কাঞ্চনজঙ্ঘা
রবি ঠাকুর ১১ বার সূর্য্যোদয় দেখতে পারেননি , কিন্তু আমরা ছাড়ব কেন?
তাই এবছর ফেব্রুয়ারিতে যখন দার্জিলিঙে অফিসের কাজ পড়ল , আমার কলিগ্ বন্ধু আর আমি প্রথমদিন দুপুরেই কাজ শেষ করে টাইগার হিলের প্ল্যান বানিয়ে ফেললাম ৷ পরদিন ভোর চারটেয় বেরিয়ে পড়তে হল ৷ ড্রাইভার অর্জুন গপ্পোবাজ মানুষ , অল্পবয়সী , চৌখস গাড়ি চালায় ৷ যেতে যেতে বলছিল একসময় প্রচুর বাঘের আনাগোনা ছিল ,সেই থেকেই নাম টাইগার হিল্ ৷ তখনও নিকষ কালো অন্ধকার , টাইগার হিলে পৌঁছে দেখলাম পাহাড়ের কোল আলো করে হাজার হাজার জনতা ৷ 'আমায় একটু জায়গা দাও' বলে দাড়িয়ে পড়লাম ৷ কয়েকজন পাহাড়ি মেয়ে ঘুরে ঘুরে কফি বিক্রি করছে আর ৫.৪০ এ সূর্য্যোদয় হবে তার বিজ্ঞপ্তি দিচ্ছে ৷ একজনকে ডেকে বললাম " এউড়া কাপ কফি দিনহুস " আমার কলিগ্ জিজ্ঞেস করল কি বললাম , জানালাম এক কাপ কফি দিতে বললাম ৷ "এক কাপ কেন, আমিও তো খাব ?" .. জানি , দুই বলতে জানিনা যে আবার 'এউড়া কাপ ' দিতে বলব ৷
বাঙালির সমস্ত ঠাণ্ডা কান দিয়েই ঢোকে , কফিতে চুমুক দিতে দিতে আমার যা কানে ঢুকল ' ভালো করে কান ঢাক ' ' কানে ঠান্ডা লেগে যাবে ' 'মাফলারটা কানে জড়িয়ে নে' এইসব পাঁচ কান করতে করতে দু' চোখ দিয়ে দেখলাম সবাই ক্যামেরা নিয়ে রেডি , কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে , এক দম্পতি এর মধ্যেও ঝট্ করে 'টাইগার হিল সেল্ফি উইথ্ ফিফটি ওয়ান অাদার্স ' তুলে নিল , কিন্তু এ কি! দু চারজন হতভাগা উল্টোদিকে মুখ করে কেন? আমিও স্রোতের বিপরীতে তাকিয়ে বুঝলাম আসল খেলা তো উল্টো দিকে !! সূর্য্যের প্রথম ছটা তুষার পাহাড়ের ওপর আছড়ে পড়ছে , অপূর্ব দৃশ্য ! তাহলে এত লোক যে সূর্য্যমুখী হয়ে আছে ! ঘার ঘুরিয়ে দেখলাম সূর্য্যোদয় হচ্ছে , কিন্তু এরকম সূর্য্য তো রোজ দেখা যায় ! মালদার বাঁধ রোড অথবা ই এম বাইপাসের ধারে দাঁড়ালেই দেখা যায় ! তাহলে এত দূর কেন ?
হাজার হাজার ফ্ল্যাশের ঝলকানি সাথে ' 'অসাধারন ' ' অপূর্ব ' ' অকল্পনীয় ' আর জোর হাততালি ৷ ততক্ষণে আকাশ ফর্সা হয়ে গেছে আর জনতা এদিক ওদিক দেখতে দেখতে উল্টো দিকে তাকাতেই অবাক " ঐ দ্যাখ কাঞ্চনজঙ্ঘা " আস্তে আস্তে সবাই মাথা ঘোরাচ্ছে আর " কাঞ্চনজঙ্ঘা কাঞ্চনজঙ্ঘা" বলে লাফিয়ে উঠছে ৷ তিন তিনটে পর্বতশৃঙ্গ (এভারেষ্ট সহ) অথচ সবাই শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাচ্ছে ৷ এরই মধ্যে দু'একজন রাধানাথ শিকদারের উত্তরসূরী নির্ভুল ভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে কোনটা এভারেষ্ট আর কোনটা কাঞ্চনজঙ্ঘা ? ক্যামেরার ঝলকানি তখনও চলছে
ততক্ষণে অর্জুন পাশে এসে দাড়িয়েছে , চাঁপা গলায় আমাদের বলল "ওটা আসলে মাকালু শৃঙ্গ , ১০৭ কি.মি আগে আছে বলে সবচেয়ে উঁচু দেখায় "
- অভিষেক বোস
মানিক'দার রোল
বিবেকানন্দ রোড ক্রসিং থেকে বিধান সরনীর বাম দিক ঘেষে কলেজস্ট্রিটের দিকে একটু এগোলেই মানিক'দার দোকান । পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও চোখে না পড়ার মতো । চার বাই চার এর ছোট্ট ঠিকানা । মানিক'দার রোল কলকাতা কাঠি রোলের মতো আহামরি নয় আবার বেদুইনের মতো বিখ্যাত নয় তবুও লোকে (আমিও তাহাদের একজন ) ভীড় করে । স্নেহ পদার্থের প্রতি যাদের স্নেহ আছে উত্তর কলকাতার সেইসব লোকেরাই এই ভীড়ের মুখ। মানিক দা রোল মিস্ত্রি নয়, ইন্টিরিয়র ডেকোরেটর । তাওয়া থেকে নধর লালচে হলুদ পরোটা গুলো যখন ডিমের পরশে গড়াগড়ি খেয়ে মানিক'দার হাতে চালান হয় ঠিক তার পরই শুরু হয় আসল শিল্প । কুঁচোনো পেঁয়াজ , কুঁচোনো লঙ্কা , হাতে পেষাই গোলমরিচ আর বিটনুন সব বাটিতে সাজানো থাকে ৷ ভীড় যতই বেশী হোক্ না কেন , প্রতিটা রোল হয় কাষ্টমাইজড , এক্কেবারে নোলা ফিট্ ৷ লঙ্কাকাণ্ড মিটে যাওয়ার পর মাংসের আত্মপ্রবেশ , আম রোলের দোকানের মতো শুকনো ছিবড়ে মাংসের পিস নয় , এক্কেবারে মায়াবী মশলা মাখানো মাংসের টুকরো ৷ প্রতিটি পিস্ বলে আমায় দ্যাখ , আমায় দ্যাখ ৷ মাংসেরা সুশৃঙ্খল ভাবে রোলের মাঝখানে লাইন দিয়ে দাড়িয়ে পড়লে শসের বাটি থেকে চামচে করে শস মাখানো হয় ৷ শসের ব্যাপারে মানিকদার সজাগ দৃষ্টি , বোতলঝাড়া কুমড়োর শস নয় নির্ভেজাল টমেটো আর গ্রিন চিলি শস ৷ শেষ তুলির প্রলেপে সবজে হলুদ তাজা লেবুর রস ।
এমনিতে মানিকদা ব্যস্ত মানুষ বিকেল ৫টা থেকে রাত ৯টা অবধি টাকা রোল , রোল টাকা , আর আমিও এ পাড়ার বাসিন্দা নই , তাই বিশেষ কোনও কথাবার্তা হয় না । আমি শুধু গিয়ে বলি " ঘন্টাখানেকের আগে কি একটা এগ চিকেন রোল দিতে পারবে ? " এরপর পরোটা পাওয়ার পর একটা র্যাপিড ফায়ার রাউন্ড , লঙ্কা কতটা ? শস হবে কি না ? গোলমরিচ দেব কি না ? খাব না নিয়ে যাব ? ব্যস ৷ এরবেশি আর কথা এগোয়নি ৷ কিছুদিন আগে মানিক'দার দোকানের সামনে এক বান্ধবীর সাথে দেখা , রোল খাওয়ার কথায় রাজী হতেই মানিক দা কে দুটো রোলের অর্ডার করলাম , মানিক দা একবার আমার দিকে মুখ তুলে চাইল তারপর অনেক দিনের পরিচিতর মতো করে বলল তোমার টা তে তো লঙ্কা বেশি হবে উনি তো প্রথমবার ওনার টা কেমন হবে ?
বুঝলাম ঐ র্যাপিড ফায়ার রাউন্ড টা আসলে ব্যস্ততার মধ্যেও আড্ডা চালিয়ে যাওয়ার জন্য ।
- অভিষেক বোস
জঙ্গলে জঙ্গলি দর্শন
গরুমারা ফরেস্টে পৌঁছে যেটা সবার আগে নজরে পড়বে সেটা হল শ'খানেক হোটেল /রিসর্ট । হঠাৎ করে ঠাওর করা মুশকিল জঙ্গলে এসেছি না ধর্মতলায় ৷ ছোট বড় মাঝারি সব রকমের পকেটোপযোগী থাকার বন্দোবস্ত ৷ কিন্ত একটা বিষয়ে এদের মিল দুর্ধর্ষ ৷ গাড়ি থেকে নামার পরই এদিক ওদিক থেকে শুধু হাতি আর গন্ডারের গল্প ভেসে আসবে I
"কাল হাতি গ্রীন ক্যাসেলের সামনে চলে এসেছিল "
"আমাদের হোটেলের পেছন দিকটা হাতি ভেঙ্গে দিয়ে চলে গেছে "
"কাল এই পিচ রাস্তার ওপর দিয়ে গন্ডার দৌড়াচ্ছিল"
"আজকে ভোরে স্টেশন থেকে ফেরার সময় এক পাল হাতির সামনে পড়ে গেছিলাম "
হাড় হিম করা সব হাতে গরম গল্প , একদম বুলবুল দাসের গরম ভাজার মতো কানে পরিবেশিত হবে ৷
গল্প শুনতে শুনতে ঢুকে পড়লাম , রিসর্টটা অবশ্য আমার এক বন্ধুর বাবার ৷ জঙ্গলের দিকেই কটেজটা বরাদ্দ হল , "আজ মোলাকাত হোকে হি রহেগা " বাঘ,হাতি না হোক এক জোড়া নিরীহ চুনী পান্না মার্কা নধর হরিণের দেখা কি মিলবে না ! আলবাত মিলবে ।
সন্ধ্যের দিকে রিসর্টের ধার ঘেষে চিকেন পাকোড়ার হাড্ডি চিবোচ্ছি , সার্ভিসের ছেলেটি বলল ' আপনারা যেখানে বসে আছেন, দুদিন আগে হাতি ওখানে চলে এসেছিল ' হেব্বি ব্যাপার, কি জায়গায় এলাম গুরু! এ কানার হস্তি দর্শন নয়, রীতিমতো হাতি পর্যবেক্ষন ৷
দস্তুরমতো আগুন জ্বালিয়ে আর গীটার বাজিয়ে আমরা হাতির আগমনী শুরু করলাম, দু চারটে নেড়ি কুত্তার বিকট প্রত্যুত্তর পেলেও 'সে তো এল না ,এল না'
কুছ পরোয়া নেহি ' মর্দ কি বাত আর হাতি কি মুলাকাত কাল সুবাহ হি হোগা '
ভোর বেলা ড্রাইভার সিউশরনের ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো , সঙ্গে আদিবাদী গাইড তারাপদ হেমব্রম। গাইড ছাড়া প্রবেশ নিষেধ , সরকারের একটা সাধু উদ্যোগ যাতে আশেপাশের জঙ্গলবাসীরা টু পাইস করতে পারে .....
গোটা জঙ্গল ঘুরে যা যা দেখতে পেলাম
১. খান দশেক ময়ূর
২. দু ডজন বাঁদর
৩. হাতির দুদিন পুরনো প্রাতকৃত
৪. একটা ঠ্যাঙ খোড়া বাইসনের (ইন্ডিয়ান গৌড়া) দোদুল্যমান লেজ আর
৫. কেমোফ্লেজ টি শার্ট পরিহিত ,হাত বিঘত লম্বা লেন্স সহ DSLR শোভিত টুরিষ্ট
রিসর্টে পৌছে ম্যানেজার বাবুদা কে বললাম " শোনো বাবুদা , বাঘ ,সিংহ, হাতি , ঘোড়া সব কষ্ট ভুলে যাব , যদি একটা জিনিষ দেখাতে পারো "
বাবুদা শশব্যস্ত হয়ে বলল " কি বল্ ?"
একটা বুনো মুর্গি বাবুদা, এই কেজি তিনেক সাইজের , মাইরি বলছি আজ রাতের বেলা জিরে বাটা, কাঁচা লঙ্কা বাটা দিয়ে একটা ঝাল ঝাল মাখা মাখা নিদেনপক্ষে একটি জঙলি মুরগির দর্শন না হলে, কলকাতা ফিরে কি মুখ দেখাব ?
ফিরে এসে বন্ধুর বাবাকে বলেছিলাম " হাতি, গরু কিছুই নেই। ঐ যে হাতিটা মাঝে মাঝে হানা দেয় , ওটা আসলে তোমাদের হোটেলিয়ার্স এ্যাশোশিয়েশনের পোষা হাতি , মাঝে খেলিয়ে দাও , যাতে গল্প চালু থাকে |
- অভিষেক বোস