়ি নদীতে সাঁতার কাটা আরো অনেক কিছুর চেয়েও অনেক অনেক বেশি আনন্দ। ছোটবেলা থেকে আজ অব্দি অনেকগুলো টুকরো টুকরো ঘটনা বায়োস্কোপের ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠছিল, মাঝখানে আরো দশ বারো মিনিট কেটে গেছে, তারপর ঠিক পূজার ভোরের শিশির ভেজা শিউলির মতো 'মাফিন' প্রিয়াঙ্কার সাথে আমার সামনে এলো। আমাদের ফুটফুটে মেয়ে 'মাফিন', আমাদের খুশির ক্যালেইডোস্কোপ আমার চোখের সামনে!! নরম তুলতুলে ছানাটাকে তখনই বুকে তুলে নিতে ইচ্ছে করছিল। ৬ই নভেম্বর জগদ্ধাত্রী পূজার দিন, নীচে আমাদের মা বাবা, গোটা পরিবার অপেক্ষা করছে  কতক্ষণে মাফিন কে দেখবে! প্রিয়াঙ্কার তখনও চোখগুলো বুজে আসছে,  তাও ঠোঁটের কোণে হাসি...

Friday, August 30, 2019

অ্যামাজন

এই কলকাতার গড়িয়াহাট থেকে যদি জল ছিটান তাহলে কি অ্যামাজনের আগুন নিভবে? তাহলে আপনি কি করতে পারেন! পোস্ট করুন 'এতবড় একটা পরিকল্পিত দুর্ঘটনা ঘটে গেল আর কোনো মিডিয়াতে কোনো খবর হলো না।' দেখবেন আস্তে আস্তে অ্যামাজনের আগুন নিভু নিভু হয়ে আসছে, WhatsApp এ লিখুন পৃথিবীর ফুসফুস জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, দেখবেন কালো ধোঁয়া কমে আসছে। মিডিয়া খবরটাকে চেপে দিয়েছিল তো!? তাহলে কোন WhatsApp University থেকে আমরা জানতে পারলাম? ঠিক কবে জানতে পারলাম যে অ্যামাজনের জঙ্গল পৃথিবীর ফুসফুস? আচ্ছা ছাড়ুন, আশে পাশের খবর জানা আছে কিছু? ছোটনাগপুর মালভূমির খনিজ সমৃদ্ধ ১৭,০০০ হেক্টর বনভূমি আদানিকে দিয়ে দিয়েছে সরকার, ২০১৬ সালে উত্তরাখন্ড - হিমাচলের জঙ্গলে আগুন লেগে পুড়ে গেছে ৩৫০০ হেক্টর বনভূমি । কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশ-মহারাষ্ট্রে যে দাবানলের ঘটনা ঘটেছে বা ঘটানো হয়েছে তাতে ফুসফুস না হোক কানের লতিকা, হাটু কিম্বা কনুই কোনো কিছু জ্বলেছে কি !!! ভারতে ২০০৩ থেকে ২০১৭ অব্দি যেখানে দাবানলের সংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ৪৬% গত দুবছরে সেটা বেড়ে হয়েছে ১২৫%। সবথেকে বেশি দাবানল ঘটেছে মধ্যপ্রদেশ (৪৭৮১), ওড়িশা (৪৪১৬) আর ছত্তিশগড়ে (৪৩৭৩)। তবে চিন্তার কোনো কারন নেই 'বাজেট টু ফাইট ফরেস্ট ফায়ার' এর বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে অর্থনীতি ঝড়ঝড়ে হয়ে ওঠে। যে বিপুল ৪৫-৫০ কোটি টাকা ফরেস্ট ফায়ার প্রিভেনশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ফান্ডে রয়েছে সেটাও খরচ হয়নি। অ্যামাজনের ঘটনা যদি (! ) ঘটানো হয়ে থাকে তাহলে সেটাই হবে এই শতাব্দীর সবথেকে বর্বরোচিত কাজ, কিন্তু ফুসফুস বাঁচিয়ে রাখার দায় কি শুধু ব্রাজিলের? উন্নত বিশ্বের দেশগুলো গ্রিন হাউস গ্যাস বাড়িয়ে যাবে আর পরিবেশ রক্ষার দায় শুধু অ্যামাজনের আশে পাশের গরীবগুর্বো দেশগুলোর! প্রতি বছর Co2 এমিশনের হিসেবে প্রথম তিনটে সারির দেশগুলো হলো চায়না ১০.২ গিগাটন, ইউ এস ৫.৩ গিগাটন আর ভারত ২.৫ গিগাটন (source UNFCC, European Commission, UNFAO)। আপনি বা আপনার দেশ যত বেশি এগিয়েছেন তত বেশি কার্বন ফুটপ্রিন্ট পেছনে ছড়াতে ছড়াতে এসেছেন। ৭৫% কার্বন এমিশনের কারন ; বিদ্যুৎ উৎপাদন (২৫%) , চাষবাসের জন্য জঙ্গল সাফাই আর গবাদি পশু থেকে উদ্ভূত মিথেন গ্যাস (২৪%), নির্মান (২১%) (যেখানে শুধু সিমেন্ট আর স্টিল উৎপাদনের জন্য প্রচুর পরিমানে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রয়োজন ।এমনকি যদি ভবিষ্যতে zero carbon energy দিয়েও উৎপাদন শুরু হয়, তাতেও Chemical reaction এ Byproduct হিসেবে কার্বন নিঃস্বরন হবেই হবে ), পরিবহন (১৪%) । একটু পাশ কাটিয়ে চলে আসুন, কারন এগুলোর জন্য আমি আপনি কেউ দায়ী নই, এটা তো রাষ্ট্রের দায়, ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেই হলো ! আমরা শুধু AC আর ফ্রিজ চালিয়েছি আর একটু আধটু এই ধরে নিন ৬% গ্রিন হাউস গ্যাস বাড়িয়েছি, তার থেকে বেশি কিছুই না। তবে দায় কিন্তু শুধু ব্রাজিলের, কেননা ফুসফুস তো ওদের ভাগে পড়েছে। দায়িত্ব যখন পেয়েছে তখন ওদেরকেই সামলাতে হবে। গোটা পৃথিবীতে যখন সমস্যা কোথাও বেশি কোথাও কম তখন আমাদেরই প্রতিবেশী দেশ ভুটান অফিসিয়ালি কার্বন নেগেটিভ দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এক্কেবারে পুঁচকে, পৃথিবীর মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না, এরকম একটা গরীব দেশ এই স্বীকৃতি পেয়েছে। কার্বন নেগেটিভ মানে একটা দেশের কার্বন নিঃস্বরনের থেকে সেই দেশের সবুজ বনভূমির কার্বন শোষন ক্ষমতা যেখানে বেশি। ভুটানের কার্বন ফুটপ্রিন্ট ২.২ মিলিয়ন টন (ভারতের কার্বন ফুটপ্রিন্ট ১০০০ গুন আর চীনের ৫০০০ গুন বেশি) আর ভূটানের বিস্তীর্ণ বনভূমির কার্বন শোষনের ক্ষমতা ৬ মিলিয়ন টন (মানে উৎপাদিত কার্বনের তিনগুন বেশি শুষে নেওয়ার ক্ষমতা )। পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশ যখন কার্বন নিউট্রাল হতেই হিমশিম খাচ্ছে, তখন ভুটান কার্বন নেগেটিভ দেশ। বিশ্বের দু'দুটো বিরাট দেশ ভারত আর চীনের উন্নয়নের হাটুর মাঝে আটকে, আর দুটো দেশের কার্বন ফুটপ্রিন্টের শিকার হয়েও শুধু নিজেদের চেষ্টায় ভুটান Carbon Negative হতে পেরেছে, কেন জানেন ? ভুটানে উন্নতির মাপকাঠি বোঝাতে Gross National Product নয় Gross National Happiness এর প্রসঙ্গ আসে। ভুটানের নিয়ন্ত্রকরা শুধু বুলিতে নয় কিম্বা নির্বাচনের প্রচারে নয় , মন থেকে বিশ্বাস করে অর্থনৈতিক উন্নতির সার্থকতা তখনই যখন ভুটানের প্রত্যেকটা মানুষ তাতে খুশি হবে। সমীক্ষা বলছে ৯১ শতাংশ ভুটানি তাদের দেশে খুশিতে রয়েছে । শুধু Social Media বিজ্ঞাপনী স্লোগান নয় রীতিমতো আইন প্রনয়ন করে বনভূমি রক্ষা করেছে, কাঠের গুড়ি রপ্তানি বন্ধ করেছে, ছ'তলার ওপর যেকোনো রকম নির্মান বন্ধ করা হয়েছে , ইলেকট্রিক গাড়ি, জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উপর জোর দিয়েছে। আগামী লক্ষ্য সীমা ২০২০ র মধ্যে পুরোপুরি Organic Agricultur আর ২০৩০ এর মধ্যে Waste Free দেশ হওয়ার । Trillion Dollar Economy ছাড়ুন, ভুটানের GNP মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার। বোঝার জন্য শুধু এইটুকু জানুন ভারতের সবথেকে ধনী মানুষ মুকেশ আম্বানির সম্পত্তির পরিমান ১৮.৯ বিলিয়ন ডলার । তাই ভুটান গরিব সারির দেশগুলোর সাথেই থাকবে। তবে কোনোদিন যদি ভুটানও আমাদের মতো চালাক হয়ে যায়, আর দেশের অর্থনীতিকে প্রথম সারিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবুজ বন জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে বড় বড় কোম্পানির হাতে তুলে দেয় তখন ফেসবুকে পোস্ট দিতে ভুললে চলবে না 'ভারতের পাশে পৃথিবীর ছোট্ট কিডনি জ্বলছে আর মিডিয়া চুপ করে আছে।'

- অভিষেক বোস

Friday, August 9, 2019

বাগান বাড়ির খবরাখবর

আমাদের পাড়ার শেষ প্রান্তে একটা বাড়ি আছে । ভারী সুন্দর বাড়ি, আমরা বলতাম বাগান বাড়ি। ভারী সুন্দর বললাম ঠিকই কিন্তু পাড়ার লোকের জন্য কিন্তু অবাধ অবারিত প্রবেশ ছিল না। বাগান বাড়িতে অনেকগুলো পরিবার ছিল, আর ছিল তাদের অবোধ্য মেজাজ। কানাঘুষো ছিল পাশের পাড়ার সাথে নাকি বেশ মোলায়েম সম্পর্ক। আমাদের পাড়ার অনেকেই নাকি ও পাড়ার লোকদের কারনে অকারণে অহরহ আসতে দেখেছে। আগে অবশ্য দুটো নয় একটাই পাড়া ছিল, নতুন পৌরপ্রধান আসার পরে শহরের বুক দিয়ে একটা গভীর ড্রেন কাটা হয়, তারপর সেটাকে কংক্রিট দিয়ে ভালো করে বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঐ ড্রেনটাই এখন এ পাড়া ও পাড়ার সীমানা। ড্রেন নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি লেগেই থাকে, কে নিজের বাড়ি পরিস্কার করে ঐপারে ফেলে দিয়ে আসে, কে ড্রেনের  কাদা নোংরা এপারে তুলে রেখে আসে, তবে যদ্দুর জানি ঐ পাড়ার লোকেরাই বেশির ভাগ সময়ে খাওয়ার পরে এঁটো নোংরা, প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরে এপারে চালিয়ে ফেলে দেয়। এইসবে অবশ্য বাগান বাড়ি নোংরা হয় সব থেকে বেশি। বাগান বাড়িটা আগে এক জমিদারের বাড়ি ছিল, তবে জমিদারির আর কিছু বাকি ছিল না।  একসময়ে একরকম বাধ্য হয়েই বাইরের কিছু অতিথিশালার মতো ঘরগুলোকে একটা সরকারি দপ্তরের হাতে লিজ্ দিয়ে দেয়। আর বাকি বাড়িতে পরিবারের নিকট দূর সম্পর্কের লোকেরা থাকতে শুরু করে। একবার বাড়িতে চরম গন্ডগোল হয় আর জমিদারের  পরিবারের কিছু লোককে পরিবারের অন্য লোকেরা বের করে দেয়। বাগান বাড়িতে অশান্তি সারাবছর চলতেই থাকে তবে বাগান বাড়ির ভেতরে একটা পোড়ো শিবমন্দির আছে, বহু পুরনো মন্দির। এপাড়ার লোকেরা খুব মানে। শ্রাবনের প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করলে বাগান বাড়ির বাগানের মাটি নরম হতে শুরু করে আর বাগান বাড়ির মানুষদের মনও । শ্রাবন জুড়ে বাগান বাড়ির দরজা খোলা থাকে, যারা পুজো দিতে আসে বাগান বাড়ির লোকেরাই তাদের হাত ধরে মন্দির অব্দি নিয়ে যায়, তারপর শ্রাবন ফুরোলেই আবার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। একবার অবশ্য ভরা শ্রাবনের সময় যখন এপাড়ার লোকেরা দল বেঁধে পুজো দিতে যাচ্ছিল, তখন ওপাড়ার কিছু বেয়াদপ বাইরে থেকে ইট পাটকেল ছুড়তে শুরু। অনেকের মাথা ফেটে যায়, অনেকের চোট আঘাত লাগে, তবে ভক্তের দল তাতে থেমে যায় না, ফি বছর শ্রাবনে বাগান বাড়ির দরজা খুলে যায় আর এ পাড়ার লোকেরা দল বেঁধে বাগান বাড়িতে পুজো দিত যায়।  তবে কিছু কিছু লোক অসময়ে বাগান বাড়িতে ঢুকে পড়ত। তাদের কাছেই শুনতে পাওয়া যেতো, যে বাগান বাড়িটা নাকি ছবির মতো সুন্দর আর বাগান বাড়ির মানুষজনও নাকি ভীষন আন্তরিক, কিছু লোকের অভিজ্ঞতা আবার অন্যরকম। এইরকমই চলছিল, বাগান বাড়ির অশান্তি আর অশান্তির গল্প ছিল পাড়ার লোকদের  সবথেকে বেশি আলোচনার বিষয়। পাড়ার মাথারা মাঝে মধ্যে গন্ডগোল অশান্তি থামানোর চেষ্টা করলেও খুব বেশি কিছু করে উঠতে পারেনি।  হাবুল মিত্র আর  গোবিন্দ সাহা পাড়ার মাথা হওয়ার পর থেকে ক্লাবের ছেলেরা বলে দিয়ে আসল এই পাড়ায় থাকতে গেলে, এই পাড়ার মতো করে থাকতে হবে। বাগান বাড়ির কয়েকটা পরিবার তাতে সম্মতি জানালো, কয়েকজন আবার সামনাসামনি না বললেও জানালো আমরা ড্রেনের উপর একটা সিমেন্ট এর স্ল্যাব ফেলে দিয়ে ওপার দিয়ে যাতায়াত করব, তবে বাগান বাড়ির বেশির ভাগ লোকেরই দাবি 'না এ পাড়ার সাথে, না ও পাড়ার সাথে, আমরা নিজেদের মতো থাকতে চায়।'  এইসব ছোটখাটো গন্ডগোল সামলাতে সাহা-র জুড়ি নেই। একদিন ক্লাবের ছেলেদের সাথে নিয়ে গোবিন্দ আর হাবুল ভেতরে ঢুকে গেল, আর ঢুকেই প্রথমে সদর দরজায় ভেতর থেকে তালা মেরে দিল। বাগান বাড়ির সদস্য যারা বাইরে বেরিয়েছিল তারাও আর ভেতরে ঢুকতে পারছিল না। ভেতরে কি চলছিল কেউ জানতে পারছিল না। সন্ধ্যাবেলা প্রথমে গোবিন্দ সাহা আর আরো গভীর রাতে হাবুল মিত্র জানালো 'বাগান বাড়ির সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। বাগান বাড়ির দোতলার লোকেরা আর সামনের সিড়ি দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে না, ওরা ব্যবহার করবে পেছনের সিড়ি আর বাগান বাড়ির একতলার লোকেরা আর দোতলার ছাদে উঠতে পারবে না, আশা করা হচ্ছে বাগান বাড়িতে আর কোনো ঝগড়া অশান্তি হবে না। বাগান বাড়ির বাগানের একটা অংশে ক্লাবের একটা অফিস হবে সাথে থাকবে ক্যারম বোর্ড আর ছোট্ট একটা লাইব্রেরি। তাতে পাড়ার ছেলে ছোকরারা পড়াশোনা করবে, বিকেলে একটু খেলাধূলা করবে, মনটা ভালো থাকবে। বাগান বাড়ির ছেলেরাও সেখানে আসা যাওয়া করতে পারবে। এতে করে মেলামেশা বাড়বে, পারস্পরিক ভুল বোঝাবোঝি কমবে। পাড়ার লোকেরা এইসব শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল 'যাক এতদিনে একটা কাজের কাজ হয়েছে।' কয়েকটা ফিচেল মনে মনে ভাবল এবারে বাগান বাড়িতে ঢুকতে পারলে ঐ বাড়ির মেয়েদের ঝাড়ি মারা যাবে, ওদের দেখলে অবশ্য খেদি পে‍ঁচিরাও মুখ ঘুরিয়ে নেয়, তবু আশা। একজন জানালো বাগান বাড়ির জায়গা প্লট করে বিক্রি হলে দু'কাঠা জমি সে কিনবে, তার নিজের বাড়িটা অবশ্য গত বছর প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার টাকায় তৈরী।  দু একজন জানালো ক্লাব সম্মতি দিলে, বাগানের পাশে লাইব্রেরির সামনে সে একটা রোলের দোকান খুলতে চায়। এত লোকজন বিকেল বেলায় আসবে, খুব একটা খারাপ ব্যবসা হবে না। ক্লাবেরই কারা সব বলল বাগানের একটা দিকের ঝোপঝাড়, গাছপালাগুলো কেটে দিয়ে এ বছর ওখানেই 'সাংশকিতিক পোতিযোগিতা' হবে। মোটের উপর বাগান বাড়ির অশান্তি শেষ হলো, গোটা পাড়ার লোক এখন খুশি । বাগান বাড়ির দরজা এখন সারা বছরের জন্য খোলা.....

— অভিষেক বোস

Friday, May 17, 2019

নির্বাচন

সকাল বেলায় একটা বেশ মজার মিম্ চোখে পড়ল " এত মারামারি, খুন খারাপি সবই নাকি দেশের একটু সেবা করার সুযোগ পাওয়ার জন্য। "

আহা রে!  সত্যিই তো এখানে তো কিছুই পাওয়ার নেই, শুধুই বিলিয়ে যাওয়া। তার জন্য দিন রাত এক করে খেটে যাওয়া।

আমার আবার পুরনো  কিছু কথা মনে পড়ে গেল। আমাদের বাড়ির একটু দূরেই টাউন স্কুলে নির্বাচনী বুথ হতো আর বুথ থেকে ৫০০ মিটার দূরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অস্থায়ী ছাউনি করে দলীয় ব্যানার পতাকা সাজিয়ে, টেবিল চেয়ার নিয়ে বসে থাকত। আমি বিজেপির ছাউনিতে  বসতাম।

এই রে! আমি আমার রাজনৈতিক পরিচয় দিতেই ভুলে গেছি। জানিয়ে রাখি আমি ছোটবেলায় যখন  রাজনীতির বর্নপরিচয় শিখে উঠিনি তখন রাজীব গান্ধী (গাঁধী নয় ) কে পছন্দ করতাম। কেন, কি জন্য, তখনও বোঝার মতো বয়স হয়নি, তবে টিভির পর্দায় রাজীব গান্ধীর ব্যক্তিত্ব দারুণ লাগত। আশেপাশে কংগ্রেসের পরিবেশ ছিল অতএব আমি ঠিক করে নিলাম 'আমি কংগ্রেস' । এত তাড়াহুড়ো করবেন না, সবে তো প্রাইমারি স্কুল। এখন আমি  রাস্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (RSS) শিশু সদস্য। নিয়ম করে শাখার মাঠে যায়। বিশ্বাস করুন ওখানে খেলাধূলা ছাড়া আর ভালো ভালো কথা ছাড়া কোনোদিনও কোনো কথা শুনিনি শিখিওনি। কোনো রাজনৈতিক কচকচানি কোনোদিনও আলোচনা হয়নি। এদিকে হল কি বাবার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিজেপি থেকে বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হলো আর বাবাও বন্ধুর সাথে নেমে পড়ল। আমাদের বেশ কিছু আত্মীয়সম প্রতিবেশীরা বিজেপি করতো। এরা সবাই খুব ভালো মানুষ তাই একদিন আমি ঠিক করলাম 'আমি বিজেপি!'  তখন হুড খোলা জিপে নয়, পায়ে হেটে প্রচার চলতো, বড়দের প্রচার শেষ হয়ে গেলে আমিও দলবল জোগাড় করে ছোট ছোট 'কংগ্রেসের পতাকা' হাতে নিয়ে স্লোগান দিতাম "ভোট দিবেন কোনখানে? পদ্মফুলের মাঝখানে।"

তো যাই হোক আমি বিজেপির ছাউনি তে বসতাম, সামনে আর পাশাপাশি কংগ্রেসে আর সিপিএমের টেবিল থাকত। এইসব টেবিলের সামনে চা, জল, সরবতের ব্যবস্থা থাকতো। ভোট দিতে যাওয়ার আগে আমাদের পাড়ার ভোটাররা নিজেদের পছন্দ মতো ছাউনির সামনে হাসি বিনিময় করে স্লিপ নিয়ে বুথের দিকে রওনা দিতো। মাঝে মাঝে খবর আসতো কে কার ভোট দিয়ে পালিয়ে গেছে। এই নিয়ে ছোটখাটো কথা কাটাকাটির মাঝেই দুপুর গড়িয়ে আসতো। এইবারে খাবারের প্যকেট আসবে। মোটামুটি বিজেপির হলুদ পোলাও আর আলুর দম , কংগ্রেসের রুটি, মাংস আর সিপিএমের পোলাও মাংস এইরকম কিছু একটা মেনু হতো। আমি একটু খেতে ভালোবাসি আর এদিকে বিজেপির প্যাকেট তখনও রেডি হয়নি, কে একটা এসে খবর দিয়ে গেল প্যাকেট এখনও এক দেড় ঘন্টা দেরি। ধুস শালা! এইসব পার্টির উপর এইজন্য কোনো ভরসা করিনা। উল্টো দিকে তখন কংগ্রেসের রুটি মাংসের খোশবাই বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি মনে মনে তখন  আবার কংগ্রেস। কিছুক্ষন পরে কংগ্রেস আর সিপিএমের লোকেরা একটা দুটো করে প্যাকেট বিজেপির কাছে দিয়ে গেল।  সিপিএমের পাড়াতুতো কাকু আমাদের ছোটদের হাতেও একটা একটা করে প্যাকেট ধরিয়ে দিল। একটু লোভী বটে তাই বলে নিজের রাজনৈতিক সত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়ে সিপিএমের খাওয়ার! ছ্যাঁ ছ্যাঁ!  গম্ভীর মুখে বললাম আমি বিজেপি করি। সিপিএম কাকু চোখটা পাকিয়ে বলল 'দিব একটা কানমলা, চুপচাপ খা'। বেলা বাড়তে থাকে আরো কিছু গন্ডগোলের খবর আসে। কার যেন একটা মাথা ফেটে যায়, একটা কংগ্রেস দিদা আর দাদু সিপিএমের ছাউনির সামনে এসে বাপ বাপান্ত করে যায়। আস্তে আস্তে বিকেল ঢলে পড়ে আর আলাদা আলাদা ছাউনির লোকগুলো আবার একসাথে ক্লাবে আড্ডা মারতে চলে যেতো, আর আমরা বালখিল্যবাহিনী সব দলের ফেস্টুন পতাকা ছিঁড়ে হাতে নিয়ে মহাজোট বানিয়ে আবার হুল্লোর শুরু করে দিতাম। কোনো সোশাল আনসোশাল মিডিয়াতে পতাকা ছিঁড়ার ফোটো ভাইরাল হতো না। সন্ধ্যাবেলায় কোনো চ্যানেলে আলোচনা সভা বসতো না "এই যে ছোট ছোট বাচ্চারা ভোট শেষ না হতেই বিজেপির পতাকা ছিঁড়ে দিল, এর পেছনে কোথাও কি কোনো দেশদ্রোহী কংগ্রেস অভিভাবকদের ভূমিকা নেই।"

মোদ্দা কথা ভোট শেষ হলেই আবার সব স্বাভাবিক। আসছে বছর আবার হবে আবার প্যকেট ভাগাভাগি। তাই বলে কি অশান্তি হতো না!? আলবাত হতো। অশান্তি হতো, মারামারি হতো, চুলোচুলিও হতো। কিন্তু সারা বছর ধরে বর্ষাকালের কোলা ব্যাঙের মতো আমার পার্টি ভালো, আমার নেতা ভালো আর তোর নেতা চোর গোছের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ শুনতে হতো না।

আচ্ছা এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন আমি বিজেপি। এত তাড়াহুড়ো করবেন না। এখন তো সবে হাই স্কুলের গন্ডি পেরোবো। পাড়ায় পাড়ায় তখন সিপিএমের রমরমা। আমাদের ওয়ার্ডের Left Wing এর যুব শাখা DYFI এর নির্বাচন। পাড়ার দাদারা বলল চল আমাদের সাথে, অতএব আমি এখন বামফ্রন্ট।  মিটিং এ গিয়ে বারবার শুনছিলাম আমাদের এত সদস্য, আমাদের এত বড় সংগঠন। মিটিং এর উদ্যোক্তাদের মধ্যে একজন আমাকে ডেকে বলল 'তুই তো ভালো বলিস, তুই আমাদের নতুন সদস্য, তুই কিছু বল।' বললাম 'এই যে সংখ্যা সংখ্যা করছ, এক্ষুনি খাওয়ারের প্যাকেট গুলো বিলি করে দিলে ভীড় হালকা হয়ে যাবে, তার উপর আমার খুব সন্দেহ এখানে অর্ধেক লোক DYFI এর পুরো কথাটাও জানে কি না?'  এরকম ভাষনের জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলনা। যাইহোক সামলে উঠে একজন প্রবীন নেতা পার্টির উদ্দেশ্য বিধেয় বোঝাতে শুরু করল। আর আমি ততক্ষণে বুঝতে পেরেছি আমার উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন এবার বিদেয় নেওয়াই ভালো। অতএব এতক্ষণে আমার রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চয়ই জেনে ফেলেছেন। আহা রাগ করছেন কেন? আমি তৃণমূল ও করেছি।  এখন কিন্তু আমি চাকরি করি, একটা রাতে কেন তৃণমূল এর সরকার আসা উচিৎ এই নিয়ে আমার ফ্ল্যাটে এক কমরেড এর সাথে তুমুল তর্ক চলছে বক্তা দুজন আর শ্রোতা তিনজন। ভোর হয়ে আসছে, হঠাৎ করে চতুর্থ শ্রোতার গম্ভীর আওয়াজ কানে এল। পাশের বাড়ির পঙ্কজ'দার আওয়াজ "অভি, বন্ধ করো এই আলোচনা।" দেখলেন, কেমন জ্বালাময়ী ভাষন দিয়ে পাশের বাড়ির লোককে অব্দি জাগিয়ে রেখেছিলাম!?

কিন্তু কি আশ্চর্য পরদিন আবার কমরেড, তৃণমূল আর বিজেপির বন্ধুদের সাথে আড্ডা জমে যেতো। বিরূদ্ধ মতের জন্য কেউ কোনোদিন দেশবিরোধীও বলেনি বা আমিও কাউকে Urban Nuxal তকমা দেগে দিইনি। কোনদিনও  বলতে শুনিনি, অমুক নেতাকে সমর্থন করলে আমি দেশের সাথে নইলে দেশের বিপক্ষে। গনতন্ত্রে বিরুদ্ধ মত থাকবে না! প্রশ্ন করতে পারবেন না! তাহলে আর কিসের গনতন্ত্র? জেনে রাখুন আপনি আমিই দেশ, আমাদের নিয়েই দেশ। দেশের নেতা নেত্রীরা আমাদের নির্বাচিত সদস্য মাত্র । সাংসদরা কোনো দাদা দিদির নয়, আমার আপনার প্রতিনিধি। খারাপ লাগে যখন দেখি আমার আশে পাশের পরিচিতরা রাত দিন ভুয়ো খবর ছড়িয়ে চলেছে। প্রচার মাধ্যম কখন যে আমাকে, আপনাকেই প্রচারের মাধ্যম বানিয়ে ফেলেছে বুঝতেও পারিনি। অথচ কতটুকু সময় লাগে খবরটার সত্যতা পরখ করে নিতে!?  আপনার পছন্দের প্রার্থী যদি সত্যিই ভালো কাজ করে থাকে তাহলে এত প্রচারের প্রয়োজন কিসের? জানি বলবেন, প্রচার না করলে সাধারণ লোক তো জানতেই পারবে না। জেনে রাখুন ভালো কাজের ভালোটুকু যদি সাধারণ মানুষ অনুভবই না করতে পারে, যদি তথ্য আর তত্ত্ব দিয়ে আপনাকে বুঝিয়ে দিতে হয়, তাহলে সেটা কাগুজে ভালো কাজ। এই লোকসভা নির্বাচনের খরচা আনুমানিক পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা ( USA র থেকেও বেশি)। ভোটার পিছু খরচা প্রায় ৫৫০  টাকা যেখানে ৬০% এর বেশি লোকের দৈনিক আয় ২১০ টাকার ও কম। বিগত লোকসভায় খরচা ছিল আনুমানিক ২৫০ কোটি টাকা, এবছর ৫০,০০০  কোটি! ৮০০০ প্রার্থীর ভোট প্রচার, সারা বছর ধরে ইলেকট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া, Whatsapp, Facebook এ প্রচারের খরচাটা যোগ করলে অজুত নিযুত এর গুনতি ভুলে যাবেন। আর এইসবই কি জন্য? যাতে কিনা কিছু লোক দেশসেবা করার সুযোগটুকু পেতে পারেন। এই পরিমাণ টাকাটার সামান্য অংশ পেলেও দেশটার চেহারা বদলে যেতো, কোনো নেতার প্রয়োজন হতো না। যদি এই কথাটা মাথায় না ঢুকে, তাহলে আগের মতোই দিন রাত এক করে ফেসবুক whatsapp এ রাজনৈতিক জোকস, গুজব, ভুয়ো খবর ফরওয়ার্ড করতে থাকবেন।

আমি বরং আপনাদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখব, সিপিএম, বিজেপি, তৃণমূল, কংগ্রেস ছাউনিতে প্যাকেট ভাগ করে খাচ্ছে। আর ভোট শেষ হওয়ার পর কাধে হাত দিয়ে ক্লাবের আড্ডায় এক হয়ে যাচ্ছে।

অভিষেক বোস