Wednesday, July 8, 2020

চমন বাহার আর দাঁতের বদলা দাঁত

এই লেখাটার মধ্যে কোনো গল্পের উপাদান নেই, কোনো সাম্প্রতিক ঘটনার আলোচনা নেই। Swiss Illnesses নামে আমার একটা অসুখ আছে এটা ঐ রোগের উপসর্গ আর কি! পুরনো পাতাগুলোর Digital Archive করে রাখা। ডিজিটাল ক্যামেরা আর স্মার্টফোনের আগের দিনগুলো Digitized করে রাখা, যেমন করে লোকে পুরনো ছবি পোস্ট করে... 

হাফ প্যান্ট বেলায় যখন পাড়ার মোড়ে রাজু কাকুর দোকানে মিষ্টি পান কিনতে যেতাম, ডান হাতের মুঠোতে পয়সা নিয়ে মন দিয়ে পান বানানো দেখতাম। প্রথমে পানটা ধুয়ে নিয়ে, ভেজা লাল কাপড়ের উপর জল ঝেড়ে একটা শতছিদ্র টিনের কৌটোর মুখ দিয়ে পাতার ভিতরটা ঘষতে ঘষতে র‍্যাপিড ফায়ার রাউন্ড শুরু হতো, খয়ের বাদ দিয়ে প্রায় সবেতেই আমার 'হ্যাঁ' । চুন-সুপুরির পালা শেষ হলেই স্কুল ছুটির পরে বাচ্চাদের মতো একের এক কৌটো বেরিয়ে আসতো, কোনোটাতে গাঢ় সবুজ, কোনোটাতে উজ্জল লাল, কোনোটা আবার হলুদ, নরম নরম মশলা, রঙবেরঙের গোল গোল দানা, পিপারমেন্ট পেরিয়ে এসে যে মশলাটা হাতে তুলে নিলেই 'আরো একটু দাও' এর আব্দার করতাম ঐ কৌটোর গায়েই লেখা থাকতো 'চমন বাহার'। পাঁচ টাকা দিয়ে একটা আস্ত কৌটো কিনে রেখেছিলাম। 

'চমন বাহার' সিনেমাটা দেখতে দেখতে এক ধাক্কায় বয়সটা অনেক পিছিয়ে গেলো, দু ঘন্টার সিনেমার পরেও যে আবেশ অনেকক্ষণ থেকে যাবে। সিনেমার গল্প নিয়ে কিছু লিখব না, এসব দেখার জিনিস, শোনার জিনিস নয়। দেখতে দেখতে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে হয়, যেখানে গিয়ে থামবে থামুক, স্টিয়ারিং ঘোরানোর কোনো ব্যস্ততা নেই....

                            
                     | কাট টু 'ফুল প্যান্ট' |
                 
ফুল প্যান্ট বেল বটস্ হতে পারে আবার নাও হতে পারে তবে পেছন পকেটে একটা সস্তা 'মানি-ব্যাগ' থাকতেই হবে আর ঘাড়ে থাকবে স্কুল ব্যাগ। স্কুল ব্যাগের স্বজন পোষনের কোনো দায় নেই তাই ভেতরে 'ভিকি' ক্যাম্বিস বল, গ্লাভস, সিন গার্ড এমনকি এক জোড়া শুকনো কাঁদা মাখা ফুটবল বুটও থাকতে পারে। তবে পান নয় চা-এর দোকান। দোকানটা শহরের উপকন্ঠে হতে পারে, আবার হতে পারে একেবারে ব্যস্ত রাস্তায় । মালদা শহরটা অবশ্য তখন মফস্বল অথবা আধা শহর নয়, তবে এখনো এখানে বুড়ো বটগাছের ছায়া আছে , জলের ঢোপ কল আছে, কোর্টের সামনে গাছ গাছড়া, তাবিজ, মাদুলির ব্যাবসা আছে আর দুপুরের পর নরম রোদ্দুর মাখা বিকেলের মাঠ আছে। এখানে ঝুপ করে দুপুরের পরে সন্ধ্যা নেমে যায় না। সন্ধ্যা হয় শঙ্খের আওয়াজে, কচি কাঁচা মেয়েদের তারসুর রেওয়াজে। মাঠ থেকে ধূলো পায়ে ফেরা, গোড়ালি না ধোওয়া ছেলে মেয়েদের ' উদ্ভিদকোষে উপস্থিত ক্লোরোফিল নামক রঞ্জক' আর 'সিরাজ-উদ-দৌলা আর পলাশীর প্রান্তরের সাথে ধূপ-ধুনো  মিলেমিশে একাকার হয়ে সন্ধ্যা জমাট হয়ে আসে। এ সব কিছু আছে, আর আছে অফুরান আড্ডার চা'য়ের দোকান। তবে এখানে নায়ক দোকানের মালিক না, চা-এর দোকানের 'ঠেক' টাই আসল নায়ক। সব গল্প ঐ 'ঠেকে' ঠেকনা দিয়ে দাঁড়িয়ে, আর এই জন্যই 'ঠেক' ভেঙে যাওয়ার পর সব হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়বে! 

নারু দা-র চা-এর দোকান 

নারু' দার দোকানটা ছিলো (!! নাকি এখনো আছে?), আমার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে, একটা চওড়া রাস্তা যেখানে হঠাৎ ঢালু হয়ে উঠে ন্যাশনাল হাইওয়েতে মিশেছে, ঠিক ঐ ঢালের ধারে। মানে দোকানের সামনেই ন্যাশনাল হাইওয়ে, আর হাইওয়েটা পার করলেই হাইওয়ের সমান্তরালে আর একটু উঁচুতে রেললাইন। দোকান মানে হাইওয়ের উপর রাধাচূড়া, আকাশমনি কিম্বা ওরকমই কিছু একটা প্রাচীন ঋজু গাছের তলায় মুলি বাঁশের একটা ছাওয়া আর তার সাথে মানানসই বাঁশের বেঞ্চি। তখন পাশের মাঠেই ফুটবল, ভলিবল খেলতে যেতাম। খেলা শেষ হয়ে গেলে কিছুক্ষন ক্যারম পিটিয়ে নারু দার দোকানে। আমরা পৌঁছলেই নারু দা এমন বিগলিত হয়ে উঠতো যেন আমরা আসিনি তাও দোকান কেন খুলেছে সেই অনুতাপে ভুগছিল, তারপরে ন্যাড়া মাথার নীচে খয়েরি রঙা দন্ত-বিকশিত করে হাসি। নারু দা যে মারকাটারি চা বানাতো এমন নয়, উল্টে ওটা চা না, চায়ের কেটলি ধোওয়া গরম জল বোঝা যেতো না ! আর আমি ঠিক চা-প্রেমী নয়, তবে চা-এর দোকানে চা এর গ্লাস হাতে নিয়ে বসে থাকার মৌতাতটাই আলাদা। নারু-দার দোকানে সন্ধ্যা অব্দি নারুদার বৌ, বাচ্চা সবাই থাকতো। ছেলেটার বয়স মনে হয় আট-দশ হবে। ভোম প্রতিদিন ওর ভবিষ্যত নিয়ে খুব চিন্তিত হয়ে যেতো, প্রায় প্রতিদিনই প্রস্তাব দিতো নারু দার ছেলের জন্য কিছু একটা করতে হবে, আমাদেরও মনে হতো একটা কিছু সত্যিই করতে হবে, কিন্তু কি করতে হবে সেসব জানা ছিল না। আমরা নিজেরাই কিছু করি না তো ঐ একরত্তি ছেলের কি করব! আপাততঃ ওর পড়াশোনার বয়স। বই- খাতা, পেন, মাস্টার, স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া টুকটাক যে টুকু করা যায় আর কি আর এইসব দেখে শুনে নারুদার মুখটা খুশিতে ভরে যেতো তারপর আবেগে ভেসে গিয়ে দুনিয়ার আজগুবি গপ্পো জুড়ে দিতো। ততক্ষণে অন্ধকার জমাট বেঁধেছে, রাস্তার সোডিয়াম ভেপার লাইটের আলো ছাড়া আর কোনো আলো নেই, সামনে ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কপথ দিয়ে হু হু করে কলকাতা আর শিলিগুড়ির দিকে বড় বড় লরি আমাদের শহরটাকে অগ্রাহ্য করে চলে যাচ্ছে। মাল বোঝাই করে যাওয়ার সময় যখন রাস্তার উপরে যখন ধাতব জিনিসের ছোয়া লাগতো তখন অন্ধকার রাস্তায় আগুনের ফুলকি উড়তো, আগুনের ফুলকিগুলো পেছনে ফেলে রেখে ট্রাকগুলো ধীরে ধীরে নিজেও একটা ফুলকি হয়ে যেতো। কোন্ দূর থেকে আসছে, কোন্ সুদূরে যাবে কে জানে! হয়তো শিলিগুড়ি পেরিয়ে আসাম, মনিপুরের সীমান্তে গন্তব্য। এর মাঝখানে আবার অস্পষ্ট থেকে স্পষ্ট হয়ে আসা দূরে ট্রেনের আওয়াজ, তারপর চোখের কাছাকাছি আসতেই একটা সজোরে হর্ন বাজিয়ে জোর করে দৃষ্টি আকর্ষন করার চেষ্টা।  কত অচেনা মানুষ শহরটাতে এলো, আবার ফিরতি ট্রেনে কত চেনা অচেনা মানুষ ফিরে চলে যাবে আর মাঝখানে অগোচরে থেকে যাবে নারুদার চায়ের দোকান। আশে পাশে কোনো বাড়ির থেকে আওয়াজ আসছে 'এক আকেলা ইস শহের মেয়, রাত মেয় অউর দোপহের মেয়, আব-ও-দানা ঢুনঢতা হ্যায়'  আমরা বেশ জমিয়ে বসেছি হঠাৎ করে একটা ট্রাক রাস্তার থেকে অনেকটা নেমে সাঁ করে ধূলো উড়িয়ে দিয়ে চলে গেল। ভোম উঠে গিয়ে ট্রাক ড্রাইভারকে বেদম গালাগালি দিতে শুরু করলো, লালু ভোমকে আওয়াজ দিল, সুযোগ বুঝে নারুদা আবার এক রাউন্ড কেটলি ধোওয়া গরম জলের গ্লাস হাতে ধরিয়ে দিল, ড্রাইভার ততক্ষণে মাইল খানেক দূরে চলে গেছে। ভোম তখনো চেঁচিয়ে যাচ্ছে। রোজই এরকম কোনো না কোনো ট্রাক বেয়াদপি করে আর ভোম বেঞ্চি থেকে উঠে চায়ের গ্লাস নিয়ে চলন্ত গাড়ির পেছনে ড্রাইভারদের গালাগালি করতে থাকে, তারপর এক চুমুক দিয়ে দোকানের দিকে তাকিয়ে বুঝিয়ে দেয় আজ ধরতে পারলে কি হাল করতো! একদিন এক পাঞ্জাবি ড্রাইভার গালি শুনতে পেয়ে জোরে ব্রেক কষে রাস্তার মাঝে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নারুর দোকানের দিকে এগিয়ে আসলো, দশাসই চেহারা আর বাজখাঁই গলায় সরাসরি ভোমকে জিজ্ঞেস করলো 'ওয়ে আওয়াজ ক্যিউ দিয়া? ' ভোম নরম সুরে উত্তর দিল ' আপকো নেহি বোলা' 
— তো রাস্তে মে খড়া হোকর কিসকে উপর চিল্লা রাহা  থা? 
-  ম্যায় তো অ্যায়সে হি চিল্লাতা হু, রোজ চিল্লাতা হু। 

সর্দার বাংলা বোঝে না, ভোম কিছু একটা বলেছে সেটা বুঝেছে কিন্তু ঠিক কি বলেছে সেটা জানে না। 

ভোম তখনো নরম সুরে গোঁ গোঁ করছে, সর্দার ওর দিকে তাকিয়ে একটা জোরে হাসি হেসে আবার ট্রাকের দিকে ফিরে গেল। ট্রাক নিরাপদ দূরত্বে এগিয়ে যাওয়ার পর ভোম আবার বেদম গালি দিতে শুরু করল তারপর দোকানের দিকে তাকিয়ে বোঝালো 'জোর বেঁচে গেল, নাহলে আজকে ধরতে পারলে....... 


                     | কাকার চা' য়ের দোকান |

কাকা বা কাকাদের নাম কেউ কোনোদিন জানতে পারেনা। কাকা রা শুধুই কাকা, আমারও 'কাকা' , আমার পাড়াতুতো কাকুরও 'কাকা'। কাকার দোকান আমার পাড়ার মোড়ের ঠিক পাশেই। বড় হওয়ার লক্ষন হলো ক্লাবে আড্ডা দেওয়া কিন্তু এর থেকে বড় হওয়ার লক্ষন ক্লাবের বাইরে পাড়ার মোড়ে আড্ডা দেওয়া। কাকার চায়ের দোকানের কর্মসূচীতে ছিল নতুন প্রেমে কারিগরী এবং আর্থিক সহযোগিতা , পুরনো প্রেমে মানসিক সহায়তা, অন্যের প্রেম ভাঙানো, সরস্বতী পূজা, দূর্গাপূজার চাঁদা, হাতখরচ শেষ করে ফেলা দুঃস্থ প্রেমিকের গ্রিটিং কার্ড, পার্কে দেখা করতে যাওয়া, সাইকেলের লিক সারানোর চাঁদা, মাথা ফাটানো, নাক ভেঙে দেওয়া, সমাজসেবা, টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি, পাড়ার চৌহদ্দি রক্ষার দায়িত্ব, টিউশন কেটে আসা মেধাবী ছাত্রদের আশ্রয়দান ইত্যাদি ইত্যাদি । আমাদের পাড়ার বেশির ভাগ ছেলেই পাড়ার পাশেই টাউন স্কুলে পড়তো,  একবার মনে হয় ক্লাস নাইনে সমবেত ফেল হলো। এক এক জনের মার্কশীটে সাবজেক্টের তলায় স্কেল দিয়ে সোজা লাল দাগ টেনে দেওয়া হলো। এর মধ্যে গাবলু আবার কি একটা ঘটনা ঘটিয়ে বসলো। গাবলুর 'গার্জিয়ান কল' করা হলো। গাবলু আমাদের পাড়ায় ওর মামা বাড়িতে দিদার কাছে থাকতো। দিদা পুরনো মানুষ, সে এইসব 'কল - গ্যাঁড়াকল' কিছুই বুঝবে না, মামাদের বললে ওর চামড়া খুলে ডুগডুগি বানাবে আর রোজ সকাল সন্ধ্যায় নিয়ম করে বাজাবে। পাড়ার বখাটে ছেলে মানেই আপদে বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়া আর প্রত্যেক পাড়াতেই একজন থাকে যে এই বখাটে ছেলেগুলোর বিপদে পাশে থাকে। গরমের দুপুরে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে কাকাকে জানানো হলো সম্মুখ সমরে কাকাকেই যেতে হবে। প্রয়োজনীয় জামাকাপড় সব দেওয়া হবে। স্কুলে গিয়ে কাকাকে শুধু কাঁচুমাচু মুখে সব কথা শুনে যেতে হবে আর হ্যাঁ এ হ্যাঁ মেলাতে হবে, ব্যস! একদা সকাল বেলা কাকা স্কুলে উপস্থিত হলো। গাবলুর গায়ের রঙ ছিল কালো আর কাকা বেশ ফর্সা (এ প্রসঙ্গে বলে রাখি আমি কালোকে কালো আর সাদাকে সাদা বলি, আর এর মধ্যে কোনো ভুল দেখতে পাইনা। ভুল তখন হবে যখন আপনি কাউকে শুধু গায়ের রঙের জন্য মনুষ্যেতর প্রানী অথবা নিম্নবর্গীয় ভাবতে শুরু করবেন), ক্লাস টিচার কিছুতেই বিশ্বাস করছেনা যে কাকা আর বাবলু একই বাড়ির, কাকা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অভিনেতা কোনো কিছুতেই মুখ খুলছে না। এদিকে টিচার সন্দেহ করলেও মুখে বলতে পারছে না 'ছেলে এত কালো কি করে হলো ?' 

গোটা ঘটনার সময়ে কাকা 'টু' শব্দ করেনি।  ক্লাস টিচার শেষে বলেছিল 'ছেলেকে দেখবেন যেন স্কুল পালিয়ে বাইরে আড্ডা মেরে না বেরোয়'। আমি হলে খ্যাঁক করে হেসে ফেলতাম 'শালা আমার দোকানেই আড্ডার মন্দির বানিয়েছে' কিন্তু কাকা জাত অভিনেতা, টুঁ শব্দটি করেনি। 


স্কুল টাইমে , মেয়েদের সাইকেল চালিয়ে স্কুল যাওয়ার সময় হলে কাকার দোকানে বৃষ্টির পরে লাল পিঁপড়ের মতো ভীড় হতো, দেখবেন পিঁপড়েরা যেমন উল্টো পথে ফেরার সময় খবর দিতে দিতে ফিরে, সেভাবেই সবাই খবরের আদান প্রদান করতে করতে আসতো। 'আরে টুনিকে দেখলাম বাবার মোটরসাইকেলে গেল আজকে'  ' টেঁপিকে দেখলাম একটা ছেলের সাথে সেম স্পীডে সাইকেল চালাচ্ছিলো' ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ সব খবর। এ সময়ে দু'দুটো কাঠের বেঞ্চি এমনকি শেষে কাকার নিজের রঙচটা 'শতাব্দী প্রাচীন' প্লাস্টিকের টুলটা দিয়েও কুলোনো যেতোনা।  কাকার চায়ের দোকানের সামনের গলিতেই একটা গার্লস স্কুল ছিল, সেই স্কুলের মেয়েদের প্রতি ঠেকের সভ্যরা ভব্য আচরন করতো এবং বাইরের কোনো  ছেলেকেও টিটকিরি মারতে দেখলে উপযুক্ত শিক্ষা প্রদান করা হতো। একবার ঠিক হলো, এরপরে কোনো ছেলেকে স্কুল শুরুর সময় ঐ চত্বরে দেখা গেলে কথা দিয়ে নয়, ব্যাথা দিয়ে বোঝানো হবে... 

দেখবেন বাড়িতে যন্ত্রপাতি মেরামতি করার জন্য লোক আসলে যন্ত্রের সমস্যা উধাও হয়ে যায়, সেইরকম আমরা কেরামতি দেখানোর পরিকল্পনা নেওয়ার পর থেকে কোনো ছেলেকে আর আসতে দেখা গেলো না। এতবড় একটা যুগান্তকারী পদক্ষেপ অথচ শুধু ছেলের অভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে না। নজরদারি আরো বাড়ানো হলো কিন্তু আশাপ্রদ ফল পাওয়া গেলো না। সবাই মরিয়া হয়ে আছে, কাউকে না কাউকে মারিয়া তবেই শান্তিতে ঘুমোবে, অবশেষে সুদিন এলো। তখন ভর দুপুরবেলা, এক হৃষ্টপুষ্ট বালক গলিতে হেলতে দুলতে ঢুকলো, তখন স্কুলে ক্লাস চলছে সুতরাং কোনো মেয়ের বাইরে থাকার কথা নয় আর তাছাড়া বালক আমাদের পাশের পাড়ার পরিচিত কিন্তু প্রথমতঃ বালক গলিতে প্রবেশ করেছে তার উপর হেলতে দুলতে । দু-দুটো  আইন ভাঙার অপরাধে পটলা আর কে একটা দৌড়ে কোনো কথা না বলে, বাঁ হাতে মুখে এক ঘুষি... 

খানিকক্ষণ পর বালক মুখে হাত দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেল। জানা গেল বালকের একটি দাঁত খোয়া গেছে। ঠেকে অনেক নামজাদা দাদা থাকলেও পটলার বাম হাতের জোর নিয়ে সন্ধ্যা অব্দি বিশ্লেষনমূলক আলোচনা চলল এবং অভিজ্ঞরা পটলাকে উপদেশ দিল যে ভবিষ্যতেও পটলা-র বাম হাত দিয়েই ঘুষি চালানো উচিৎ। দুই নয়, দেড় নয়, আধা নয়, সিকি নয় ঠিক মেপে একটা দাঁত খুলে দেওয়া! ওর যা বাম হাতের জোর, তাতে অবিলম্বে ওর সমস্ত বাঁ হাতি কাজ ডান হাত দিয়ে করা উচিৎ এবং বাম হাতকে শুধুমাত্র এধরনের শৈল্পিক কাজের জন্য লাগানো উচিৎ । পরদিন সকাল বেলায় খবর এলো বালক কোনো রকম অসদুদ্দেশে নয়, টিফিন বক্সে গরম লাউ চিংড়ি নিয়ে এসেছিল, ঐ গলিতেই ওর পিসীর বাড়ি । এসব শুনে পটলার বাম হাত থেকে উপরে আস্তে আস্তে বাম দিকে পাঁজরের ভিতর নরম জায়গাটা শক্ত হয়ে গেল। পাশের পাড়ার মারামারি কমিটির বোর্ড মেম্বাররা পটলাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।  তখন মারামারি হওয়ার পর পরিস্থিতি বেসামাল হয়ে গেলে মার-দাতারা মার-গ্রহীতার সাথে বিশিষ্ট প্রবীন মারপিট শিল্পীদের উপস্থিতিতে 'মিউচ্যুয়াল' করে নিতো যার পোশাকি নাম ছিল 'মিল-চাল', মানে চালে ডালে মিলে যাওয়া আর কি! 

'মিল-চালে'  দাঁতহারা জানালো ' কোনো মিল-চাল হবে না। দাঁতের বদলা দাঁত । ' 

পটলা ওর অবশ্যম্ভাবী প্রাক্তন দাঁতের কথা চিন্তা করতে গিয়ে ওর বিখ্যাত হাতের কথা ভুলে গেল। 

বালক তখনো বলে চলেছে ' আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি সাড়ে সাতশো টাকা লাগবে দাঁত লাগাতে, এক পয়সা কম হবে না।' 

'দাঁতের বদলা দা‍ঁত'  

সাড়ে সাতশো টাকা কোনো মামুলি কথা নয়, সাত টাকায় একটা আস্ত এগরোল পাওয়া যেতো আর সাতশো টাকায় অনেক অনেক এগরোল, তার থেকেও পঞ্চাশ টাকা বেশি!  কাকার দোকানে আবার চাঁদা তোলা হলো একটা মজবুত টিকসই দাঁতের জন্য..... 


কলকাতায় চলে আসার পর আস্তে আস্তে কাকাদের দোকান থেকে ভীড় উধাও হয়ে গেল।  বালক আর আমরা একসাথেই বড় হলাম, এইসব অনেক পুরনো কথা, সহজ পাঠের মতোই সম্পর্কগুলো সহজ সরল ছিল, মালদায় এলে বালকের  (এই যা! এখন আর আমরা বালক কোথায়!) সাথে রাস্তায় কখনো সখনো দেখা হলে এখন হাসি বিনিময় হয় আর দাঁতের দিকে তাকালেই একটা চা-এর দোকান, লাগামছুট ছেলেবেলা আর অনেকগুলো পুরনো মুখ মনে পড়ে যায়....... 


হাবিজাবি লিখতে গিয়ে কাজের কথাটাই বলতে ভুলে গেছিলাম। 'চমন বাহার' টা দেখুন, কোনো হিরোগিরি নেই, কোনো অতিনাটকীয় ঘটনা নেই তবে জিতেন্দ্র কুমার আর বাকিরা দু-ঘন্টায় ছোট শহরের ছেলেবেলা ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে। এখন তো আবার কোন্ অভিনেতা কত পড়াশোনা করেছে সেগুলো খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে, জিতেন্দ্র কুমার আই আই টি খড়গপুরের প্রাক্তনী আর কোনো ফিল্মি পরিবারের সাথে দূর দুরান্তের সম্পর্ক নেই। 

- অভিষেক বোস 











                            


Tuesday, June 23, 2020

ঘোড়াওয়ালা রথের গল্প

তখন সদ্য প্রোমোশন পেয়েছি, পাঁচ টাকা থেকে দশ টাকায় আর হাফ প্যান্ট থেকে সাময়িক ফুল-প্যান্টে। চুলে চিরুনি এখন আর সোজা চলে না আর টাকা পেছনের পকেটে থাকে। তখন দশ টাকায় কি কি পাওয়া যেতো ? দশ টাকায় একটা গোটা ইলিশ, পাঁচ - ছ'কিলো বাসমতি চাল, দু লিটার আগমার্কা সর্ষের তেল, আধা কিলো পোস্ত….. ইল্লি আর কি! একি গুপ্তযুগের গল্প !? এসব কিস্যু পাওয়া যেতো না। দশ টাকায় পাওয়া যেতো দু' প্লেট চপ ঘুগনি, ভাগাভাগি করে একটা এগরোল (কুমড়োর আর চালতার শস দেওয়া) আর মেলা থেকে ফেরার সময় একটা কুলফি । 

মেলা মানে রথের মেলা, আর রথ মানে ঐ পুঁচকে রথ না, রীতিমতো বড়সড় রথ। রথের মাথাটা মন্দিরের চূড়োর মতো আর রথের দোতলার সামনে দুটো প্রমাণ সাইজের কাঠের আধা ঘোড়া পা উঁচু করে। ঐ কাঠের ঘোড়ার খুড় ছুঁয়ে একটা খুড়বত্ প্রনাম না করলে কিসের কি! (গত কয়েক বছর ধরে ইস্ক নের যে রথের মতো দেখতে একটা ঝকঝকে ধাঁচা ত্রয়ীকে স্টিয়ারিং আর ইঞ্জিন লাগিয়ে সামনে 'কৃষ্ণনাম' করতে করতে নিয়ে যায়, সেটাকে আমি কিছুতেই রথের স্টেটাস দিবো না, আর তাছাড়া শ'য়ে শ'য়ে লোক দড়ি টেনে নিয়ে যায় না তাই ওটা রথ নয়, গাড়ি)। তো আমার সেই ঘোড়াওয়ালা রথের মেলা বসে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামনে বড়রাস্তার উপরে , আর ঐখান থেকে আরো দেড় কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমেই  বন্ধুদের জুটিয়ে নিয়ে ভীড়ের মধ্যে সেদিয়ে যাওয়ার নামই মেলা যাওয়া , ভুলে গেলে চলবে না হিরোর পকেটে আছে দশটাকা, সাথে আছে আরো সাত - আটটা বন্ধু, তাদের সবার জটিল পকেটকে নিয়ে যদি সরল করা যায় তবে যোগ বিয়োগ করে ( কে কবে কাকে খাইয়েছিল, সেগুলো বিয়োগ হবে) মোটামোটি পঞ্চাশ টাকা হয়ে যাবে, এই টাকায় একটা আস্ত মেলা কিনে নেওয়া যায় তবে আমরা আপাততঃ চপ ঘুগনি কিনব। চপ ঘুগনি খেতে খেতে দেখলাম, গ্যাং এর অনেকেই 'ধাঁ' হয়ে গেছে, পাশের দুটো তখনো নাকের জলে, চোখের জলে নির্বিকারে খেয়ে যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে লঙ্কা গুড়ো, পেঁয়াজ কুচি চেয়ে যাচ্ছে, ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম বাকিরা কোথায়?

— 'সব পালিয়েছে'
    কোথায়? 
 —'কোথায় কে জানে, মেলার ভীড়ে আছে কোথাও, 
     আমরাও পালাবো, তুইও পালা'     
                        
    প্লেটটা রাখতে গেলে ধরে নিবে যে?
— 'প্লেটটা নিয়ে পালা'

প্লেটটা নিয়ে আর পালাতে পারিনি, পকেট থেকে গচ্ছা দিয়ে, মাথা চুলকোতে চুলকোতে বেরোলাম। জানি জানি দশ টাকার হিসেব তো? ইনকামের কথা কি এত খোলাখুলি বলতে হয়! মা-বাবা ছাড়াও, দাদু-দিদা, ছোট মাসী' যত নাম, তত ইনকাম'। এছাড়া আরো কিছু 'আশরফি' আমাকে দেওয়া হতো, ফেরার সময় 'ছোট্ট ছোট্ট লালমোহন' কিনে আনার জন্য, নরম, তুলতুলে আর নিক্তিতে মাপা মিষ্টি, একটু কম-ও নয় আর বেশিও নয়, আর তার উপরে বোনাস এক্কেবারে 'হাতে গরম' । মেলার পাপড় ভাজা নিয়ে আমার কোনো কালেই আদিখ্যেতা নেই, বরং পাপড়টা দেখলেই কেমন শীর্নকায় খসখসে হলদে পাতা লাগতো যার সামনে গেলেই  একটা তেলচিটে গন্ধ আসতো। ঐ পয়সায় আমি দুটো চপ মুখে চালান করে দিব, কেউ টেরটিও পাবে না। পাতার কথায় মনে পড়ল রথের সামনে পান-চিনি দেওয়ার রেওয়াজ আছে, একবার কায়দা মেরে রেওয়াজ পালন করতে গিয়ে দেখি কাঠাল পাতা মুড়ে দিয়ে দিচ্ছে, সবাই সেটাই ছুড়ে দিচ্ছে।আমি অত্যুতসাহী বালক, কাঠাল পাতা খুলে দেখি 'চিনি' টুকুও নেই, এত্তো বড় ধোঁকা! থাক, এর থেকে আমার খুড়বত্ প্রণামই ভালো, কোনো ফাঁকিবাজি নেই, তাছাড়া সামনে গিয়ে খুড় ছোঁয়ার জন্য লাফালাফি করলে আমার পায়ের 'স্প্রিং'- গুলোও ঠিক থাকবে।

আমার বিশ্বস্ত বন্ধুদ্বয়, যারা প্লেট সমেত পালিয়ে গেছিল, চপের দোকান থেকে বেরিয়ে একটু এগোতেই হাস্যমুখ অবতারে অবতীর্ণ হয়েছিল, এ-ওর কাঁধে হাত রেখে, এঁকেবেঁকে চলতে সব জায়গায় একটু একটু করে ঢুঁ মেরে যখন এই ফিরব ফিরব করছি, ঠিক তখনই ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমে এলো। সামনেই একটা জিলিপির দোকান দিয়েছিল, মাথা বাঁচাতে ওখানেই ঢুকেছি, হঠাৎ করে কানের কাছে কে একটা জোরে পোঁ করে বাঁশি বাজিয়ে উঠল, পেছন ঘুরে কচিমনে দুটো কাঁচা গালি দিতে গিয়ে দেখি, গ্যাং এর বাকিরা দাঁড়িয়ে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসছে। না, আর আটকে লাভ নেই, দিয়েই দিলাম 'দুটো' একটু নরম করে।

- 'জিলিপি খাবি…?' নরম গলায় জিজ্ঞেস করল 
   না, আমি জিলিপি খাই না 
 - 'আরে খেয়ে নে, হেব্বি খেতে। ' 
    পয়সা ছিল তো পালালি কেন? 
 -  'ওটাই  মজা' 

জিলিপি টা সত্যি ভালো ছিলো, জানিনা মেলার জিলিপি বলে, নাকি বন্ধুদের সাথে একসাথে খেলাম বলে! 

অনেক বছর পর, এবারে রথের দিন আবার আমার শহরেই আছি, সব ঠিক থাকলে মাফিন-কে নিয়ে ঘাড়ে চড়িয়ে মেলা দেখিয়ে নিয়ে আসতাম! আমার সব বেড়ে ওঠার ছোট্ট ছোট্ট ভালোলাগার দিনগুলোর সাথে মাফিনের বন্ধুত্ব করিয়ে দিতাম। সেসব আর কিচ্ছু হোলো না। 

'চিনি না দেওয়া' কাঠালপাতা বিক্রি করা আধ ছেড়া চটি পড়া ছেলেটাকে অনেক দিন আগেই  মাফ করে দিয়েছিলাম, হয়তো দেখা হলে আবার ওর মতো কারো কাছ থেকে পাতা কিনে ভিতরে কি আছে না দেখেই 'ঘোড়ার পায়ে' ছুড়ে দিতাম কিন্তু সবকিছু উলটপালট করে দেওয়া হালফিলের অনাহুত 'চিনি' - র জন্য কোনো ছাড় নেই। 

— অভিষেক বোস

(ছাদের উপর থেকে রথের রাস্তার দিকে তাকানো ছবিটা ক্লিকিয়েছে প্রিয়াঙ্কা, পাশে দাঁড়িয়ে ছিল মাফিনের ঠাম্মি)

Tuesday, June 16, 2020

জিমি জিমি

কয়েকদিন আগে রাতে আমার মাখনের গোলাটার খাওয়ার তৈরী করে আনতে একটু দেরী হয়ে গিয়েছিল, গোলা ততক্ষণে রাগের প্রথম পর্ব দেখানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করবে, আর ঠিক তখনই খাওয়ার হাজির। আমি 'আ গ্যায়া, আ গ্যায়া, হালুয়াবালা আ গ্যায়া' গানটা গাইতে গিয়ে বুঝতে পারলাম গানের লিরিক জানি না। এদিকে অখাদ্য কুখাদ্য সব গানের লিরিক মনে থাকলেও ছোট্ট বেলার এই গানের লিরিক আমি ভুলে যাইনি, জানিই না। ইউটিউব এ গানটা সার্চ করতে গিয়ে কমেন্ট এ দেখলাম সব রাশিয়ান এ লেখা ( কি করে বুঝলাম রাশিয়ান!? মালদাতে একবার সেকেন্ড ডিভিশন ফুটবলহ লীগে  গোয়ার ডেম্পো স্পোর্ট ক্লাবের হয়ে কয়েকজন উজবেকিস্তানি ফুটবলার এসেছিল, তাদের মধ্যে মিকোলো শেভচেঙ্কো বলে একজনের সাথে বেশ দোস্তি হয়েছিল, ওর কাছ থেকেই আধো আধো শিখেছিলাম), লিরিক ভুলে গিয়ে ততক্ষণে আমি কমেন্ট ঘাটতে শুরু করেছি, পাঁচ-সাতটা নয়, সাতশো কমেন্টের বেশিরভাগ কমেন্টই রাশিয়ান, আর তাতে বারবার জিমি লেখা। সুতরাং কোনো রুশি ভুল করে কমেন্ট করেনি, আর আমাকে এবার জানতে হবে কেন

এতদিন জানতাম সোভিয়েত ইউনিয়নে সবথেকে বেশি জনপ্রিয় ভারতীয় রাজ কাপুর, কিন্তু জিমি তার থেকে অনেক এগিয়ে। ১৯৮২ তে ডিস্কো ডান্সার এর সময় থেকে জিমি মধ্যবিত্ত রাশিয়ানদের ঘরে পৌঁছে গেছে। ভারতীয়দের মিঠুন চক্রবর্তী, রাশিয়ানদের কাছে জিমি। 

আশির দশকের শেষে ইউএসএসআর নেতা মিখাইল গর্বাচেভ যখন ভারত সফর করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী অমিতাভ বচ্চনকে দেখিয়ে বলেছিলেন ' ইনি ভারতের সবথেকে বড় সুপারস্টার', গর্বাচেভ জবাব দিয়েছিলেন: " আবার বৌ শুধু রাজ কাপুরকে চেনে আর আমার মেয়ে শুধু মিঠুনকে।"

ডিস্কো ডান্সার এর পরিচালক বি সুভাষ মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ডিস্কো ডান্সার স্ক্রিনিং নিয়ে খুব বেশি উৎসাহী ছিলেন না , তখন ফিল্ম ফেস্টিবভ্যালে ' দো বিঘা জমিনের মতো বাস্তববাদী আর সমান্তরাল সিনেমাগুলো যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতো, সেখানে ডিস্কো ডান্সার নিয়ে স্মিতা পাতিল ও অস্বস্তি বোধ করছিল । বিকেল তিনটায় এক বিশাল অডিটোরিয়ামে স্ক্রিনিং শুরু হলো আর সন্ধ্যার মধ্যে জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী, জিমি ততক্ষণে সুপারহিরো, ঐ বছর সোভিয়েত ইউনিয়নের 
highest grossing foreign film  । 

প্রথম ছবি মৃগয়া তে জাতীয় পুরস্কার তারপরে একের পর এক সুপারহিট ফিল্ম এমনকি 'অগ্নিপথ' এ কৃষ্ণন আইয়ার এর মতো ছোট্ট পরিসরেও অমিতাভের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করার পর কেন যে খাজা-খাজা সিনেমা করতে শুরু করল কে জানে? 

'মিলে সুর মেরা তুমহারা' র সময় মিঠুন চট্টবট্টি-র ফ্যান ছিলাম আমি, তখনো চক্রবর্তী বলতে শিখিনি। পরে অবশ্য পুকার-এ অমিতাভকে দেখে মিঠুন এর জায়গা নড়ে গেছিলো, সে সব অন্য গপ্পো। যাই হোক তখন বোধ হয় ক্লাস ফাইভ-সিক্সে পড়ি, মালদাতে মিঠুনের ফাংশন আর আমার বাড়িতে তিনটে ভিআইপি পাস আছে, টিকিট শেষ, এখন তিনটে টিকিটে কে কে যাবে? আমার মাসতুতো দিদি মালদাতে আছে, একটা পাস তার জুটল, একটা বোধহয় আমার মামা পেলো আর একটাতে কে যাবে? যদিও আমার বাড়িতে ভিসিপি-তে রোজ একটা সিনেমা দেখতাম, তাও সদ্য সিক্সে উঠেছি, তখনো এতো সিনেমা-টিভির ছুট ছিলনা, আমার ভাগ্যে কি একটা পাস জুটবে! এরকম সময়ে মা বলল ঐ পাসটা তে 'আমি' যাবো, আমার ছোট্টবেলার মিঠুন চট্টবট্টি, এইজন্যই বলে 'জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। এত কাছ থেকে টিভির পর্দার বাইরে নায়ককে দেখে ফিরে এসে সারারাত ধরে স্বপ্ন দেখলাম এই মিঠুন আমাকে হাতে ধরে বক্সিং শেখাচ্ছে, তো এই ডান্স শেখাচ্ছে। 

এরপরের সুযোগটা এলো আরো বছর দুয়েক পরে, তখন যুবভারতীতে ফুটবল ক্যাম্পে প্র্যাক্টিস করি। মালদা ডি.এস.এ, থ্যালাসেমিয়া সোস্যাইটি আর যুবভারতী মিলে একটা প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করেছিল 'মালদা একাদশ বনাম মিঠুন একাদশ'। তখন থ্যালাসেমিয়ার নাম শুনলেই মিঠুন বিনে পয়সায় একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত দৌড়ে বেরাতো। মিঠুন ইলেভেন এর মিঠুন আর প্রাক্তন প্লেয়ারদের আমরা ফুলের তোড়া দিয়ে সম্বর্ধনা জানাবো, আমার ভাগ্যে পড়ল সুরজিৎ সেনগুপ্ত। এত বড় ফুটবলার কিন্তু' মিঠুন' তো নয়, আমি পনেরো টাকা দামের রেনল্ড এর জেটার পেন নিয়ে এসেছি, যাতে অটোগ্রাফ দিতে কোনো অসুবিধে না হয় আর আমার সাথে এতো বড় ধোঁকা। যাই হোক আগে থেকেই ঠিক করে নিলাম ' সুরজিৎ সেনগুপ্ত' কে ফুলের তোড়া দিয়ে সোজা এগিয়ে যাবো 'মিঠুন' এর দিকে। সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান শুরু হতে হতেই সবাই নিজের নিজের জায়গা ছেড়ে ফুল হাতে এক্কেবারে মিঠুনের কাছে, এদিকে আমার প্ল্যান-এ পুরো জল। বাকি ফুটবলাররা দাঁড়িয়ে আছে, একবার মনে হলো আমিও দৌড়ে যায়, তারপরে সুরজিৎ সেনগুপ্তের হাতে ফুলের তোড়াটা ধরিয়ে, সবার পরে মিঠুনের কাছে পৌঁছলাম। ছ ফিটের লম্বা চেহারা, ব্যাকব্রাশ করা চুল আর হাই অ্যাঙ্কল বুট পড়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে 'মিঠুন', হাত মেলানোর পর অনেক কষ্টে বললাম 'অটোগ্রাফ', মিঠুনোচিতো স্টাইলে বলল 'আগে থ্যালাসেমিয়ার অনুষ্ঠানটা হয়ে যাক'। 

অটোগ্রাফ আরে নেওয়া হয়নি, আমার বন্ধু কৌশিক একটা অটোগ্রাফ দেওয়া ফুটবল পেয়েছিল, ওটার উপর আমার বহুদিন চোখ ছিল, তারপরে আবার সুযোগ এসেছে, তখন অটোগ্রাফের দিন শেষ। তবে ছোটবেলার নায়ক এর সাথে হাত মেলানোর মূহুর্তের যে স্মৃতি সেটাই বা কম কিসে! 


আজকে মিঠুন 'জিমি' চক্রবর্তী-র জন্মদিন। 

-অভিষেক বোস










Tuesday, June 2, 2020

চায়না চাই না

চাই নিজ নিজ মাল, চায়না চাই না। মানে চায়নার মাল আর চাই না। শুধু নিজে বললেই হবে না, আশেপাশের মানুষদেরও বোঝাতে হবে। তবে চাই আর না চাই, ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই রোজ ডজন খানেক মেসেজ, ফরোয়ার্ড , আর শিক্ষামূলক ভিডিওতে আমার মোটোরোলা মোবাইলের দীর্ঘজীবি স্টোরেজ হ্রস্ব হতে শুরু করেছে। চায়না আমারো চাই না, ইয়ে মানে মন থেকে বলছি। বিশ্বাস করুন আমিও চায়নাকে চাই না, তাই দু একজনের কাছে জানতে চাইলাম ঠিক কি কি বয়কট করা উচিৎ!? কোন্ কোন্ দৈনিক মাল চৈনিক বংশজাত সেটা জেনে নিতে হবে তো নাকি? চীনের আবির, চীনের খেলনা, চীনের প্রাচীর , চীনে বাদাম ( না এটা থাক)!? 

বয়কটের তালিকাতে প্রথমেই আছে VIVO, OPPO মোবাইল, আর TikTok ,তারপরে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক জিনিস, যেগুলো প্রত্যেকটা ছোট বড় শহরের চিনা মার্কেটে, এমনকি আমার নিজের শহর মালদার ছোট ছোট দোকানেও পাওয়া যায় । TikTok এর মতো অপদার্থ অ্যাপ আমি আর দুটো দেখিনি, ওটাকে শুধু বয়কট নয়, আন-ইনস্টল করে 1 স্টার রেটিং দেওয়ার পক্ষে আমার একটি নিঃশর্ত ভোট আমি আগাম দিয়ে রাখলাম। এরপরে বাকি জিনিসগুলো নিয়ে একটু আড্ডা হয়ে যাক। 

বয়কটের জিনিসগুলো আমি পাঁচ ভাগে ভাগ করে নিচ্ছি। একদম প্রথমে সেই জিনিসগুলোকে রাখব যেগুলো ফিনিশড গুড হিসেবে এই দেশে আমদানি হয়ে আসে ( গোদা বাংলায় Made in China), তারপরে রাখব সেই জিনিসগুলো যেগুলো চিনা কোম্পানির ভারতের ফ্যাক্টরিতে স্পেয়ার পার্টস (যন্ত্রাংশ) হিসেবে এসে এখানেই অ্যাসেম্বল্ড্ হয়, এরপরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানির প্রোডাক্ট যাদের কন্ট্র্যাক্ট ম্যানুফাকচারার চায়নাতে রয়েছে, এরপরে আসবে আমাদের দেশীয় কোম্পানি, যারা যন্ত্রাংশের বা Key Ingredient এর জন্য চায়না নির্ভরশীল, পরের সারিতে যে সব কোম্পানিতে চাইনার অর্থ লগ্নি অথবা মালিকানা রয়েছে আর সবার শেষে রাখব তাদের, যারা চাইনিজ OEM থেকে মাল কিনে Made in India বলে চালিয়ে দেয়। ( এছাড়াও আছে বিভিন্ন চাইনিজ অ্যাপ, ওয়েবসাইট ,যেগুলোর জন্য আমরা কোনো পয়সা দিই না, যেখানে আমরাই পণ্য) 

প্রথম ভাগের চিনের জিনিসগুলো চিনে নেওয়া বেশ সহজ (!), এই যেমন VIVO , OPPO ।  ঠিক এতটাও সহজ নয়, এই যেমন ধরুন প্রথমদিকে আমার মোটোরোলা স্মার্টফোনের কথা বলেছিলাম, আমেরিকান 'মোটোরোলা' গুগলের হাত ঘুরে এখন চাইনিজ Lenovo র মালিকানাধীন। Lenovo আবার IBM Think Pad এর মালিকানা কিনে এই মূহুর্তে বিক্রির নিরিখে World's largest personal computer vendor (March 2019) ।  এমনকি স্মার্টফোনের মার্কেটেও দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং এর সাথে পাল্লা দিয়ে উঠে আসছে।

(এখনো অব্দি যা কিছু বলা হচ্ছে এগুলো সবই কিন্তু মেনল্যান্ড চায়না - র কথা মাথায় রেখে। পৃথিবীতে দু দুটো চায়না আছে, যারা নিজেদের চায়না হিসেবেই পরিচয় দেয় । এক নম্বরে পিপল্ রিপাবলিক অফ্ চায়না (PRC), যাদের সাথে আমাদের বোঝাপড়া আর দ্বিতীয়টা হলো রিপাবলিক অফ চায়না (ROC) বা তাইওয়ান। প্রসঙ্গতঃ ACER, ASUS, HTC র মতো বহুজাতিক কোম্পানির হেডকোয়ার্টার ROC তে আর সাথে রয়েছে FOXCON এর মতো বিশ্বের সবথেকে বড় ইলেকট্রনিক ম্যানুফাকচারার আর তৃতীয় বৃহত্তম টেকনোলজি কোম্পানি । FOXCON এর তালিকায় কি নেই! Blackberry, iPad, iPhone, iPod, Nokia, Xiomi, Kindle, Playstation, XBox এর মতো প্রোডাক্ট FOXCON এ তৈরী হয়। যাইহোক আমাদের বোঝাপড়াটা যেহেতু রিপাবলিক অফ চায়না-র সাথে নয় তাই আপাততঃ আর এদিকে এগোচ্ছি না।)

দ্বিতীয় ভাগে আছে সেইসব প্রোডাক্ট, যেগুলো যন্ত্রাংশের আকারে এসে ভারতে তৈরী হয়। চীনের সবথেকে বড় চালাকি যে ওরা বিভিন্ন দেশের আবেগ, অনুভূতিগুলো অনেক আগে ধরে ফেলতে পেরেছে। Motorola, Xiomi, Lava র মতো স্মার্টফোন কোম্পানিগুলো বহুদিন ধরে ভারতের মাটিতে ম্যানুফাকচারিং শুরু করে দিয়েছে আর এই ফ্যাক্টরিগুলোতে কয়েক হাজার ভারতীয় কর্মী প্রত্যক্ষ ভাবে কাজ করছে। ভারতের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সমাদৃত হলেও চীনের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে রয়েছে। Active pharmaceutical ingredients (biologically active component of a drug product) এর একটা বড় অংশ চায়না থেকে আসে। গত আর্থিকবর্ষে ভারতে যত Bulk Drug আমদানি হয়েছে তার ৬০ শতাংশের বেশি এসেছে চীন থেকে, এছাড়াও ভারতের ব্যপক হারে চায়নার অ্যান্টিবায়োটিক আমদানি হয়ে থাকে। মানে হতেই পারে আপনি, আমি যেই ওষুধগুলো খাচ্ছি তার Active Pharmaceuticals Ingredient অথবা পুরো ওষুধটাই হয়তো চায়নাতে তৈরী। 

এরপরে আসবে চীনাদের সবথেকে বড় শক্তি চাইনিজ OEM ( Original Equipment Manufacturer) । শুধু স্মার্টফোন নয়, বিশ্বের তাবড় তাবড় কোম্পানির মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট (ভেন্টিলেটর, আল্ট্রাসাউন্ড, পেশেন্ট মনিটর, বায়োকেমিস্ট্রি আরো অনেক কিছু ) এর একটা বড় অংশ চায়নাতে তৈরী হয়। আমার চাকরির সুবাদে যতটুকু দেখেছি বা বুঝেছি বড় শহরের বড় বড় কর্পোরেট হাসপাতালগুলো বাদ দিলে, পাঁচ এর মধ্যে তিনটে প্রাইভেট /সরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোমে হয় চাইনিজ আর নয়তো চীনের যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি ইক্যুইপমেন্ট আছে। আর শুধু মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট কেন অটোমোবাইল, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিয়ারিং এমনকি আপনার আমার বাড়ির স্মার্ট / আনস্মার্ট টিভিগুলো অব্দি বেশিরভাগ চায়নাতেই অথবা চায়নার প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে তৈরী। 

চীনের অর্থলগ্নি। Big Basket, Byju’s, Flipkart, Hike, MakeMyTrip, Ola, Oyo, Paytm, Paytm Mall, PolicyBazzar, Quikr, Snapdeal, Swiggy, Zomato, Gland Pharma কয়েকটা নাম যেখানে চীনের বেশ বড় ধরনের অংশীদারি আছে। আপাতভাবে দেশী এই জনপ্রিয় কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ চীনে চলে যাচ্ছে আবার এইসব কোম্পানির সাথে ভারতের কয়েক লক্ষ অথবা কয়েক কোটি পরিবার প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে। 

BMW, Ford, Fiat, Honda, Hyundai, Mitsubishi, Renault, Suzuki, Toykta, Volkswagen, Mercedesg-Benz এর মতো অটোমোবাইল কোম্পানিগুলোর চীনের সাথে Joint Venture আছে অথবা সাম্প্রতিককালে ছিল। 

এইসব তো আছেই, শুনলে হয়তো বিশ্বাস হবে না চীন এখন ভারতে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান থেকে শুরু করে Nuclear Reactor হয়ে এক্কেবারে পূজোর ঘর অব্দি পৌঁছে গেছে। বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, ফোটোর যে বিরাট বাজার রয়েছে, চীনারা তাতেও থাবা বসিয়েছে। 

কি মনে হয়, এই যে এত এত দেশের নামজাদা কোম্পানি কয়েক দশক ধরে চীনের সাথে বানিজ্যিক সম্পর্ক বাড়িয়ে তুলেছে সেগুলো কি চীনাদের ভালোবেসে? এদের অনেকেই জানে চীনের সাথে দ্বিপাক্ষিক বানিজ্যে কি ধরনের ঝুঁকি আছে! তারপরেও ইউরোপ, আমেরিকার বড় বড় কোম্পানিগুলো চীনের সাথে গাটছাড়া বেঁধেছে, এমনকি আমেরিকার মতো দেশ নিজেদের পেনশন ফান্ড চায়নাতে বিনিয়োগ করেছে। চীন একটা দুর্বোধ্য দেশ, সবকিছুতে লাগাম, ব্যক্তি স্বাধীনতা যেখানে Error 404, চীনের মিডিয়া এতটাই সরকার নিয়ন্ত্রিত যে পৃথিবীর বাকি দেশগুলো জানতেও পারে না চীনে কি চলছে কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে চীন নিজেকে যেভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে তাতে করে এই মূহুর্তে চীনকে বয়কট করা দূরে থাক, প্রয়োজনে চীন বিশ্বকে থমকে দিতে পারে।  মনে রাখতে হবে সরকারিভাবে বিবৃতি দিয়ে ব্যান নয়, জনগন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বয়কটের ডাক দিয়েছে। এর আগেও বহুবার বয়কট হয়েছে, বিগত দীপাবলির সময় যে বয়কট হয়েছিল তার পরেও  ৩২০০ কোটি টাকার চিনা মাল বিক্রি হয়েছে। আসলে আমরা অনেক সময় জানতেই পারিনা কোনটা চীনের আর কোনটা নয়। আবার অনেক সময় কোনো বিকল্পও থাকে না বা থাকলেও হয় তার গুনমান ভালো নয়, আর নয়তো দাম অনেক বেশি। চীনের শিকড়টাতে গোটা বিশ্বের বড় বড় দেশগুলো জল ঢেলে এত গভীরে পৌঁছে দিয়েছে যে এখন উপড়ে ফেলতে গেলে অনেক সময় ধরে চেষ্টা করে যেতে হবে, আর উপড়ে ফেলতে গেলে নিজের নিজের বাড়ির ভিতেরও ক্ষতি হবে। 

COVID-19 এর পরে ভারতের কাছে একটা সুযোগ এসেছে চীনের পরিবর্ত হিসেবে উঠে আসার। ভারতের মাটিতে ম্যানুফাকচারিং শুরু হলে একটা ভারসাম্য তৈরী হবে কিন্তু মনে রাখতে হবে বেশিরভাগ সংস্থাগুলো মহামারীর জন্য মূলধনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছে সুতরাং কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তারা খুব সতর্ক থাকবে। ভারতে 'ল্যান্ড-ব্যাঙ্কের' সমস্যা না থাকলেও উৎপাদন আর সরবরাহের সংযোগটা দুর্বল। 

চীনের একাধিক শিল্পাঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের বিমান আর সমুদ্রবন্দর, সড়ক যোগাযোগ, পরিবহন এত অত্যাধুনিক যে ভারতে ঐ ধরনের পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একটা দশক লেগে যাবে। আমার কোম্পানির একজন ব্রিটিশ ডিরেক্টর ২০১৮ তে কলকাতা এসেছিল, রুবি বাইপাস থেকে রাজার হাট নিউটাউনের রাস্তায় যেতে যেতে বলছিল, 'ইন্ডিয়া সত্যিই এগিয়ে আসছে অভিষেক , আমি যখন ৯০-৯৫  এ চীনের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতাম, তখন ঠিক এইভাবেই চীন উঠে আসছিল। প্রচুর বড় বড় বিল্ডিং, অফিস, চওড়া রাস্তা তৈরি হচ্ছে, চারপাশটা ঠিক এইভাবেই বদলে যেতে দেখেছি। ' আমি বুঝলাম আসল বক্তব্যটা হলো আমরা চীনের থেকে ২০-২৫ বছর পিছিয়ে রয়েছি। 

ভারতের ছোট থেকে ছোট গলি থেকে শুরু করে ভারী শিল্প অব্দি চায়নার অবাধ যাতায়াত থাকলেও, চীন যত টাকার রফতানি ব্যাবসা করে, তার মাত্র ৩% এর কাছাকাছি ভারতে রফতানি করে বাকি ৯৭% এর জন্য চীনের কাছে ভারতের বাইরে বাজার রয়েছে। আমাদের দেশের জনসংখ্যা যত বিশাল হোক না কেন চীনের বহির্বানিজ্যের ব্যাপ্তি তার থেকে অনেক অনেক বড়, উল্টো দিকে ভারত থেকে চীনে রফতানির পরিমান ৬% এর কাছাকাছি ( যদিও Trade Deficit টা বিরাট অঙ্কের) 

আমাদের দেশে মেধার অভাব নেই  ,পরিশ্রমী শ্রমিকেরও অভাব নেই, তবে চীনের মতো Skilled আর Trained Labour এর কিন্তু অভাব আছে। চীনের সাথে চোখে চোখ রেখে বিশ্ববানিজ্যে উঠে আসতে এলে আমাদের অনেক কিছু Unlearn আর Relearn করতে হবে । উল্টোদিকে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান এ এধরনের পরিকাঠামো আর মানবসম্পদ তৈরী আছে। 

বছর খানেক আগে চীনের মিডিয়া ব্যঙ্গ করে ভারতকে উপদেশ দিয়েছিল চীনের সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়তে হলে আর বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হলে ভারতকে '996' জানতে হবে। 996 'Jack Ma' র একটা বিতর্কিত Tough Overtime Work Schedule, যেখানে সকাল ৯ টা থেকে রাত ৯টা অব্দি, সপ্তাহে ৬ দিন কাজের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। 

এখানে যে কোম্পানিগুলো আসবে তারা তো শুধু উৎপাদনের জন্য আসবে না তাদের চাই একটা বিরাট বাজার, ভারতের সাথে বিভিন্ন দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক সম্পর্কও বিশ্বব্যাপী বহুজাতিক কোম্পানিদের জন্য আমাদের দেশ প্রথম পছন্দ না হওয়ার আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। গত বছর নয়া দিল্লী এশিয়ার ১২ টি দেশের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে এসেছিল (RCEP) , এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলি দেশের জন্য ভালো না খারাপ  সেটা তর্কসাপেক্ষ কিন্তু শুল্কমুক্ত রফতানির পরিপন্থী। 

আবেগ দিয়ে ভাবলে হয়তো আমরা অনেক এগিয়ে আছি, সত্যি সত্যি এগিয়ে আসতে গেলে অনেক সময়ের প্রয়োজন, আমরা নিজেরা খুব ভালো করে জানি আমরা ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। বয়কট করার আগে বিকল্পগুলো তৈরি রাখতে হবে, নইলে চীনের তৈরি Boycott China টি-শার্ট পড়ে চীনের মোবাইলে ' অচিন ' আন্দোলন চলতে থাকবে। 

- অভিষেক বোস

Sunday, April 26, 2020

'মাফিন' এর গল্প ♥️♥️

ঠিক এই সময়ে আমার বাড়ি কাছের মানুষদের ভীড়ে ভরে যাওয়ার কথা ছিল, ঠিক এই সময় আমার সবথেকে বেশি ব্যস্ত থাকার কথা ছিল, হয়তো একটু রেগে যাওয়ার কথাও ছিল! প্রিয়াঙ্কা, আমার মা বাবা, শ্বশুর, শাশুরি, ভাই-বোনদের এইদিক থেকে ঐদিক দৌড়োদৌড়ি, শেষ মূহুর্তের জোগাড়, ঠিক এই সময় আমার ফটোগ্রাফার ভাই ওর পুরো দলবলকে নিয়ে ফ্ল্যাশের ঝলকানিতে ঘর ভরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। পিন্টু 'দার পাঁচ বার ফোন এসে যেতো রাতে কাবাব এ কি' ফিশ' রাখবে কিনা? কিমা নানটা একটু বেশি করেই রাখছে, ওটা দারুণ হয়েছে। আমার আর  প্রিয়াঙ্কার পিসতুতো, মাসতুতো, মামাতো ভাই বোন আত্মীয়রা লাস্ট মিনিট টাচ আপের জন্য হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। এই সময় আমার কাছে ফোন আসার কথা ছিল 'দাদা রাতের লাইটটা একটু দেখে যান, সব লাগিয়ে দিয়েছি।' ঠিক এইসময় আমার মাখনের গোলা মাফিন টুকটুকে লাল ড্রেস  আর অনেক গয়না পড়ে গাল ভরা হাসি দিয়ে সবার মন ভুলিয়ে দিতো।  হয়তো এত ভীড় দেখে বিরক্ত হয়ে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়তো। তারপর আবার একটু পরেই ঘুম থেকে উঠে যেই আমার কোলে উঠৈ  ওর ঐ নতুন শেখা আপ্রু, আকাই, ক্লপ বলতে খিলখিল করে হাসতো তখন সবাই বলতো 'দেখো কেমন বাবাকে চেনে!' এইসব কিছুই হলো না! আমার মাফিন আজকে প্রথম বার ভাত খাবে আর ওর মা আর দাদু দিদা ছাড়া কেউই আসতে পারবে না, দেখতে পারবে না। আর আমি ঠিক এইসময় আমার মাফিনের থেকে 350 কিলোমিটার দূরে ফ্ল্যাটের মধ্যে অপেক্ষা করে থাকব কবে আবার বাড়ি ফিরে মাফিনকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারব.....

Tuesday, March 17, 2020

SARS-CoV-2 আর আমরা

Disclaimer : আমি COVID-19 বিশেষজ্ঞ নই, কিছু জানতে হলে WHO, CDC, MoH এর Website আর পরিচিত ডাক্তারদের থেকে জেনে নিই)

একটু বড় লেখা তাই ধৈর্য্য ধরে পুরোটা না পড়তে পারলে, অর্ধেকটা পড়ে সময় নষ্ট করবেন না।

লেখার কোনো অংশের সাথে আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা মিলে গেলে সেটা নেহাতই কাকতালীয়। কোনো বিশেষ কাউকে উদ্দেশ্য করে কিছু লিখিনি বরং একটু সচেতন করার জন্য লিখেছি।

কোনো sensational গল্পের আশা থাকলে একটু নিরাশ হবেন।)

ইতিহাস সাক্ষী আছে যখনই এদেশে কোনো বড় ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটেছে তখনই আমরা উৎসব শুরু করে দিয়েছি। কাব্যি করেছি, মিম্ বানিয়েছি, ছ্যাবলামো করেছি আর গুজব ছড়িয়েছি। Covid- 19 একদিন তার শক্তি কমিয়ে হয়তো কোনো ঝালমুড়ির ঠোঙার নিচের খবর হয়ে থেকে যাবে কিন্তু বাকি অসুখগুলোর কি করবেন? এই অসুখগুলো আমাদের অস্থি মজ্জায় ঢুকে গেছে। আর এইজন্য বিন্দুমাত্র খোঁজ না নিয়ে পোস্ট হয়ে যাচ্ছে 'Dean Koonz নামের এক লেখক তার Eyes of Darkness এ সেই কবে লিখে গেছিলেন People's Republic of China তার গরীব জনসংখ্যার উপর করোনা ভাইরাসের জৈব মারনাস্ত্র প্রয়োগ করবে, তিনশ অমুক নম্বর পাতায় Wuhan - 400 শব্দটা চকচক করছে।' যেই জানতে পারলেন অমনি আমার হাত লকলক করতে শুরু করল, এবারে ছড়িয়ে দিতে হবে, নইলে করোনা-সমাজে আপনার নামযশ হবে কি করে? সামান্য একটু সময় খরচা করলেই জেনে নিতেন মূল বইয়ে নামটা Gorki-400 ছিল, (রাশিয়ার পটভূমিতে লেখা) । ঠান্ডা যুদ্ধের পরে যখন রাশিয়ার পরিবর্তে নতুন শত্রু দেশ হিসেবে কম্যুনিস্ট চিন উঠে আসছে তখন এই নামটা পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু আপনার কাছে এতো সময় কোথায়? সময় এত কম যে কেউ কেউ Sylvia Browne এর End of Days এর Screenshot দিয়ে Dean Koonz এর তত্ত্ব ঝেড়ে দিয়েছে। এতো গেল সাহিত্য, এরপরে আসবে কাব্যি

'করোনা তুমি ওদের ক্ষমা কোরোনা
যারা বাদুর খেয়েছিল তাদের তুমি ছেড়োনা
তবে আমরা সব ছাগল মুরগি বেগুন খেকো
আমাদের ভুল করে মেরোনা।'

[©অভিষেক বোস ১০৮ symbol দিয়ে কোনো সত্বাধিকার জানালাম না, এ কবিতা করোনা সমাজের Whatsapp Group এ দায়িত্ব নিয়ে ছড়িয়ে দিন]

ইত্যাদি ইত্যাদি সব জ্বালাময়ী কবিতা।

সিনেমা আর সাহিত্য হাত ধরাধরি করে চলবে, এটাই নিয়ম ।তাই  কি করে আগে থাকতেই COVID-19 এর প্রেক্ষিতে 2011 সালে 'Contagion' সিনেমাটা আমাদের জ্ঞানচক্ষু খুলে দিতে এসেছিল সে নিয়েও একটা পোস্ট দেওয়া যেতেই পারে। Hollywood এ Bio Weapon conspiracy theory নিয়ে 500 মুভি রয়েছে কিন্তু আমাদের কাজ হলো জোর করে এর সাথে COVID-19 কে গুলিয়ে একটা রোজ সিরাপ তৈরি করা, যেটা খেতে সুস্বাদু, সুগন্ধি আর বেশ রঙচঙে হবে।

সিনেমায়  crowd psychology, mass hysteria    এগুলোও ছিল, সেগুলো নিয়েও না হয় একটু আলোচনা হোক। '2012' সিনেমায়  People's Republic of China বিশ্বের ত্রাতা হিসেবে এসেছিল, Ark তৈরী করে মানুষ আর পৃথিবীর জীব বৈচিত্র্যকে নিশ্চিন্ন হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছিল । আর একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী যে এই বিপদের পূর্বাভাস দিয়েছিল সেই বিজ্ঞানী আর তার পরিবার সমেত গোটা ভারত জলের তলায় তলিয়ে গেছিল। (দেখে নিন আগে থাকতে যদি কোনো ব্যবস্থা করে রাখতে পারেন! আপনি তো আবার বিজ্ঞানীও নন)। এই মূহুর্তে চিন আপনার এক নম্বর শত্রু তাই চিনের সবকিছু বয়কট করতে হবে। তালিকায় কি নেই! চীনের আবির, চীনের খেলনা, চীনের প্রাচীর, চীনে বাদাম এমনকি চীনের ওষুধ  ( এই ফাঁকে একবার Google search করে Chinese Bulk Drug নিয়ে একটু জেনে নিন)।

পরশু শুনলাম COVID-19 Virus নাকি ফুসফুসে ঢোকার আগে তিনদিন গলায় ঘাপটি মেরে বসে থাকে  তাই গরমজলে লেবু অথবা লবন জলে গার্গল করলেই ভাইরাসের খেল খতম। নিয়মিত জল খেলেও COVID-19 আপনার ধারে কাছে আসবে না (Viral replication, immune hyperreactivity and pulmonary destruction এই তিনটে Stage তখন মাথায় বনবন করতে শুরু করল)। জল খাওয়ার নিজস্ব উপকারিতা রয়েছে কিন্তু এই তথ্যটা কে দিল? এ তো মনে হচ্ছে সেই পার্লারে গিয়ে যেকোনো সমস্যার কথা বললেই যে উত্তরটা পাওয়া যায় ঠিক তার মতো "গোল্ড ফেশিয়াল করে নিন, সব ঠিক হয়ে যাবে"। জানতে চাইলাম কোত্থেকে জানলে? উত্তর এলো UNICEF থেকে বলেছে। দেখাও দেখি!  দেখলাম একটা সস্তার লেটারহেডে কোনো এক ছাত্রাবাসের নোটিস আর তার নীচে  bold এ 'Unicef' type করা হয়েছে।

প্রতিদিন আমি জানতে পারছি ঠিক ঠিক কি কি করলে আমি ভাইরাস আক্রান্ত হব না। (লম্বা লিস্ট ধৈর্য্য ধরে রাখতে হবে)  রসুন, আদা, লেবু, সৈন্ধব লবন, মেয়োনিজ, ভেজ বার্গার, ইটের গুড়ো, পাথরের সন্দেশ, পঞ্চ গব্য, গো মূত্র, নামাজ পাঠ, যোগাসন, মাদুলি, বাবাদুলি, তাবিজ কবজ, ব্যাটারি, Go Kyarona আবৃত্তি মানে খাদ্য, অখাদ্য, কুখাদ্য, পদার্থ, অপদার্থ সব কিছুতেই সেই গুনাবলী বিদ্যমান। তবে প্রতিবারের মতো এবারো ব্রয়লার মুরগি থেকে দূরে থাকতে হবে, ৭৫০ টাকা কেজি খাসির মাংসে কিন্তু ঔষধি গুন লেজ থেকে ক্ষুর অব্দি আছে।

ভারতের উপর দিয়ে যাচ্ছে আর একটু সংস্কৃতি কচলাবো না। অতএব আমার ইনবক্সে প্রতিদিন জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে করোনার বাজারে কিভাবে হিন্দু সংস্কৃতি গোটা বিশ্বে সমাদৃত হচ্ছে। বড় বড় রাষ্ট্রনেতারা কিভাবে করমর্দনের বদলে নমস্কার বেছে নিয়েছে, ভাবা যায় কি প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা আমাদের! দু একজনকে উত্তর দিলাম পা'এ হাত দিয়ে প্রনাম করা, হরির লুটের বাতাসা রাস্তা থেকে কুড়িয়ে খাওয়াটাও কিন্তু আমাদের আর তাছাড়া 'নমস্কার' হিন্দু নয় ভারতীয় সংস্কৃতি! তাতে দুকথা কুকথা শুনতে হলো। আমাদের সংস্কৃতির অনেক অনেক কিছু নিয়ে গর্ব করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে কিন্তু এইভাবে জোর করে 'UNESCO র বিচারে আমরাই সেরা' প্রচারের লাইনে আমি নেই।

সার্জিকল মাস্ক, N95, N90, 3 ply, 4 ply, micron, filter নিয়ে যেধরনের প্রকৃত শিক্ষা আমি প্রত্যেকদিন  পেয়ে চলেছি, ১৪ বছর Medical Equipment এ চাকরি করেও আমার হয়নি। কাল যখন মালদা থেকে ট্রেনে ফিরছিলাম তখন প্রায় আদ্ধেক লোকের মুখে কাপড় ( হ্যাঁ কাপড়, ন্যাকড়াও হতে পারে), আর 'প্রায় বাকি' আদ্ধেকের মুখে মাস্ক /রেসপিরেটর। এসি কামরাতে এই ছেলেভোলানো মাস্ক পড়ে কি কাজে লাগবে ভাবছি আর সামনের ভদ্রলোক আমাকে কড়া চোখে স্ক্রিনিং করছে, যেন এক্কেবারে Mobile Digital Flat Panel Detector Radiography । এই যখন ঘুমোতে যাব তখন দেখলাম ভদ্রলোক (!!) মুখের ন্যাকড়া খুলে গুটকা চিবোতে শুরু করল। ততক্ষণে বাকিরাও মাস্ক খুলতে শুরু করেছে, মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করলাম কোনো Safety Announcement হলো কি না  " দয়া করে ধ্যান দিন, এখন রাত এগারোটা, সমস্ত ভাইরাস ল্যাদ খেয়ে শুয়ে পড়েছে। ক্যাপ্টেন মাস্ক খুলে ফেলার সংকেত দিয়ে দিয়েছে।" না! কোথাও কিছু নেই ॥ "সঞ্জিত দার লেখা 'মহারাষ্ট্রের কৃষি মেলার' সোলার ইনসেক্ট রেপেল্যান্ট মনে পড়ে গেল, যা সন্ধ্যে থেকে সাড়ে তিন ঘন্টা কাজ করে, কেননা ওই সময়েই ক্ষতিকর পোকারা ভিড় করে, তার পরে আসে উপকারী পোকার দল।" সেরকমই একটা কিছু হবে হয়তো ভেবে ঘুমোতে গেলাম।

আচ্ছা বলুন তো এই মাস্ক পড়ার উপদেশটা কোত্থেকে পেলেন?  নাকি সবাই কিনছে তাই আপনাকেও পড়তে হবে? Health Organization গুলো যেখানে প্রথমদিন থেকে বলে আসছে যে আপনি নিজে অসুস্থ অথবা অসুস্থ হওয়ার লক্ষন না আসা পর্য্যন্ত মাস্ক পড়ার প্রয়োজন নেই তাও কালোবাজারি করার সুযোগ করে দিলেন। যদি একটু সময় নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য Website এ গিয়ে Precaution গুলো দেখতেন তাহলে জানতে পারতেন অকারণে মাস্ক পড়ার কিছু বিপদও রয়েছে, যেমন অনভ্যাসের কারনে বার বার মুখে হাত দিয়ে মাস্ক ঠিক করার প্রবনতা। এছাড়াও এগুলো আদৌ কতটা কার্যকরী সেটা আপনি Whatsapp থেকেই জেনেছেন। Whatsapp এই যখন এত বিশ্বাস তখন নিশ্চয়ই ডঃ সব্যসাচী সেনগুপ্তের Cough Etiquette,  Basic Hygiene, Myth আর Fact  পড়ে ফেলেছেন , তো সেগুলো মেনে চললেই তো হতো। হারুর চা এর দোকানে আড্ডা মারতে গিয়ে যেগুলো শুনে এলেন সেই গুজব ছড়ানোর কি খুব বেশি প্রয়োজন ছিল? আমার চার মাসের বাচ্চা বাড়িতে রয়েছে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনতে গিয়ে জানতে পারলাম এখন লোকে ঝোলা গুড়ের মতো স্যানিটাইজার খাচ্ছে। কুড়ি ত্রিশটা করে বোতল কিনে নিয়ে গেছে। ম্যারিনেট করার সময় স্যানিটাইজার ঢেলে দিচ্ছে। 

এর মধ্যেও কিছু ভালো খবর আছে। কলকাতায় যে হাউসিং কমপ্লেক্সে আমরা থাকি, সেখানকার দায়িত্বশীল মানুষরা এগিয়ে এসে করোনাভাইরাসের আক্রমণ রুখতে কিছু স্টেপ নিয়েছে। প্রায় দুশো চোদ্দটা অ্যাপার্টমেন্ট এই কমপ্লেক্সে, বিভিন্ন মেডিক্যাল অ্যাডভাইসরি পড়ে আর আবাসিক ডাক্তারদের কাছ থেকে শুনে ও অনান্য ডাক্তারবাবুদের সাথে কথা বলে  সিকিউরিটি আর হাউসকিপিং-এর লোকেদের জন্য অ্যাওয়ারনেস সেশন করে চলেছে  । তাঁদের জানিয়েছেন , তাঁরা যেন নিজের নিজের বাড়িতে, নিজের পাড়ায়, সেসব কথা সব্বাইকে শোনান ।

আবাসনে তিনটে গেট । তিনটে গেটেই সাবান  জল রাখা হয়েছে। আজ 17 তারিখ থেকে আবাসনে ঢুকতে গেলে অন্ততঃ কুড়ি সেকেন্ড ধরে সাবান-জলে হাত ধুতেই হবে । আবাসনের বাসিন্দা, নিরাপত্তারক্ষী, আমাদের ডোমেস্টিক হেল্প, হাউস-কিপিং এর লোকজন এবং অবশ্যই বাইরে থেকে আসা যে কেউ, তাঁদের গাড়ির চালক এই নিয়ম সবার জন্যই প্রযোজ্য। এছাড়াও বাচ্চাদের Hand Wash Protocol শেখানো, অকারনে মাস্ক না পরার জন্য ছোট ছোট ভিডিও শুট করে Group এ পাঠানো হচ্ছে। উদ্দেশ্য আমাদের সাথে সাথে আমাদের আশপাশের মানুষগুলোও যেন সুস্থ থাকে। নইলে যেখান থেকে শুরু সেখানেই এসে মিশে যাবে।

(আবাসনের এই অংশটা আমি সঞ্জিত দার লেখা থেকেই ছোট্ট করে লিখে দিলাম)

আর উল্টো দিকে এমন মানুষের সাথেও দেখা হচ্ছে যারা বেশ উৎসাহের সাথে জানাচ্ছে এপ্রিল মাসে গরমটা পড়লেই করোনা ফরোনা সব শেষ হয়ে যাবে। এই গল্পটা কে বলল? World Health Organization কিন্তু অন্য কথা বলছে

"COVID-19 virus can be transmitted in areas with hot and humid climates

From the evidence so far, the COVID-19 virus can be transmitted in ALL AREAS, including areas with hot and humid weather. Regardless of climate..."

(link :https://www.who.int/emergencies/diseases/novel-coronavirus-2019/advice-for-public/myth-busters)

কোনটা গাঁজাখুরি আর কোনটা সত্যি এটা বোঝার জন্য বিরাট গবেষনা করতে হয় না, শুধু একটু সময় খরচা করে বিশ্বাসযোগ্য website এ ঢুঁ মেরে আসলেই হয়, বা একবার Cross Check করে দেখলেই হয়, তাও সম্ভব না হলে পরিচিত ডক্টর /বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বললেই চলে, এখন অনেক Fact Check Website ও আছে কিন্তু Fake News Virus আপনার Cellular level এ পৌঁছে গেছে তাই COVID-19 গরম  না পড়লেও একদিন বাসি খবর হয়ে যাবে তবে আপনার রোগটা এর থেকেও বেশি মারাত্মক।

যত্ন নিন নইলে জিনে ছড়িয়ে পড়বে।

- অভিষেক বোস

(কিছু ব্যাকরণগত ভুল রেখে দিলাম, Copy র Paste  করতে হলে শুধু আমার নামটা না, ভুলগুলোও ঠিক করে নিবেন)