Friday, December 9, 2016

ব্যাডমিন্টন

তখনও রাতে টর্চ নিয়ে ঘুমোতে যায়, আর সন্ধ্যা বেলায় মাফলার জড়িয়ে পড়তে বসি। আর শীতকাল বললে নভেম্বর ডিসেম্বর বুঝি। তখন, যখন বিশ্বাস করি ডট্ পেন দিয়ে শুধু বড়রা লিখে আর ফাউন্টেন পেন-এ কালি ভরতে গিয়ে দোয়াতের কালি গোটা হাতে মেখে বসে থাকি।

বিকেল বেলায় উলের হাফ সোয়েটার পড়ে ক্রিকেট মাঠে খেলতে গিয়ে ঠিক হল,
'যথেষ্ট ঠান্ডা পড়েছে রাতে ব্যাডমিন্টন চালু করতে হবে !' যেমন ভাবা তেমনি কাজ। আমার দাদুর বাড়ির সামনের রাস্তাটা বেশ চওড়া, সন্ধ্যা বেলায় চকের গুড়ো জোগাড় করে কোর্ট বানানো হল। আর একটা নাইলনের দড়ি বেঁধে নেট বানানো হল। কারা যেন বাড়ি থেকে এক জোড়া আধ ছেড়া র‌্যাকেট নিয়ে এল। এবার শুধু একটা শাটল্ কক্ এলেই খেলা চালু। একটা শাটল কক খুঁজে আনলাম, যার দুটো ফেদার ইঁদুরের পেটে গেছে।

সাড়ে সাতটা প্লেয়ার, কে আগে খেলবে ? সহজ হিসেব, যার যেমন কাঁচামালের যোগান। খেলার জায়গাটা আমার দাদুর বাড়ি তাই আমি প্রথমে থাকতেই পারি ! এরকম একটা প্রস্তাব দিতেই যাব আমার বাকি ভাই বোনরা খেঁকিয়ে উঠল।

পাশে দাদা গোত্রের কয়েকজন ওঁত পেতেই ছিল। যেই না সবে চালু শুরু আরম্ভ করব , 'একবার দেখি' বলে কোর্টে সার্জিকল স্ট্রাইক করল। চোখে চোখে ইশারা করে দু'জন ঠিক করে নিয়েছিল কেউ কাউকে আউট করবে না।
আমরা হাতপাখার মতো মাথা এদিক আর ওদিক করতে থাকলাম। শাটল্ ককটা আদতেই দুর্বল, বেশ কয়েক রাউন্ড এঁকে বেঁকে চলে শেষে হাত তুলে দিল।

'দিলে তো আমাদের খেলাটা শেষ করে!' সমবেত গালাগালি শুরু করতেই একজন পকেট থেকে দশ টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে বলল 'যা দুটো কিনে নিস' আর আমার বাড়িতে একটা নেট আছে নিয়ে আসিস।
আর শোন, কাল একটু তাড়াতাড়ি শুরু করিস একটা 500 ওয়াটের বাল্ব লাগিয়ে নিতে হবে।

পরদিন থেকে ধুন্ধুমার খেলা চালু হল। সন্ধ্যা বেলা হলেই জায়গাটা সরগরম হয়ে উঠত। গন্ডগোলটা শুরু হল পাঁচ দিনের মাথায়, যখন র‌্যাকেটবান আর র‌্যাকেটবতীরা 'তোদের সাথে আর খেলব না' বলে বেঁকে বসল।
আমার কাছে একখানা র‌্যাকেট ছিল বটে আর একটাও জোগাড় করা যেত, কিন্তু বালখিল্য বাহিনী ভীড় না করলে আর খেলে মজা কোথায় ? সুতরাং দুবার আউটের শর্তে র‌্যাকেট ভ্রাতৃদ্বয়দের রাজী করালাম।
আর আটকাতে হয়নি। ফিবছর শীত পড়লেই সাড়ম্বরে ব্যাডমিন্টন খেলা হত।

বেশ কয়েক বছর পর পড়াশোনার জন্য অন্য শহরে চলে আসতে হয়েছিল। শীতকালে বাড়ি ফিরে দেখলাম কেউ আর নেট টাঙায়নি।
আবার সবাইকে জড়ো করে একটা উদ্যোগ নেওয়া হল, যেকদিন বাড়িতে ছিলাম খেলা চলল, ফিরে এসে খবর নিলাম আবার বন্ধ হয়ে গেছে। জাঁকিয়ে শীত পড়তে শুরু করেছিল আর আমাদের সম্পর্ক গুলোও ঠান্ডা হচ্ছিল।

এখনও নিয়ম মেনে শীত পড়ে, কখনও আগে, কখনও পরে।
দাদুর বাড়ির রাস্তাটাও এখনও চওড়া রয়েছে ,শুধু চেনা খেলার সাথী গুলো অচেনা হয়ে গেছে।

- অভিষেক বোস

শীতের সেরা

কে কবে ফেসবুকে আপডেট দেবে আর কোন চ্যানেলে গ্লিসারিন সাবানের বিজ্ঞাপন দিবে  তা দেখে শীতের সূচনা শুধু বেরসিকরা করতে পারে । আমার খাওয়ারের মেনুতে যেদিন নতুন গোল আলুর দম পড়বে (ফুলকপির বড়া সহ) সেদিন আমার শীত শুরু হবে । আরো আগে যখন জোর করে গলা দিয়ে  হাফ সোয়েটার গলিয়ে দেওয়া হত তখন মানতে হত শীত পড়েছে । সোয়েটারটা পড়ার সাথে সাথে মনে হত এখানে কুটকুট, ওখানে কুটকুট সুতরাং সঙ্গে সঙ্গে খুলে দেওয়ার জোরালো অ্যাপিল জানাতাম, অত্যন্ত নির্মম ভাবে অ্যাপিল নাকচ করা হত, তারপর যখন মা'র মনে হোত যে এবার খুলে ফেলা যেতে পারে তখন গৌরাঙ্গের মতো হাত তুলে দাঁড়াতে হত, মিনিট সাতেকের যুদ্ধ, চোখ মুখ লাল করে সোয়েটারটা বেরিয়ে আসত ।

পরদিন দুপুরে দেখতাম রঙ বেরঙের উলের গোলা আর উলকাঁটা নিয়ে মা বসে পড়েছে ।প্রতিদিন দেখতাম গোলাটা আস্তে আস্তে ছোট হচ্ছে আর সোয়েটারের হাত পা গজিয়ে উঠছে । মাঝে মাঝে উল্টো করে দাড় করিয়ে মাপ মিলিয়ে নেওয়া হত ।

স্নো ফলস আমি অনেক দেখেছি কিন্তু আমার এক বন্ধুর বাড়িতে যে পরিমাণে স্নো মাখা হত তার কাছে এসব কিছুই না । আড়াইশো গ্রাম করে মাখা সফেদ মুখ গুলো আলাদাই জেল্লা ছড়াতো । নামটা এখনও মনে আছে 'চার্মস' ।

যেকোনো রকম ঠোঁট ফাটার একমাত্র কারণ ছিল বোরোলিন না লাগানো এবং মুক্তির একমাত্র উপায় স্বয়ং বোরোলিন । জানিনা কেন, ভি বালসারার সুর বাদ দিয়ে বোরোলিনের সাথে কোনোদিনই কোনো আত্মীয়তা রাখতে পারলাম না । নাম বোরোলিন হলেও মোটেও লীন হত না । সাদা  কাদার মতো লেপ্টে থাকত আর উগ্র গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসত ।

শীতকালের ছাদে মাদুর বিছিয়ে আলসে ভাবে রোদ পোহানোকে আজও আমি নবাবিয়ানার সেরা মনে করি । এই নবাবিয়ানার জন্য কুমীরদের আমার বাঙালি বাঙালি মনে হয় । 'ল্যাদ খেয়ে পড়ে আছি, হালকা ঝিমুনি আর মিঠে কড়া রোদ্দুর'  এমন সুখটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি! 

শীত আর বিয়ে বাড়ি হল রাজযোটক । একসাথে দল বেঁধে খেতে যেতাম আর ফেরার সময় হু হু  করে কাঁপতে কাঁপতে শুধু একটাই কথা মনে হত, বাড়িতে পৌছলেই একটা নরম লেপ, একটা অন্ধকার ঘর আর সবুজ নাইট বাল্বের আলো । নিশির ডাকের থেকেও মায়াবী ।

আর ছিল পিকনিক । যেখানে শীতের জয় সেখানে পিকনিক হয় । বাঙালিরা পিকনিকও পঞ্জিকা দেখে করত । পৌষ পড়ার আগেও নয়,  পৌষ শেষ হওয়ার পরেও নয় । বেলুন সজ্জিত আর চোঙ্ মাইক শোভিত গাড়ি দেখলেই পিকনিকের গাড়ি খেতাব জুটত ।

পিকনিকটা অবশ্য এখনও আছে,  শুধু পৌষ নেই ।

— অভিষেক বোস

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=1006283959444601&id=900039906735674