Tuesday, June 2, 2020

চায়না চাই না

চাই নিজ নিজ মাল, চায়না চাই না। মানে চায়নার মাল আর চাই না। শুধু নিজে বললেই হবে না, আশেপাশের মানুষদেরও বোঝাতে হবে। তবে চাই আর না চাই, ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই রোজ ডজন খানেক মেসেজ, ফরোয়ার্ড , আর শিক্ষামূলক ভিডিওতে আমার মোটোরোলা মোবাইলের দীর্ঘজীবি স্টোরেজ হ্রস্ব হতে শুরু করেছে। চায়না আমারো চাই না, ইয়ে মানে মন থেকে বলছি। বিশ্বাস করুন আমিও চায়নাকে চাই না, তাই দু একজনের কাছে জানতে চাইলাম ঠিক কি কি বয়কট করা উচিৎ!? কোন্ কোন্ দৈনিক মাল চৈনিক বংশজাত সেটা জেনে নিতে হবে তো নাকি? চীনের আবির, চীনের খেলনা, চীনের প্রাচীর , চীনে বাদাম ( না এটা থাক)!? 

বয়কটের তালিকাতে প্রথমেই আছে VIVO, OPPO মোবাইল, আর TikTok ,তারপরে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক জিনিস, যেগুলো প্রত্যেকটা ছোট বড় শহরের চিনা মার্কেটে, এমনকি আমার নিজের শহর মালদার ছোট ছোট দোকানেও পাওয়া যায় । TikTok এর মতো অপদার্থ অ্যাপ আমি আর দুটো দেখিনি, ওটাকে শুধু বয়কট নয়, আন-ইনস্টল করে 1 স্টার রেটিং দেওয়ার পক্ষে আমার একটি নিঃশর্ত ভোট আমি আগাম দিয়ে রাখলাম। এরপরে বাকি জিনিসগুলো নিয়ে একটু আড্ডা হয়ে যাক। 

বয়কটের জিনিসগুলো আমি পাঁচ ভাগে ভাগ করে নিচ্ছি। একদম প্রথমে সেই জিনিসগুলোকে রাখব যেগুলো ফিনিশড গুড হিসেবে এই দেশে আমদানি হয়ে আসে ( গোদা বাংলায় Made in China), তারপরে রাখব সেই জিনিসগুলো যেগুলো চিনা কোম্পানির ভারতের ফ্যাক্টরিতে স্পেয়ার পার্টস (যন্ত্রাংশ) হিসেবে এসে এখানেই অ্যাসেম্বল্ড্ হয়, এরপরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কোম্পানির প্রোডাক্ট যাদের কন্ট্র্যাক্ট ম্যানুফাকচারার চায়নাতে রয়েছে, এরপরে আসবে আমাদের দেশীয় কোম্পানি, যারা যন্ত্রাংশের বা Key Ingredient এর জন্য চায়না নির্ভরশীল, পরের সারিতে যে সব কোম্পানিতে চাইনার অর্থ লগ্নি অথবা মালিকানা রয়েছে আর সবার শেষে রাখব তাদের, যারা চাইনিজ OEM থেকে মাল কিনে Made in India বলে চালিয়ে দেয়। ( এছাড়াও আছে বিভিন্ন চাইনিজ অ্যাপ, ওয়েবসাইট ,যেগুলোর জন্য আমরা কোনো পয়সা দিই না, যেখানে আমরাই পণ্য) 

প্রথম ভাগের চিনের জিনিসগুলো চিনে নেওয়া বেশ সহজ (!), এই যেমন VIVO , OPPO ।  ঠিক এতটাও সহজ নয়, এই যেমন ধরুন প্রথমদিকে আমার মোটোরোলা স্মার্টফোনের কথা বলেছিলাম, আমেরিকান 'মোটোরোলা' গুগলের হাত ঘুরে এখন চাইনিজ Lenovo র মালিকানাধীন। Lenovo আবার IBM Think Pad এর মালিকানা কিনে এই মূহুর্তে বিক্রির নিরিখে World's largest personal computer vendor (March 2019) ।  এমনকি স্মার্টফোনের মার্কেটেও দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং এর সাথে পাল্লা দিয়ে উঠে আসছে।

(এখনো অব্দি যা কিছু বলা হচ্ছে এগুলো সবই কিন্তু মেনল্যান্ড চায়না - র কথা মাথায় রেখে। পৃথিবীতে দু দুটো চায়না আছে, যারা নিজেদের চায়না হিসেবেই পরিচয় দেয় । এক নম্বরে পিপল্ রিপাবলিক অফ্ চায়না (PRC), যাদের সাথে আমাদের বোঝাপড়া আর দ্বিতীয়টা হলো রিপাবলিক অফ চায়না (ROC) বা তাইওয়ান। প্রসঙ্গতঃ ACER, ASUS, HTC র মতো বহুজাতিক কোম্পানির হেডকোয়ার্টার ROC তে আর সাথে রয়েছে FOXCON এর মতো বিশ্বের সবথেকে বড় ইলেকট্রনিক ম্যানুফাকচারার আর তৃতীয় বৃহত্তম টেকনোলজি কোম্পানি । FOXCON এর তালিকায় কি নেই! Blackberry, iPad, iPhone, iPod, Nokia, Xiomi, Kindle, Playstation, XBox এর মতো প্রোডাক্ট FOXCON এ তৈরী হয়। যাইহোক আমাদের বোঝাপড়াটা যেহেতু রিপাবলিক অফ চায়না-র সাথে নয় তাই আপাততঃ আর এদিকে এগোচ্ছি না।)

দ্বিতীয় ভাগে আছে সেইসব প্রোডাক্ট, যেগুলো যন্ত্রাংশের আকারে এসে ভারতে তৈরী হয়। চীনের সবথেকে বড় চালাকি যে ওরা বিভিন্ন দেশের আবেগ, অনুভূতিগুলো অনেক আগে ধরে ফেলতে পেরেছে। Motorola, Xiomi, Lava র মতো স্মার্টফোন কোম্পানিগুলো বহুদিন ধরে ভারতের মাটিতে ম্যানুফাকচারিং শুরু করে দিয়েছে আর এই ফ্যাক্টরিগুলোতে কয়েক হাজার ভারতীয় কর্মী প্রত্যক্ষ ভাবে কাজ করছে। ভারতের ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সমাদৃত হলেও চীনের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে রয়েছে। Active pharmaceutical ingredients (biologically active component of a drug product) এর একটা বড় অংশ চায়না থেকে আসে। গত আর্থিকবর্ষে ভারতে যত Bulk Drug আমদানি হয়েছে তার ৬০ শতাংশের বেশি এসেছে চীন থেকে, এছাড়াও ভারতের ব্যপক হারে চায়নার অ্যান্টিবায়োটিক আমদানি হয়ে থাকে। মানে হতেই পারে আপনি, আমি যেই ওষুধগুলো খাচ্ছি তার Active Pharmaceuticals Ingredient অথবা পুরো ওষুধটাই হয়তো চায়নাতে তৈরী। 

এরপরে আসবে চীনাদের সবথেকে বড় শক্তি চাইনিজ OEM ( Original Equipment Manufacturer) । শুধু স্মার্টফোন নয়, বিশ্বের তাবড় তাবড় কোম্পানির মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট (ভেন্টিলেটর, আল্ট্রাসাউন্ড, পেশেন্ট মনিটর, বায়োকেমিস্ট্রি আরো অনেক কিছু ) এর একটা বড় অংশ চায়নাতে তৈরী হয়। আমার চাকরির সুবাদে যতটুকু দেখেছি বা বুঝেছি বড় শহরের বড় বড় কর্পোরেট হাসপাতালগুলো বাদ দিলে, পাঁচ এর মধ্যে তিনটে প্রাইভেট /সরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোমে হয় চাইনিজ আর নয়তো চীনের যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি ইক্যুইপমেন্ট আছে। আর শুধু মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট কেন অটোমোবাইল, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিয়ারিং এমনকি আপনার আমার বাড়ির স্মার্ট / আনস্মার্ট টিভিগুলো অব্দি বেশিরভাগ চায়নাতেই অথবা চায়নার প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে তৈরী। 

চীনের অর্থলগ্নি। Big Basket, Byju’s, Flipkart, Hike, MakeMyTrip, Ola, Oyo, Paytm, Paytm Mall, PolicyBazzar, Quikr, Snapdeal, Swiggy, Zomato, Gland Pharma কয়েকটা নাম যেখানে চীনের বেশ বড় ধরনের অংশীদারি আছে। আপাতভাবে দেশী এই জনপ্রিয় কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ চীনে চলে যাচ্ছে আবার এইসব কোম্পানির সাথে ভারতের কয়েক লক্ষ অথবা কয়েক কোটি পরিবার প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে। 

BMW, Ford, Fiat, Honda, Hyundai, Mitsubishi, Renault, Suzuki, Toykta, Volkswagen, Mercedesg-Benz এর মতো অটোমোবাইল কোম্পানিগুলোর চীনের সাথে Joint Venture আছে অথবা সাম্প্রতিককালে ছিল। 

এইসব তো আছেই, শুনলে হয়তো বিশ্বাস হবে না চীন এখন ভারতে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান থেকে শুরু করে Nuclear Reactor হয়ে এক্কেবারে পূজোর ঘর অব্দি পৌঁছে গেছে। বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি, ফোটোর যে বিরাট বাজার রয়েছে, চীনারা তাতেও থাবা বসিয়েছে। 

কি মনে হয়, এই যে এত এত দেশের নামজাদা কোম্পানি কয়েক দশক ধরে চীনের সাথে বানিজ্যিক সম্পর্ক বাড়িয়ে তুলেছে সেগুলো কি চীনাদের ভালোবেসে? এদের অনেকেই জানে চীনের সাথে দ্বিপাক্ষিক বানিজ্যে কি ধরনের ঝুঁকি আছে! তারপরেও ইউরোপ, আমেরিকার বড় বড় কোম্পানিগুলো চীনের সাথে গাটছাড়া বেঁধেছে, এমনকি আমেরিকার মতো দেশ নিজেদের পেনশন ফান্ড চায়নাতে বিনিয়োগ করেছে। চীন একটা দুর্বোধ্য দেশ, সবকিছুতে লাগাম, ব্যক্তি স্বাধীনতা যেখানে Error 404, চীনের মিডিয়া এতটাই সরকার নিয়ন্ত্রিত যে পৃথিবীর বাকি দেশগুলো জানতেও পারে না চীনে কি চলছে কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে চীন নিজেকে যেভাবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে তাতে করে এই মূহুর্তে চীনকে বয়কট করা দূরে থাক, প্রয়োজনে চীন বিশ্বকে থমকে দিতে পারে।  মনে রাখতে হবে সরকারিভাবে বিবৃতি দিয়ে ব্যান নয়, জনগন স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে বয়কটের ডাক দিয়েছে। এর আগেও বহুবার বয়কট হয়েছে, বিগত দীপাবলির সময় যে বয়কট হয়েছিল তার পরেও  ৩২০০ কোটি টাকার চিনা মাল বিক্রি হয়েছে। আসলে আমরা অনেক সময় জানতেই পারিনা কোনটা চীনের আর কোনটা নয়। আবার অনেক সময় কোনো বিকল্পও থাকে না বা থাকলেও হয় তার গুনমান ভালো নয়, আর নয়তো দাম অনেক বেশি। চীনের শিকড়টাতে গোটা বিশ্বের বড় বড় দেশগুলো জল ঢেলে এত গভীরে পৌঁছে দিয়েছে যে এখন উপড়ে ফেলতে গেলে অনেক সময় ধরে চেষ্টা করে যেতে হবে, আর উপড়ে ফেলতে গেলে নিজের নিজের বাড়ির ভিতেরও ক্ষতি হবে। 

COVID-19 এর পরে ভারতের কাছে একটা সুযোগ এসেছে চীনের পরিবর্ত হিসেবে উঠে আসার। ভারতের মাটিতে ম্যানুফাকচারিং শুরু হলে একটা ভারসাম্য তৈরী হবে কিন্তু মনে রাখতে হবে বেশিরভাগ সংস্থাগুলো মহামারীর জন্য মূলধনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছে সুতরাং কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তারা খুব সতর্ক থাকবে। ভারতে 'ল্যান্ড-ব্যাঙ্কের' সমস্যা না থাকলেও উৎপাদন আর সরবরাহের সংযোগটা দুর্বল। 

চীনের একাধিক শিল্পাঞ্চলে আন্তর্জাতিক মানের বিমান আর সমুদ্রবন্দর, সড়ক যোগাযোগ, পরিবহন এত অত্যাধুনিক যে ভারতে ঐ ধরনের পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একটা দশক লেগে যাবে। আমার কোম্পানির একজন ব্রিটিশ ডিরেক্টর ২০১৮ তে কলকাতা এসেছিল, রুবি বাইপাস থেকে রাজার হাট নিউটাউনের রাস্তায় যেতে যেতে বলছিল, 'ইন্ডিয়া সত্যিই এগিয়ে আসছে অভিষেক , আমি যখন ৯০-৯৫  এ চীনের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতাম, তখন ঠিক এইভাবেই চীন উঠে আসছিল। প্রচুর বড় বড় বিল্ডিং, অফিস, চওড়া রাস্তা তৈরি হচ্ছে, চারপাশটা ঠিক এইভাবেই বদলে যেতে দেখেছি। ' আমি বুঝলাম আসল বক্তব্যটা হলো আমরা চীনের থেকে ২০-২৫ বছর পিছিয়ে রয়েছি। 

ভারতের ছোট থেকে ছোট গলি থেকে শুরু করে ভারী শিল্প অব্দি চায়নার অবাধ যাতায়াত থাকলেও, চীন যত টাকার রফতানি ব্যাবসা করে, তার মাত্র ৩% এর কাছাকাছি ভারতে রফতানি করে বাকি ৯৭% এর জন্য চীনের কাছে ভারতের বাইরে বাজার রয়েছে। আমাদের দেশের জনসংখ্যা যত বিশাল হোক না কেন চীনের বহির্বানিজ্যের ব্যাপ্তি তার থেকে অনেক অনেক বড়, উল্টো দিকে ভারত থেকে চীনে রফতানির পরিমান ৬% এর কাছাকাছি ( যদিও Trade Deficit টা বিরাট অঙ্কের) 

আমাদের দেশে মেধার অভাব নেই  ,পরিশ্রমী শ্রমিকেরও অভাব নেই, তবে চীনের মতো Skilled আর Trained Labour এর কিন্তু অভাব আছে। চীনের সাথে চোখে চোখ রেখে বিশ্ববানিজ্যে উঠে আসতে এলে আমাদের অনেক কিছু Unlearn আর Relearn করতে হবে । উল্টোদিকে দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান এ এধরনের পরিকাঠামো আর মানবসম্পদ তৈরী আছে। 

বছর খানেক আগে চীনের মিডিয়া ব্যঙ্গ করে ভারতকে উপদেশ দিয়েছিল চীনের সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড়তে হলে আর বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হলে ভারতকে '996' জানতে হবে। 996 'Jack Ma' র একটা বিতর্কিত Tough Overtime Work Schedule, যেখানে সকাল ৯ টা থেকে রাত ৯টা অব্দি, সপ্তাহে ৬ দিন কাজের জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। 

এখানে যে কোম্পানিগুলো আসবে তারা তো শুধু উৎপাদনের জন্য আসবে না তাদের চাই একটা বিরাট বাজার, ভারতের সাথে বিভিন্ন দেশের অস্থিতিশীল রাজনৈতিক সম্পর্কও বিশ্বব্যাপী বহুজাতিক কোম্পানিদের জন্য আমাদের দেশ প্রথম পছন্দ না হওয়ার আরেকটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। গত বছর নয়া দিল্লী এশিয়ার ১২ টি দেশের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি থেকে সরে এসেছিল (RCEP) , এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলি দেশের জন্য ভালো না খারাপ  সেটা তর্কসাপেক্ষ কিন্তু শুল্কমুক্ত রফতানির পরিপন্থী। 

আবেগ দিয়ে ভাবলে হয়তো আমরা অনেক এগিয়ে আছি, সত্যি সত্যি এগিয়ে আসতে গেলে অনেক সময়ের প্রয়োজন, আমরা নিজেরা খুব ভালো করে জানি আমরা ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। বয়কট করার আগে বিকল্পগুলো তৈরি রাখতে হবে, নইলে চীনের তৈরি Boycott China টি-শার্ট পড়ে চীনের মোবাইলে ' অচিন ' আন্দোলন চলতে থাকবে। 

- অভিষেক বোস

No comments:

Post a Comment