Wednesday, January 18, 2017

উপ(সং)হার - বিয়ে বাড়ি ২

ভালোবাসায় জিৎ হার যাই হোক না কেন
বিয়েতে উপহার হবেই হবে।

সে আপনি যতই '' নো গিফ্ট প্লিজ " লিখুন।  নেহাত যদি গিফ্ট একদম না নিতে চান দেখবেন আপনার অতিথিরা বিয়ে বাড়ি কে কাশ্মীরের গুলমার্গ বানিয়ে দিয়ে চলে যাবে।  এবার বসে থাকুন ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে! 

গিফ্ট কেনা যার তার কম্মো নয়, উপহার কিনতে গিয়ে হার মানেনি এমন লোক খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তবে সবাই এমন আনকোরা নয়, কিছু লোক অত শত উপহারের মাঝখানেও খুঁজে আনে কাঁচের থালা বাটি।এর জন্য শিল্পীর দক্ষতা চায় আর চাই ঐতিহ্য , ঐতিহ্য একই উপহার বার বার কেনার।  এছাড়াও বাঙালি বিয়েতে যেসব চিরন্তন উপহার সামগ্রী রয়েছে তাদের মধ্যে বিছানার চাদর আর ফোটো ফ্রেম সবার উপরে। এইসব উপহারই বেশি চলে, তবে উপহার চালিয়ে দেওয়া মানে চলমান রাখাটাও একটা দক্ষতা।

আমি একজন ভদ্রলোক কে চিনতাম উনি এই চালু শিল্পের সেরা শিল্পী। ছোট্ট হাতের তালুতে এটে যায় এরকম একটা উপহার নিয়ে উনি বিয়েবাড়িতে ঢুকতেন আর মাংস পোলাও সাবাড় করে পান চিবোতে চিবোতে বেরিয়ে আসতেন। হাতে রয়ে যেত সেই পারিবারিক সাথী, ছোট্ট উপহার। একদম অনুঘটকের মতো খাওয়ার এর দফারফা করে দিব, কিন্তু নিজের পরিবর্তন হতে দিব না।  বাড়ি ফিরে সযত্নে আলমারি তে চালান হয়ে যেত সেই বিশ্বস্ত উপহার। 

সেবারে শুভজিৎ এর বাড়ি গেছি।  কর্ড লাইনে বেগমপুরে শুভজিৎ এর বাড়ি। শুভজিৎ আমাকে নিয়ে ক্লাবে গিয়ে দু'বার গলা খাঁকারি দিয়ে বলল " জুলাই মাসে আমার বিয়ে,  তোরা সবাই বরযাত্রী যাবি, বৌভাতেও আসবি কিন্তু খবরদার ঐ জিনিস টা যেন না দেখতে পাই"  শেষের কথাটা অত্যন্ত গম্ভীর আর বিরক্তি মেশানো।  ক্লাব থেকে বেরিয়েই জিজ্ঞেস করলাম কিসের হুঁশিয়ারি দিলে?

এবার শুভজিৎ এর বয়ানেই বাকিটুকু শুনে নিন

" তুমি তো জানই আমরা শহরতলির লোকেরা একটু বেশিই মিশুকে! তো এলাকায় কোনো বিয়ে, অন্নপ্রাশন থাকলেই আমরা ভীড়ের মধ্যে মিশে যায়। নেমন্তন্ন থাকুক আর নাই থাকুক।  এমনিতে ফুল, ফুলদানি আর ভালোবাসা দিয়েই উপহার সেরে দি ', কিন্তু সেবারে গদা দার বিয়ের সময় গদা দা বলে গেল ' দ্যাখ ভাই তোদের বৌদি শহরের মেয়ে, বুঝে শুনে গিফ্ট টা দিস। '  একরকম বাধ্য হয়েই একটা পেল্লাই সাইজের ওয়াটার ফিল্টার কিনে ফেললাম।  যথারীতি বিয়ের দিন গদা দার বৌ এর হাতে চালিয়ে দিয়ে,  হাতে পায়ে লেগে পড়লাম। আরে ৪৫০০ টাকা তুলতে হবে তো নাকি!  এরপর বিয়ের মাসখানেক কেটে গেছে একদিন গদা দা কে সামনে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম ফিল্টার টা বেচবে নাকি চার - এ?  গদা দা তো গদগদ হয়ে উঠল, তারপর একদিন ভরদুপুরে মাল নিয়ে হাজির।  মাল টা নিয়ে চালিয়ে দিলাম জগা দার বিয়েতে। আবার একমাস, আবার একই প্রস্তাব। এবারে ৩৬০০।  এইভাবে মালটা গত একবছরে বেগমপুরের সব নব দম্পতিদের বাড়ি ঘুরে এসেছে।  লাস্ট ১৮০০ তে বাপ্পা দার ছেলের অন্নপ্রাশন খেয়ে এসেছে।  এদিকে আমার বিয়ের খবর শুনে দেখি বাপ্পা দা ক্লাবের আশে পাশে ঘুরে এসেছে।  ১২০০ তে কথাবার্তা চলছে। এরকম একটা কানেও এসেছে......

- অভিষেক বোস

Monday, January 16, 2017

নিশির ডাক

পরপর তিন রাত একই ঘটনা ঘটল।  লেকটাউন এর নতুন ঘড়িটার ঢং ঢং আওয়াজ বাঙুর অ্যাভিনিউয়ের এই ফ্ল্যাটবাড়ির সাত তলা থেকে পরিষ্কার শোনা যায়। তিনবার আওয়াজ করে শব্দটা বন্ধ হয়ে গেল। আওয়াজ টা পুরনো গির্জার ঘন্টার মতো।  আবার চারদিক নিশ্চুপ, মাঝে মাঝে ভি আই পি রোডের উপর নিস্তব্ধতা চিরে যাওয়া গাড়ির আওয়াজ আসে, একটা ঘোর মতো লেগে এসেছিল শৌভিকের , শৌভিক সেন, একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করে, একা থাকে। হঠাৎ একটা গাড়ি সজোরে ব্রেক কষে দাড়ানোর আওয়াজে সম্বিত ফিরে এল।

একটু জল খেয়ে কিছুক্ষন চোখ বুঁজে থাকার চেষ্টা করল। কম্বলটা ভারী নরম, এবারে কলকাতায় বেশ ঠান্ডা পড়েছে। না, বেশিক্ষণ এভাবে থাকা গেল না।  বারবার সেই একই কথা মনে পড়ছে, মনের ভেতর থেকে কেমন মোচর মতো দিচ্ছে।  যন্ত্রচালিতের মতো উঠে দাঁড়িয়ে শৌভিক চলতে শুরু করল, সেই একই জায়গায় এসে থামল, তারপর দুদিনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ....... 

একটু অন্যরকম গন্ধ নাকে এল। 

এইসব কথা কাউকে বলা যায় না, লোকে শুনলেও হাসবে।  পরদিন সকালে আয়নার সামনে মুখের বা পাশটার কাছে  কিছু একটা লেগে আছে মনে হল।  জোরে জোরে চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে নিজেকে বোঝালো, এইসবই মনের ভুল।

সারাদিনের অফিসের ব্যস্ততার মধ্যে গত রাতের কথা আর মনে  ছিল না। দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকের সময় যখন কিছুক্ষন একা ছিল তখন মনের মধ্যে ঘটনাটা একবার ঝিলিক মেরে মিলিয়ে গেল। 

অফিস ফেরতা একটা ফিস কবিরাজি খেয়ে শৌভিক বাড়ি ঢুকেছিল । পাশের ফ্ল্যাটের তন্ময় এসেছিল।  শৌভিকের সমবয়সী।  দুজনের খুব বন্ধুত্ব। একবার তন্ময়কে বলবে ভেবেও শৌভিক পিছিয়ে এল। শেষে তন্ময়ও যদি...   না না, কিছুতেই বলা যাবে না।  

তন্ময় কফি খাবে কি না শুনে নিয়ে শৌভিক কিচেনে ঢুকল।  ভেতর থেকে আওয়াজ দিল 'চিনি কতটা?' উত্তর টা একটু পরে এল, তন্ময় কি তাহলে পাশের ঘরে?  ঝটকা দিয়ে বেডরুমে ঢুকতেই তন্ময় কেমন হকচকিয়ে গেল।  তারপর ঘরের মধ্যে একটু ঘোরাঘুরি করে 'আসছি' বলে চলে গেল।

এইভাবে তো কোনোদিন তন্ময়কে চলে যেতে দেখেনি।  যাই হোক আজ রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে হবে।  ঠান্ডাটা আজকেও জমিয়ে পড়েছে, বারান্দা থেকে ভি আই পি রোডটা দেখা যায়, আলো আবছায়ায় শহরের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া অন্য শহরের যাওয়ার পথটা কেমন থম মেরে পড়ে থাকে, এইদিকটায় এখনও কিছু গাছপালা বাকি আছে।

লেকটাউনের ঘড়ির আওয়াজ আবার কানে এল ঢং ঢং ঢং !  শীতের রাতে এইরকম একটা আওয়াজ কেমন যেন একটা গম্ভীর পরিবেশ তৈরি করে।  শৌভিক সেই অমোঘ হাতছানির দিকে পা বাড়ালো।  এই অন্ধকারেও পা গুনে যেতে কোনো অসুবিধে হয়না।  পাশের ঘরে ঢুকে দরজাটা একটু ফাঁক করতেই সেই মায়াবী  আলো, দরজাটা পুরো খুলেই বুকের ভেতরটা কেমন দপ করে উঠল!  এ কি!  শৌভিকের ভেতর থেকে কান্না দলা পাকিয়ে উঠছিল! 

এ কাজ ঐ হতচ্ছাড়া তন্ময়ের না হয়েই যায় না। কাল রাতেও ফ্রিজের মধ্যে প্যাকেটে তিন পিস হানি ডিউ সন্দেশ রাখা ছিল।  একদম হিসেব করে রাখা।  খোদ চূচূঁড়ার সন্ধ্যাশ্রী থেকে আনানো।  সন্ধ্যাশ্রী চেনেন না নাকি মশাই! হ্যান্ডক্রাফ্টেড হানিডিউ সন্দেশ এর আতুর ঘর। সামান্য কয়েকজন লোকই এর স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। একদম গোনাগুন্তি মাল। প্রথম কামড়ে কিচ্ছুটি বুঝবেন না, কেমন একটা বোকাবোকা সেজে বসে থাকবে, যেই না আন্ডার এস্টিমেট করে দ্বিতীয় কামড় টা দিয়েছেন ব্যস ভেতর থেকে অমৃত বেরিয়ে আসবে, তারপর আপনার মুখের আশপাশ দিয়ে বইতে শুরু করবে। এবার পুরো জিভের খেলা, দাঁত তখন রেস্টে। 

ঐ হতচ্ছাড়া তন্ময়।  কপাল জোরে বিয়ে করে বেঁচে গিয়েছে, নইলে আজ রাতেই ওর উদ্ধার হত। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে ওর খবর আছে।  গালাগালি গুলো আরও একবার শানিয়ে নিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে শৌভিক ঘুমোতে গেল।

— অভিষেক বোস

Monday, January 2, 2017

নিউ ইয়ার

এক টাকার দশটা দিন, পাঁচ টাকার তিনটে  আর দশ টাকার দুটো, কত হল?

'পঁয়তাল্লিশ ।'

চল্লিশ নাও, আর ঐ মিউজিক্যাল কার্ডটা?

'ওটা এক পিসই আছে, পঞ্চাশ টাকা ।'

ওটা রেখে দিও, বিকেলে এসে নেব ।

(এরপর মনে মনে ছকে নেওয়া, কাকে এক, কাকে পাঁচ আর কাকে দশ, মিউজিক টা তো স্পেশাল ! )

এরপর যখন যেমন সময় পাওয়া যাবে, টিউটোরিয়ালে অথবা ক্লাস রুমে বসে,  সুযোগ বুঝে খাম খুলে বের করে নিয়ে নাম গুলো লিখে নিলেই হল ।

রাতে কিছুক্ষণ টিভির সামনে বসে নিউ ইয়ার সেলিব্রিটিদের দেখে ঠিক সাড়ে বারোটায় জয় ঘুমোতে গেল । মিউজিক্যাল গ্রিটিং কার্ডটা বালিশের তলায় লুকিয়ে রাখল,  যদি কেউ দেখে নেয় !

মাঝ রাতে হঠাৎ কি করে জানি মিউজিক্যাল কার্ডটা বেজে উঠল, ঘুম ভেঙ্গে সব কিছু কেমন অচেনা ঠেকল । মাথাটা কেমন ভার হয়ে আছে । কোনওমতে আড়মোঢ়া ভেঙে আয়নার সামনে তাকাতেই বুকটা ছ্যাত্ করে উঠল । আবছা মুখটা ঠাওর হলনা,  কিন্তু মুখটা একটা লোকের, এই আন্দাজ তিরিশ বত্রিশ বছর । গালে হাত দিয়ে খোঁচা খোঁচা দাড়ি অনুভব হল ।

এবারে বোঝা গেল বয়সটা অনেক বেড়ে গেছে । কখন, কিভাবে সেটা দেখার আর সময় হয়ে ওঠেনি ।  মোবাইলটা বিরক্তিভরে নামিয়ে রেখে কি মনে হতে আরও একবার বালিশের তলায় হাত বুলোল,  না কোনও গ্রিটিং কার্ড মিলল না,  একটা পেট মোটা মানিব্যাগ,  ভেতরে অনেক গুলো ব্যাংক কার্ড ।  মোবাইলটা আর একবার হাতে নিয়ে দেখল বেশিরভাগই  অফিস পরিচিত, কয়েকজন পুরনো বন্ধুবান্ধব আর একটা টেক্সট মেসেজ,  স্যালারি ক্রেডিট হয়ে গেছে,  ডেবিট কার্ডটার দিকে তাকিয়ে একটু হেসে নিয়ে জয় এবার নিজেই নিজেকে অস্ফুটে বলে উঠল "Happy New Year"

- অভিষেক বোস