Saturday, December 21, 2019

জামিয়া

জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, নামটা শুনেই কেমন বোম বাঁধার কারখানা মনে হচ্ছে না?  মনে হবে নাই বা কেন! উর্দুতে 'জামিয়া' শব্দের অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় আর 'মিলিয়া' মানে জাতীয়। তাতে কি হলো! আরে ইসলামিয়া তো আছে, ওটাতেই তো যতো গন্ডগোল।
না হে আমি এখানে ইসলাম আর সনাতন ধর্মের তুলনা করতে আসিনি, এটা বরং একটু সময় কাটানোর জন্য পড়ুন।

জামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গড়ে ওঠার জন্য যারা সমর্থন করেছেন তাদের মধ্যে গান্ধীজি (নাম শুনেই কেমন গা জ্বালা জ্বালা করছে না?) আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অন্যতম। এনারা মনে করতেন জামিয়া হাজার হাজার শিক্ষার্থীর সংস্কৃতি আদান প্রদানের কেন্দ্র হওয়ার উপযুক্ত। ঐ যে দু হাত ছড়িয়ে কোমরটা এলিয়ে দিয়ে যে পোস টা জীবনে অন্ততঃ একবার দিয়েছেন সেই শাহরুখ খান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ( হজম হলো না তো? কেমন একটা চোঁয়া ঢেকুর উঠছে, হাজার হোক মুসলমান), আচ্ছা ছাড়ুন, ভক্তকুলের আরাধ্যা অঞ্জনা ওম কাশ্যপ ( আজ তক চ্যানেলের) এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। কিরন রাও, গগন অজিত সিং (হকি), বীরেন্দ্র সেহ্ বাগ (উফফ্ কি পাকিস্তান কে পেটায় মাইরি!), অনশু গুপ্তা ( Senior DGM L&T),  রীতু কাপুর ও এখানকার ছাত্র ছাত্রী। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর নাজমা হেপতুল্লা বিজেপির প্রাক্তন সহসভাপতি আর ছ ছ'বার রাজ্যসভার সাংসদ (বিজেপি)। উনি আবার আমির খানের তুতো আত্মীয় আর মৌলানা আবুল কালাম আজাদ এর নাতনি। তাতে কে কিছু এসে যায়!? আচ্ছা দেখুন তো এটা শুনে ভালো লাগে কি না? জামিয়া তে ইঞ্জিয়ারিং আর ন্যানো সায়েন্স, ন্যানো টেকনোলজির সাথে সাথে বিভিন্ন ভাষার শাখা রয়েছে যার মধ্যে অন্যতম হলো সংস্কৃত।

আসুন এবার দেখে নিই বিভিন্ন দেশি বিদেশি সংস্থা কি বলছে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে।

Jamia Millia Islamia (JMI) has been ranked at 3rd position among the top 25 Central Universities and at 17th rank among top 100 universities by Outlook-I Care India University Rankings 2019,

Jamia Millia Islamia (JMI) is among the very few academic institutions from India which has improved its position in Times Higher Education World University Rankings (THE) 2020 .

It was ranked 19 in India overall by the National Institutional Ranking Framework (NIRF) in 2019

The Faculty of Law was ranked sixth in India by Outlook India's "Top 25 Law Colleges in 2017"[44] and 20th in India by The Week's "Top Law Colleges 2017

কিস্যু বোঝা গেল?  আরো একটা অভিযোগ আছে জামিয়া তে 50% ইসলাম ধর্মের লোকেদের সংরক্ষণ রয়েছে, কালকেই আমার এক খুব ভালো বন্ধুর পোস্টে পড়লাম। দেখলেন তো কেমন টুটি চিপে ধরা গেল। কথাটা অর্ধেক সত্যি। 30% মুসলিমদের জন্য, 10% মুসলিম মহিলাদের জন্য, 10% তফসিলি জাতি আর অন্য অনগ্রসর জাতির জন্য যারা ইসলাম ধর্মাবলম্বী। এছাড়াও স্বল্প দৃষ্টি, অন্ধ, প্রতিবন্ধী আর কাশ্মীরি পন্ডিতদের (একদম ঠিক পড়েছেন) জন্যেও সংরক্ষণ আছে। মোদ্দা কথা ইসলামিয়া নাম শুনে যদি গাত্রদাহ হয়, সেটা বোঝা যায় , কিন্তু তার জন্য ক্যাম্পাসে পুলিশের এইরকম অমানবিক মুখ দেখে আনন্দ হলে জেনে রাখুন একদিন শুধু নিধিরাম সর্দার জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া আর কিছু থাকবে না। জামিয়া কিম্বা JNU র কৃতিত্ব তাতে এক নয়া পয়সাও কম হয় না। আপনার পরবর্তী প্রজন্মকে উচ্চ শিক্ষার জন্য নিশ্চয়ই কোনো পার্টি অফিসে নয়, কলেজ ইউনিভার্সিটিতেই পাঠাবেন, তাই না। একের পর এক ইউনিভার্সিটিকে দেশবিরোধী তকমা দিলে হাতে থাকবে শুধু Whatsapp আর গুড মর্নিং মেসেজ। ছাত্ররা আন্দোলন করলে আপত্তি?  প্রয়াত অরুন জেটলিজি কে মনে আছে? ইমার্জেন্সির সময় ইন্দিরা গান্ধীর একনায়কতন্ত্রের সামনে বুক চিতিয়ে  দাঁড়িয়ে ছিল যে ছাত্রনেতা, শুধু জেটলিজি কেন ভারতবর্ষ আর গোটা বিশ্বের সব থেকে বড় বড় তাবর নেতারা ছাত্র আন্দোলন করেই উঠে এসেছে।  নিশ্চয়ই প্রতিবাদের ধরন হবে সংযত এবং গঠনমূলক তার মানে এই না যে দেশের সরকারের সব কথায় সমর্থন জানাতে হবে। দেশকে ভালোবাসার জন্য দেশের সরকারকে ভালোবাসতেই হবে এরকম কোনো সূত্র কেউ আবিস্কার করে যায়নি । আর মনে রাখবেন 10 জন ধৃতদের মধ্যে একজন ও ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়।  জামিয়ার ঘটনার প্রতিবাদ করেছেন বিজেপির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ( নাম বলব না, খুঁজে নিন)

34-35  বয়সে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ছে বলে হাসি পাচ্ছে, রাগ উঠছে যে আপনার পয়সা ধ্বংস হয়ে গেল।  জেনে রাখুন PHD করতে গড়ে প্রায় আট বছর সময় আর অন্ততঃ তেত্রিশ বছর বয়স হয়ে যায়। আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী আঠাশ বছরে B.A আর 33 বছর বয়সে M.A পাশ করার দাবি করেছেন।

আজ যদি আপনি মনে মনে হর্ষিত হয়ে থাকেন, সরকার যা করেছে ভালো করেছে তাহলেও চিন্তার কোনো কারণ নেই। একটা একটা করে সব ভালো ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে বিরুদ্ধ কথা শুনলেই যদি দেশ বিরোধী তকমা দিয়ে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয় তাতেও অন্ততঃ হাতের কাছে একটা ইউনিভার্সিটি থাকবেই থাকবে Whatsapp University.

- অভিষেক

Tuesday, December 3, 2019

❤️'মাফিন' ❤️


নভেম্বরের ২০ তারিখের দিকে 'মাফিন' এর আসার কথা, কিন্তু মাফিন আমার মতোই অধৈর্য। অত রয়ে সয়ে কাজ করার সময় ওর নেই। অক্টোবরের শেষদিকে হঠাৎ জানিয়ে দিল নভেম্বরের প্রথম দিকে ঐ ৭ তারিখ নাগাদ ও আসবে। এদিকে আমার তো অফিসে ছুটি আগে থেকেই প্ল্যান করে রেখেছি, এখন মাফিন এর আসার দিনটা এগিয়ে এসে সব প্ল্যান এর দফারফা। প্রিয়াঙ্কার তো চিন্তার শেষ নেই, কোথায় থাকতে দিবে, কোন ঘরে ঘুমোবে, কতবার খেতে দিতে হবে। মোদ্দা কথা মাফিন এর মেজাজ মর্জি কিছুই আমাদের জানা নেই! ঐ তিন চারটে প্রায় অস্পষ্ট সাদা কালো ছবিতে যতটুকু দেখেছি, এবারে প্রথম সামনে থেকে দেখব।

নভেম্বরের ৬ তারিখে সবাই মিলে মাফিন কে আনতে গেলাম, সবাই মানে মোটামোটি সব্বাই, আমি- প্রিয়াঙ্কা, আমার আর প্রিয়াঙ্কার মা বাবা, আমার পিসতুতো মাসতুতো ভাই দাদা বোন সব্বাই।

একেবারে ভিতরের গেট অব্দি শুধু প্রিয়াঙ্কাকেই যেতে দিল, আর আমাকে লবি অব্দি। প্রায় চল্লিশ পঞ্চাশ মিনিট কেটে গেছে, এদিকে না প্রিয়াঙ্কা বেরিয়ে আসছে, না মাফিন।  আরো কিছুটা সময় কেটে যাওয়ার পর আমার সত্যিই প্রিয়াঙ্কা আর মাফিন এর জন্য চিন্তা শুরু হয়ে গেছিল, এক একটা সেকেন্ড এমন ভাবে কাটছিল যেন চোখ বন্ধ করে কপালের উপর একফোটা একফোটা করে জল। এদিকে কতজনের পরিচিতরা দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসছে আর তাদের দেখে বাইরের মানুষগুলোর আনন্দ একটা দেখার মত দৃশ্য। শেষমেষ আমার সব দুশ্চিন্তা  কাটিয়ে একজন পরিচিত মুখ এসে জানালো মাফিন চলে এসেছে, জিজ্ঞেস করলাম প্রিয়াঙ্কা!?  বলল প্রিয়াঙ্কাও আসছে, দুজনের দেখা হয়েছে একটু পরেই বেরিয়ে আসবে।

ফুটবল খেলতে ভালোবাসতাম, এতটাই ভালোবাসতাম যে মাধ্যমিক পরীক্ষা না দিয়ে S.A.I এর টুর্নামেন্ট খেলতে যাবো ঠিক করেছিলাম, সিলেকশনের হওয়ার মূহুর্তেও এতটা আনন্দ হয়নি, সত্যি কথা বলতে পৃথিবীতে আর যা কিছু, প্রথমবার ভোরবেলা কাঞ্চনজঙ্ঘার উপর সূর্যের প্রথম ছটা, প্রথমবার তাজমহল চোখের সামনে দেখা,  কোনো বুনো ঝর্ণার নীচে কোনকিছু না ভেবে নেমে যাওয়া, প্রথমবার কোনো পাহাড়ি নদীতে সাঁতার কাটা আরো অনেক কিছুর চেয়েও অনেক অনেক বেশি আনন্দ। ছোটবেলা থেকে আজ অব্দি অনেকগুলো টুকরো টুকরো ঘটনা বায়োস্কোপের ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে উঠছিল, মাঝখানে আরো দশ বারো মিনিট কেটে গেছে, তারপর ঠিক পূজার ভোরের শিশির ভেজা শিউলির মতো 'মাফিন' প্রিয়াঙ্কার সাথে আমার সামনে এলো। আমাদের ফুটফুটে মেয়ে 'মাফিন', আমাদের খুশির ক্যালেইডোস্কোপ আমার চোখের সামনে!! নরম তুলতুলে ছানাটাকে তখনই বুকে তুলে নিতে ইচ্ছে করছিল। ৬ই নভেম্বর জগদ্ধাত্রী পূজার দিন, নীচে আমাদের মা বাবা, গোটা পরিবার অপেক্ষা করছে  কতক্ষণে মাফিন কে দেখবে! প্রিয়াঙ্কার তখনও চোখগুলো বুজে আসছে,  তাও ঠোঁটের কোণে হাসি...