Sunday, May 29, 2022

মন্ডা চিনির দিনগুলো

—' কিসের আলোয় পড়ছো ভাস্কর?' 

প্রথম দিন পড়তে এসে প্রশ্নটা শুনে খিক করে হেসে ফেললাম। ভাস্কর দা টেস্ট পেপার থেকে মাথা তুলে একবার তাকালো। তারপর আবার মাথা নীচু করে টেস্ট পেপারে মন দিলো। এই খেলা ভাস্কর দা অনেকবার খেলেছে।

মন্ডা স্যার একটু হতোদ্যম হয়ে রাজাকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো
 
— 'কিসের আলোয় পড়ছো রাজা?' 

রাজা মনে হয় এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যhl দু'সপ্তাহের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলো। ভারী গলা করে বললো 

'কেন স্যার, টিউবের আলোয়। নতুন টিউব লাগিয়েছেন মনে হচ্ছে!' মন্ডা স্যার খুব উৎসাহ নিয়ে উত্তরটা শুনলো তারপর আমাকে আর কমলকে একই প্রশ্ন করলো। 

টিউবের কোনো বিজ্ঞানসম্মত নাম কিম্বা প্রজাতি আছে কিনা ভাবছিলাম। মনে পড়লো না। দুজনেই উত্তর দিলাম 'টিউব লাইটের আলোয় ।' 

—'কি করে জানলে?' 

এবার সমবেত উত্তর দিলাম -' দেখলাম। এই তো টিউব লাইট জ্বলছে।'

মন্ডা স্যারের গলার স্বর সপ্তমে চড়লো, সোনালী ফ্রেমের চশমার পেছনে চোখগুলো গোল্লা গোল্লা হয়ে উঠলো —'এতো সময় কোথায়? আলো আছে, পড়ে যাও। টিউব লাইটের আলো, না নিয়নের আলো, না জোনাকির আলো, জানার কি প্রয়োজন? আলো আছে পড়ে যাও। 

এতক্ষণে খেলাটা ধরতে পারলাম। কেন ভাস্কর দা উত্তর দিলো না বুঝতে পারলাম। ভাস্কর দা ইলেভেনে পড়ে আর আমরা নাইন। মনে মনে ভাবলাম এতক্ষণ ধরে যে সময়টা নষ্ট হলো, তার থেকে অনেক কম সময়ে টিউবের দিকে তাকানো যায়। কিন্তু ততক্ষণে দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলা শুরু হয়ে গেছে। 

—'নাইনেই আমরা টেনের সিলেবাস শেষ করে দিবো। তাহলে টেন-এ কি করবো? হাওয়া খাবো নাকি?' বলে একটা অট্টহাস্য করে উঠলো। 

আমি আর কমল একে অন্যের দিকে তাকালাম। কি টিচার খুঁজে বের করেছি গুরু! নাইনেই টেন-এর সায়েন্স সিলেবাস শেষ। পুরো টেন জুড়ে তাহলে খেলা আর আড্ডার জন্য অফুরন্ত সময়। ভাবা যায়! আনন্দে আমাদের চোখে জল এসে যাচ্ছিলো। 

— কি হলো উত্তর দাও । টেন-এ তাহলে কি করবো? 
(প্রশ্নের উত্তর দিতেই ভুলে গেছি। আমাদের চোখে মুখে আনন্দের হাসি ) 

— ভাস্-কঅর ... 

ভাস্কর দা এইসব খেলার পোড় খাওয়া খেলোয়াড় । খাতার পাতা থেকে চোখ না তুলেই পেন চালাতে চালাতে একটু বিরক্তির স্বরে উত্তর দিলো "টেস্ট পেপার করবে ।" 

বিউটিফুল। শ্রীযুক্ত মন্ডার চোখে মুখে খুশির ঝিলিক। 

'টেস্ট পেপার করবো। বিউটিফুল ভাস্কর।' তারপর একটু থেমে আবার শুরু করলো 

— "০-৮৯ নম্বরের অঙ্কের উত্তর তো কোয়েশ্চেন পেপারেই থাকে। তার জন্য আমার কাছে পড়তে আসার কোনো দরকার নেই। ০-৮৯ মানে আমার কাছে 'শূন্য' ।  ৯০ থেকে ১০০ (গলার স্বর আবার সপ্তমে চড়লো, চোখগুলো গোল্লা গোল্লা হয়ে উঠলো) এই যে দশটা নম্বর, এর জন্য আমাদের তৈরী হতে হবে। আলো আছে পড়ে যাও। " 

আমি আর কমল টিউশন থেকে বেরিয়ে এসে খুশিতে দশ টাকার চপ কিনে খেয়ে ফেললাম। নাইনেই টেনের সিলেবাস শেষ হয়ে যাবে। ৯০ থেকে ১০০ নম্বরের জন্য প্রস্তুতি চলবে, ভাবা যায়! আমি পরীক্ষা দেওয়ার সময় খাতা দেখে নিজেই নিজেকে নম্বর দিতে থাকা জনতা। ষাট- পয়ষট্টি পেয়ে গেলেই (আমার হিসেবে) খাতা জমা দেওয়ার জন্য রেডি হয়ে যেতাম। সেই ষাট-পয়ষট্টির মন্বন্তরের সংসারে ৯০-৯৫ নম্বর! টিচারের মতো টিচার একটা খুঁজে বের করেছি মাইরি! 

এরপর মন্ডা স্যারের সমস্ত সৎচেষ্টার পরেও পিরিয়ডিক্যল পরীক্ষায় অঙ্কে আমি আর কমল যে নম্বরটা পেয়েছিলাম স্যার সেটা জানতে পারলে শুধু টিউব কেন আয়নার দিকেও তাকাতে দিতো না। আমরা বেমালুম নম্বরটা চেপে গেলাম 

— কতো এলো অঙ্কে? 

 — ঐ শূন্যই ধরতে পারেন। 

— হুমমম্। ৯০ থেকে ১০০, এই দশটা নম্বরের লড়াই।বুঝলে? 

আলবাৎ বুঝেছি । আমরা দু'জন মিলে মোট ১০০ পাওয়ার চেষ্টাই করেছিলাম । আমরা বুঝব না তো কে বুঝবে? 

মন্ডা স্যারের চোখ এবার রাজার দিকে পড়লো। রাজা এতো গভীর তত্ত্ব বোঝেনা। হালকা ছেলে। এতো হালকা, যে একবার দোতলার ছাদ থেকে পাশে টালির ছাদে পড়েছিলো। টালি এবং রাজা দুজনেই নাকি অক্ষত ছিলো। রাজা একটা চ্যুইংগাম চিবোচ্ছিলো। শ্রীমতি মন্ডা সেটা দেখতে পেয়ে বললো 'ওটা কি মুখে? হয় ফেলে এসো, নয় গিলে ফেলো।' 

রাজা টিউবলাইটের খেলা খেলেছে। ভাবলো বাইরে গিয়ে চ্যুইংগাম ফেলে আসতে না জানি কত সময় নষ্ট হবে। তারপর গলাটা ভোরবেলার মোরগের চীৎকার করার মতো  করে উপরে তুললো আবার নীচে নামিয়ে একটা ঢোঁক গিললো। এরপর একটু ধাতস্থ হয়ে বেশ গর্বের সুরে বললো "গিলে ফেলেছি ম্যাডাম।" 

আমরা সবাই  রাজার সর্বভুক অবতার চাক্ষুষ করলাম। স্যার নিজেও একটা ঢোঁক গিলে দ্রবণ সম্বন্ধে প্রশ্ন শুরু করলো — 

'সম্পৃক্ত দ্রবণ কাকে বলে?' 

আমি আর কমল উত্তর দেওয়ার পরে রাজার পালা। রাজা শুরু করলো

সম্পৃক্ত দ্রবণ স্যার। ঐ তো অভিষেক যেটা বললো, 

— হ্যাঁ, বলো রাজা বলো। অভিষেক কি বললো

—ঐ তো অভিষেক বললো, কমলও বললো সম্পৃক্ত দ্রবণ হলো... 

- বলো, বলো

— মানে অভিষেক যেটা বললো, কমলও তো বললো। 'অভিষেকমল' এর অনন্ত চক্রে তখন মন্ডা স্যার অধৈর্য হয়ে উঠেছে।  

'তোমরা তো এক স্কুলেও পড়ো না। পরীক্ষার খাতায় কি লিখে আসবে? অভিষেক আর কমল বলে দিয়েছে, আমি আর বলবো না। '

আচ্ছা ঠিক আছে ভালো করে বুঝে নাও। ধরো তোমার কাছে এক কাপ চা আছে আর তুমি তাতে এক চামচ করে চিনি নিচ্ছো আর গোলাচ্ছো। গোলানো শেষ হলেই আবার এক চামচ, আবার এক চামচ... 

হঠাৎ দেখা গেলো রাজা পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে । দুই হাতের একটাতে অদৃশ্য কাপ আর অন্য হাতে চিনির চামচ ধরার ভঙ্গি । 

— কি হল রাজা!? 

—রাজা কষ্ট করে চেঁচিয়ে উত্তর দিলো "গ্গুলচ্ছে না  স্যাঅ্যর।" 

সম্পৃক্ত দ্রবণের একরম ব্যবহারিক প্রয়োগের নিখুঁত অভিনয় আমি সারাজীবনে দ্বিতীয়বার দেখিনি। 

মন্ডা স্যার হতোদ্যম না হয়ে আবার শুরু করলো। 'আলো আছে পড়ে যাও রাজা।' 

একদিন সন্ধ্যাবেলা কমল আর আমি পড়তে ঢুকেছি। ঢুকে দেখি শ্রীযুক্ত মন্ডাবাবু সম্ভবতঃ অফিস ফেরতা একটু মৌতাত সেরে সোফার নীচের দিকে পিঠটা এলিয়ে দিয়ে মাটিতে বসে ফুটবল ম্যাচ দেখছেন । শ্রীমতি মন্ডা হঠাৎ পড়ার ঘরে এসে বললেন 
— "শুনছো, ছেলেটা আজকে কেমিস্ট্রিতে 98 পেয়েছে।" 

—ব্বাহ্। আয় বাবা বোস, একটু টিভি দ্যাখ। দারুণ খেলা হচ্ছে। 

গুরুপত্নীর কর্ণকুহ্বরে এধরণের অলুক্ষণে কথা আসার সাথে সাথে তিরিক্ষে মেজাজে বললো 
— 'কি বলছো কি তুমি !? জানো প্রিয়দর্শিনী হিস্ট্রিতে ওর থেকে পৌঁণে দুই নম্বর বেশি পেয়েছে? তুমি টিভিটা বন্ধ করো এক্ষুণি।' 

—যাহ্ বাবা যা। মায়ের কাছে পড়তে বোস্। খেলাটা এতোটাও ভালো হচ্ছে না। 

শ্রীমান এই কথা শুনে মায়ের পিছু নিলো। আর স্যার যখন বুঝতে পারলো আপদ-বিপদ দুটোই পাশের ঘরে পৌঁছে গেছে, তখন টুক করে আবার টিভিটা চালিয়ে দিলো। 

শ্রীমান এর মধ্যে আবার কখন পড়ানোর ঘরে ঢুকে পড়েছে কারো চোখে পড়েনি। ঢুকেই সোফায় বসে বাপের ঘাড়ে পা তুলে তিলে খচ্চরের মতো হাসতে শুরু করলো। ততক্ষণে শ্রীমতি মন্ডা ঘরে ঢুকে যেই না দেখেছে টিভি চালানো, ব্যস! 

অনেক অনুনয় বিনয় করে স্যার ওকে আবার ঘরে পাঠালো। কিছুক্ষণ অপেক্ষা। তারপর যেই মোটামোটি নিশ্চিত হওয়া গেল যে পুত্র অধ্যায়নে মনোনিবেশ করেছে, ওমনি আবার টুক করে টিভিটা চালিয়ে দিলো। 

কনিষ্ঠ মন্ডাটি একটি আগমার্কা হাতবাক্সো ছিল। সুযোগ পেয়ে ব্যাটা আবার একই ভাবে বাপের কাঁধে পা তুলে সোফায় বসলো। সম্ভাব্য বিপদের কথা ভেবে স্যার ততক্ষণে ছেলের কাছে রীতিমতো কাঁদুনে সুরে বলে উঠলো 

— 'যা না বাবা যা। তোর মা চলে এলে তো বুঝতেই পারছিস....' 

তারপর আপদ বিদেয় করে গম্ভীর সুরে বললো 'সারাদিন কোনো অসুবিধে নেই বুঝলে, ঐ শুধু সাতটা থেকে সাড়ে ন' টার সময়টাতেই মানে আর কি। 

আমরাও মনে মনে অঙ্ক পরীক্ষার আপ্তবাক্যটা বুঝে নিলাম। সকাল থেকে সন্ধ্যা ৬:৫৯ অবধি তো যখন ইচ্ছে টিভি খুলে দেখা যেতে পারে কিন্তু সন্ধ্যা সাতটা থেকে সাড়ে ন'টা, এই যে আড়াই ঘন্টা, এই আড়াই ঘন্টার জন্যই লড়াই। 

(মন্ডা স্যার আসলে ভালো মানুষ ছিলো। এগ্রিকালচার ত্থুড়ি এগরোল-কালচার cess কেটে ১৫০ টাকা বেতনের কখনো ১৪০ পেতো, কখনো ১৩০ কিন্তু কোনোদিনও কোনো রিটার্ন ফাইল করেননি। আর হ্যাঁ, মন্ডা স্যারের নাম মন্ডা ছিল না। ) 

— অভিষেক বোস

Saturday, May 28, 2022

তারাদের কথা —৩


(লাল মাটির পৃথিবী) 

গৌড়ের সবুজ মাঠে পিকনিক করতে যেতাম আমরা। মাঠের সামনে মিনা করা স্থাপত্যগুলোর উপরে পা রেখে দাঁড়িয়ে মনে হতো, একদিন এখানেই রাজা-বাদশাহরা চলাফেরা করতো। আজ যেখানে সন্ধ্যা হলেই ঝুঁপ করে অন্ধকার ঘিরে ধরে, একসময় আলোতে ঝলমল করতো। তারপর একদিন সব মাটির গর্ভে চলে গেল। একটা পুরো জলজ্যান্ত নগরী ইতিহাসের পাতার তলায় চাঁপা পড়ে গেলো। 

সময়! 
আজ যেখানে ঝকঝকে শপিং মল, বহুতল বাড়ি, আর একটা সভ্যতা তার শিখরে আছে, হাজার বছর পেরিয়ে সেখানে হয়তো শুধু ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকবে। তারপর একদিন সেসব ধ্বংসাবশেষের শেষ চিহ্নও মুছে যাবে। তখন যদি কোনো আগামী সভ্যতা সেখানে পা রেখে দাঁড়ায়, কখনো কি তারা জানতে পারবে, 'হাজার বছর আগে এখানে জীবন কত চঞ্চল ছিলো !?' 

পৃথিবী নামের আগুনের গোলাটাও একদিন বরফে মুড়ে গিয়েছিল। তারপর একদিন বরফ সরে গিয়ে জীবন তার আজকের নীল সবুজ রঙ পেলো। বহির্বিশ্বে প্রানের সন্ধান করতে গিয়ে এই কথাগুলো মনে রাখতে হয়। 

নক্ষত্রের চারপাশে যে গ্রহগুলো ঘুরে চলেছে তাদের মধ্যে যারা এমন দূরত্বে রয়েছে, যেখানে না তো ভয়ঙ্কর গরম না অবিশ্বাস্য রকম ঠান্ডা, সেখানেই পাওয়া গেলেও পাওয়া যেতে পারে 'জলের অস্তিত্ব' । প্রাণের উপযোগী পরিবেশ। আর এই জায়গাকে বলা হয় Habitable Zone (Goldilocks zone)। হাজার কোটি গুণ বেশি ঔজ্জ্বল্যের নক্ষত্রের সামনে গ্রহের প্রতিফলিত আলো এতটাই ম্লান যে সরাসরি এক্সোপ্ল্যানেটের সনাক্তকরণ করা প্রায় দুঃসাধ্য কাজ। তাই Transit Method এর মতো পরোক্ষ পদ্ধতিগুলোর সাহায্য নেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে প্রদক্ষিণ করার সময় যখন কোনো গ্রহ, নক্ষত্রের ডিস্ক-এর সামনে চলে আসে তখন নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্য সামান্য কমে আসে। এই কমে আসার তারতম্য দেখে গ্রহের আকার সম্বন্ধেও একটা ধারণা পাওয়া যায়। পৃথিবীর তাবড় তাবড় স্পেস রিসার্চ ইন্সটিটিউট এক্সোপ্ল্যানেটের খোঁজে এইধরণের অসাধ্য সাধন করে  চলেছে। আর দূর থেকে দূরতম ছায়াপথের অজানা তথ্যকে জানার সাথে সাথে আমাদের প্রায় অচেনা প্রতিবেশী গ্রহদের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টাও করে চলেছে। 

দৃশ্যমান মহাবিশ্বে অন্ততঃ কয়েকশ কোটি গ্রহ রয়েছে যারা সম্ভবতঃ Goldilocks Zone এর মধ্যে প্রদক্ষিণ করছে আর আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী গ্রহ রয়েছে Habitable Zone এর বহিঃসীমারেখার সামান্য বাইরে। স্বভাবতই মহাকাশ বিজ্ঞানীদের চোখ গিয়ে পড়লো লাল মাটির পৃথিবীর দিকে। জল, অক্সিজেন, তাপমাত্রা ছাড়াও আরো একটা উপাদান রয়েছে যার অনুপস্থিতিতে মূহুর্তের মধ্যে প্রাণ নিশ্চিন্ন হয়ে যেতে পারে। 'চৌম্বক ক্ষেত্র' (Magnetic field) । 

চৌম্বকক্ষেত্র না থাকলে সৌরবায়ু ( stream of charge particle) পৃথিবীর বুক থেকে প্রাণের উপস্থিতি নিশ্চিহ্ন করে দিতো। লাল গ্রহেরও একসময় নিজস্ব চৌম্বকক্ষেত্র ছিলো। তারপর একদিন মঙ্গলগ্রহ তার 'ম্যাগনেটিক ফিল্ড' হারিয়ে ফেলল। সূর্য্যরশ্মি লাল গ্রহের বায়ুস্তরকে ছিন্নভিন্ন করে দিলো। বায়ুমন্ডলের ঘনত্ব কমতে শুরু করলো আর  বায়ুমন্ডল ক্ষীণ হওয়ার সাথে সাথে মঙ্গলপৃষ্ঠের জলও ধীরে ধীরে উধাও হয়ে গেল। লাল গ্রহের আজকের হিমশীতল, মরুভূমির মতো অনুর্বর, ধূলোঝড়ে ঘেরা চেহারার সাথে অতীতের কোনো মিল নেই। এখনো অব্দি যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে তাতে এতটুকু পরিস্কার সেদিনের মঙ্গলগ্রহ একটা অন্যরকম জগৎ ছিলো। প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক হ্রদ, বহমান জলখাত বারবার ইঙ্গিত দেয় একসময় এখানেও প্রাণের অনুকুল উষ্ণতা ছিল, বায়ুমন্ডল ছিল, নদীসদৃশ জলের প্রবাহ ছিল, চৌম্বকক্ষেত্র ছিল আর হয়তো এককোষী, বহুকোষী কিম্বা আরো উন্নত প্রাণ ছিল। আনুমাণিক চার হাজার কোটি বছর আগে প্রায় পঞ্চাশ কোটি বছর ধরে চলা অবক্ষয়ের পর সেসব ইতিহাসের হদিস অনেক নীচে চাপা পড়ে আছে। চার হাজা-আ-র কোটি বছর। মাত্র পঁচিশ কোটি বছর আগেও পৃথিবীর বুকে ডায়নোসরেরা হেঁটে বেড়াতো। আমাদের চেনা পরিচিত জগতে আমাদের কল্পনাতীত আদিম পরিবেশ ছিল। তারও আগে পৃথিবীর বুক থেকে ভয়াবহ দুর্যোগ একাধিকবার সামুদ্রিক আর ভূপৃষ্ঠের সমস্ত  জীবপ্রজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। আবার নতুন করে প্রাণের উদ্ভব হয়েছে, বিকাশ হয়েছে।  একটা সামান্য গ্রহাণু পৃথিবীর বুক থেকে সবথেকে শক্তিশালী, সবথেকে বিশাল প্রাণীদের জীবাশ্মের তলায় পৌঁছে দিয়েছে। মাত্র পঁচিশ তিরিশ বছর আগেও আমাদের চারপাশের পরিবেশটা ছিল আজকের থেকে ভীষণরকম আলাদা । চার হাজার কোটি বছর আগে কতটা আলাদা ছিল তার অনুমাণ করাটাও অসম্ভব। মহাবিশ্বের সাপেক্ষে কয়েক কোটি বছর সময়টা তেমন কোনো বড় সংখ্যাই নয়। অথচ আগামী যেকোনো মূহুর্তে এরকম দুর্যোগ আবার নেমে আসতে পারে। সভ্যতার শেষ চিহ্নটুকু ধূলোকণায় মিশে যেতে পারে।  লালমাটির পৃথিবীর মতো আমাদের পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র হারিয়ে যেতে পারে। অন্তঃসলিলা নদীগুলো থেকে শুরু করে হিমবাহ অব্দি বিলোপ পেতে পারে। তারপর পাশাপাশি দুটো মরুভূমি সদৃশ, জীবনের অস্তিত্ব হীন শীতল গ্রহ, গভীর রাতের আকাশে শুধু অতীতের স্মৃতিভার নিয়ে অবিরত ঘুরে বেড়াবে। হয়তো সেদিন সৌরজগতের অন্য কোনো কোণায় প্রাণের উদ্ভব হবে।  তারপর একদিন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করে সেই জগতের প্রাণে বুদ্ধিমত্তা আর অনুভূতির বিকাশ হবে। সেদিন সেই দুনিয়ার একজোড়া অনুভূতিপ্রবণ প্রাণী যদি রাতের আকাশে পাশাপাশি দুটো লাল আর নীল গ্রহের দুনিয়ায় দিকে তাকিয়ে দেখে ভাবে " মহাবিশ্বে কোটি কোটি গ্রহ, উপগ্রহের মধ্যে শুধু আমাদের এই গ্রহতেই প্রাণের অস্তিত্ব ছিল, আছে আর থাকবে!!" 

— অভিষেক বোস