এই লেখাটার মধ্যে কোনো গল্পের উপাদান নেই, কোনো সাম্প্রতিক ঘটনার আলোচনা নেই। Swiss Illnesses নামে আমার একটা অসুখ আছে এটা ঐ রোগের উপসর্গ আর কি! পুরনো পাতাগুলোর Digital Archive করে রাখা। ডিজিটাল ক্যামেরা আর স্মার্টফোনের আগের দিনগুলো Digitized করে রাখা, যেমন করে লোকে পুরনো ছবি পোস্ট করে...
হাফ প্যান্ট বেলায় যখন পাড়ার মোড়ে রাজু কাকুর দোকানে মিষ্টি পান কিনতে যেতাম, ডান হাতের মুঠোতে পয়সা নিয়ে মন দিয়ে পান বানানো দেখতাম। প্রথমে পানটা ধুয়ে নিয়ে, ভেজা লাল কাপড়ের উপর জল ঝেড়ে একটা শতছিদ্র টিনের কৌটোর মুখ দিয়ে পাতার ভিতরটা ঘষতে ঘষতে র্যাপিড ফায়ার রাউন্ড শুরু হতো, খয়ের বাদ দিয়ে প্রায় সবেতেই আমার 'হ্যাঁ' । চুন-সুপুরির পালা শেষ হলেই স্কুল ছুটির পরে বাচ্চাদের মতো একের এক কৌটো বেরিয়ে আসতো, কোনোটাতে গাঢ় সবুজ, কোনোটাতে উজ্জল লাল, কোনোটা আবার হলুদ, নরম নরম মশলা, রঙবেরঙের গোল গোল দানা, পিপারমেন্ট পেরিয়ে এসে যে মশলাটা হাতে তুলে নিলেই 'আরো একটু দাও' এর আব্দার করতাম ঐ কৌটোর গায়েই লেখা থাকতো 'চমন বাহার'। পাঁচ টাকা দিয়ে একটা আস্ত কৌটো কিনে রেখেছিলাম।
'চমন বাহার' সিনেমাটা দেখতে দেখতে এক ধাক্কায় বয়সটা অনেক পিছিয়ে গেলো, দু ঘন্টার সিনেমার পরেও যে আবেশ অনেকক্ষণ থেকে যাবে। সিনেমার গল্প নিয়ে কিছু লিখব না, এসব দেখার জিনিস, শোনার জিনিস নয়। দেখতে দেখতে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে হয়, যেখানে গিয়ে থামবে থামুক, স্টিয়ারিং ঘোরানোর কোনো ব্যস্ততা নেই....
| কাট টু 'ফুল প্যান্ট' |
ফুল প্যান্ট বেল বটস্ হতে পারে আবার নাও হতে পারে তবে পেছন পকেটে একটা সস্তা 'মানি-ব্যাগ' থাকতেই হবে আর ঘাড়ে থাকবে স্কুল ব্যাগ। স্কুল ব্যাগের স্বজন পোষনের কোনো দায় নেই তাই ভেতরে 'ভিকি' ক্যাম্বিস বল, গ্লাভস, সিন গার্ড এমনকি এক জোড়া শুকনো কাঁদা মাখা ফুটবল বুটও থাকতে পারে। তবে পান নয় চা-এর দোকান। দোকানটা শহরের উপকন্ঠে হতে পারে, আবার হতে পারে একেবারে ব্যস্ত রাস্তায় । মালদা শহরটা অবশ্য তখন মফস্বল অথবা আধা শহর নয়, তবে এখনো এখানে বুড়ো বটগাছের ছায়া আছে , জলের ঢোপ কল আছে, কোর্টের সামনে গাছ গাছড়া, তাবিজ, মাদুলির ব্যাবসা আছে আর দুপুরের পর নরম রোদ্দুর মাখা বিকেলের মাঠ আছে। এখানে ঝুপ করে দুপুরের পরে সন্ধ্যা নেমে যায় না। সন্ধ্যা হয় শঙ্খের আওয়াজে, কচি কাঁচা মেয়েদের তারসুর রেওয়াজে। মাঠ থেকে ধূলো পায়ে ফেরা, গোড়ালি না ধোওয়া ছেলে মেয়েদের ' উদ্ভিদকোষে উপস্থিত ক্লোরোফিল নামক রঞ্জক' আর 'সিরাজ-উদ-দৌলা আর পলাশীর প্রান্তরের সাথে ধূপ-ধুনো মিলেমিশে একাকার হয়ে সন্ধ্যা জমাট হয়ে আসে। এ সব কিছু আছে, আর আছে অফুরান আড্ডার চা'য়ের দোকান। তবে এখানে নায়ক দোকানের মালিক না, চা-এর দোকানের 'ঠেক' টাই আসল নায়ক। সব গল্প ঐ 'ঠেকে' ঠেকনা দিয়ে দাঁড়িয়ে, আর এই জন্যই 'ঠেক' ভেঙে যাওয়ার পর সব হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে!
নারু দা-র চা-এর দোকান
নারু' দার দোকানটা ছিলো (!! নাকি এখনো আছে?), আমার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে, একটা চওড়া রাস্তা যেখানে হঠাৎ ঢালু হয়ে উঠে ন্যাশনাল হাইওয়েতে মিশেছে, ঠিক ঐ ঢালের ধারে। মানে দোকানের সামনেই ন্যাশনাল হাইওয়ে, আর হাইওয়েটা পার করলেই হাইওয়ের সমান্তরালে আর একটু উঁচুতে রেললাইন। দোকান মানে হাইওয়ের উপর রাধাচূড়া, আকাশমনি কিম্বা ওরকমই কিছু একটা প্রাচীন ঋজু গাছের তলায় মুলি বাঁশের একটা ছাওয়া আর তার সাথে মানানসই বাঁশের বেঞ্চি। তখন পাশের মাঠেই ফুটবল, ভলিবল খেলতে যেতাম। খেলা শেষ হয়ে গেলে কিছুক্ষন ক্যারম পিটিয়ে নারু দার দোকানে। আমরা পৌঁছলেই নারু দা এমন বিগলিত হয়ে উঠতো যেন আমরা আসিনি তাও দোকান কেন খুলেছে সেই অনুতাপে ভুগছিল, তারপরে ন্যাড়া মাথার নীচে খয়েরি রঙা দন্ত-বিকশিত করে হাসি। নারু দা যে মারকাটারি চা বানাতো এমন নয়, উল্টে ওটা চা না, চায়ের কেটলি ধোওয়া গরম জল বোঝা যেতো না ! আর আমি ঠিক চা-প্রেমী নয়, তবে চা-এর দোকানে চা এর গ্লাস হাতে নিয়ে বসে থাকার মৌতাতটাই আলাদা। নারু-দার দোকানে সন্ধ্যা অব্দি নারুদার বৌ, বাচ্চা সবাই থাকতো। ছেলেটার বয়স মনে হয় আট-দশ হবে। ভোম প্রতিদিন ওর ভবিষ্যত নিয়ে খুব চিন্তিত হয়ে যেতো, প্রায় প্রতিদিনই প্রস্তাব দিতো নারু দার ছেলের জন্য কিছু একটা করতে হবে, আমাদেরও মনে হতো একটা কিছু সত্যিই করতে হবে, কিন্তু কি করতে হবে সেসব জানা ছিল না। আমরা নিজেরাই কিছু করি না তো ঐ একরত্তি ছেলের কি করব! আপাততঃ ওর পড়াশোনার বয়স। বই- খাতা, পেন, মাস্টার, স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া টুকটাক যে টুকু করা যায় আর কি আর এইসব দেখে শুনে নারুদার মুখটা খুশিতে ভরে যেতো তারপর আবেগে ভেসে গিয়ে দুনিয়ার আজগুবি গপ্পো জুড়ে দিতো। ততক্ষণে অন্ধকার জমাট বেঁধেছে, রাস্তার সোডিয়াম ভেপার লাইটের আলো ছাড়া আর কোনো আলো নেই, সামনে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কপথ দিয়ে হু হু করে কলকাতা আর শিলিগুড়ির দিকে বড় বড় লরি আমাদের শহরটাকে অগ্রাহ্য করে চলে যাচ্ছে। মাল বোঝাই করে যাওয়ার সময় যখন রাস্তার উপরে যখন ধাতব জিনিসের ছোয়া লাগতো তখন অন্ধকার রাস্তায় আগুনের ফুলকি উড়তো, আগুনের ফুলকিগুলো পেছনে ফেলে রেখে ট্রাকগুলো ধীরে ধীরে নিজেও একটা ফুলকি হয়ে যেতো। কোন্ দূর থেকে আসছে, কোন্ সুদূরে যাবে কে জানে! হয়তো শিলিগুড়ি পেরিয়ে আসাম, মনিপুরের সীমান্তে গন্তব্য। এর মাঝখানে আবার অস্পষ্ট থেকে স্পষ্ট হয়ে আসা দূরে ট্রেনের আওয়াজ, তারপর চোখের কাছাকাছি আসতেই একটা সজোরে হর্ন বাজিয়ে জোর করে দৃষ্টি আকর্ষন করার চেষ্টা। কত অচেনা মানুষ শহরটাতে এলো, আবার ফিরতি ট্রেনে কত চেনা অচেনা মানুষ ফিরে চলে যাবে আর মাঝখানে অগোচরে থেকে যাবে নারুদার চায়ের দোকান। আশে পাশে কোনো বাড়ির থেকে আওয়াজ আসছে 'এক আকেলা ইস শহের মেয়, রাত মেয় অউর দোপহের মেয়, আব-ও-দানা ঢুনঢতা হ্যায়' আমরা বেশ জমিয়ে বসেছি হঠাৎ করে একটা ট্রাক রাস্তার থেকে অনেকটা নেমে সাঁ করে ধূলো উড়িয়ে দিয়ে চলে গেল। ভোম উঠে গিয়ে ট্রাক ড্রাইভারকে বেদম গালাগালি দিতে শুরু করলো, লালু ভোমকে আওয়াজ দিল, সুযোগ বুঝে নারুদা আবার এক রাউন্ড কেটলি ধোওয়া গরম জলের গ্লাস হাতে ধরিয়ে দিল, ড্রাইভার ততক্ষণে মাইল খানেক দূরে চলে গেছে। ভোম তখনো চেঁচিয়ে যাচ্ছে। রোজই এরকম কোনো না কোনো ট্রাক বেয়াদপি করে আর ভোম বেঞ্চি থেকে উঠে চায়ের গ্লাস নিয়ে চলন্ত গাড়ির পেছনে ড্রাইভারদের গালাগালি করতে থাকে, তারপর এক চুমুক দিয়ে দোকানের দিকে তাকিয়ে বুঝিয়ে দেয় আজ ধরতে পারলে কি হাল করতো! একদিন এক পাঞ্জাবি ড্রাইভার গালি শুনতে পেয়ে জোরে ব্রেক কষে রাস্তার মাঝে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নারুর দোকানের দিকে এগিয়ে আসলো, দশাসই চেহারা আর বাজখাঁই গলায় সরাসরি ভোমকে জিজ্ঞেস করলো 'ওয়ে আওয়াজ ক্যিউ দিয়া? ' ভোম নরম সুরে উত্তর দিল ' আপকো নেহি বোলা'
— তো রাস্তে মে খড়া হোকর কিসকে উপর চিল্লা রাহা থা?
- ম্যায় তো অ্যায়সে হি চিল্লাতা হু, রোজ চিল্লাতা হু।
সর্দার বাংলা বোঝে না, ভোম কিছু একটা বলেছে সেটা বুঝেছে কিন্তু ঠিক কি বলেছে সেটা জানে না।
ভোম তখনো নরম সুরে গোঁ গোঁ করছে, সর্দার ওর দিকে তাকিয়ে একটা জোরে হাসি হেসে আবার ট্রাকের দিকে ফিরে গেল। ট্রাক নিরাপদ দূরত্বে এগিয়ে যাওয়ার পর ভোম আবার বেদম গালি দিতে শুরু করল তারপর দোকানের দিকে তাকিয়ে বোঝালো 'জোর বেঁচে গেল, নাহলে আজকে ধরতে পারলে.......
| কাকার চা' য়ের দোকান |
কাকা বা কাকাদের নাম কেউ কোনোদিন জানতে পারেনা। কাকা রা শুধুই কাকা, আমারও 'কাকা' , আমার পাড়াতুতো কাকুরও 'কাকা'। কাকার দোকান আমার পাড়ার মোড়ের ঠিক পাশেই। বড় হওয়ার লক্ষন হলো ক্লাবে আড্ডা দেওয়া কিন্তু এর থেকে বড় হওয়ার লক্ষন ক্লাবের বাইরে পাড়ার মোড়ে আড্ডা দেওয়া। কাকার চায়ের দোকানের কর্মসূচীতে ছিল নতুন প্রেমে কারিগরী এবং আর্থিক সহযোগিতা , পুরনো প্রেমে মানসিক সহায়তা, অন্যের প্রেম ভাঙানো, সরস্বতী পূজা, দূর্গাপূজার চাঁদা, হাতখরচ শেষ করে ফেলা দুঃস্থ প্রেমিকের গ্রিটিং কার্ড, পার্কে দেখা করতে যাওয়া, সাইকেলের লিক সারানোর চাঁদা, মাথা ফাটানো, নাক ভেঙে দেওয়া, সমাজসেবা, টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি, পাড়ার চৌহদ্দি রক্ষার দায়িত্ব, টিউশন কেটে আসা মেধাবী ছাত্রদের আশ্রয়দান ইত্যাদি ইত্যাদি । আমাদের পাড়ার বেশির ভাগ ছেলেই পাড়ার পাশেই টাউন স্কুলে পড়তো, একবার মনে হয় ক্লাস নাইনে সমবেত ফেল হলো। এক এক জনের মার্কশীটে সাবজেক্টের তলায় স্কেল দিয়ে সোজা লাল দাগ টেনে দেওয়া হলো। এর মধ্যে গাবলু আবার কি একটা ঘটনা ঘটিয়ে বসলো। গাবলুর 'গার্জিয়ান কল' করা হলো। গাবলু আমাদের পাড়ায় ওর মামা বাড়িতে দিদার কাছে থাকতো। দিদা পুরনো মানুষ, সে এইসব 'কল - গ্যাঁড়াকল' কিছুই বুঝবে না, মামাদের বললে ওর চামড়া খুলে ডুগডুগি বানাবে আর রোজ সকাল সন্ধ্যায় নিয়ম করে বাজাবে। পাড়ার বখাটে ছেলে মানেই আপদে বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়া আর প্রত্যেক পাড়াতেই একজন থাকে যে এই বখাটে ছেলেগুলোর বিপদে পাশে থাকে। গরমের দুপুরে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে কাকাকে জানানো হলো সম্মুখ সমরে কাকাকেই যেতে হবে। প্রয়োজনীয় জামাকাপড় সব দেওয়া হবে। স্কুলে গিয়ে কাকাকে শুধু কাঁচুমাচু মুখে সব কথা শুনে যেতে হবে আর হ্যাঁ এ হ্যাঁ মেলাতে হবে, ব্যস! একদা সকাল বেলা কাকা স্কুলে উপস্থিত হলো। গাবলুর গায়ের রঙ ছিল কালো আর কাকা বেশ ফর্সা (এ প্রসঙ্গে বলে রাখি আমি কালোকে কালো আর সাদাকে সাদা বলি, আর এর মধ্যে কোনো ভুল দেখতে পাইনা। ভুল তখন হবে যখন আপনি কাউকে শুধু গায়ের রঙের জন্য মনুষ্যেতর প্রানী অথবা নিম্নবর্গীয় ভাবতে শুরু করবেন), ক্লাস টিচার কিছুতেই বিশ্বাস করছেনা যে কাকা আর বাবলু একই বাড়ির, কাকা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিনেতা কোনো কিছুতেই মুখ খুলছে না। এদিকে টিচার সন্দেহ করলেও মুখে বলতে পারছে না 'ছেলে এত কালো কি করে হলো ?'
গোটা ঘটনার সময়ে কাকা 'টু' শব্দ করেনি। ক্লাস টিচার শেষে বলেছিল 'ছেলেকে দেখবেন যেন স্কুল পালিয়ে বাইরে আড্ডা মেরে না বেরোয়'। আমি হলে খ্যাঁক করে হেসে ফেলতাম 'শালা আমার দোকানেই আড্ডার মন্দির বানিয়েছে' কিন্তু কাকা জাত অভিনেতা, টুঁ শব্দটি করেনি।
স্কুল টাইমে , মেয়েদের সাইকেল চালিয়ে স্কুল যাওয়ার সময় হলে কাকার দোকানে বৃষ্টির পরে লাল পিঁপড়ের মতো ভীড় হতো, দেখবেন পিঁপড়েরা যেমন উল্টো পথে ফেরার সময় খবর দিতে দিতে ফিরে, সেভাবেই সবাই খবরের আদান প্রদান করতে করতে আসতো। 'আরে টুনিকে দেখলাম বাবার মোটরসাইকেলে গেল আজকে' ' টেঁপিকে দেখলাম একটা ছেলের সাথে সেম স্পীডে সাইকেল চালাচ্ছিলো' ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ সব খবর। এ সময়ে দু'দুটো কাঠের বেঞ্চি এমনকি শেষে কাকার নিজের রঙচটা 'শতাব্দী প্রাচীন' প্লাস্টিকের টুলটা দিয়েও কুলোনো যেতোনা। কাকার চায়ের দোকানের সামনের গলিতেই একটা গার্লস স্কুল ছিল, সেই স্কুলের মেয়েদের প্রতি ঠেকের সভ্যরা ভব্য আচরন করতো এবং বাইরের কোনো ছেলেকেও টিটকিরি মারতে দেখলে উপযুক্ত শিক্ষা প্রদান করা হতো। একবার ঠিক হলো, এরপরে কোনো ছেলেকে স্কুল শুরুর সময় ঐ চত্বরে দেখা গেলে কথা দিয়ে নয়, ব্যাথা দিয়ে বোঝানো হবে...
দেখবেন বাড়িতে যন্ত্রপাতি মেরামতি করার জন্য লোক আসলে যন্ত্রের সমস্যা উধাও হয়ে যায়, সেইরকম আমরা কেরামতি দেখানোর পরিকল্পনা নেওয়ার পর থেকে কোনো ছেলেকে আর আসতে দেখা গেলো না। এতবড় একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ অথচ শুধু ছেলের অভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে না। নজরদারি আরো বাড়ানো হলো কিন্তু আশাপ্রদ ফল পাওয়া গেলো না। সবাই মরিয়া হয়ে আছে, কাউকে না কাউকে মারিয়া তবেই শান্তিতে ঘুমোবে, অবশেষে সুদিন এলো। তখন ভর দুপুরবেলা, এক হৃষ্টপুষ্ট বালক গলিতে হেলতে দুলতে ঢুকলো, তখন স্কুলে ক্লাস চলছে সুতরাং কোনো মেয়ের বাইরে থাকার কথা নয় আর তাছাড়া বালক আমাদের পাশের পাড়ার পরিচিত কিন্তু প্রথমতঃ বালক গলিতে প্রবেশ করেছে তার উপর হেলতে দুলতে । দু-দুটো আইন ভাঙার অপরাধে পটলা আর কে একটা দৌড়ে কোনো কথা না বলে, বাঁ হাতে মুখে এক ঘুষি...
খানিকক্ষণ পর বালক মুখে হাত দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। জানা গেল বালকের একটি দাঁত খোয়া গেছে। ঠেকে অনেক নামজাদা দাদা থাকলেও পটলার বাম হাতের জোর নিয়ে সন্ধ্যা অব্দি বিশ্লেষনমূলক আলোচনা চলল এবং অভিজ্ঞরা পটলাকে উপদেশ দিল যে ভবিষ্যতেও পটলা-র বাম হাত দিয়েই ঘুষি চালানো উচিৎ। দুই নয়, দেড় নয়, আধা নয়, সিকি নয় ঠিক মেপে একটা দাঁত খুলে দেওয়া! ওর যা বাম হাতের জোর, তাতে অবিলম্বে ওর সমস্ত বাঁ হাতি কাজ ডান হাত দিয়ে করা উচিৎ এবং বাম হাতকে শুধুমাত্র এধরনের শৈল্পিক কাজের জন্য লাগানো উচিৎ । পরদিন সকাল বেলায় খবর এলো বালক কোনো রকম অসদুদ্দেশে নয়, টিফিন বক্সে গরম লাউ চিংড়ি নিয়ে এসেছিল, ঐ গলিতেই ওর পিসীর বাড়ি । এসব শুনে পটলার বাম হাত থেকে উপরে আস্তে আস্তে বাম দিকে পাঁজরের ভিতর নরম জায়গাটা শক্ত হয়ে গেল। পাশের পাড়ার মারামারি কমিটির বোর্ড মেম্বাররা পটলাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। তখন মারামারি হওয়ার পর পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে গেলে মার-দাতারা মার-গ্রহীতার সাথে বিশিষ্ট প্রবীন মারপিট শিল্পীদের উপস্থিতিতে 'মিউচ্যুয়াল' করে নিতো যার পোশাকি নাম ছিল 'মিল-চাল', মানে চালে ডালে মিলে যাওয়া আর কি!
'মিল-চালে' দাঁতহারা জানালো ' কোনো মিল-চাল হবে না। দাঁতের বদলা দাঁত । '
পটলা ওর অবশ্যম্ভাবী প্রাক্তন দাঁতের কথা চিন্তা করতে গিয়ে ওর বিখ্যাত হাতের কথা ভুলে গেল।
বালক তখনো বলে চলেছে ' আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি সাড়ে সাতশো টাকা লাগবে দাঁত লাগাতে, এক পয়সা কম হবে না।'
'দাঁতের বদলা দাঁত'
সাড়ে সাতশো টাকা কোনো মামুলি কথা নয়, সাত টাকায় একটা আস্ত এগরোল পাওয়া যেতো আর সাতশো টাকায় অনেক অনেক এগরোল, তার থেকেও পঞ্চাশ টাকা বেশি! কাকার দোকানে আবার চাঁদা তোলা হলো একটা মজবুত টিকসই দাঁতের জন্য.....
কলকাতায় চলে আসার পর আস্তে আস্তে কাকাদের দোকান থেকে ভীড় উধাও হয়ে গেল। বালক আর আমরা একসাথেই বড় হলাম, এইসব অনেক পুরনো কথা, সহজ পাঠের মতোই সম্পর্কগুলো সহজ সরল ছিল, মালদায় এলে বালকের (এই যা! এখন আর আমরা বালক কোথায়!) সাথে রাস্তায় কখনো সখনো দেখা হলে এখন হাসি বিনিময় হয় আর দাঁতের দিকে তাকালেই একটা চা-এর দোকান, লাগামছুট ছেলেবেলা আর অনেকগুলো পুরনো মুখ মনে পড়ে যায়.......
হাবিজাবি লিখতে গিয়ে কাজের কথাটাই বলতে ভুলে গেছিলাম। 'চমন বাহার' টা দেখুন, কোনো হিরোগিরি নেই, কোনো অতিনাটকীয় ঘটনা নেই তবে জিতেন্দ্র কুমার আর বাকিরা দু-ঘন্টায় ছোট শহরের ছেলেবেলা ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে। এখন তো আবার কোন্ অভিনেতা কত পড়াশোনা করেছে সেগুলো খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে, জিতেন্দ্র কুমার আই আই টি খড়গপুরের প্রাক্তনী আর কোনো ফিল্মি পরিবারের সাথে দূর দুরান্তের সম্পর্ক নেই।
- অভিষেক বোস