Thursday, November 26, 2015

"বিকেলবেলা"


"একটা বিকেল ছিল, না ভুল বললাম, অনেক গুলো বিকেল ছিল । বছর দশেক আগেও তো ছিল! এখন আর নেই! কি জানি হয়তো কোনও এক্স্পায়ারি ডেট  ছিল, খেয়াল করে দেখা হয়নি ।
সকাল পেরিয়ে দুপুর, আর দুপুর শেষ হলেই আদরের বিকেল, চাতকের মতো বসে থাকতাম, কেননা সব নিয়মের বেড়ি কোন্ মন্ত্রবলে খুলে যেত । আমার পাড়ায় শিবমন্দিরের পাশে যে মাঠ টা আছে.... ওখানেই জড়ো হতাম, বিকেল বেলার মাঠটা কিন্তু ভীষণ রকম সেকুলার  । কোন্ স্কুল, কোন্ ক্লাস, রোল নম্বর, কোন্ বাড়ির? অবান্তর প্রশ্ন নয় । বিকেল টা না থাকলে এরা অনেকেই হয়তো হারিয়ে যেত । সারাদিন ধরে যত বকুনি, সব বিকেলে খেলার মাঠে শেষ  হয় ।
এরপরে যখন সাইকেল শিখতে শুরু করলাম তখন তো বিকেলবেলা মানেই টো টো কোম্পানি । ৭ দিনেই সাইকেল  চালানোতে পোস্ট  গ্র্যজুয়েট  ডিপ্লোমা , আর আমার ট্রেনি  থেকে ট্রেনারে প্রমোশন । গর্ব করে বলতে পারি আমার সমবয়সী বন্ধুরা আমার কাছেই সাইকেল শিক্ষা লাভ করেছে । ব্যালেন্স টা শিখে নিলেই সাইকেল টা আলতো করে ছেড়ে দিতাম, আর সাইকেল এ বসে থাকা আমার বন্ধু যখন বুঝতে পারত একাই চালাচ্ছে তখন আমার কেতা দেখে কে?
বিনিময়ে একটা নেতা গোছের সম্মান জুটিয়ে নিয়েছিলাম, এর মাঝখানে অবশ্য ক্রিকেট , ফুটবল  চলছে । এরপরে পাড়ার দাদার নজরে পড়ে এ ফুটবল ক্যাম্প এ ভর্তি হলাম , বিকেল গুলোর সাথে প্রেমে পড়ে গেলাম, বাজি রেখে বলতে পারি বিকেলবেলাতেই শুরু হয়েছিল বাকিদেরও প্রেম । কেউ টিউশন ব্যাচ এর সামনে দাঁড়িয়ে থাকত, আর কেউ মাঠের থেকে ছাদের দিকে তাকিয়ে । অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম সেইসব বন্ধুদের দিকে যারা বিকেলবেলায় পড়তে যেত । মনে মনে বলে উঠতাম আহা রে! বেচারাদের কি কষ্ট!
তবে বিকেলগুলো কিন্ত ছোট হতে শুরু করেছিল, বয়স হচ্ছিল তো, আমার আর আমার বিকেলের........
এখন অফিসের মধ্যে আর বিকেল বুঝতে পারিনা । এখন দুপুরের পর একেবারে সন্ধ্যা হয় ।
কোনোদিন যদি জীবনের চাওয়া পাওয়া আর হারানোর হিসেব করি, হারিয়ে যাওয়া বিকেল গুলো Suspense Account এ রাখব । 


- অভিষেক বোস

Sunday, November 22, 2015

লোডশেডিং




রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের সাথে ছোটবেলায় বাড়ি ফেরার একটা অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল । প্রায়ই শুনতে হত "রাস্তার লাইট  জ্বলে গেছে, এখন বাড়ি ঢুকছিস" কে বোঝাবে আজ পাড়া কাঁপানো পারফরমেন্স  দিয়েছি খেলার মাঠে , সুমন দা যাকে সবাই জন্টির ভাই মন্টি বলে ডাকে সে অব্দি হাততালি দিয়েছে । আর আমার বাড়িতে তুলকালাম রাস্তার লাইট জ্বলে গেছে! এইজন্য এই দেশের কিছু হল না! মুখরা ছেলে, তাই বলেই ফেললাম কথাটা রাস্তা র লাইট যদি না জ্বলে তাহলে কি আমার বাইরে থাকা চলবে? এরকম তর্ক বাগীশ এর সাথে তর্ক বৃথা অতএব আমার মা রণে ভঙ্গ দিল, কিন্তু ততক্ষণে আমি নিউটনের মোক্ষম সূত্র পেয়ে গেছি সন্ধ্যা বেলায় বাড়ি ফেরা রাস্তার লাইট জ্বলে ওঠার সাথে ইনভার্সলি প্রপর্সোনাল  । দু চারদিন ইট পাটকেল দিয়ে চেষ্টা  করলাম, যখনই হাতে ইট তুলি কেউ না কেউ দেখে ফেলে । অতএব লোডশেডিং এর শরণাপন্ন । লোডশেডিং হয়েছিল কিনা সে গল্প থাক কিন্তু আমি লোডশেডিং কে ভালোবেসে ফেললাম । ঐভাবে তাকানোর কিছু নেই আমি এখনও ভালোবাসি ।অনেক আগে লোডশেডিং মানেই পড়া থেকে ছুটি । এরপর জ্বলে উঠবে মোমবাতি, লণ্ঠন, ডিমলাইট, ইমার্জেন্সি লাইট , যার যেমন সঙ্গতি  । আমি যেখানে পড়তে যেতাম সেখানে ছিল ডিমলাইট, জ্বলে উঠলেই অনেকে গঙ্গাফড়িং ধরা প্র্যাকটিস  করত আর আমি নখের ডগায় জল নিয়ে দিতাম কাচের উপর ছিটিয়ে, ব্যস ডিমলাইটের ডিম নিমেষে চৌচির । আরও ছোটবেলায় গরম কালে রাতের বেলা আমরা মাঠে খেলতে যেতাম, দাদুরা বসে বসে গালগল্প করত আর আমরা মাঠ জুড়ে ছুটে বেড়াতাম, তারপর রাত য়খন আরও বাড়তো আর জাম গাছের পেঁচা ডেকে উঠতো তখন দূর থেকে “ গরম ভাজা... " শুনতে পেতাম । লোকটাকে কোনওদিন চোখে দেখিনি আর গরম ভাজা চেখে দেখিনি কিন্তু বড়দের কাছে শুনতাম ওদের ছোটবেলা থেকে নাকি লোকটা আসে, সুর টা এখনও মনে আছে ।
এরপর গরম পেড়িযে যেদিন প্রথম বৃষ্টি নামবে সেদিনও তার সাথে থাকত লোডশেডিং, আর তারপরে বর্ষার সময় লোডশেডিং আর ভুতের গল্প ছিল Deadly combo। অন্ধকারের মধ্যে যখন পেঁয়াজি ভাজার গন্ধ আসত কে জানে অজান্তে পুকুর পাড়ের ভুতও এসে জুটত কিনা ! এরপর যখন গল্প জমে উঠেছে ঠিক তখনই বেরসিকের মত কারেন্ট চলে আসত আর ছন্দ টা কেটে যেত ।

এরপরে কালীপুজোর রাতের অন্ধকার তো আমার সবচেয়ে বড় ফ্যান্টাসি .... দিওযালির রাতের অন্ধকারেই তো দূর হয়ে যায় সব কিছু অশুভ ।

শীতের রাতে যখন কোনও বিয়ে বাড়ি থেকে হেটে ফিরতাম আর লোডশেডিং হয়ে যেত তখনই জ্বলে উঠত তিন ব্যাটারির টর্চ, টর্চ জ্বালিয়ে রাখার মধ্যে কোনও শিল্প  নেই তাই সবার সামনে থাকা আমি ঠিক ঠিক জায়গায় টর্চ জ্বেলে রাস্তা দেখিয়ে দিতাম... টর্চ অন অফ  করতে করতে কখন যে হাতের টর্চ টা মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট  হয়ে গেছে ! তবে 
অন অফ  করার অভ্যেস টা এখনও যায়নি .......... 

পুনশ্চ : এখন লোডশেডিং না হলেও অনেক রাতে ফিরি, তবে বাড়িতে নয়, অন্য শহরের ফ্ল্যাট - এ আর ল্যাম্পপোস্ট  গুলো সারারাত জ্বলে থাকে..


-অভিষেক বোস

Monday, November 9, 2015

ভুত চতুর্দশী

দূর্গাপুজোর যে বাজী, পটকাগুলো বেঁচে থাকত সেগুলো লক্ষী পুজোয় ফাটানোর একটা চেষ্টা চালাতাম, কিন্তু প্রথম পটকাটা ফাটানোর সাথে সাথেই বড়রা খেঁকিয়ে উঠত ' লক্ষীপুজোয় বাজি পোড়াতে নেই , এত শব্দ হলে মা লক্ষ্মী ঘরে আসবে না ৷' পরদিন থেকে স্কুল না খুললেও টিউশন চালু হয়ে যেত ৷ এরপরেই আসবে কালীপুজো আর কালীপুজোর আগের দিন হল ভুত চতুর্দশী ৷ নামটা শুনলেই একটা ভয় ভয় পেত ৷ তবে ঐ রাতেই ১৪ প্রদীপ জ্বালিয়ে কালীপূজোর মহড়া শুরু হয়ে যেত ৷ মোটামুটি দু'দিন আগে থাকতেই সব বারুদ মজুত করে নিতাম... তুবড়ি, চড়কি , লঙ্কাপটকা (ধানি পটকা) ৷ চকোলেট বোম ফাটানোর লাইসেন্স তখনও পাইনি ৷ তবে নাগিন লঙ্কা পটকাই বা কম কিসে ? মা কালীর দিব্যি হচ্ছে সত্যির সবথেকে বড় সার্টিফিকেট ( সেল্ফ অ্যাটেস্টেড ) সেই সার্টিফিকেটের কসম ,হাতে নিয়ে লঙ্কাপটকা জ্বালিয়ে ঠিক ফাটার অাগের মূহুর্তে ছুড়ে দেওয়ার যে অনুভূতি , তার সাথে আর কিছুর তুলনা চলে না ৷ শিল্পীর দক্ষতা চাই , অনেক আগে ফেলে দিলে তুমি ভীতু আর সময় মতো না ফেলতে পারলে চিত্তির ৷ আর যে পটকাগুলো ছুড়ে ফেলার পরেও ফাটত না সেগুলো তদন্ত করতে রীতিমতো বোম্ব স্কোয়াডের কর্মীদের দক্ষতা প্রয়োজন ৷ আর রকেট ছাড়ার জন্য চাই একটা বোতল , অন্তত চারটে বছর রকেট চালানোর অভিজ্ঞতা আর খান পাঁচেক লোকের সরে আয় , সরে আয় চিৎকার ৷

তবে শুধু বোমাবাজি নয় , পাটকাঠি জ্বালানোটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল , সবাই পাটকাঠি জ্বালিয়ে রাখতে পারতনা একটু পরেই নিভে যেত , আরে ভাই অ্যাঙ্গেলটা বুঝতে হবে তো !

দু'একবার ফানুশ বানানোর চেষ্টা করলাম , মানুষের যেমন মান আর হুশ , তেমনি ফানুশের ফান আর হুশ ৷ আমার তৈরী ফানুশে বানানোর ফান থাকলেও হুশ করে উড়ে যাওয়ার প্রযুক্তি ছিল না কিম্বা হয়তো মাটির টান ছিল , তাই মাটিতেই খেল খতম হয়ে যেত ৷ তবে আকাশপ্রদীপটা কিন্তু হেব্বি বানাতাম আর এক্কেবারে ছাদের উপরে টাঙ্গিয়ে আসতাম , অমাবস্যার অন্ধকারে দূর থেকে লাল, নীল, সবুজ সেলোফেনে মোড়া আকাশপ্রদীপ দেখতে মায়াবী লাগত ৷

মোমবাতি জ্বালানোতে আমার বিশেষ উৎসাহ ছিল না , আমি বরং টুনি লাগাতে গিয়ে ভুল ভাল তার লাগিয়ে বাড়ির ফিউস্ ওড়াতে বেশি দক্ষ ছিলাম ৷

এখন এতদিন পরে কালীপুজো হয়ে গেছে দিওয়ালি , আর ছুটিটা মিলে পুজোর পরের দিন (পুজো তো রাতে , দিওয়ালি পরের দিন) , তবে কালীপুজোর রাতে সেই যে প্রথম রাত জাগার লাইসেন্স পেয়েছিলাম , মা কালীর দিব্যি আজও রাত জেগে চলেছি ৷

- অভিষেক বোস

Friday, November 6, 2015

বৌ কথা কও


চা বাগানের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই আওয়াজটা কানে এসেছিল, ভরদুপুরেও এই রাস্তাগুলো আলো আবছায়া । আর একটু এগোলেই ঝুলনা পুল, পাহাড়ি নদীর ওপর বাঁশের সাঁকো ।
স্থানীয় আদিবাসী সঙ্গী জিজ্ঞেস করল : চেনো এই পাখি টা?
সত্যি চিনতাম না, তবে আবার ' না ' বললেই শহুরে হওয়ার জন্য একপ্রস্থ শুনতে হবে, তা ছাড়া আওয়াজ টা চিনতে পেরেছিলাম !
বললাম “ বৌ কথা কও "
ঠিক, তবে তোমরা বলো, এটাকে এখানে....
পিউ কঁহা বলে তো !? গুগলের মতো লেখা শেষ না হওয়ার আগেই উত্তর টা দিয়ে ফেললাম ।
প্রত্যুত্তর এল না, তবে একটা ফিচেল হাসি আমার নজর এড়াল না ।
বাঁ দিক ধরে মিনিট ১৫ এগোতেই আবার ঐ পাখির আওয়াজ, তবে এবার চোখে পড়ল কালো কালো বাচ্চা গুলো খালি গায়ে নকল করে পালা করে গলা মেলাচ্ছে.....
“আম্বা পাকো, কাঠাল পাকো "
ফিচেল হাসির কারণটা বোঝা গেল, দুপুর বেলা গুছিয়ে কচি পাঁঠা আর সরু চালের ভাতের পর বিকেল বেলা পাখির আওয়াজের সাথে বৌ কথা কও এর মিল চলতে পারে, তবে এখানে এই চা বাগানের আধ পেটা ভুখা বাচ্চা গুলোর কানে আম, কাঁঠাল পাকার আওয়াজটা বেশি মানানসই .......
- অভিষেক বোস

Sunday, November 1, 2015

রবিবারের গপ্পো


 "রবিবারের গপ্পো  "

সকাল থেকেই বাগানে পাইচারী চলছে | প্রদীপবাবু আজ গাছ গুলোর দিকে নজর দিয়েছেন |
"কই গো শুনছ ? পাতাবাহার এর গাছটা তো শুকিয়েই গেল ! আমি না দেখলে তো মরেই যেত ! "
ভিতর থেকে গিন্নীর মুখ ঝামটা ...
"মরণ ! এদিকে যে সংসারের চাপে আমি মরতে বসেছি সেটা চোখে পড়ে ? যাও আগে বাজার টা করে নিয়ে এসো, আর বেসন আনতে ভুলোনা যেন ! "
প্রদীপবাবু হাতে ঝোলা ঝোলাতে ঝোলাতে বেরিয়ে পড়ল | সন্তুর চায়ের দোকানে প্রথম স্টপেজ  |
"এই একটা চিনি ছাড়া লাল চা দে তো, দেরী করাস না মাংস কিনতে হবে , তোর বৌদি আবার ভালো মাংস না পেলে খায় না। "
নেক্সট স্টপেজ বাপির দোকান
'' কই রে বাপি , এই জিনিষ গুলো ready কর দেখি ,আমি বাজার করে এসে নেব | আর ভালো দেখে জিরে গুড়ো দিস, মাংসে দেব কিন্ত ! "
"কি রে বাপ্পা তোদের ক্লাবের ছাদ হল? কোনও অসুবিধে হলে বলিস! এখন আর দাঁড়াচ্ছি না বুঝলি, মাংস কিনতে হবে | "
অতঃপর বাজারে ঢুকে পটল , ঝিঙে, টমেটো সব কেনা হয়ে গেলে আলুওয়ালা কে স্পেশাল ইন্সট্রাকশন 
" আলু গুলো বেছে দিবি ,মাংসের পিস্ হবে কিন্তু !"
এরপর ভীড় ঠেলে পাজামা তে কাদা ছিটিয়ে যখন বসির এর সামনে পৌছলেন তখন দু'বার গলা খাঁকারি দিয়ে প্রদীপবাবু
" আমাকে ভালো দেখে ৭৫০ মাংস দাও তো , মিডিয়াম পিস্ , আর একটু মেটে দিও তো ! "(শেষের টা একটু আস্তে) |
যাই হোক মেটে পাওয়া গেল | প্রদীপদার মুখে যুদ্ধজয়ের হাসি | এরপর বাজারের থলে টা বৌয়ের হাতে তুলে দিলেই ব্যস্ !
খবরের কাগজ পড়তে পড়তে প্রদীপবাবু রান্নাঘরের পাশে পায়চারি শুরু করলেন | মহাভারত সবে শুরু হল, শেষ হওয়ার আগেই জুটে যাবে এক পিস কষা! এরপরে স্নান সেরে শাক দিয়ে ভাত মাখতে মাখতেই চলে আসবে পেতলের বাটিতে তিন পিস , আর সাথে দু'পিস আলু |
আহ্হা রবিবারের মজাই আলাদা | মনে মনে একটু হেসে নিলেন প্রদীপবাবু |
" তার ভালোবাসা বাসি যেন রোববারে খাসি....আর দ্বিতীয় পলাশী "

- অভিষেক বোস 

বাকি কথা :  গল্পের মূল অনুপ্রেরনা আমার প্রবাসী বাঙালি বন্ধু কৌশিক উপাদ্ধ্যায়