Tuesday, June 23, 2020

ঘোড়াওয়ালা রথের গল্প

তখন সদ্য প্রোমোশন পেয়েছি, পাঁচ টাকা থেকে দশ টাকায় আর হাফ প্যান্ট থেকে সাময়িক ফুল-প্যান্টে। চুলে চিরুনি এখন আর সোজা চলে না আর টাকা পেছনের পকেটে থাকে। তখন দশ টাকায় কি কি পাওয়া যেতো ? দশ টাকায় একটা গোটা ইলিশ, পাঁচ - ছ'কিলো বাসমতি চাল, দু লিটার আগমার্কা সর্ষের তেল, আধা কিলো পোস্ত….. ইল্লি আর কি! একি গুপ্তযুগের গল্প !? এসব কিস্যু পাওয়া যেতো না। দশ টাকায় পাওয়া যেতো দু' প্লেট চপ ঘুগনি, ভাগাভাগি করে একটা এগরোল (কুমড়োর আর চালতার শস দেওয়া) আর মেলা থেকে ফেরার সময় একটা কুলফি । 

মেলা মানে রথের মেলা, আর রথ মানে ঐ পুঁচকে রথ না, রীতিমতো বড়সড় রথ। রথের মাথাটা মন্দিরের চূড়োর মতো আর রথের দোতলার সামনে দুটো প্রমাণ সাইজের কাঠের আধা ঘোড়া পা উঁচু করে। ঐ কাঠের ঘোড়ার খুড় ছুঁয়ে একটা খুড়বত্ প্রনাম না করলে কিসের কি! (গত কয়েক বছর ধরে ইস্ক নের যে রথের মতো দেখতে একটা ঝকঝকে ধাঁচা ত্রয়ীকে স্টিয়ারিং আর ইঞ্জিন লাগিয়ে সামনে 'কৃষ্ণনাম' করতে করতে নিয়ে যায়, সেটাকে আমি কিছুতেই রথের স্টেটাস দিবো না, আর তাছাড়া শ'য়ে শ'য়ে লোক দড়ি টেনে নিয়ে যায় না তাই ওটা রথ নয়, গাড়ি)। তো আমার সেই ঘোড়াওয়ালা রথের মেলা বসে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামনে বড়রাস্তার উপরে , আর ঐখান থেকে আরো দেড় কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমেই  বন্ধুদের জুটিয়ে নিয়ে ভীড়ের মধ্যে সেদিয়ে যাওয়ার নামই মেলা যাওয়া , ভুলে গেলে চলবে না হিরোর পকেটে আছে দশটাকা, সাথে আছে আরো সাত - আটটা বন্ধু, তাদের সবার জটিল পকেটকে নিয়ে যদি সরল করা যায় তবে যোগ বিয়োগ করে ( কে কবে কাকে খাইয়েছিল, সেগুলো বিয়োগ হবে) মোটামোটি পঞ্চাশ টাকা হয়ে যাবে, এই টাকায় একটা আস্ত মেলা কিনে নেওয়া যায় তবে আমরা আপাততঃ চপ ঘুগনি কিনব। চপ ঘুগনি খেতে খেতে দেখলাম, গ্যাং এর অনেকেই 'ধাঁ' হয়ে গেছে, পাশের দুটো তখনো নাকের জলে, চোখের জলে নির্বিকারে খেয়ে যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে লঙ্কা গুড়ো, পেঁয়াজ কুচি চেয়ে যাচ্ছে, ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম বাকিরা কোথায়?

— 'সব পালিয়েছে'
    কোথায়? 
 —'কোথায় কে জানে, মেলার ভীড়ে আছে কোথাও, 
     আমরাও পালাবো, তুইও পালা'     
                        
    প্লেটটা রাখতে গেলে ধরে নিবে যে?
— 'প্লেটটা নিয়ে পালা'

প্লেটটা নিয়ে আর পালাতে পারিনি, পকেট থেকে গচ্ছা দিয়ে, মাথা চুলকোতে চুলকোতে বেরোলাম। জানি জানি দশ টাকার হিসেব তো? ইনকামের কথা কি এত খোলাখুলি বলতে হয়! মা-বাবা ছাড়াও, দাদু-দিদা, ছোট মাসী' যত নাম, তত ইনকাম'। এছাড়া আরো কিছু 'আশরফি' আমাকে দেওয়া হতো, ফেরার সময় 'ছোট্ট ছোট্ট লালমোহন' কিনে আনার জন্য, নরম, তুলতুলে আর নিক্তিতে মাপা মিষ্টি, একটু কম-ও নয় আর বেশিও নয়, আর তার উপরে বোনাস এক্কেবারে 'হাতে গরম' । মেলার পাপড় ভাজা নিয়ে আমার কোনো কালেই আদিখ্যেতা নেই, বরং পাপড়টা দেখলেই কেমন শীর্নকায় খসখসে হলদে পাতা লাগতো যার সামনে গেলেই  একটা তেলচিটে গন্ধ আসতো। ঐ পয়সায় আমি দুটো চপ মুখে চালান করে দিব, কেউ টেরটিও পাবে না। পাতার কথায় মনে পড়ল রথের সামনে পান-চিনি দেওয়ার রেওয়াজ আছে, একবার কায়দা মেরে রেওয়াজ পালন করতে গিয়ে দেখি কাঠাল পাতা মুড়ে দিয়ে দিচ্ছে, সবাই সেটাই ছুড়ে দিচ্ছে।আমি অত্যুতসাহী বালক, কাঠাল পাতা খুলে দেখি 'চিনি' টুকুও নেই, এত্তো বড় ধোঁকা! থাক, এর থেকে আমার খুড়বত্ প্রণামই ভালো, কোনো ফাঁকিবাজি নেই, তাছাড়া সামনে গিয়ে খুড় ছোঁয়ার জন্য লাফালাফি করলে আমার পায়ের 'স্প্রিং'- গুলোও ঠিক থাকবে।

আমার বিশ্বস্ত বন্ধুদ্বয়, যারা প্লেট সমেত পালিয়ে গেছিল, চপের দোকান থেকে বেরিয়ে একটু এগোতেই হাস্যমুখ অবতারে অবতীর্ণ হয়েছিল, এ-ওর কাঁধে হাত রেখে, এঁকেবেঁকে চলতে সব জায়গায় একটু একটু করে ঢুঁ মেরে যখন এই ফিরব ফিরব করছি, ঠিক তখনই ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমে এলো। সামনেই একটা জিলিপির দোকান দিয়েছিল, মাথা বাঁচাতে ওখানেই ঢুকেছি, হঠাৎ করে কানের কাছে কে একটা জোরে পোঁ করে বাঁশি বাজিয়ে উঠল, পেছন ঘুরে কচিমনে দুটো কাঁচা গালি দিতে গিয়ে দেখি, গ্যাং এর বাকিরা দাঁড়িয়ে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসছে। না, আর আটকে লাভ নেই, দিয়েই দিলাম 'দুটো' একটু নরম করে।

- 'জিলিপি খাবি…?' নরম গলায় জিজ্ঞেস করল 
   না, আমি জিলিপি খাই না 
 - 'আরে খেয়ে নে, হেব্বি খেতে। ' 
    পয়সা ছিল তো পালালি কেন? 
 -  'ওটাই  মজা' 

জিলিপি টা সত্যি ভালো ছিলো, জানিনা মেলার জিলিপি বলে, নাকি বন্ধুদের সাথে একসাথে খেলাম বলে! 

অনেক বছর পর, এবারে রথের দিন আবার আমার শহরেই আছি, সব ঠিক থাকলে মাফিন-কে নিয়ে ঘাড়ে চড়িয়ে মেলা দেখিয়ে নিয়ে আসতাম! আমার সব বেড়ে ওঠার ছোট্ট ছোট্ট ভালোলাগার দিনগুলোর সাথে মাফিনের বন্ধুত্ব করিয়ে দিতাম। সেসব আর কিচ্ছু হোলো না। 

'চিনি না দেওয়া' কাঠালপাতা বিক্রি করা আধ ছেড়া চটি পড়া ছেলেটাকে অনেক দিন আগেই  মাফ করে দিয়েছিলাম, হয়তো দেখা হলে আবার ওর মতো কারো কাছ থেকে পাতা কিনে ভিতরে কি আছে না দেখেই 'ঘোড়ার পায়ে' ছুড়ে দিতাম কিন্তু সবকিছু উলটপালট করে দেওয়া হালফিলের অনাহুত 'চিনি' - র জন্য কোনো ছাড় নেই। 

— অভিষেক বোস

(ছাদের উপর থেকে রথের রাস্তার দিকে তাকানো ছবিটা ক্লিকিয়েছে প্রিয়াঙ্কা, পাশে দাঁড়িয়ে ছিল মাফিনের ঠাম্মি)

Tuesday, June 16, 2020

জিমি জিমি

কয়েকদিন আগে রাতে আমার মাখনের গোলাটার খাওয়ার তৈরী করে আনতে একটু দেরী হয়ে গিয়েছিল, গোলা ততক্ষণে রাগের প্রথম পর্ব দেখানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করবে, আর ঠিক তখনই খাওয়ার হাজির। আমি 'আ গ্যায়া, আ গ্যায়া, হালুয়াবালা আ গ্যায়া' গানটা গাইতে গিয়ে বুঝতে পারলাম গানের লিরিক জানি না। এদিকে অখাদ্য কুখাদ্য সব গানের লিরিক মনে থাকলেও ছোট্ট বেলার এই গানের লিরিক আমি ভুলে যাইনি, জানিই না। ইউটিউব এ গানটা সার্চ করতে গিয়ে কমেন্ট এ দেখলাম সব রাশিয়ান এ লেখা ( কি করে বুঝলাম রাশিয়ান!? মালদাতে একবার সেকেন্ড ডিভিশন ফুটবলহ লীগে  গোয়ার ডেম্পো স্পোর্ট ক্লাবের হয়ে কয়েকজন উজবেকিস্তানি ফুটবলার এসেছিল, তাদের মধ্যে মিকোলো শেভচেঙ্কো বলে একজনের সাথে বেশ দোস্তি হয়েছিল, ওর কাছ থেকেই আধো আধো শিখেছিলাম), লিরিক ভুলে গিয়ে ততক্ষণে আমি কমেন্ট ঘাটতে শুরু করেছি, পাঁচ-সাতটা নয়, সাতশো কমেন্টের বেশিরভাগ কমেন্টই রাশিয়ান, আর তাতে বারবার জিমি লেখা। সুতরাং কোনো রুশি ভুল করে কমেন্ট করেনি, আর আমাকে এবার জানতে হবে কেন

এতদিন জানতাম সোভিয়েত ইউনিয়নে সবথেকে বেশি জনপ্রিয় ভারতীয় রাজ কাপুর, কিন্তু জিমি তার থেকে অনেক এগিয়ে। ১৯৮২ তে ডিস্কো ডান্সার এর সময় থেকে জিমি মধ্যবিত্ত রাশিয়ানদের ঘরে পৌঁছে গেছে। ভারতীয়দের মিঠুন চক্রবর্তী, রাশিয়ানদের কাছে জিমি। 

আশির দশকের শেষে ইউএসএসআর নেতা মিখাইল গর্বাচেভ যখন ভারত সফর করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী অমিতাভ বচ্চনকে দেখিয়ে বলেছিলেন ' ইনি ভারতের সবথেকে বড় সুপারস্টার', গর্বাচেভ জবাব দিয়েছিলেন: " আবার বৌ শুধু রাজ কাপুরকে চেনে আর আমার মেয়ে শুধু মিঠুনকে।"

ডিস্কো ডান্সার এর পরিচালক বি সুভাষ মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ডিস্কো ডান্সার স্ক্রিনিং নিয়ে খুব বেশি উৎসাহী ছিলেন না , তখন ফিল্ম ফেস্টিবভ্যালে ' দো বিঘা জমিনের মতো বাস্তববাদী আর সমান্তরাল সিনেমাগুলো যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতো, সেখানে ডিস্কো ডান্সার নিয়ে স্মিতা পাতিল ও অস্বস্তি বোধ করছিল । বিকেল তিনটায় এক বিশাল অডিটোরিয়ামে স্ক্রিনিং শুরু হলো আর সন্ধ্যার মধ্যে জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী, জিমি ততক্ষণে সুপারহিরো, ঐ বছর সোভিয়েত ইউনিয়নের 
highest grossing foreign film  । 

প্রথম ছবি মৃগয়া তে জাতীয় পুরস্কার তারপরে একের পর এক সুপারহিট ফিল্ম এমনকি 'অগ্নিপথ' এ কৃষ্ণন আইয়ার এর মতো ছোট্ট পরিসরেও অমিতাভের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করার পর কেন যে খাজা-খাজা সিনেমা করতে শুরু করল কে জানে? 

'মিলে সুর মেরা তুমহারা' র সময় মিঠুন চট্টবট্টি-র ফ্যান ছিলাম আমি, তখনো চক্রবর্তী বলতে শিখিনি। পরে অবশ্য পুকার-এ অমিতাভকে দেখে মিঠুন এর জায়গা নড়ে গেছিলো, সে সব অন্য গপ্পো। যাই হোক তখন বোধ হয় ক্লাস ফাইভ-সিক্সে পড়ি, মালদাতে মিঠুনের ফাংশন আর আমার বাড়িতে তিনটে ভিআইপি পাস আছে, টিকিট শেষ, এখন তিনটে টিকিটে কে কে যাবে? আমার মাসতুতো দিদি মালদাতে আছে, একটা পাস তার জুটল, একটা বোধহয় আমার মামা পেলো আর একটাতে কে যাবে? যদিও আমার বাড়িতে ভিসিপি-তে রোজ একটা সিনেমা দেখতাম, তাও সদ্য সিক্সে উঠেছি, তখনো এতো সিনেমা-টিভির ছুট ছিলনা, আমার ভাগ্যে কি একটা পাস জুটবে! এরকম সময়ে মা বলল ঐ পাসটা তে 'আমি' যাবো, আমার ছোট্টবেলার মিঠুন চট্টবট্টি, এইজন্যই বলে 'জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। এত কাছ থেকে টিভির পর্দার বাইরে নায়ককে দেখে ফিরে এসে সারারাত ধরে স্বপ্ন দেখলাম এই মিঠুন আমাকে হাতে ধরে বক্সিং শেখাচ্ছে, তো এই ডান্স শেখাচ্ছে। 

এরপরের সুযোগটা এলো আরো বছর দুয়েক পরে, তখন যুবভারতীতে ফুটবল ক্যাম্পে প্র্যাক্টিস করি। মালদা ডি.এস.এ, থ্যালাসেমিয়া সোস্যাইটি আর যুবভারতী মিলে একটা প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করেছিল 'মালদা একাদশ বনাম মিঠুন একাদশ'। তখন থ্যালাসেমিয়ার নাম শুনলেই মিঠুন বিনে পয়সায় একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত দৌড়ে বেরাতো। মিঠুন ইলেভেন এর মিঠুন আর প্রাক্তন প্লেয়ারদের আমরা ফুলের তোড়া দিয়ে সম্বর্ধনা জানাবো, আমার ভাগ্যে পড়ল সুরজিৎ সেনগুপ্ত। এত বড় ফুটবলার কিন্তু' মিঠুন' তো নয়, আমি পনেরো টাকা দামের রেনল্ড এর জেটার পেন নিয়ে এসেছি, যাতে অটোগ্রাফ দিতে কোনো অসুবিধে না হয় আর আমার সাথে এতো বড় ধোঁকা। যাই হোক আগে থেকেই ঠিক করে নিলাম ' সুরজিৎ সেনগুপ্ত' কে ফুলের তোড়া দিয়ে সোজা এগিয়ে যাবো 'মিঠুন' এর দিকে। সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান শুরু হতে হতেই সবাই নিজের নিজের জায়গা ছেড়ে ফুল হাতে এক্কেবারে মিঠুনের কাছে, এদিকে আমার প্ল্যান-এ পুরো জল। বাকি ফুটবলাররা দাঁড়িয়ে আছে, একবার মনে হলো আমিও দৌড়ে যায়, তারপরে সুরজিৎ সেনগুপ্তের হাতে ফুলের তোড়াটা ধরিয়ে, সবার পরে মিঠুনের কাছে পৌঁছলাম। ছ ফিটের লম্বা চেহারা, ব্যাকব্রাশ করা চুল আর হাই অ্যাঙ্কল বুট পড়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে 'মিঠুন', হাত মেলানোর পর অনেক কষ্টে বললাম 'অটোগ্রাফ', মিঠুনোচিতো স্টাইলে বলল 'আগে থ্যালাসেমিয়ার অনুষ্ঠানটা হয়ে যাক'। 

অটোগ্রাফ আরে নেওয়া হয়নি, আমার বন্ধু কৌশিক একটা অটোগ্রাফ দেওয়া ফুটবল পেয়েছিল, ওটার উপর আমার বহুদিন চোখ ছিল, তারপরে আবার সুযোগ এসেছে, তখন অটোগ্রাফের দিন শেষ। তবে ছোটবেলার নায়ক এর সাথে হাত মেলানোর মূহুর্তের যে স্মৃতি সেটাই বা কম কিসে! 


আজকে মিঠুন 'জিমি' চক্রবর্তী-র জন্মদিন। 

-অভিষেক বোস










Tuesday, June 2, 2020

চায়না চাই না

চাই নিজ নিজ মাল, চায়না চাই না। মানে চায়নার মাল আর চাই না। শুধু নিজে বললেই হবে না, আশেপাশের মানুষদেরও বোঝাতে হবে। তবে চাই আর না চাই, ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই রোজ ডজন খানেক মেসেজ, ফরোয়ার্ড , আর শিক্ষামূলক ভিডিওতে আমার মোটোরোলা মোবাইলের দীর্ঘজীবি স্টোরেজ হ্রস্ব হতে শুরু করেছে। চায়না আমারো চাই না, ইয়ে মানে মন থেকে বলছি। বিশ্বাস করুন আমিও চায়নাকে চাই না, তাই দু একজনের কাছে জানতে চাইলাম ঠিক কি কি বয়কট করা উচিৎ!? কোন্ কোন্ দৈনিক মাল চৈনিক বংশজাত সেটা জেনে নিতে হবে তো নাকি? চীনের আবির, চীনের খেলনা, চীনের প্রাচীর , চীনে বাদাম ( না এটা থাক)!? 

বয়কটের তালিকাতে প্রথমেই আছে VIVO, OPPO মোবাইল, আর TikTok ,তারপরে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক জিনিস, যেগুলো প্রত্যেকটা ছোট বড় শহরের চিনা মার্কেটে, এমনকি আমার নিজের শহর মালদার ছোট ছোট দোকানেও পাওয়া যায় । TikTok এর মতো অপদার্থ অ্যাপ আমি আর দুটো দেখিনি, ওটাকে শুধু বয়কট নয়, আন-ইনস্টল করে 1 স্টার রেটিং দেওয়ার পক্ষে আমার একটি নিঃশর্ত ভোট আমি আগাম দিয়ে রাখলাম। এরপরে বাকি জিনিসগুলো নিয়ে একটু আড্ডা হয়ে যাক। 

বয়কটের জিনিসগুলো আমি পাঁচ ভাগে ভাগ করে নিচ্ছি। একদম প্রথমে সেই জিনিসগুলোকে রাখব যেগুলো ফিনিশড গুড হিসেবে এই দেশে আমদানি হয়ে আসে ( গোদা বাংলায় Made in China), তারপরে রাখব সেই জিনিসগুলো যেগুলো চিনা কোম্পানির ভারতের ফ্যাক্টরিতে স্পেয়ার পার্টস (যন্ত্রাংশ) হিসেবে এসে এখানেই অ্যাসেম্বল্ড্ হয়, এরপরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানির প্রোডাক্ট যাদের কন্ট্র্যাক্ট ম্যানুফাকচারার চায়নাতে রয়েছে, এরপরে আসবে আমাদের দেশীয় কোম্পানি, যারা যন্ত্রাংশের বা Key Ingredient এর জন্য চায়না নির্ভরশীল, পরের সারিতে যে সব কোম্পানিতে চাইনার অর্থ লগ্নি অথবা মালিকানা রয়েছে আর সবার শেষে রাখব তাদের, যারা চাইনিজ OEM থেকে মাল কিনে Made in India বলে চালিয়ে দেয়। ( এছাড়াও আছে বিভিন্ন চাইনিজ অ্যাপ, ওয়েবসাইট ,যেগুলোর জন্য আমরা কোনো পয়সা দিই না, যেখানে আমরাই পণ্য) 

প্রথম ভাগের চিনের জিনিসগুলো চিনে নেওয়া বেশ সহজ (!), এই যেমন VIVO , OPPO ।  ঠিক এতটাও সহজ নয়, এই যেমন ধরুন প্রথমদিকে আমার মোটোরোলা স্মার্টফোনের কথা বলেছিলাম, আমেরিকান 'মোটোরোলা' গুগলের হাত ঘুরে এখন চাইনিজ Lenovo র মালিকানাধীন। Lenovo আবার IBM Think Pad এর মালিকানা কিনে এই মূহুর্তে বিক্রির নিরিখে World's largest personal computer vendor (March 2019) ।  এমনকি স্মার্টফোনের মার্কেটেও দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং এর সাথে পাল্লা দিয়ে উঠে আসছে।

(এখনো অব্দি যা কিছু বলা হচ্ছে এগুলো সবই কিন্তু মেনল্যান্ড চায়না - র কথা মাথায় রেখে। পৃথিবীতে দু দুটো চায়না আছে, যারা নিজেদের চায়না হিসেবেই পরিচয় দেয় । এক নম্বরে পিপল্ রিপাবলিক অফ্ চায়না (PRC), যাদের সাথে আমাদের বোঝাপড়া আর দ্বিতীয়টা হলো রিপাবলিক অফ চায়না (ROC) বা তাইওয়ান। প্রসঙ্গতঃ ACER, ASUS, HTC র মতো বহুজাতিক কোম্পানির হেডকোয়ার্টার ROC তে আর সাথে রয়েছে FOXCON এর মতো বিশ্বের সবথেকে বড় ইলেকট্রনিক ম্যানুফাকচারার আর তৃতীয় বৃহত্তম টেকনোলজি কোম্পানি । FOXCON এর তালিকায় কি নেই! Blackberry, iPad, iPhone, iPod, Nokia, Xiomi, Kindle, Playstation, XBox এর মতো প্রোডাক্ট FOXCON এ তৈরী হয়। যাইহোক আমাদের বোঝাপড়াটা যেহেতু রিপাবলিক অফ চায়না-র সাথে নয় তাই আপাততঃ আর এদিকে এগোচ্ছি না।)

দ্বিতীয় ভাগে আছে সেইসব প্রোডাক্ট, যেগুলো যন্ত্রাংশের আকারে এসে ভারতে তৈরী হয়। চীনের সবথেকে বড় চালাকি যে ওরা বিভিন্ন দেশের আবেগ, অনুভূতিগুলো অনেক আগে ধরে ফেলতে পেরেছে। Motorola, Xiomi, Lava র মতো স্মার্টফোন কোম্পানিগুলো বহুদিন ধরে ভারতের মাটিতে ম্যানুফাকচারিং শুরু করে দিয়েছে আর এই ফ্যাক্টরিগুলোতে কয়েক হাজার ভারতীয় কর্মী প্রত্যক্ষ ভাবে কাজ করছে। ভারতের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সমাদৃত হলেও চীনের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে রয়েছে। Active pharmaceutical ingredients (biologically active component of a drug product) এর একটা বড় অংশ চায়না থেকে আসে। গত আর্থিকবর্ষে ভারতে যত Bulk Drug আমদানি হয়েছে তার ৬০ শতাংশের বেশি এসেছে চীন থেকে, এছাড়াও ভারতের ব্যপক হারে চায়নার অ্যান্টিবায়োটিক আমদানি হয়ে থাকে। মানে হতেই পারে আপনি, আমি যেই ওষুধগুলো খাচ্ছি তার Active Pharmaceuticals Ingredient অথবা পুরো ওষুধটাই হয়তো চায়নাতে তৈরী। 

এরপরে আসবে চীনাদের সবথেকে বড় শক্তি চাইনিজ OEM ( Original Equipment Manufacturer) । শুধু স্মার্টফোন নয়, বিশ্বের তাবড় তাবড় কোম্পানির মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট (ভেন্টিলেটর, আল্ট্রাসাউন্ড, পেশেন্ট মনিটর, বায়োকেমিস্ট্রি আরো অনেক কিছু ) এর একটা বড় অংশ চায়নাতে তৈরী হয়। আমার চাকরির সুবাদে যতটুকু দেখেছি বা বুঝেছি বড় শহরের বড় বড় কর্পোরেট হাসপাতালগুলো বাদ দিলে, পাঁচ এর মধ্যে তিনটে প্রাইভেট /সরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোমে হয় চাইনিজ আর নয়তো চীনের যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি ইক্যুইপমেন্ট আছে। আর শুধু মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট কেন অটোমোবাইল, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিয়ারিং এমনকি আপনার আমার বাড়ির স্মার্ট / আনস্মার্ট টিভিগুলো অব্দি বেশিরভাগ চায়নাতেই অথবা চায়নার প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে তৈরী। 

চীনের অর্থলগ্নি। Big Basket, Byju’s, Flipkart, Hike, MakeMyTrip, Ola, Oyo, Paytm, Paytm Mall, PolicyBazzar, Quikr, Snapdeal, Swiggy, Zomato, Gland Pharma কয়েকটা নাম যেখানে চীনের বেশ বড় ধরনের অংশীদারি আছে। আপাতভাবে দেশী এই জনপ্রিয় কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ চীনে চলে যাচ্ছে আবার এইসব কোম্পানির সাথে ভারতের কয়েক লক্ষ অথবা কয়েক কোটি পরিবার প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে। 

BMW, Ford, Fiat, Honda, Hyundai, Mitsubishi, Renault, Suzuki, Toykta, Volkswagen, Mercedesg-Benz এর মতো অটোমোবাইল কোম্পানিগুলোর চীনের সাথে Joint Venture আছে অথবা সাম্প্রতিককালে ছিল। 

এইসব তো আছেই, শুনলে হয়তো বিশ্বাস হবে না চীন এখন ভারতে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান থেকে শুরু করে Nuclear Reactor হয়ে এক্কেবারে পূজোর ঘর অব্দি পৌঁছে গেছে। বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, ফোটোর যে বিরাট বাজার রয়েছে, চীনারা তাতেও থাবা বসিয়েছে। 

কি মনে হয়, এই যে এত এত দেশের নামজাদা কোম্পানি কয়েক দশক ধরে চীনের সাথে বানিজ্যিক সম্পর্ক বাড়িয়ে তুলেছে সেগুলো কি চীনাদের ভালোবেসে? এদের অনেকেই জানে চীনের সাথে দ্বিপাক্ষিক বানিজ্যে কি ধরনের ঝুঁকি আছে! তারপরেও ইউরোপ, আমেরিকার বড় বড় কোম্পানিগুলো চীনের সাথে গাটছাড়া বেঁধেছে, এমনকি আমেরিকার মতো দেশ নিজেদের পেনশন ফান্ড চায়নাতে বিনিয়োগ করেছে। চীন একটা দুর্বোধ্য দেশ, সবকিছুতে লাগাম, ব্যক্তি স্বাধীনতা যেখানে Error 404, চীনের মিডিয়া এতটাই সরকার নিয়ন্ত্রিত যে পৃথিবীর বাকি দেশগুলো জানতেও পারে না চীনে কি চলছে কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে চীন নিজেকে যেভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে তাতে করে এই মূহুর্তে চীনকে বয়কট করা দূরে থাক, প্রয়োজনে চীন বিশ্বকে থমকে দিতে পারে।  মনে রাখতে হবে সরকারিভাবে বিবৃতি দিয়ে ব্যান নয়, জনগন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বয়কটের ডাক দিয়েছে। এর আগেও বহুবার বয়কট হয়েছে, বিগত দীপাবলির সময় যে বয়কট হয়েছিল তার পরেও  ৩২০০ কোটি টাকার চিনা মাল বিক্রি হয়েছে। আসলে আমরা অনেক সময় জানতেই পারিনা কোনটা চীনের আর কোনটা নয়। আবার অনেক সময় কোনো বিকল্পও থাকে না বা থাকলেও হয় তার গুনমান ভালো নয়, আর নয়তো দাম অনেক বেশি। চীনের শিকড়টাতে গোটা বিশ্বের বড় বড় দেশগুলো জল ঢেলে এত গভীরে পৌঁছে দিয়েছে যে এখন উপড়ে ফেলতে গেলে অনেক সময় ধরে চেষ্টা করে যেতে হবে, আর উপড়ে ফেলতে গেলে নিজের নিজের বাড়ির ভিতেরও ক্ষতি হবে। 

COVID-19 এর পরে ভারতের কাছে একটা সুযোগ এসেছে চীনের পরিবর্ত হিসেবে উঠে আসার। ভারতের মাটিতে ম্যানুফাকচারিং শুরু হলে একটা ভারসাম্য তৈরী হবে কিন্তু মনে রাখতে হবে বেশিরভাগ সংস্থাগুলো মহামারীর জন্য মূলধনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছে সুতরাং কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তারা খুব সতর্ক থাকবে। ভারতে 'ল্যান্ড-ব্যাঙ্কের' সমস্যা না থাকলেও উৎপাদন আর সরবরাহের সংযোগটা দুর্বল। 

চীনের একাধিক শিল্পাঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের বিমান আর সমুদ্রবন্দর, সড়ক যোগাযোগ, পরিবহন এত অত্যাধুনিক যে ভারতে ঐ ধরনের পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একটা দশক লেগে যাবে। আমার কোম্পানির একজন ব্রিটিশ ডিরেক্টর ২০১৮ তে কলকাতা এসেছিল, রুবি বাইপাস থেকে রাজার হাট নিউটাউনের রাস্তায় যেতে যেতে বলছিল, 'ইন্ডিয়া সত্যিই এগিয়ে আসছে অভিষেক , আমি যখন ৯০-৯৫  এ চীনের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতাম, তখন ঠিক এইভাবেই চীন উঠে আসছিল। প্রচুর বড় বড় বিল্ডিং, অফিস, চওড়া রাস্তা তৈরি হচ্ছে, চারপাশটা ঠিক এইভাবেই বদলে যেতে দেখেছি। ' আমি বুঝলাম আসল বক্তব্যটা হলো আমরা চীনের থেকে ২০-২৫ বছর পিছিয়ে রয়েছি। 

ভারতের ছোট থেকে ছোট গলি থেকে শুরু করে ভারী শিল্প অব্দি চায়নার অবাধ যাতায়াত থাকলেও, চীন যত টাকার রফতানি ব্যাবসা করে, তার মাত্র ৩% এর কাছাকাছি ভারতে রফতানি করে বাকি ৯৭% এর জন্য চীনের কাছে ভারতের বাইরে বাজার রয়েছে। আমাদের দেশের জনসংখ্যা যত বিশাল হোক না কেন চীনের বহির্বানিজ্যের ব্যাপ্তি তার থেকে অনেক অনেক বড়, উল্টো দিকে ভারত থেকে চীনে রফতানির পরিমান ৬% এর কাছাকাছি ( যদিও Trade Deficit টা বিরাট অঙ্কের) 

আমাদের দেশে মেধার অভাব নেই  ,পরিশ্রমী শ্রমিকেরও অভাব নেই, তবে চীনের মতো Skilled আর Trained Labour এর কিন্তু অভাব আছে। চীনের সাথে চোখে চোখ রেখে বিশ্ববানিজ্যে উঠে আসতে এলে আমাদের অনেক কিছু Unlearn আর Relearn করতে হবে । উল্টোদিকে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান এ এধরনের পরিকাঠামো আর মানবসম্পদ তৈরী আছে। 

বছর খানেক আগে চীনের মিডিয়া ব্যঙ্গ করে ভারতকে উপদেশ দিয়েছিল চীনের সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়তে হলে আর বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হলে ভারতকে '996' জানতে হবে। 996 'Jack Ma' র একটা বিতর্কিত Tough Overtime Work Schedule, যেখানে সকাল ৯ টা থেকে রাত ৯টা অব্দি, সপ্তাহে ৬ দিন কাজের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। 

এখানে যে কোম্পানিগুলো আসবে তারা তো শুধু উৎপাদনের জন্য আসবে না তাদের চাই একটা বিরাট বাজার, ভারতের সাথে বিভিন্ন দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক সম্পর্কও বিশ্বব্যাপী বহুজাতিক কোম্পানিদের জন্য আমাদের দেশ প্রথম পছন্দ না হওয়ার আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। গত বছর নয়া দিল্লী এশিয়ার ১২ টি দেশের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে এসেছিল (RCEP) , এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলি দেশের জন্য ভালো না খারাপ  সেটা তর্কসাপেক্ষ কিন্তু শুল্কমুক্ত রফতানির পরিপন্থী। 

আবেগ দিয়ে ভাবলে হয়তো আমরা অনেক এগিয়ে আছি, সত্যি সত্যি এগিয়ে আসতে গেলে অনেক সময়ের প্রয়োজন, আমরা নিজেরা খুব ভালো করে জানি আমরা ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। বয়কট করার আগে বিকল্পগুলো তৈরি রাখতে হবে, নইলে চীনের তৈরি Boycott China টি-শার্ট পড়ে চীনের মোবাইলে ' অচিন ' আন্দোলন চলতে থাকবে। 

- অভিষেক বোস