Wednesday, April 19, 2023

নিমাসরাই

এখানে কালিন্দ্রী, মহানন্দার সাথে এসে মিশেছে। সরু একফালি অগভীর নদী কালিন্দ্রী । যেমন হয় আর কি গ্রাম বাংলার নদী। সেই কিশলয় বইয়ের ছবির মতো। শান্ত গ্রামের পাশ দিয়ে এঁকে-বেঁকে যেতে যেতে দুম করে টাল সামলাতে না পেরে  মহানন্দার বুকে এসে পড়েছে। পাঁচশ বছর আগে ঐ সঙ্গমস্থলের দুপাশে দুটো বড় নগরী ছিল। যেমন লেখা থাকে ইতিহাসের পাতায়। রাজা , বাদশাহ, সুলতানদের ঝলমলে দুটো নগরী। সেখান থেকে রেশমী সুতোর কাজ ঐ নদীপথ ধরেই আশে পাশের রাজ্য ছাড়িয়ে দেশ বিদেশে পৌঁছে যেতো। গৌড় আর পান্ডুয়ার ঠিক মাঝখানে দুটো নদীর মিলনস্থলের সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে সুউচ্চ মিনার। আর সেখান থেকেই মিনারের নাম হয়েছে নিমাসরাই ( ফার্সি 'নিম' অর্থ 'অর্ধেক পথ' )।
   
         মিনারের বাইরের দিকে হাতির দাঁত সদৃশ পাথরের অভিক্ষেপগুলো এক বিরলতম স্থাপত্য। এইরকম গড়নের মিনার নাকি গোটা বিশ্বে আর মাত্র দুটো আছে। একটা আকবরের ফতেপুর সিক্রির হিরন মিনার আরেকটা লাহোরের কাছে দারা শিকোহ-র মিনার।

অস্ত্রের মতো বেরিয়ে থাকা পাথরের অভিক্ষেপগুলো কেউ বলে মিনারের সজ্জা আবার কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে ঐ হাতির দাঁতের মতো পাথরে, আগুন জ্বালিয়ে দূরে গৌড় রাজ্যকে বিপদ সংকেত জানানো হতো। কারো মতে ঐ পাথুরে অংশে মশালের মতো আগুন জ্বেলে জলপথের যাত্রীদের দিকনির্দেশ করা হতো। আবার কিছু ইতিহাসবিদ মনে করে ঐ পাথুরে হাতির দাঁতে শাস্তি প্রাপ্ত অপরাধীদের নরমুন্ড ঝুলিয়ে দস্যুদের সতর্কবার্তা দেওয়া হতো। 

পাঁচশ বছর আগে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা নদীর মধ্যে দিয়ে দুই বানিজ্য নগরীর যাত্রীরা, বন্য জন্তু আর জলদস্যুদের ভয় নিয়ে আঁধার রাতে জলপথ পেরোনোর সময়, নিমাসরাইয়ের পাথুরে দাঁতে মশালের মতো আগুন জ্বলতে দেখে রাতের ঠিকানার খোঁজ পেয়ে নিশ্চিন্ত হতো নাকি মানুষের ধড়হীন মাথা দেখে ঐপথটুকু সভয়ে এড়িয়ে যেতো সে ইতিহাসের কোনো দলিল নেই। সেই ইতিহাস কেউ কোনোদিনও জানতে পারবে না। তবে বিদ্যুৎপাতে ক্ষতিগ্রস্ত অর্ধসহস্র প্রাচীন মিনারের সামনে বয়ে চলা নদী জোড়া ঐ ইতিহাস জানে। সন্ধ্যাবেলা যখন মিনারের চারপাশে অন্ধকার জমাট বাঁধে আর দূরে নদীর ওপারে আমবাগানে পিউ কাঁহা ডেকে ওঠে, তখন চুপ করে শুনলে সেই ইতিহাস শুনতে পাওয়া যায়। 

— অভিষেক বোস

#World_Heritage_Day 18th April, 2023
International Day for Monuments and Sites

(গৌতমদা একদিন দুম করে ডেকে নিমাসরাই আর মালদার অচেনা, অজানা পাতাগুলো দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল। সেদিন আমবাগানের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে সত্যিই পিউ কাঁহা দেখেছিলাম।)

Saturday, April 1, 2023

তারাদের কথা - ৪

(চাঁদের দেশে)

কিশলয় বেলায় মনে হতো চাঁদ আমার সাথে চলছে। আমি থামলে থামছে। আমি চলতে শুরু করলে, আমার পিছু করছে। 
                   ___________________

পৃথিবীর মাটিতে দাঁড়িয়ে যা কিছু খালিচোখে দেখা যায়, চাঁদ তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চিত্তগ্রাহী। 
বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে কেমন একটা ভাবুক বানিয়ে ছাড়ে। লোকে কবিতা-টবিতা লিখে ফেলে। গানের কলি গুনগুনিয়ে নেয়। তারপর একদিন জানতে পারে চাঁদের শুধু একটা দিকই আমরা দেখতে পেয়েছি! 

গত সপ্তাহের রাতে আরো একবার বুঝলাম যে মানুষ আসলে 
নরম-সরম মনের আবেগপ্রবণ প্রাণী । চাঁদের ঠিক নীচে শুক্র গ্রহকে দেখে সবাই কেমন অসময়ে খুশি হয়ে উঠল! পয়সা দিয়ে কিনতে হয় না এমন আনন্দ ছাড়া মানুষ সব খুশিকেই ভাগ করে নিতে চাই। হাজার হাজার লোক , ফেসবুকে কাঁপা কাঁপা হাতে তোলা অস্পষ্ট ফোটো পোস্ট করল। ফোন করে প্রিয়জনদের একবার ফাঁকা জায়গায় গিয়ে আকাশের দিকে তাকাতে বলল। সে'সব নিয়ে আরেকদল বলল — দ্যাখো, আমরা কিন্তু সবার থেকে আলাদা। আমরা আজ ফোটো পোষ্ট করিনি। আমরা Lunatic নই, চন্দ্রাহতও নই। 

           যাই হোক, দিনের শেষে চৈত্রের সন্ধ্যায় কিছু মানুষ অনেকদিন পর রাতের আকাশের দিকে চেয়ে থাকল। অল্প কিছুক্ষণের জন্য হলেও জাগতিক অভাব অভিযোগ সুখ দুঃখ ভুলে দুম করে খুশি হয়ে উঠল। এটাকেই বোধহয় মহাজাগতিক ঘটনা বলে! 
                            ____________

সবথেকে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব (বৈজ্ঞানিক অনুকল্প) অনুযায়ী, একটা অমঙ্গল, ত্থুড়ি মঙ্গলগ্রহের আকারের একটা গ্রহ সাড়ে চার হাজার কোটি বছর আগে পৃথিবীর উপর আছড়ে পড়ে। অনুকল্পিত 'থিয়া' নামের ঐ গ্রহের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষের পরে মহাকাশে ভাসমান অসংখ্য টুকরোগুলো একসময় জড়ো হয়েই আজকের চাঁদের চেহারা পায়। যদি না হতো!? না হলে হয়তো পৃথিবীটাই অন্যরকম হতো! রাতের আকাশের সবথেকে উজ্জল জ্যোতিস্ক চাঁদ, এই টালমাটাল পৃথিবীকে নিজের অক্ষের উপর থিতু হতে সাহায্য করেছে। ফলে পৃথিবীতে আপাত সুস্থিত জলবায়ু আছে। মাটির পৃথিবী আরো একটু বেশি জীবনের উপযোগী হয়ে উঠেছে। 

                            আর এইরকম পরিবেশ পেয়েই হয়তো মানুষের মতো উন্নত প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে। তারপর সেই মানুষ চাঁদের ছবি এঁকেছে। কবিতা, গান লিখেছে। ফোটো তুলেছে, দূরবীন নিয়ে চেয়ে থেকেছে। এমনকি চাঁদের পাথুরে মাটিতে বিজয় পতাকা গেঁথে দিয়ে এসেছে। কিন্তু এখানেই থেমে থাকেনি। পৃথিবীর মতো মহাকাশের জন্যও লিখিত আইন থাকলেও ( Outer space treaty) সেসবের তোয়াক্কা না করে চাঁদের বুক থেকে Helium-3 তুলে আনার পরিকল্পনা করে চলেছে। পৃথিবীর সমস্ত জ্বালানির উপাদান পুড়িয়ে শেষ করে এবার ভবিষ্যতের জ্বালানির খোঁজে কয়েক দশক পরে আবার নতুন করে একের পর এক চন্দ্রাভিযান করে চলেছে। 

চীন চাঁদের উপর নিজেদের একটা স্থায়ী আস্তানা গড়তে চাইছে (moon base) । ওদের দেশের স্পেস এজেন্সি কিছুদিন আগে রাশিয়ার সাথে এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। আমেরিকাও নিজেদের human base বানাতে চলেছে (Artemis Mission)। আগামী দিনে মহাকাশে আরো দূরে পাড়ি দেওয়ার পরিকাঠামো তৈরি হচ্ছে। 

এই সব কিছুকে হার মানাবে এমন এক পরিকল্পনা, যেটা আমাদের ভাবনার সীমানা থেকেও আরো অনেএএক দূর। যতই বিপুলা পৃথিবী বলি না কেন, আসলে তো ব্রহ্মান্ডের ক্যানভাসে সামান্য একটা নীলচে বিন্দুর থেকে বেশি কিছু নয়। মহাকাশে নিয়মিত ঘটে চলা, একটা গামা রে বিস্ফোরণ পৃথিবীতে পৌঁছলে নিমেষে প্রাণের অস্তিত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। একটা সামান্য গ্রহাণু পৃথিবীর বুক থেকে ডায়নোসরদের প্রজাতিকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিল। ভবিষ্যতেও এরকম প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা প্রবল। এরকম কোনো মহাজাগতিক দুর্ঘটনা যে ঘটবেই সেটাই পৃথিবীর ভবিতব্য! 

               তাই আজ না হোক কাল এই দুনিয়ায় নরম মাটির মায়া কাটিয়ে কোনো অজানা পৃথিবীর পাথুরে মাটিতে পৌঁছে আমাদের মাল্টিপ্ল্যানেটারি স্পিসিস হয়ে উঠতে হবে। যাতে কোনো একটা দুনিয়ায় এরকম দুর্ঘটনা ঘটলেও, আরেকটি দুনিয়ায় মানুষ নামের অসহায় জীব বিলুপ্ত হওয়া থেকে বেঁচে যেতে পারে। 

কিন্তু দ্বিতীয় দুনিয়া খুঁজে পাওয়ার আগেই যদি এরকম কোনো বিপদ নেমে আসে!? সেটা আন্দাজ করেই  জীববৈচিত্র্যের মধ্যে ষাট লাখের বেশি প্রজাতির DNA পৃথিবীর বাইরে সংরক্ষণ করে রাখার কথা ভাবা হয়েছে। আর এই আধুনিক nohas ark এর ঠিকানার নাম 'চাঁদ' । চন্দ্রপৃষ্ঠের মধ্যে খুঁজে পাওয়া প্রায় দুশোর বেশি লাভা ট্যিউব নেটওয়ার্কে থাকবে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের আগামী দিনের ইনস্যুরেন্স। সোলার রেডিয়েশন, ক্ষুদ্র উল্কাপিন্ড, তাপমাত্রার তারতম্যের থেকে রক্ষা পাওয়ার উপযুক্ত, পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, এই লাভা ট্যিউবে সোলার প্যানেলের সাহায্যে মাইনাস একশ আশি ডিগ্রির নীচের উষ্ণতায় সংরক্ষিত থাকবে ভবিষ্যতের প্রাণের ঘুমন্ত বীজ। 

               _______________

শহর থেকে অনেক দূরে যেখানে এখনো চোখ ঝলসানো আলোয় রাতের আকাশ দূষিত হয়ে যায়নি। যেখানে এখনো জোছনা রাতে নরম আলোয় গলি রাস্তা ভেসে যায়। যেখানে মা, ঠাকুমার কোল ঘেষে কিশলয় পাঠ শেষ করে শিশুমন চাঁদের বুড়ির গল্প শুনতে চায় আর রাতের আকাশে দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে— 'এই বুঝি চাঁদ আমার সাথে সাথে চলছে, আমি থামলে থামছে। আমি চলতে শুরু করলে, আমার পিছু করছে।' সে শিশুও একদিন জানতে পারবে চাঁদ আমাদের সবার থেকে, এই পৃথিবীর থেকেও একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে। এইভাবেই সরে যেতে যেতেই একদিন এতো দূরে চলে যাবে যেদিন খালি চোখে আর চাঁদ দেখা যাবে না ! 

—  অভিষেক বোস

1st April, 2023 

বাড়ি থেকে পালিয়ে

তখন মনে হয় পাঁচ ক্লাসে পড়ি কিন্ত 'পড়া-শোনা' নিয়ে আমার উৎসাহ আরো অনেক আগে থেকে। পড়ার ফাঁকে (গল্প) শোনা আর পড়তে পড়তে গড়িয়ে পরায় আমার জুড়ি মেলা ভার। তবে সত্যি সত্যি পড়াও আমি প্রচুর পড়েছি । দ্বিস্তর বই নিয়ে আমার বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে। দ্বিস্তরে বাইরের স্তরে থাকত স্কুলের বই আর ভিতরের স্তরে গল্পের বই। বইয়ের গল্প আর গল্পের বইয়ের মধ্যে ফারাক কোথায়!?

তো সেইবার প্রথম কলকাতা বইমেলা গেলাম, ময়দানে। চারিদিকে শুধু বই আর বই । এত বড় বইমেলায় একটা পছন্দের বই না মেলার কোনো কারণ ছিল না বৈকি, তবু মিলল না! বিপ্লু মামা জিজ্ঞেস করল একটাও বই পছন্দ হলো না!? এদিক ওদিক মাথা ঘুরিয়ে একটা মোটা মতো বই নজরে এলো। প্রায় হাজার খানেক পাতা আর আমার ওজনের এক তৃতীয়াংশ ওজনের বেশ ওজনদার বই। বই নিলে এরকমই নেওয়া  উচিৎ। একটা ভারিক্কী ব্যাপার থাকে, কোনো হালকা চালের বই নয়। পড়তে পড়তে রীতিমতো কসরত করতে হয়। বেশি সময় ধরে থাকলে হাতের পেশী শক্ত হয়ে যায়। হ্যাঁ এরকমই একটা বই আমার চাই!

বিপ্লু মামা তথাস্ত বলে বইটা কিনে দিলো। বইয়ের উপরে লেখকের নামের পর লেখা আছে 'রচনা সমগ্র - অখণ্ড সংস্করণ '। আরো একবার নিশ্চিন্ত হলাম সমগ্র মানে পুরোটা, আধছাড়া নয়। পয়সা যখন দিচ্ছি (মানে বিপ্লু মামা দিচ্ছে) তখন পুরোটা নেওয়াই ভালো। 

আজ ২৫ বছর পরে আমি বলতে পারি এই হাজার পাতার যেকোনো পাতা খুলে, যেকোনো জায়গা থেকে হাজার বার পড়লেও আমার বিরক্তি আসে না।' রিনির প্রেমিকের' লেখা এই বইটা কিনে দেওয়ার জন্য আমি বিপ্লু মামার কাছে বিশেষভাবে ঋণী। 

স্বয়ং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন 

"আমার আন্তরিক বিশ্বাস  ........ এর যে কোনো রচনা পড়িয়াই কাহাকেও হতাশ হইতে হবে না।" 

অথচ সেইসময়ে অর্থকষ্টে ভুগতে থাকা লেখক, অমর কথাশিল্পীর ব্যবহারে মর্মাহতও হয়েছেন। দেনা পাওনার নাট্যরুপ দিয়েছিলেন। 'ষোঢ়শী' নামের সেই নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পর এসে দেখেছিলেন একাধিক দৃশ্যে শিশির ভাদুরি বাবু কিছু পরিবর্তন করেছেন । সেই নিয়ে লিখেছেন 

" যাই হোক, তার জন্য আমার কোনো মাথাব্যাথা ছিল না, নাট্যরুপের জন্য আমার নাম না থাকলেও নয় তেমনটা কিন্তু উক্ত প্রয়াসে আমার অংশ হেতু, কৃতিত্ব গৌরবের কিছুটা না হোক, আংশিক অর্থপ্রাপ্তির কিঞ্চিৎ প্রত্যাশা স্বভাবতই ছিল আমার।" 

শুনতে হয়েছিল " ওর আবার টাকার কি দরকার? মেসে থাকে, ঘর সংসার নেই, ও টাকা নিয়ে কি করবে? "

মালদার রাজপ্রাসাদ থেকে এসে ঐ মেসেই আজীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। বহুকাল আগে একবার এক ব্যাক্তি মেসের ঘরে জঞ্জাল আবর্জনা আর ধূলো দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন ঘরে একটা পাপোষ রাখতে পারেন তো, উত্তর পেয়েছিলেন 
"রাখব একটা পাপোষ। তবে সেটা ঘরের বাইরে নয়‚ ভেতরে। বাইরেটাই তো পরিস্কার‚ রোজ ঝাঁটপাট পড়ে। নোংরা তো ঘরের মধ্যে। তাই ঘর থেকে বেরোনোর সময় লোকজন সেই পাপোষে পা মুছে বাইরে চলে যাবে‚ যাতে বাইরেটা পরিস্কার থাকে।"

ঐ মেস ঘরেই একবার এক সাংবাদিক সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে ঘরের মধ্যে টায়ার, ভাঙা কাঠের টুকরোর জঞ্জাল দেখে বলেছিলেন এই অবস্থা কেন? উনি বলেছিলেন পরিস্কার করে রাখলে মেস মালিক এখানে আর একজনকে ঢুকিয়ে দিবে। নিজের একা থাকার বন্দোবস্ত কে জবরদস্ত করার জন্য এই ব্যবস্থা। মেস মালিক পরে জানতে পেরে বলেছিলেন 'ওঁনার মতো বিখ্যাত লেখক আমার মেসে থাকে এটাই আমার পরম সৌভাগ্য। ঐ ঘরে আমি আর কাউকে ঢুকাবো না।' 

প্রথম জীবনে কবিতা লিখতেন। তারপর গল্প লেখা শুরু। চরম আর্থিক কষ্টের মধ্যে থাকা সেইসব লেখার গল্প করতে গিয়ে লিখেছেন “ প্রেমেন আমার জন্য অনেক  করেছিল। পেষার জন্যই নিছক কলম পেশার দায় থেকে আমায় পুরোপুরি পেশাদার লেখকে দাঁড় করাতে দস্তুরমতো প্রয়াস ছিল তার। প্রেমেনের মতন মিত্র আর হয় না। " 

এই তো কিছুদিন আগে বিখ্যাত কার্টুনিস্ট শ্রী শৈল চক্রবর্তীর সাথে ওনার একটা সাক্ষাৎকার দেখছিলাম। সেখানে অকপটে টিভি চ্যানেলে বলেছেন 'আপনার আঁকা ছবিগুলোর জন্যই আমার একটু নামডাক হয়েছিল।' 

কখনো লিখেছেন তুলনাটা অশোভন হলেও রবীন্দ্রনাথের মতো তারও কাবুলিওয়ালার জন্যই সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ । এক কাবুলিওয়ালার ধার শোধ করতে গিয়েই তাকে রাত দিন লেখালেখি করতে হয়েছে। 

ভাগ্যিস ধার নিয়েছিলেন, নইলে বাংলা সাহিত্যের কত বড় ক্ষতি হয়ে যেতো! 

নিজেকে নিয়ে যা লিখেছেন তার কোনটা ব্যঙ্গ আর কোনটা সত্যি বোঝা মুশকিল। তবে বোঝার দরকার টাই বা কি? 

আমার পরম সৌভাগ্য, আমার প্রিয় লেখক ত্রয়ীরা হলেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখ্যোপাধ্যায় (দ্বিতীয় জনের সাথে একবার একটা সিটের পরে পাশাপাশি সিটে ফ্লাইটে এসেছি) আর তৃতীয় জন মুক্তারাম বাবু স্ট্রীটের মেসের আজীবন বাসিন্দা, যিনি 'বাড়ি থেকে পালিয়ে'  লিখেছিলেন। সেই 'বাড়ি' যেই জেলায় আমি সেখানেই জন্মেছি, বড় হয়েছি.... 

আজ শিব্রাম চকর্ বরতির প্রয়াণ দিবস। 

— অভিষেক বোস 

(আর একটা কথা না বললেই নয় ঐ রচনা সমগ্রটা মোটেও সমগ্র নয়। অগোছালো জীবনে যা কিছু লিখেছেন তার খোঁজ নিজেও রাখেননি। এমনকি আর্থিক দুরবস্থার জন্য প্রকাশকের কাছ থেকে পাওয়া নিজের কপিটাও বিক্রি করে দিয়েছেন। ওঁনার লেখার সমগ্র হয় না, হতে পারেও না। সমগ্র মানে তো শুরু থেকে শেষ। আর শিব্রাম চকরবরতির শুরু আছে শেষ নেই )