Sunday, May 29, 2022

মন্ডা চিনির দিনগুলো

—' কিসের আলোয় পড়ছো ভাস্কর?' 

প্রথম দিন পড়তে এসে প্রশ্নটা শুনে খিক করে হেসে ফেললাম। ভাস্কর দা টেস্ট পেপার থেকে মাথা তুলে একবার তাকালো। তারপর আবার মাথা নীচু করে টেস্ট পেপারে মন দিলো। এই খেলা ভাস্কর দা অনেকবার খেলেছে।

মন্ডা স্যার একটু হতোদ্যম হয়ে রাজাকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলো
 
— 'কিসের আলোয় পড়ছো রাজা?' 

রাজা মনে হয় এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যhl দু'সপ্তাহের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিলো। ভারী গলা করে বললো 

'কেন স্যার, টিউবের আলোয়। নতুন টিউব লাগিয়েছেন মনে হচ্ছে!' মন্ডা স্যার খুব উৎসাহ নিয়ে উত্তরটা শুনলো তারপর আমাকে আর কমলকে একই প্রশ্ন করলো। 

টিউবের কোনো বিজ্ঞানসম্মত নাম কিম্বা প্রজাতি আছে কিনা ভাবছিলাম। মনে পড়লো না। দুজনেই উত্তর দিলাম 'টিউব লাইটের আলোয় ।' 

—'কি করে জানলে?' 

এবার সমবেত উত্তর দিলাম -' দেখলাম। এই তো টিউব লাইট জ্বলছে।'

মন্ডা স্যারের গলার স্বর সপ্তমে চড়লো, সোনালী ফ্রেমের চশমার পেছনে চোখগুলো গোল্লা গোল্লা হয়ে উঠলো —'এতো সময় কোথায়? আলো আছে, পড়ে যাও। টিউব লাইটের আলো, না নিয়নের আলো, না জোনাকির আলো, জানার কি প্রয়োজন? আলো আছে পড়ে যাও। 

এতক্ষণে খেলাটা ধরতে পারলাম। কেন ভাস্কর দা উত্তর দিলো না বুঝতে পারলাম। ভাস্কর দা ইলেভেনে পড়ে আর আমরা নাইন। মনে মনে ভাবলাম এতক্ষণ ধরে যে সময়টা নষ্ট হলো, তার থেকে অনেক কম সময়ে টিউবের দিকে তাকানো যায়। কিন্তু ততক্ষণে দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলা শুরু হয়ে গেছে। 

—'নাইনেই আমরা টেনের সিলেবাস শেষ করে দিবো। তাহলে টেন-এ কি করবো? হাওয়া খাবো নাকি?' বলে একটা অট্টহাস্য করে উঠলো। 

আমি আর কমল একে অন্যের দিকে তাকালাম। কি টিচার খুঁজে বের করেছি গুরু! নাইনেই টেন-এর সায়েন্স সিলেবাস শেষ। পুরো টেন জুড়ে তাহলে খেলা আর আড্ডার জন্য অফুরন্ত সময়। ভাবা যায়! আনন্দে আমাদের চোখে জল এসে যাচ্ছিলো। 

— কি হলো উত্তর দাও । টেন-এ তাহলে কি করবো? 
(প্রশ্নের উত্তর দিতেই ভুলে গেছি। আমাদের চোখে মুখে আনন্দের হাসি ) 

— ভাস্-কঅর ... 

ভাস্কর দা এইসব খেলার পোড় খাওয়া খেলোয়াড় । খাতার পাতা থেকে চোখ না তুলেই পেন চালাতে চালাতে একটু বিরক্তির স্বরে উত্তর দিলো "টেস্ট পেপার করবে ।" 

বিউটিফুল। শ্রীযুক্ত মন্ডার চোখে মুখে খুশির ঝিলিক। 

'টেস্ট পেপার করবো। বিউটিফুল ভাস্কর।' তারপর একটু থেমে আবার শুরু করলো 

— "০-৮৯ নম্বরের অঙ্কের উত্তর তো কোয়েশ্চেন পেপারেই থাকে। তার জন্য আমার কাছে পড়তে আসার কোনো দরকার নেই। ০-৮৯ মানে আমার কাছে 'শূন্য' ।  ৯০ থেকে ১০০ (গলার স্বর আবার সপ্তমে চড়লো, চোখগুলো গোল্লা গোল্লা হয়ে উঠলো) এই যে দশটা নম্বর, এর জন্য আমাদের তৈরী হতে হবে। আলো আছে পড়ে যাও। " 

আমি আর কমল টিউশন থেকে বেরিয়ে এসে খুশিতে দশ টাকার চপ কিনে খেয়ে ফেললাম। নাইনেই টেনের সিলেবাস শেষ হয়ে যাবে। ৯০ থেকে ১০০ নম্বরের জন্য প্রস্তুতি চলবে, ভাবা যায়! আমি পরীক্ষা দেওয়ার সময় খাতা দেখে নিজেই নিজেকে নম্বর দিতে থাকা জনতা। ষাট- পয়ষট্টি পেয়ে গেলেই (আমার হিসেবে) খাতা জমা দেওয়ার জন্য রেডি হয়ে যেতাম। সেই ষাট-পয়ষট্টির মন্বন্তরের সংসারে ৯০-৯৫ নম্বর! টিচারের মতো টিচার একটা খুঁজে বের করেছি মাইরি! 

এরপর মন্ডা স্যারের সমস্ত সৎচেষ্টার পরেও পিরিয়ডিক্যল পরীক্ষায় অঙ্কে আমি আর কমল যে নম্বরটা পেয়েছিলাম স্যার সেটা জানতে পারলে শুধু টিউব কেন আয়নার দিকেও তাকাতে দিতো না। আমরা বেমালুম নম্বরটা চেপে গেলাম 

— কতো এলো অঙ্কে? 

 — ঐ শূন্যই ধরতে পারেন। 

— হুমমম্। ৯০ থেকে ১০০, এই দশটা নম্বরের লড়াই।বুঝলে? 

আলবাৎ বুঝেছি । আমরা দু'জন মিলে মোট ১০০ পাওয়ার চেষ্টাই করেছিলাম । আমরা বুঝব না তো কে বুঝবে? 

মন্ডা স্যারের চোখ এবার রাজার দিকে পড়লো। রাজা এতো গভীর তত্ত্ব বোঝেনা। হালকা ছেলে। এতো হালকা, যে একবার দোতলার ছাদ থেকে পাশে টালির ছাদে পড়েছিলো। টালি এবং রাজা দুজনেই নাকি অক্ষত ছিলো। রাজা একটা চ্যুইংগাম চিবোচ্ছিলো। শ্রীমতি মন্ডা সেটা দেখতে পেয়ে বললো 'ওটা কি মুখে? হয় ফেলে এসো, নয় গিলে ফেলো।' 

রাজা টিউবলাইটের খেলা খেলেছে। ভাবলো বাইরে গিয়ে চ্যুইংগাম ফেলে আসতে না জানি কত সময় নষ্ট হবে। তারপর গলাটা ভোরবেলার মোরগের চীৎকার করার মতো  করে উপরে তুললো আবার নীচে নামিয়ে একটা ঢোঁক গিললো। এরপর একটু ধাতস্থ হয়ে বেশ গর্বের সুরে বললো "গিলে ফেলেছি ম্যাডাম।" 

আমরা সবাই  রাজার সর্বভুক অবতার চাক্ষুষ করলাম। স্যার নিজেও একটা ঢোঁক গিলে দ্রবণ সম্বন্ধে প্রশ্ন শুরু করলো — 

'সম্পৃক্ত দ্রবণ কাকে বলে?' 

আমি আর কমল উত্তর দেওয়ার পরে রাজার পালা। রাজা শুরু করলো

সম্পৃক্ত দ্রবণ স্যার। ঐ তো অভিষেক যেটা বললো, 

— হ্যাঁ, বলো রাজা বলো। অভিষেক কি বললো

—ঐ তো অভিষেক বললো, কমলও বললো সম্পৃক্ত দ্রবণ হলো... 

- বলো, বলো

— মানে অভিষেক যেটা বললো, কমলও তো বললো। 'অভিষেকমল' এর অনন্ত চক্রে তখন মন্ডা স্যার অধৈর্য হয়ে উঠেছে।  

'তোমরা তো এক স্কুলেও পড়ো না। পরীক্ষার খাতায় কি লিখে আসবে? অভিষেক আর কমল বলে দিয়েছে, আমি আর বলবো না। '

আচ্ছা ঠিক আছে ভালো করে বুঝে নাও। ধরো তোমার কাছে এক কাপ চা আছে আর তুমি তাতে এক চামচ করে চিনি নিচ্ছো আর গোলাচ্ছো। গোলানো শেষ হলেই আবার এক চামচ, আবার এক চামচ... 

হঠাৎ দেখা গেলো রাজা পাথরের মতো শক্ত হয়ে আছে । দুই হাতের একটাতে অদৃশ্য কাপ আর অন্য হাতে চিনির চামচ ধরার ভঙ্গি । 

— কি হল রাজা!? 

—রাজা কষ্ট করে চেঁচিয়ে উত্তর দিলো "গ্গুলচ্ছে না  স্যাঅ্যর।" 

সম্পৃক্ত দ্রবণের একরম ব্যবহারিক প্রয়োগের নিখুঁত অভিনয় আমি সারাজীবনে দ্বিতীয়বার দেখিনি। 

মন্ডা স্যার হতোদ্যম না হয়ে আবার শুরু করলো। 'আলো আছে পড়ে যাও রাজা।' 

একদিন সন্ধ্যাবেলা কমল আর আমি পড়তে ঢুকেছি। ঢুকে দেখি শ্রীযুক্ত মন্ডাবাবু সম্ভবতঃ অফিস ফেরতা একটু মৌতাত সেরে সোফার নীচের দিকে পিঠটা এলিয়ে দিয়ে মাটিতে বসে ফুটবল ম্যাচ দেখছেন । শ্রীমতি মন্ডা হঠাৎ পড়ার ঘরে এসে বললেন 
— "শুনছো, ছেলেটা আজকে কেমিস্ট্রিতে 98 পেয়েছে।" 

—ব্বাহ্। আয় বাবা বোস, একটু টিভি দ্যাখ। দারুণ খেলা হচ্ছে। 

গুরুপত্নীর কর্ণকুহ্বরে এধরণের অলুক্ষণে কথা আসার সাথে সাথে তিরিক্ষে মেজাজে বললো 
— 'কি বলছো কি তুমি !? জানো প্রিয়দর্শিনী হিস্ট্রিতে ওর থেকে পৌঁণে দুই নম্বর বেশি পেয়েছে? তুমি টিভিটা বন্ধ করো এক্ষুণি।' 

—যাহ্ বাবা যা। মায়ের কাছে পড়তে বোস্। খেলাটা এতোটাও ভালো হচ্ছে না। 

শ্রীমান এই কথা শুনে মায়ের পিছু নিলো। আর স্যার যখন বুঝতে পারলো আপদ-বিপদ দুটোই পাশের ঘরে পৌঁছে গেছে, তখন টুক করে আবার টিভিটা চালিয়ে দিলো। 

শ্রীমান এর মধ্যে আবার কখন পড়ানোর ঘরে ঢুকে পড়েছে কারো চোখে পড়েনি। ঢুকেই সোফায় বসে বাপের ঘাড়ে পা তুলে তিলে খচ্চরের মতো হাসতে শুরু করলো। ততক্ষণে শ্রীমতি মন্ডা ঘরে ঢুকে যেই না দেখেছে টিভি চালানো, ব্যস! 

অনেক অনুনয় বিনয় করে স্যার ওকে আবার ঘরে পাঠালো। কিছুক্ষণ অপেক্ষা। তারপর যেই মোটামোটি নিশ্চিত হওয়া গেল যে পুত্র অধ্যায়নে মনোনিবেশ করেছে, ওমনি আবার টুক করে টিভিটা চালিয়ে দিলো। 

কনিষ্ঠ মন্ডাটি একটি আগমার্কা হাতবাক্সো ছিল। সুযোগ পেয়ে ব্যাটা আবার একই ভাবে বাপের কাঁধে পা তুলে সোফায় বসলো। সম্ভাব্য বিপদের কথা ভেবে স্যার ততক্ষণে ছেলের কাছে রীতিমতো কাঁদুনে সুরে বলে উঠলো 

— 'যা না বাবা যা। তোর মা চলে এলে তো বুঝতেই পারছিস....' 

তারপর আপদ বিদেয় করে গম্ভীর সুরে বললো 'সারাদিন কোনো অসুবিধে নেই বুঝলে, ঐ শুধু সাতটা থেকে সাড়ে ন' টার সময়টাতেই মানে আর কি। 

আমরাও মনে মনে অঙ্ক পরীক্ষার আপ্তবাক্যটা বুঝে নিলাম। সকাল থেকে সন্ধ্যা ৬:৫৯ অবধি তো যখন ইচ্ছে টিভি খুলে দেখা যেতে পারে কিন্তু সন্ধ্যা সাতটা থেকে সাড়ে ন'টা, এই যে আড়াই ঘন্টা, এই আড়াই ঘন্টার জন্যই লড়াই। 

(মন্ডা স্যার আসলে ভালো মানুষ ছিলো। এগ্রিকালচার ত্থুড়ি এগরোল-কালচার cess কেটে ১৫০ টাকা বেতনের কখনো ১৪০ পেতো, কখনো ১৩০ কিন্তু কোনোদিনও কোনো রিটার্ন ফাইল করেননি। আর হ্যাঁ, মন্ডা স্যারের নাম মন্ডা ছিল না। ) 

— অভিষেক বোস

Saturday, May 28, 2022

তারাদের কথা —৩


(লাল মাটির পৃথিবী) 

গৌড়ের সবুজ মাঠে পিকনিক করতে যেতাম আমরা। মাঠের সামনে মিনা করা স্থাপত্যগুলোর উপরে পা রেখে দাঁড়িয়ে মনে হতো, একদিন এখানেই রাজা-বাদশাহরা চলাফেরা করতো। আজ যেখানে সন্ধ্যা হলেই ঝুঁপ করে অন্ধকার ঘিরে ধরে, একসময় আলোতে ঝলমল করতো। তারপর একদিন সব মাটির গর্ভে চলে গেল। একটা পুরো জলজ্যান্ত নগরী ইতিহাসের পাতার তলায় চাঁপা পড়ে গেলো। 

সময়! 
আজ যেখানে ঝকঝকে শপিং মল, বহুতল বাড়ি, আর একটা সভ্যতা তার শিখরে আছে, হাজার বছর পেরিয়ে সেখানে হয়তো শুধু ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকবে। তারপর একদিন সেসব ধ্বংসাবশেষের শেষ চিহ্নও মুছে যাবে। তখন যদি কোনো আগামী সভ্যতা সেখানে পা রেখে দাঁড়ায়, কখনো কি তারা জানতে পারবে, 'হাজার বছর আগে এখানে জীবন কত চঞ্চল ছিলো !?' 

পৃথিবী নামের আগুনের গোলাটাও একদিন বরফে মুড়ে গিয়েছিল। তারপর একদিন বরফ সরে গিয়ে জীবন তার আজকের নীল সবুজ রঙ পেলো। বহির্বিশ্বে প্রানের সন্ধান করতে গিয়ে এই কথাগুলো মনে রাখতে হয়। 

নক্ষত্রের চারপাশে যে গ্রহগুলো ঘুরে চলেছে তাদের মধ্যে যারা এমন দূরত্বে রয়েছে, যেখানে না তো ভয়ঙ্কর গরম না অবিশ্বাস্য রকম ঠান্ডা, সেখানেই পাওয়া গেলেও পাওয়া যেতে পারে 'জলের অস্তিত্ব' । প্রাণের উপযোগী পরিবেশ। আর এই জায়গাকে বলা হয় Habitable Zone (Goldilocks zone)। হাজার কোটি গুণ বেশি ঔজ্জ্বল্যের নক্ষত্রের সামনে গ্রহের প্রতিফলিত আলো এতটাই ম্লান যে সরাসরি এক্সোপ্ল্যানেটের সনাক্তকরণ করা প্রায় দুঃসাধ্য কাজ। তাই Transit Method এর মতো পরোক্ষ পদ্ধতিগুলোর সাহায্য নেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে প্রদক্ষিণ করার সময় যখন কোনো গ্রহ, নক্ষত্রের ডিস্ক-এর সামনে চলে আসে তখন নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্য সামান্য কমে আসে। এই কমে আসার তারতম্য দেখে গ্রহের আকার সম্বন্ধেও একটা ধারণা পাওয়া যায়। পৃথিবীর তাবড় তাবড় স্পেস রিসার্চ ইন্সটিটিউট এক্সোপ্ল্যানেটের খোঁজে এইধরণের অসাধ্য সাধন করে  চলেছে। আর দূর থেকে দূরতম ছায়াপথের অজানা তথ্যকে জানার সাথে সাথে আমাদের প্রায় অচেনা প্রতিবেশী গ্রহদের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টাও করে চলেছে। 

দৃশ্যমান মহাবিশ্বে অন্ততঃ কয়েকশ কোটি গ্রহ রয়েছে যারা সম্ভবতঃ Goldilocks Zone এর মধ্যে প্রদক্ষিণ করছে আর আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী গ্রহ রয়েছে Habitable Zone এর বহিঃসীমারেখার সামান্য বাইরে। স্বভাবতই মহাকাশ বিজ্ঞানীদের চোখ গিয়ে পড়লো লাল মাটির পৃথিবীর দিকে। জল, অক্সিজেন, তাপমাত্রা ছাড়াও আরো একটা উপাদান রয়েছে যার অনুপস্থিতিতে মূহুর্তের মধ্যে প্রাণ নিশ্চিন্ন হয়ে যেতে পারে। 'চৌম্বক ক্ষেত্র' (Magnetic field) । 

চৌম্বকক্ষেত্র না থাকলে সৌরবায়ু ( stream of charge particle) পৃথিবীর বুক থেকে প্রাণের উপস্থিতি নিশ্চিহ্ন করে দিতো। লাল গ্রহেরও একসময় নিজস্ব চৌম্বকক্ষেত্র ছিলো। তারপর একদিন মঙ্গলগ্রহ তার 'ম্যাগনেটিক ফিল্ড' হারিয়ে ফেলল। সূর্য্যরশ্মি লাল গ্রহের বায়ুস্তরকে ছিন্নভিন্ন করে দিলো। বায়ুমন্ডলের ঘনত্ব কমতে শুরু করলো আর  বায়ুমন্ডল ক্ষীণ হওয়ার সাথে সাথে মঙ্গলপৃষ্ঠের জলও ধীরে ধীরে উধাও হয়ে গেল। লাল গ্রহের আজকের হিমশীতল, মরুভূমির মতো অনুর্বর, ধূলোঝড়ে ঘেরা চেহারার সাথে অতীতের কোনো মিল নেই। এখনো অব্দি যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে তাতে এতটুকু পরিস্কার সেদিনের মঙ্গলগ্রহ একটা অন্যরকম জগৎ ছিলো। প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক হ্রদ, বহমান জলখাত বারবার ইঙ্গিত দেয় একসময় এখানেও প্রাণের অনুকুল উষ্ণতা ছিল, বায়ুমন্ডল ছিল, নদীসদৃশ জলের প্রবাহ ছিল, চৌম্বকক্ষেত্র ছিল আর হয়তো এককোষী, বহুকোষী কিম্বা আরো উন্নত প্রাণ ছিল। আনুমাণিক চার হাজার কোটি বছর আগে প্রায় পঞ্চাশ কোটি বছর ধরে চলা অবক্ষয়ের পর সেসব ইতিহাসের হদিস অনেক নীচে চাপা পড়ে আছে। চার হাজা-আ-র কোটি বছর। মাত্র পঁচিশ কোটি বছর আগেও পৃথিবীর বুকে ডায়নোসরেরা হেঁটে বেড়াতো। আমাদের চেনা পরিচিত জগতে আমাদের কল্পনাতীত আদিম পরিবেশ ছিল। তারও আগে পৃথিবীর বুক থেকে ভয়াবহ দুর্যোগ একাধিকবার সামুদ্রিক আর ভূপৃষ্ঠের সমস্ত  জীবপ্রজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। আবার নতুন করে প্রাণের উদ্ভব হয়েছে, বিকাশ হয়েছে।  একটা সামান্য গ্রহাণু পৃথিবীর বুক থেকে সবথেকে শক্তিশালী, সবথেকে বিশাল প্রাণীদের জীবাশ্মের তলায় পৌঁছে দিয়েছে। মাত্র পঁচিশ তিরিশ বছর আগেও আমাদের চারপাশের পরিবেশটা ছিল আজকের থেকে ভীষণরকম আলাদা । চার হাজার কোটি বছর আগে কতটা আলাদা ছিল তার অনুমাণ করাটাও অসম্ভব। মহাবিশ্বের সাপেক্ষে কয়েক কোটি বছর সময়টা তেমন কোনো বড় সংখ্যাই নয়। অথচ আগামী যেকোনো মূহুর্তে এরকম দুর্যোগ আবার নেমে আসতে পারে। সভ্যতার শেষ চিহ্নটুকু ধূলোকণায় মিশে যেতে পারে।  লালমাটির পৃথিবীর মতো আমাদের পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র হারিয়ে যেতে পারে। অন্তঃসলিলা নদীগুলো থেকে শুরু করে হিমবাহ অব্দি বিলোপ পেতে পারে। তারপর পাশাপাশি দুটো মরুভূমি সদৃশ, জীবনের অস্তিত্ব হীন শীতল গ্রহ, গভীর রাতের আকাশে শুধু অতীতের স্মৃতিভার নিয়ে অবিরত ঘুরে বেড়াবে। হয়তো সেদিন সৌরজগতের অন্য কোনো কোণায় প্রাণের উদ্ভব হবে।  তারপর একদিন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করে সেই জগতের প্রাণে বুদ্ধিমত্তা আর অনুভূতির বিকাশ হবে। সেদিন সেই দুনিয়ার একজোড়া অনুভূতিপ্রবণ প্রাণী যদি রাতের আকাশে পাশাপাশি দুটো লাল আর নীল গ্রহের দুনিয়ায় দিকে তাকিয়ে দেখে ভাবে " মহাবিশ্বে কোটি কোটি গ্রহ, উপগ্রহের মধ্যে শুধু আমাদের এই গ্রহতেই প্রাণের অস্তিত্ব ছিল, আছে আর থাকবে!!" 

— অভিষেক বোস

Saturday, April 16, 2022

তারাদের কথা - ২

(পৃথিবীরও কান আছে) 

১৫ই অগাস্ট, ১৯৭৭ (স্থানীয় সময়) । বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের দেশের ছোট-বড় শহরের একটা সাধারণ দৃশ্য।  বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে, গরম চায়ের কাপের ধো়ঁয়া সামনে রেখে বাড়ির বয়স্করা রেডিওতে কান পেতে রয়েছে। আর ঝ্যা-ঝ্যা আওয়াজকে সরিয়ে রেখে পছন্দের স্টেশনের হদিশ পেতে 'নব্' ঘুরিয়েই চলেছে । ঠিক সেই দিন ভারতীয় উপমহাদেশে থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে, ওহাইওতে পৃথিবীর 'Big Ear'এর কানে ধরা পড়ল অপ্রত্যাশিত 'রেডিও সিগন্যাল' । 

'Big Ear' আসলে তিনটে ফুটবল মাঠের সমান একটা রেডিও টেলিস্কোপ , 'এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল ইন্টেলিজেন্স' সন্ধানের আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক প্রয়াস। 

বেতার তরঙ্গ আবিষ্কারের দিন থেকেই আমরা মহাশূন্যে 
কারণে অকারণে রেডিও সিগন্যাল পাঠিয়ে চলেছি। টেলিভিশন আসার পর সিগন্যাল ব্রডকাস্টিং আরো বেড়েছে। কিন্তু ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি রেডিও অবসার্ভেটরি' -র বিগ ইয়ার প্রথমবার ওপারের সংকেত শুনতে পেলো। অতর্কিত তীব্র সিগন্যালটা ঠিক ৭২ সেকন্ড পর মিলিয়ে গেল। এর আগে আর কোনোদিনও এরকম কিছু শুনতে পাওয়া যায়নি । আগামী আরো একুশ বছর রাত দিন এক করে অপেক্ষা করার পরেও আর কোনো সূত্র পাওয়া গেল না। এতো ক্ষনস্থায়ী সংকেতের উৎসস্থলও জানা সম্ভব হয়নি । গভীর মহাকাশের (Deep Space) এর স্যাজিটেরিয়াস নক্ষত্রপুঞ্জের (Sagittarius constellation) কাছাকাছি কোনো জায়গা থেকে আসা প্রথম রেডিও সংকেত শুধু একবারের জন্যে পৃথিবীর কানে এসেই হারিয়ে গেল অনন্ত শূন্যে। ঘটনার মূহুর্তে অ্যাস্ট্রোনমার জেরি আর. এহম্যান এতটাই শিহরিত হয়েছিল যে সিগন্যাল এর প্রতিনিধিত্বকারী সংখ্যাগুলোর প্রিন্টআউটে লাল কালি দিয়ে গোল করে পাশে 'ওয়াও' (Wow!) লিখে দেয়। এরপর চার দশকের বেশি সময় পেরিয়েও 1420 মেগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সির Narrow Band (অনেকটা আমাদের রেডিওর AM - Amplitude Modulation চ্যানেলের সিগন্যালের মতো) আর্টিফিশিয়াল  সিগন্যালের আর কোনো হদিশ পাওয়া যায়নি । আগামী পৃথিবীর মানুষ শুধু জানতে পেরেছে একবার আমরাও হয়তো ওপারের অজানা সংকেত পেয়েছিলাম Wow! Signal । 


                           বহির্বিশ্বের বুদ্ধিমান প্রাণের সভ্যতার সন্ধানে পৃথিবীর বিগ ইয়ার এলিয়েন সিগন্যাল খুঁজছিল ঠিকই কিন্তু এমন অবিশ্বাস্য কিছু শোনার আশা কেউ করেনি! Wow Signal ছিলো সেই রাতের পটভূমিতে মহাকাশের সবচেয়ে তীব্র সংকেত। এর পরে প্রায় পঞ্চাশ বছর কেটে গেলেও এই রহস্যের কোনো সুরাহা হয়নি। পরবর্তীতে অনেক বৈজ্ঞানিক অনুমান (hypotheses) সামনে এসেছে। কখনো ধূমকেতুর থেকে নির্গত রেডিও সিগন্যালের তত্ত্ব এসেছে, কখনো বা গুপ্তচর কৃত্রিম উপগ্রহের। আবার কখনো বা বহির্জগতের বুদ্ধিমান প্রাণের। যেই সভ্যতা হয়তো যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিল হাজার আলোকবর্ষ দূরে তাদেরই মতো অন্য জগতের সাথে। 
                           

অ্যাস্ট্রনমারদের একটা বড় অংশ পরবর্তীতে ধূমকেতুর তত্ত্ব যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে নাকচ করে দেয়। কিছুদিন আগে Wow! signal এর সম্ভাব্য উৎসস্থলের একটা লম্বা লিস্ট প্রকাশ করা হয়েছিল। যার মধ্যে সবথেকে উৎসাহব্যঞ্জক নাম 2MASS 19281982-2640123 এর কাছাকাছি কোনো একটা জায়গা। এরকম লম্বা চওড়া বিদ্ঘুটে নামটা ১৮০০ আলোকবর্ষ দূরের প্রায় সূর্যের মতো আয়তন আর তাপমাত্রার একটা নক্ষত্রের। তবে গভীর মহাশূন্যে স্টার, ম্যাগনেটার, ক্যোয়েসার, পালসার খুঁজে বার করা যতটা জটিল তার থেকে কয়েক'শ গুণ বেশি জটিল এক্সোপ্ল্যানেট ( সৌরজগতের বাইরের গ্রহ) এর সন্ধান। আজ অবধি মাত্র পাঁচ হাজারের মতো এক্সোপ্ল্যানেট এর খোঁজ পাওয়া গেছে। তাই 2MASS 19281982-2640123 কে প্রদক্ষিণ করছে (!) যেসব উপগ্রহ তাদের অস্তিত্বের তথ্যটুকু জানাটাও একরকম দুঃসাধ্য কাজ। আর ১৮০০ আলোকবর্ষ দূরের 
তমোছায়াপথ পেরিয়ে আসা সংকেত যখন আমরা পেয়েছি ততদিনে স্পেস-টাইমের ঐ জ্যোতিষ্কের দুনিয়ায় পৃথিবীর হিসেবে এক হাজার আটশ বছর পেরিয়ে গেছে
(Radio waves travel at the speed of light) ।
সেখানে যদি কোনো উন্নত প্রাণ থেকেও থাকে, সেই সভ্যতা কালের নিয়ম মেনে আরো আধুনিক হয়েছে কিম্বা নিশ্চিন্ন হয়ে গেছে। রাতের বিশাল আকাশের দুই প্রান্তে দুটো বিন্দু এই ইতিহাসের হদিশ কিম্বা ভবিষ্যতের নাগাল হয়তো কোনোদিনও জানতে পারবে না। AB

১৯৯৮ সালে বিগ ইয়ার অবসর নিল আর তার সাথে সাথে বিশ্বের ইতিহাসে সবথেকে দীর্ঘদিন ধরে চলা SETI গবেষণার নজির তৈরী হলো। SETI - Search for Extraterrestrial Intelligence কোনো কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়, বিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা। 
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বহির্বিশ্বের উন্নত প্রাণ আর তার সংকেতের খোঁজে যে বৈজ্ঞানিক কর্মকান্ড চলছে তার সর্বজনীন নাম SETI। এই প্রয়াসে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সাথে সাথে জুড়ে রয়েছে বেশ কিছু বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের নাম। স্টিভেন হকিং (breakthrough listen), নিকোলা টেসলা (interplanetary communication), ফ্রাঙ্ক ড্রেক (Project Ozma), হ্যারল্ড ক্লেইন ; লিস্টটা অনে-এ-ক লম্বা কিন্তু এর মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য নাম, মহাকাশ নিয়ে যাদের সামান্যতম উৎসাহ আছে তাদের প্রায় সবার প্রিয় 'কার্ল সেগান'। 

বিভিন্ন সময়ে SETI র সাথে জুড়ে গেছে নাসা, হিউলেট-প্যাকার্ড ল্যাবরেটরি (HP) আর হার্ভার্ড এর মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। আমাদের পরিচিত জগতের পরিধির বাইরে প্রাণের সন্ধানে বৈজ্ঞানিক প্রয়াস কখনো থমকে গেছে, কখনো বা মুখ থুবড়ে পড়েছে কিন্তু কখনোই বন্ধ হয়ে যায়নি আর এই প্রয়াসে নবতম সংযোজন মাত্র তিন মাস আগে। James Webb Space Telescope (large infrared telescope) । Hubble Space Telescope এর উত্তরসূরী James Webb এতো বেশি শক্তিশালী, যে চাঁদের সমান দূরত্বে থাকা একটা ভোমরার heat signature শনাক্ত করতে সক্ষম। 

সত্তর হাজার কোটি টাকায় নির্মিত সবথেকে শক্তিশালী  Space Telescope 'ওয়েব্' কে বলা হয় এই সময়ের টাইম মেশিন। আর এই 'টাইম মেশিন' আমাদের আদিমতম প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে। এই মহাবিশ্বের সৃষ্টির প্রথম পর্যায়ের নক্ষত্র আর ছায়াপথের সন্ধান করবে। জানার চেষ্টা করবে সৃষ্টির প্রাচীনতম ইতিহাস আর তার বিবর্তন। সৌর পরিবারের গ্রহদের অজানা অধরা কাহিনী আর সৌরজগতের বাইরের গভীর থেকে গভীরতম মহাকাশে এক্সোপ্ল্যানেটের বায়ুমন্ডলের (!) উপাদানের হদিশ পাওয়ার। কার্বন ডাই অক্সাইডের কিম্বা মিথেনের মতো গ্যাসের সন্ধান পাওয়া গেলে পর্যবেক্ষণের তীক্ষ্ণতা আরো বাড়ানো হবে । কেননা প্রাণের অস্তিত্বের ইঙ্গিত হিসেবে অক্সিজেনের থেকেও এই দুটো গ্যাসের উপস্থিতি আরো অনেক জোরালো দাবি রাখে। তল্লাশি চালাবে প্রাণ সৃষ্টির প্রাথমিক উপাদানের (building blocks of life) চিহ্নের সন্ধানে । এইভাবে সুদূর ভবিষ্যতে কোনো একদিন হয়তো পেয়েও যেতে পারি আমাদেরই মতো আরো একটা পৃথিবী! সেই পৃথিবীর রঙ হয়তো গোলাপ ফুলের মতো গোলাপি আর তার সমুদ্রের রঙ জেড পাথরের মতো সবুজ। 


ছেলেমানুষি খেয়াল শোনালেও, এরপর কোনো দিন যদি এই গোলার্ধের গ্রীষ্মকালের রাতে খোলা আকাশের নীচে শুয়ে তারা গুনতে গুনতে, কোনো নীলচে উজ্জ্বল তারামন্ডলের  দিকে চোখ আটকে যায়, যার নাম Sagittarius constellation। তখনো কি মনে হবে না, ঐ তারাদের দেশ থেকেই আমাদের জন্য আমাদেরই মতো কাদের যেন উড়ো চিঠি এসেছিলো! যে চিঠি কোনোদিনও খুলে দেখা হয়নি..... 

— অভিষেক বোস

Saturday, April 9, 2022

তারাদের কথা - ১


(ছায়াপথের ওপারে )

এরিক ফন্ দানিকেন (Erich von Däniken) এর নাম আমি সম্ভবতঃ ক্লাস এইটে প্রথম জানতে পেরেছিলাম। এমন কিছু জানার মতো করে নয়, ঐ সিলেবাসের বইয়ের এক দুটো লাইন, ব্যস। 'এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়ালদের' নিয়ে যেসব লেখকের লেখা 'গল্প' গোটা পৃথিবীতে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলো 'এরিক' এর নাম তার প্রথম সারিতে থাকে । 

                      তারও অনেক আগে ঐ হাফপ্যান্ট বেলায় ছোটো মাসীর কাছে ই.টি -র গল্প শুনতাম (বঙ্কুবাবুর বন্ধু তখনো হাতে পায়নি)। কোনো একটা পেটমোটা পত্রিকাতে ই.টি-র গল্প ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করা হতো। স্পিলবার্গের ই.টি প্রায় মানুষের মতো দ্বিপদ কিন্তু ছোটখাটো কিম্ভুতকিমাকার এক প্রাণী। এর পরেও যত কল্পবিজ্ঞানের গল্প পড়েছি, তাতে বারবার এরকম ধারণায় দেওয়া হয়েছে যে, ভিনগ্রহীরা মানুষের মামাতো ভাই। লম্বা গলা, বড় মাথা, গোল্লা-গোল্লা চোখ, বরফির মতো কান আর ঘর্ঘর সুরে কথা বলে, এই টুকুই যা তফাৎ । 

এইসবই কল্পবিজ্ঞান আর আষাঢ়ে গল্প ।  কিছু উটকো চিন্তা ভাবনার মানুষ ছাড়া আর কেউ ভিনগ্রহীদের অস্তিত্ব নিয়ে মাথা ঘামায় না। 

ভুলটা ভাঙলো দশ বছর আগে, যখন জানতে পারলাম উপরের উদাহরণগুলো মস্তিষ্কপ্রসূত গল্প হলেও পৃথিবীর একটা বড় সংখ্যক কসমোলজিস্ট, অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট, অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্টরা প্রতিনিয়ত একটাই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছেন  'এই মহাবিশ্বে আমরা কি একা !?' 

এই যে মহাবিশ্বের কথা বলছি সেটা ঠিক কতো বড়? ফ্ল্যাট কিনতে যাওয়ার সময় আমার মাথায় ছিলো ঠিক কতো 'স্কোয়ার ফিট' জায়গা হলে ঠিকঠাক একটা ফ্ল্যাট হবে। ছোটবেলায় যে মালদা DSA-র মাঠে ফুটবল খেলতাম তার কাছে ফ্ল্যাটের ঐ জায়গাটুকু কোনো হিসেবের মধ্যেই আসবে না। একটা গোটা দেশের নিরিখে ঐ মাঠটার আয়তন কিস্যু না। এতো বড় দেশ ভারত, সেটাও নাকি পৃথিবীর ২.৫ শতাংশেরও কম ভূখন্ড। বিপুলা সেই পৃথিবীর মতো তেরো লক্ষ পৃথিবী (Volume) সূর্যের মধ্যে সেঁদিয়ে যাবে। 

সেই বিরাটবপু সূর্য নাকি আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির একটা মামুলি নক্ষত্র। এর থেকে কয়েক'শ গুণ বড়  (Diameter) নক্ষত্র আমাদের গ্যালাক্সির মধ্যেই রয়েছে। এরকম ছোট - বড় মিলিয়ে মিল্কিওয়েতে দশ হাজার কোটি নক্ষত্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে (খালি চোখে পরিস্কার আকাশে আমরা এই হাজার পাঁচেক তারা দেখতে পাই)। একেকটা নক্ষত্র থেকে প্রতিবেশি নক্ষত্র কত দূরে রয়েছে তার একটা উদাহরণ দিই। সূর্য থেকে নিকটতম নক্ষত্রের দূরত্ব চল্লিশ লক্ষ কোটি কিলোমিটারের বেশি ( 268,770 AU) । যেখান থেকে পৃথিবীর বুকে আলো এসে পৌঁছতে সময় লাগে 4.25 বছর। আর পুরো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিটা ঠিক কতটা বড়? আলোর গতিতে মিল্কিওয়ের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে সময় লাগবে এক লক্ষ বছর! 

আমরা আছি মিল্কিওয়ের কেন্দ্র থেকে অনেকটা দূরে ঐ কলকাতার পাশে হরিণঘাটার মতো জায়গায়। ছোটবেলায় যে শেখানো হয়েছিলো, সূর্য একজন সুবোধ বালক যে একজায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা নেহাতই গপ্পো । সূর্য তার ছানা-পোনা পরিবার নিয়ে মিল্কিওয়ের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে। এইভাবে একবার চক্কর কাটতে সূর্যের পঁচিশ কোটি বছর সময় লাগে (One Galactic year) । শেষবার যখন সৌরপরিবার গ্যালাক্সির এই জায়গায় ছিল যেখানে আজ রয়েছি তখন পৃথিবীর বুকে ডায়নোসর যুগ সদ্য হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছে । মানুষ নামের দুপেয়ে দুর্বল প্রজাতিরা তখন কোথায়!? আরো প্রায় চব্বিশ কোটি বছর পর প্রথম মানুষের পূর্বসুরীরা পৃথিবীর মাটিতে জন্ম নিল। আবার যখন পঁচিশ কোটি বছর পর আরো একটা 'গ্যালাক্টিক' বছর পার হবে, কে জানে এই সভ্যতার কোনো চিহ্নও থাকবে কি না! হয়তো নতুন কোনো প্রাণের উদ্ভব হবে কিম্বা পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে প্রাণের শেষ চিহ্ন। প্রতিবার পৃথিবীর বুকে প্রাণ বিলুপ্তির ঘটনার পরই আরো উন্নততর প্রাণের উদ্ভব হয়েছে। 

এতো বড় মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি কিন্তু মহাবিশ্বের পরিবারে
একটা লাল পিঁপড়ের থেকে বেশি কিছু নয়। এর থেকে ছোট বড় মিলিয়ে দু লক্ষ কোটির বেশি গ্যালাক্সি রয়েছে (observable universe) । সাম্প্রতিক একটা গবেষণা বলছে  সম্ভবত আরো দশ গুন বেশি গ্যালাক্সির অস্তিত্ব রয়েছে। এর কোনো শেষ নেই, কোনো সীমা নেই, প্রতিমূহুর্তে এই সীমানা বেড়েই চলেছে। 

একটা সোডা স্ট্র চোখের সামনে নিয়ে আকাশের দিকে তাকালে যেটুকু আকাশ দেখা যায় সেইটুকু শূন্যের মধ্যে হাজার খানেক গ্যালাক্সি থাকতে পারে । এই অনন্তের অসীমের প্রান্তে আর কোথাও কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই, কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব নেই, কোনো দিনও ছিল না কিম্বা কোনোদিনও উন্নততর প্রাণের সৃষ্টি হবে না এমন দাবি আর যেই করুক মহাকাশ বিজ্ঞান কোনোদিনও করেনি। উল্টে NASA, ESA, JAXA র official website এ নিয়ে গভীর আলোচনা রয়েছে, পরবর্তী অভিযানের হদিস রয়েছে। প্রশ্নটা আদিম, উত্তরটা এখনো অধরা। এই এতো বড় মহাবিশ্বে শুধু আমরাই আছি, আর কেউ কোথাও নেই!? নাকি ওপারে নীল তারাদের দেশে কেউ অপেক্ষা করছে একই প্রশ্ন নিয়ে?...............(ক্রমশ) 

— অভিষেক বোস

Friday, March 18, 2022

তিন হাজারি উপকথা

ফুলকপি যেমন শীতের শাহেনশাহ , সজনের ডাঁটা তেমনি বসন্তের বদ্যি। সজনের ডাঁটা না খেলে, ত্থুড়ি ভালো করে চিবিয়ে না খেলে 'বসন্ত ছুঁয়ে যাবে' মার্কা সাবধানবাণী শুনতে হতো। সাধারণত সজনের ডাঁটা, নিমপাতারা আসতো 'ট্রোজান হর্সের' মতো মাংসের জামবাটির সাথে। 

সজনের ডাঁটা, নিম-বেগুন, কোকিলের কুহু আর ফিনফিনে কুয়াশার চাঁদর সরিয়ে হোলিও আসতো। হ্যাঁ হোলি, দোল নয়। দোলের রঙীন দুপুর ফুরিয়ে যাওয়ার আরো একটা রাত অপেক্ষার পর উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় হোলি খেলা হয়। এই যেমন মালদাতে আজ 'দেব দোল'।  মানে আজ শুধু দেবতাদের মূর্তিতে আবির দেওয়া যেতে পারে। পাবলিকের গায়ে রঙ দিলে 'ফাউল'। খুব ছোটবেলায় একবার নিয়ম ভেঙ্গে উত্তম ক্যালানি খেয়েছিলাম।

(বেশ কিছু বছর আগে) শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব  তখনও ফরাক্কা ব্যারেজ পেরোয়নি। আর আমি যেহেতু একটু সংস্কারী গোছের তাই একদিন কলকাতায় রঙ খেলতাম আর একদিন মালদাতে।

এই প্রসঙ্গে আদালতের সামনে হলফনামা জমা দিয়ে বলছি যে, মালদাতে আমার হাফপ্যান্ট বেলায় আশেপাশে কাউকে 'ন্যাড়াপোড়া'-তে দেখিনি। যেমন আজ থেকে দশ বছর আগে কোনো ক্লাবকে খুঁটি পূজা করতেও দেখিনি। সেজেগুজে হলুদ পরিধান পরে, মোলায়েম সঙ্গীতের মূর্ছনার সাথে সমান্তরাল অথবা সমকৌণিক রঙের নরম  আঙুলের প্রলেপ আঁকা মুখপটও দেখিনি। এখন শুনেছি শহরের উদ্যানে চিত্রনাট্য মেনে জনগণ রঙ খেলছে। 

                        প্রাকস্ক্রিপ্টেড যুগে হোলির জন্য বরাদ্দ জামাকাপড়রা আকচার শেষবারের মতো আলমারির মুখ দেখতে পেতো। রে-রে করে একদঙ্গল ছেলে-মেয়ে দৌড়ে এসে 'হাজার পাওয়ারি' রঙ আর সোনালী রূপালি 'বার্ণিশ' ঘষে দিয়ে যেতো। যে পাঁচটি দলের মধ্যে খেলা হতো তাদের পরিচয় এরকম — হোলি খেলব না, রঙ খেলব না, আবির খেলব না, লোককে রঙ দিব কিন্তু নিজে নিব না আর সব খেলব। আর এর মধ্যেও কিছু মানুষ মুখে নারকেল তেল মেখে ঘুরে বেড়াতো । এদের মুখে সাধারণত কেউ রঙ মাখাতো না, দাঁতে ঘষে দিয়ে যেতো। শোলে আর সিলসিলার মতো কয়েকটা সিনেমার গান বাদ দিলে হোলির গান আসলে দুর্বোধ্য ।  সারারারা রারারারা ছাড়া আর কিস্যু বুঝতে পারতাম না ! 


মাইরি বলছি, যতই মনুষ্যেতর অথবা না-মানুষের মতো শোনাক — 'হোলি হ্যায়' বলে দৌড়ে গিয়ে কাউকে রঙ মাখিয়ে দেওয়া কিম্বা পিচকিরি দিয়ে রঙ ছুড়ে দেওয়ার মধ্যে যে উন্মাদনা আছে, সেটা বসন্ত এসে গেছে গাইতে গাইতে দু' পাঁক ঘুরে তিন আঙুল দিয়ে আলতো করে আবির মাখানোর মধ্যে কোনোদিনও খুঁজে পায়নি। আমাদের হাতের তালুর রঙ সপ্তাহ খানেক শোভাবর্ধন করতো।

দিনের বেলা জলরঙ খেলে বাড়ি ফিরে বাসন্তী পোলাও আর খাসির মাংসের সুরভি নাকে আসতো । স্নানের পরেও তাতে হাত লাগাতেই হাতের লাল রঙ সোজা পাতে। লাল হলুদ পোলাও খেয়ে ভিসিপি-তে আধা সিনেমা দেখে, আবার বিকেলবেলা থেকে আবির খেলা শুরু করে দিতাম।

সেই সময়ের কথা বলছি যখন পৃথিবীতে 'শুভেচ্ছা যুগ' নেমে আসেনি। তাই 'হ্যাপি হোলি' বলব নাকি 'শুভ দোল পূর্ণিমা' এই নিয়ে কোনো বিতর্ক ছিলনা। সন্ধ্যা একটু জমাট হলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বড়দের প্রণাম করে একটু সন্ধ্যাভোজ সেরে আসতাম। আজও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারবো পাড়ার কোন বাড়িতে পাঁঠার মাংসের ঘুগনি হয় l কোন বাড়িতে জালি মালপোয়া। প্রণাম পর্ব মিটে গেলে পাড়া জুড়ে আবার আবির খেলায় মেতে উঠতাম। আবির যত না গায়ে পড়তো তার থেকে বেশি বাতাসে উড়তো । সোডিয়াম ভেrপার লাইটের বাসন্তী আলোয় বসন্তের বাতাসে ভেসে যাওয়া রঙ-বেরঙের আবির আকাশে রঙীন ক্যানভাস এঁকে দিতো। এরপর রাত বাড়তে থাকতো । বেলাগাম একটা দিন একেবারে কিনারায় এসে পৌঁছতো । শেষে মাথা ঝাড়তে ঝাড়তে একটা সাদাকালো জীবনকে রঙীন করে বাড়ি ফেরার পথে দেখতাম সারাদিনের হুল্লোর কালো পিচ রাস্তার গায়ে লাল, সবুজ এঁকে রেখেছে। দোতলা বাড়ির যে বারান্দা থেকে খেউরি শুনতে হয়েছিলো, তার ঠিক নীচেই হাল্কা আসমানি দেওয়ালে বেগুনি আর গোলাপি রঙের দুটো বড় ছোঁপ লেগে রয়েছে। সারমেয়র দল একটু নিশ্চিন্তে কুন্ডলি পাঁকিয়ে শুয়ে আছে। বাতাস তখনও আবিরের সুবাসে ভারী হয়ে রয়েছে। সেই সুবাস বসন্তের সুবাসের থেকে একটু আলাদা, আবার অনেকটা একই রকম। ঠিক যেমন সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্রর থেকে একটু দূরের শহরগুলোর উৎসব, আনন্দ, উচ্ছ্বাস একটু আলাদা আবার অনেকটা একরকম। এইটুকু টিকে থাক,এই আলাদা টুকুই তো ঐ শহরগুলোর প্রাণভোমরা। সবকিছু একই ছাঁচে, একই মাপকাঠিতে হুবহু এক নাই বা হলো। হাজার হোক, তিন হাজার বছর পুরনো জনপদ বলে কথা। 

— অভিষেক বোস