Wednesday, June 29, 2016

ট্যাক্সি ড্রাইভার

তো এটা তোমার নিজের ট্যাক্সি
- না স্যার, আমি চালাই 
আচ্ছা, এই যে তুমি সিগনালে দাড়ালেই বই খুলে খুলে দেখছ, ওটা কিসের বই?
- টুয়েলভ এর, এবার পরীক্ষা দেব প্রাইভেটে
বাহ্। খুব ভালো, কিন্তু এভাবে পড়লে মনে থাকবে?
- আমি পাশ ফেল এর জন্য পড়ছি না স্যার, আমার পড়তে ভাল লাগে, আর তাছাড়া লাখ লাখ ছেলে কলেজ পাশ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে এই ১২ ক্লাস পাশ করে কে আমাকে চাকরি দেবে?
চেষ্টা কর, তাহলে তো আর ট্যাক্সি চালাতে হবে না
- স্যার আমরা যদি ট্যাক্সি না চালাই, তাহলে আপনারা চড়বেন কিসে !?
রামায়ণে একটা গল্প আছে জানেন  " একবার লক্ষন রামের কাছে এসে বলল শ্রীরাম আপনি তো সবার ভগবান তাহলে এই ভেদাভেদ রেখেছেন কেন। রাম বললেন আচ্ছা আমি সবাইকেই সমান ঐশ্বর্য ভাগ করে দিচ্ছি। এর কিছুদিন পর বনবাসের সময় রাম লক্ষনকে একজন ঘরামি খুঁজে আনতে বলল, লক্ষন তন্ন তন্ন করে খুজেও আশে পাশের গ্রামে কোনও ঘরামি খুজেঁ পেল না, সবাই প্রচুর সম্পত্তির মালিক, কারও কোনও কাজের প্রয়োজন নেই। "
(গল্পটা শেষ হওয়ার আগেই আমার গন্তব্য চলে এসেছিল)
ভাড়া মিটিয়ে একটা ১০০ টাকার নোট ধরিয়ে বললাম " একটা বই কিনে নিও "
- বিনয়ের সাথে টাকাটা ফিরিয়ে দিয়ে বলল " এই জন্য কি পড়াশুনা শিখছি স্যার "


- অভিষেক বোস

Thursday, June 16, 2016

নিয়তি

নিয়তি কি গো? 
ধুৎ,  বিরক্ত করিসনা,  অনেকটা রাস্তা পারি দিতে হবে ।
বল না,  বাবা বলল এরপর আর হয়তো দেখা হবে না!  
জিজ্ঞেস করলাম কেন? 
বলল নিয়তি ।
মেজকা একটু চুপ করে আবার পায়চারি শুরু করল । 
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে পুচকে টা কে আদর করে বলল শোন,  যদি দেখিস কেউ আমাদের আটকে রেখেছে,  আশপাশে আসবি না,  আর যদি ধরা পড়ে যাস তবে ছটপট করবি,  তোর মতো বাচ্চাদের ওরা আটকে রাখে না । 

এত বিপদ! তবে যাওয়ার কি প্রয়োজন ? 
আমাদের যে জন্মই হয়েছে দূরে পাড়ি দেওযার জন্য,  এটাই নিয়ম । 
সারা বছর লুকিয়ে থাকলেও,  ভরা চাঁদের রাতে যখন পুবালি হাওয়া বইতে শুরু করবে তখন সব মায়া কাটিয়ে আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে,  আজ অব্দি কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেনি । 

ভোর বেলা সত্যি হাওয়া বইতে শুরু করল,  মা এসে ঘুম থেকে জাগিয়ে বলল,  চল এবার বেরিয়ে পড়ি । পথে যেতে যেতে পুঁচকে টা বুঝতে পারছিল নোনা হাওয়া ফিকে হয়ে মিষ্টি হাওয়া গায়ে এসে লাগছে,  ঘোর বর্ষায় জল ছপছপ্ করতে করতে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল কি সুন্দর গোলপানা চাঁদ ।  বাবাকে আর সত্যি দেখা যাচ্ছে না! 

মা,  বাবা কি অনেকটা এগিয়ে গেছে!! 
নির্বিকার মুখে মা উত্তর করল,  মন দিয়ে শোন আমিও হয়তো আর বেশিক্ষণ নেই,  সামনেই
কোথাও ওরা অপেক্ষা করে আছে,  সাবধানে থাকিস,  মন খারাপ করিস না,  তোকে দেখতে পেলেও ওরা ছেড়ে দেবে,   থামবি না এগিয়ে চলবি,  উল্টো দিক থেকে যত বাধায় আসুক,   এগিয়ে যেতেই হবে,  ফেরার সময় আর কোনও বিপদ নেই । 

মা,  তুমিও আমার সাথে চল ।
মা র চোখ ছলছল করে উঠল । 
গলা বুজে আসছিল, তাও কষ্ট করে বলল কথা দে পরের বছর আবার যখন পূবালি হাওয়া বইতে শুরু করবে তখন তুই আবার এই পথেই আমাদের খুঁজতে বেরোবি । 
আমি আসব মা ....   কিন্তু তুমি... 
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই কারা যেন মাকে তুলে নিয়ে গেল । 
পুঁচকে টা ভয়ে কাঠ হয়েছিল,  কারা যেন বলাবলি করছে  “এতক্ষণে দেড় কিলো সাইজের মাছ উঠেছে,  এগুলো কে আলাদা করে রাখ,  এইসব ইলিশেরই তো দাম পাওয়া যাবে  বাজারে  ".............

- অভিষেক বোস

Saturday, June 11, 2016

শনিবার বনাম রবিবার

এই ভাই এদিকে শোনো 

ইয়েস স্যার 

আচ্ছা এই অ্যাঞ্জেল অন্ হর্সেস ব্যক্ এটা কিরকম? 

স্যার ইট্স আ সেভারি,  মেড্ অফ অয়েস্টার র‍্যাপ্ড  উইথ বেকন ।

ওহ্ !   এটা ঝাল হবে? 

স্যার,  এটা মিডিয়াম স্পাইসি 

না,  তাহলে ছেড়ে দাও  

(মেনু কার্ডের বাম দিক দিয়ে নামতে নামতে  একটা পছন্দসই জায়গায় এসে সুবীর বাবু ডান দিকে চোখ তুলে নিয়ে গিয়ে দেখলেন আলুগোত্রীয় কিছু,  আশে পাশের টেবিলে কিছুক্ষণ চোখ চালালেন) 

তারপর হতোদ্যম হয়ে বললেন “আচ্ছা ১ প্লেট চিলি চিকেন আর ২ টো মিক্সড চাউমিন হাক্কা ।"

শীলা হাল্কা করে টোকা দিয়ে বলল আচ্ছা  শোন 'এখানকার ডেভিলস ক্র্যাব আর চিকেন আ লা কিভ্ নাকি দারুণ খেতে' 

হুমম্,  আর একটা ডেভিলস ক্র্যাব দিও 

স্যার ক্র্যাব দু পিস থাকবে 

জানি,  এক প্লেটই দাও আর একটা সালাদ্ 

(সুবীর বাবুর ছেলে রোহন সজল চোখ তুলে চাইতেই শীলা বলে উঠল আরে আমরা ভাগ করে খাব তো... ) 

স্যার জল রেগুলার না মিনারেল? 

রেগুলার 

চিল্ড্ অর রুম টেম্পারেচার? 

নরমাল ।

শীলা জানো তো,  এটা শহরের সব থেকে ভালো কন্টিনেন্টাল রেস্টুরেন্ট । 

খাওযাব় সার্ভ হতেই ৮ পিস্ চিকেন ৩-৩-২ ছকে সাজিয়ে খাওযাব় পর্ব শুরু করলেন দত্ত পরিবার ।

খাওয়ার পর্বে শেষ বাশি বাজার আগে সুবীর বাবু ইশারায় ওয়েটার কে ডাকলেন,  ওয়েটার সামনে এসে দাড়াতেই কেতায় বলললেন 'বিল' 

স্যার  ডেসার্ট? 

না  (রোহন একবার আইসক্রিমের আবদার করতেই সুবীরবাবু চুপ করার ইঙ্গিত দিলেন ) 

তারপর গলা নীচু করে রোহন কে বললেন,  এখানে বেশী দাম,  বাইরে বেরিয়ে খাব । 

বাইরে বেরিয়ে বেমালুম আইসক্রিমের কথা ভুলে গিয়ে হাঁক ডাক করে ট্যাক্সি থামিয়ে বললেন 'পাইকপাড়া' 

২০ টাকা এক্সট্রা 

১০ টাকা দিব । 

দরদাম করে ট্যাক্সিতে উঠে শীলার দিকে তাকিয়ে বললেন 'শুধু বড় বড় নাম,  সেই একই খাওয়ার,  কাল রোববার বরং কচি পাঠার মাংস নিয়ে আসব,  মুসুরির ডাল আর পোস্তর বড়া কোরো ' 

শীলা জানলার কাঁচ নামাতে নামাতে উত্তর করল “ বাঙালিদের মতো রান্না কেউ করতে পারে নাকি!! ? মনে করে টক দই নিয়ে এসো "

— অভিষেক বোস 

Monday, June 6, 2016

"যদিদং হৃদয়ং তব"

প্রশ্নটা যদি হয় কবে বিয়ে করছিস  ,
আমার উত্তর  হয় "এই বছর" ৷
এই বছর কবে ?
ডিসেম্বর

ছুটির দিন দেখে করিস কিন্তু !
নিশ্চয়ই , ২৫ শে ডিসেম্বর করব

ধুৎ!  ২৫শে ডিসেম্বর বাঙালি বিয়ে হয় নাকি?
আমিঃ কেন হয় না ?

ঐ সময় তিথি নেই ৷

আমি :এত যে তিথি ,নক্ষত্র , ছায়াপথ,ধূমকেতু দেখে বিয়ে হয় তারপর কি অশান্তি হয় না ?

হয়৷
তাহলে?

পুরোহিত পাবি না?

কথাটা শুনেই আমার এক বন্ধুর গল্প মনে পড়ল ৷  বিয়ের সময় পুরোহিত এক একটা স্তোত্র পাঠ করছিল  যার শেষ টা ছিল  পথিকৃৎ দাসায় নমোঃ , আবার একটা স্তোত্র আর আবার পথিকৃৎ দাসায় নমোঃ ৷ বিরক্ত হয়ে বন্ধুটি পুরোহিত কে প্রশ্ন করেছিল '' ঠাকুরমশাই আমার নাম কিন্ত পথিকৃৎ সাহা , পথিকৃৎ দাস নয় ! (শেষে কোনও পথিকৃৎ দাসের সাথে বিয়ে হয়ে যায় !)

পুরোহিতের চটজলদি উত্তর এল "আমরা তো সবাই দাস বাবা ! ভগবানের দাস "

Damage Control কাহারে কয় !

— অভিষেক বোস

Thursday, June 2, 2016

কার্ড


শহুরে বাঙালির গড়ে নয় খানা করে কার্ড থাকে সর্বনিম্ন একটা ডেবিট একটা ক্রেডিট কার্ড, একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, স্মার্ট কার্ড ,আধার কার্ড, আলোকিত কার্ড, প্যান্টালুন গ্রিন কার্ড, ওয়েস্টসাইড ফাইভ স্টার কার্ড .....   একটা আর্বান চাকুরিজীবীর পকেট নিঁচরোলে আপনি এত কার্ড পাবেন! এত কার্ড ! যা দিয়ে এক সেট তাস বানানো যাবে
বছর বিশেক আগে কিন্তু ছিল দুটো বিবর্ন হলুদ কার্ড একটা রেশন কার্ড আর একটা পোস্ট কার্ড
সপ্তাহান্তে তিন দিন বিকেলে লোক বালক মহিলা বর্গ দল বেঁধে রেশন দোকানে যেত চাল, ডাল, লাইন টানা খাতা আর কেরোসিন তেল তোলা ছাড়াও লাইনে দাঁড়িয়ে খোস গল্প ছিল রেশন দোকানের অবিচ্ছেদ্য অংশ
টুকটাক পরনিন্দা, সুখ-অসুখের গল্প, নতুন আলমারি, ছাতা, জুতো সবকিছু পাশের বাড়ির মেয়েটা কলেজ কেটে কোথায় যায়, পাত্র পাত্রী সম্বন্ধ, হরেক গল্প এক লাইন তারপর একসাথে ফিরে আসা
বাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার থাকায় রেশন দোকানে আমাদের যাতায়াত ছিল না ঠিকই কিন্তু আশপাশের পাড়া প্রতিবেশীরা কার্ডটা ধার নিয়ে যেত আর আমিও কোনও কোনও দিন পাড়াতুতো লোকদের সঙ্গে যেতাম লাইনের মুখগুলো সব চেনা হয়ে গিয়েছিল নামগুলো কোনোদিন জানা হয়নি আমি যত বড় হচ্ছিলাম রেশন দোকানের লাইনগুলো তত ছোট হচ্ছিল
রেশন কার্ডের দূর সম্পর্কের কোনো আত্মীয় না হলেও রেশন কার্ড আর পোস্ট কার্ডের সহাবস্থান ছিল পোস্ট আপিস থেকে পঁচিশ পয়সা দিয়ে হলুদ পোস্ট কার্ড পাওয়া যেত একদিক পুরো ফাঁকা আর উল্টো দিকে অর্ধেক টা জুড়ে বাঘের মাথা আর প্রাপকের ঠিকানা লেখার জায়গা লোকে নিয়ম করে চিঠি লিখত, সাধারণত বাড়ির বড়দের নামে চিঠি দেওয়া হত শ্রীচরনেষু ইত্যাদি ইত্যাদি..... পত্রের প্রথমেই আমার প্রনাম নিও.. আমরা সকলেই ভালো আছি, তারপর Cc. Bcc তে পিঙ্কু কে বল পরীক্ষার পর চলে আসতে, মামন কত বড় হল? দিয়ে এক্কেবারে পাশের বাড়ির রুনু পিসির পা ভেঙেছে সব খবরের ফর্দ কোন এনক্রিপশন নেই, কোনো রাখঢাক নেই, এক্কেবারে খোলা চিঠি দায়িত্ব নিয়ে সপরিবারে পড়া হত আমরা যারা নতুন নতুন চিঠি লিখতে শিখছি তাদের বিশেষ নজর থাকত বানান ভুলের দিকে কোনও কোনও চিঠি পৌঁছবার আগে প্রেরক প্রাপকের দু বার দেখা হয়ে যেত
এক বিখ্যাত বিজনেস টাইকুনের স্বপ্ন ছিল পোস্ট কার্ডের থেকেও কম দামে মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে এখন আমি গড়ে খানেক মেসেজ পড়ি।অঙ্ক সাহিত্যের যোগফল আর অজস্র বানান ভুলে ভরা f9 b8r 4m 2d মার্কা মেসেজ এখন কেউ কারও মেল পড়ে না উহুঃ ব্যাড এটিকেট কেউ কারও খবর নেয় না।কোনো পোস্টম্যান বাড়ির সামনে ' চিঠি' বলে হাঁক দেয়না তবু অকাজের চিঠিগুলো বাতাসে ভেসে বেড়ায়
আমার শহরে ফিরলে রেশন দোকানের নাম না জানা কিছু লোকের সাথে রাস্তায় এখনও কোনও কোনও দিন দেখা হয়ে যায় রেশন কার্ডও নেই আর পোস্ট কার্ডও নেই, শুধু অজানা নামের চেনা হাসি গুলো রয়ে গেছে......
অভিষেক বোস