Tuesday, March 17, 2020

SARS-CoV-2 আর আমরা

Disclaimer : আমি COVID-19 বিশেষজ্ঞ নই, কিছু জানতে হলে WHO, CDC, MoH এর Website আর পরিচিত ডাক্তারদের থেকে জেনে নিই)

একটু বড় লেখা তাই ধৈর্য্য ধরে পুরোটা না পড়তে পারলে, অর্ধেকটা পড়ে সময় নষ্ট করবেন না।

লেখার কোনো অংশের সাথে আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা মিলে গেলে সেটা নেহাতই কাকতালীয়। কোনো বিশেষ কাউকে উদ্দেশ্য করে কিছু লিখিনি বরং একটু সচেতন করার জন্য লিখেছি।

কোনো sensational গল্পের আশা থাকলে একটু নিরাশ হবেন।)

ইতিহাস সাক্ষী আছে যখনই এদেশে কোনো বড় ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটেছে তখনই আমরা উৎসব শুরু করে দিয়েছি। কাব্যি করেছি, মিম্ বানিয়েছি, ছ্যাবলামো করেছি আর গুজব ছড়িয়েছি। Covid- 19 একদিন তার শক্তি কমিয়ে হয়তো কোনো ঝালমুড়ির ঠোঙার নিচের খবর হয়ে থেকে যাবে কিন্তু বাকি অসুখগুলোর কি করবেন? এই অসুখগুলো আমাদের অস্থি মজ্জায় ঢুকে গেছে। আর এইজন্য বিন্দুমাত্র খোঁজ না নিয়ে পোস্ট হয়ে যাচ্ছে 'Dean Koonz নামের এক লেখক তার Eyes of Darkness এ সেই কবে লিখে গেছিলেন People's Republic of China তার গরীব জনসংখ্যার উপর করোনা ভাইরাসের জৈব মারনাস্ত্র প্রয়োগ করবে, তিনশ অমুক নম্বর পাতায় Wuhan - 400 শব্দটা চকচক করছে।' যেই জানতে পারলেন অমনি আমার হাত লকলক করতে শুরু করল, এবারে ছড়িয়ে দিতে হবে, নইলে করোনা-সমাজে আপনার নামযশ হবে কি করে? সামান্য একটু সময় খরচা করলেই জেনে নিতেন মূল বইয়ে নামটা Gorki-400 ছিল, (রাশিয়ার পটভূমিতে লেখা) । ঠান্ডা যুদ্ধের পরে যখন রাশিয়ার পরিবর্তে নতুন শত্রু দেশ হিসেবে কম্যুনিস্ট চিন উঠে আসছে তখন এই নামটা পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু আপনার কাছে এতো সময় কোথায়? সময় এত কম যে কেউ কেউ Sylvia Browne এর End of Days এর Screenshot দিয়ে Dean Koonz এর তত্ত্ব ঝেড়ে দিয়েছে। এতো গেল সাহিত্য, এরপরে আসবে কাব্যি

'করোনা তুমি ওদের ক্ষমা কোরোনা
যারা বাদুর খেয়েছিল তাদের তুমি ছেড়োনা
তবে আমরা সব ছাগল মুরগি বেগুন খেকো
আমাদের ভুল করে মেরোনা।'

[©অভিষেক বোস ১০৮ symbol দিয়ে কোনো সত্বাধিকার জানালাম না, এ কবিতা করোনা সমাজের Whatsapp Group এ দায়িত্ব নিয়ে ছড়িয়ে দিন]

ইত্যাদি ইত্যাদি সব জ্বালাময়ী কবিতা।

সিনেমা আর সাহিত্য হাত ধরাধরি করে চলবে, এটাই নিয়ম ।তাই  কি করে আগে থাকতেই COVID-19 এর প্রেক্ষিতে 2011 সালে 'Contagion' সিনেমাটা আমাদের জ্ঞানচক্ষু খুলে দিতে এসেছিল সে নিয়েও একটা পোস্ট দেওয়া যেতেই পারে। Hollywood এ Bio Weapon conspiracy theory নিয়ে 500 মুভি রয়েছে কিন্তু আমাদের কাজ হলো জোর করে এর সাথে COVID-19 কে গুলিয়ে একটা রোজ সিরাপ তৈরি করা, যেটা খেতে সুস্বাদু, সুগন্ধি আর বেশ রঙচঙে হবে।

সিনেমায়  crowd psychology, mass hysteria    এগুলোও ছিল, সেগুলো নিয়েও না হয় একটু আলোচনা হোক। '2012' সিনেমায়  People's Republic of China বিশ্বের ত্রাতা হিসেবে এসেছিল, Ark তৈরী করে মানুষ আর পৃথিবীর জীব বৈচিত্র্যকে নিশ্চিন্ন হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে নিয়েছিল । আর একজন ভারতীয় বিজ্ঞানী যে এই বিপদের পূর্বাভাস দিয়েছিল সেই বিজ্ঞানী আর তার পরিবার সমেত গোটা ভারত জলের তলায় তলিয়ে গেছিল। (দেখে নিন আগে থাকতে যদি কোনো ব্যবস্থা করে রাখতে পারেন! আপনি তো আবার বিজ্ঞানীও নন)। এই মূহুর্তে চিন আপনার এক নম্বর শত্রু তাই চিনের সবকিছু বয়কট করতে হবে। তালিকায় কি নেই! চীনের আবির, চীনের খেলনা, চীনের প্রাচীর, চীনে বাদাম এমনকি চীনের ওষুধ  ( এই ফাঁকে একবার Google search করে Chinese Bulk Drug নিয়ে একটু জেনে নিন)।

পরশু শুনলাম COVID-19 Virus নাকি ফুসফুসে ঢোকার আগে তিনদিন গলায় ঘাপটি মেরে বসে থাকে  তাই গরমজলে লেবু অথবা লবন জলে গার্গল করলেই ভাইরাসের খেল খতম। নিয়মিত জল খেলেও COVID-19 আপনার ধারে কাছে আসবে না (Viral replication, immune hyperreactivity and pulmonary destruction এই তিনটে Stage তখন মাথায় বনবন করতে শুরু করল)। জল খাওয়ার নিজস্ব উপকারিতা রয়েছে কিন্তু এই তথ্যটা কে দিল? এ তো মনে হচ্ছে সেই পার্লারে গিয়ে যেকোনো সমস্যার কথা বললেই যে উত্তরটা পাওয়া যায় ঠিক তার মতো "গোল্ড ফেশিয়াল করে নিন, সব ঠিক হয়ে যাবে"। জানতে চাইলাম কোত্থেকে জানলে? উত্তর এলো UNICEF থেকে বলেছে। দেখাও দেখি!  দেখলাম একটা সস্তার লেটারহেডে কোনো এক ছাত্রাবাসের নোটিস আর তার নীচে  bold এ 'Unicef' type করা হয়েছে।

প্রতিদিন আমি জানতে পারছি ঠিক ঠিক কি কি করলে আমি ভাইরাস আক্রান্ত হব না। (লম্বা লিস্ট ধৈর্য্য ধরে রাখতে হবে)  রসুন, আদা, লেবু, সৈন্ধব লবন, মেয়োনিজ, ভেজ বার্গার, ইটের গুড়ো, পাথরের সন্দেশ, পঞ্চ গব্য, গো মূত্র, নামাজ পাঠ, যোগাসন, মাদুলি, বাবাদুলি, তাবিজ কবজ, ব্যাটারি, Go Kyarona আবৃত্তি মানে খাদ্য, অখাদ্য, কুখাদ্য, পদার্থ, অপদার্থ সব কিছুতেই সেই গুনাবলী বিদ্যমান। তবে প্রতিবারের মতো এবারো ব্রয়লার মুরগি থেকে দূরে থাকতে হবে, ৭৫০ টাকা কেজি খাসির মাংসে কিন্তু ঔষধি গুন লেজ থেকে ক্ষুর অব্দি আছে।

ভারতের উপর দিয়ে যাচ্ছে আর একটু সংস্কৃতি কচলাবো না। অতএব আমার ইনবক্সে প্রতিদিন জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে করোনার বাজারে কিভাবে হিন্দু সংস্কৃতি গোটা বিশ্বে সমাদৃত হচ্ছে। বড় বড় রাষ্ট্রনেতারা কিভাবে করমর্দনের বদলে নমস্কার বেছে নিয়েছে, ভাবা যায় কি প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা আমাদের! দু একজনকে উত্তর দিলাম পা'এ হাত দিয়ে প্রনাম করা, হরির লুটের বাতাসা রাস্তা থেকে কুড়িয়ে খাওয়াটাও কিন্তু আমাদের আর তাছাড়া 'নমস্কার' হিন্দু নয় ভারতীয় সংস্কৃতি! তাতে দুকথা কুকথা শুনতে হলো। আমাদের সংস্কৃতির অনেক অনেক কিছু নিয়ে গর্ব করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে কিন্তু এইভাবে জোর করে 'UNESCO র বিচারে আমরাই সেরা' প্রচারের লাইনে আমি নেই।

সার্জিকল মাস্ক, N95, N90, 3 ply, 4 ply, micron, filter নিয়ে যেধরনের প্রকৃত শিক্ষা আমি প্রত্যেকদিন  পেয়ে চলেছি, ১৪ বছর Medical Equipment এ চাকরি করেও আমার হয়নি। কাল যখন মালদা থেকে ট্রেনে ফিরছিলাম তখন প্রায় আদ্ধেক লোকের মুখে কাপড় ( হ্যাঁ কাপড়, ন্যাকড়াও হতে পারে), আর 'প্রায় বাকি' আদ্ধেকের মুখে মাস্ক /রেসপিরেটর। এসি কামরাতে এই ছেলেভোলানো মাস্ক পড়ে কি কাজে লাগবে ভাবছি আর সামনের ভদ্রলোক আমাকে কড়া চোখে স্ক্রিনিং করছে, যেন এক্কেবারে Mobile Digital Flat Panel Detector Radiography । এই যখন ঘুমোতে যাব তখন দেখলাম ভদ্রলোক (!!) মুখের ন্যাকড়া খুলে গুটকা চিবোতে শুরু করল। ততক্ষণে বাকিরাও মাস্ক খুলতে শুরু করেছে, মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করলাম কোনো Safety Announcement হলো কি না  " দয়া করে ধ্যান দিন, এখন রাত এগারোটা, সমস্ত ভাইরাস ল্যাদ খেয়ে শুয়ে পড়েছে। ক্যাপ্টেন মাস্ক খুলে ফেলার সংকেত দিয়ে দিয়েছে।" না! কোথাও কিছু নেই ॥ "সঞ্জিত দার লেখা 'মহারাষ্ট্রের কৃষি মেলার' সোলার ইনসেক্ট রেপেল্যান্ট মনে পড়ে গেল, যা সন্ধ্যে থেকে সাড়ে তিন ঘন্টা কাজ করে, কেননা ওই সময়েই ক্ষতিকর পোকারা ভিড় করে, তার পরে আসে উপকারী পোকার দল।" সেরকমই একটা কিছু হবে হয়তো ভেবে ঘুমোতে গেলাম।

আচ্ছা বলুন তো এই মাস্ক পড়ার উপদেশটা কোত্থেকে পেলেন?  নাকি সবাই কিনছে তাই আপনাকেও পড়তে হবে? Health Organization গুলো যেখানে প্রথমদিন থেকে বলে আসছে যে আপনি নিজে অসুস্থ অথবা অসুস্থ হওয়ার লক্ষন না আসা পর্য্যন্ত মাস্ক পড়ার প্রয়োজন নেই তাও কালোবাজারি করার সুযোগ করে দিলেন। যদি একটু সময় নিয়ে বিশ্বাসযোগ্য Website এ গিয়ে Precaution গুলো দেখতেন তাহলে জানতে পারতেন অকারণে মাস্ক পড়ার কিছু বিপদও রয়েছে, যেমন অনভ্যাসের কারনে বার বার মুখে হাত দিয়ে মাস্ক ঠিক করার প্রবনতা। এছাড়াও এগুলো আদৌ কতটা কার্যকরী সেটা আপনি Whatsapp থেকেই জেনেছেন। Whatsapp এই যখন এত বিশ্বাস তখন নিশ্চয়ই ডঃ সব্যসাচী সেনগুপ্তের Cough Etiquette,  Basic Hygiene, Myth আর Fact  পড়ে ফেলেছেন , তো সেগুলো মেনে চললেই তো হতো। হারুর চা এর দোকানে আড্ডা মারতে গিয়ে যেগুলো শুনে এলেন সেই গুজব ছড়ানোর কি খুব বেশি প্রয়োজন ছিল? আমার চার মাসের বাচ্চা বাড়িতে রয়েছে, হ্যান্ড স্যানিটাইজার কিনতে গিয়ে জানতে পারলাম এখন লোকে ঝোলা গুড়ের মতো স্যানিটাইজার খাচ্ছে। কুড়ি ত্রিশটা করে বোতল কিনে নিয়ে গেছে। ম্যারিনেট করার সময় স্যানিটাইজার ঢেলে দিচ্ছে। 

এর মধ্যেও কিছু ভালো খবর আছে। কলকাতায় যে হাউসিং কমপ্লেক্সে আমরা থাকি, সেখানকার দায়িত্বশীল মানুষরা এগিয়ে এসে করোনাভাইরাসের আক্রমণ রুখতে কিছু স্টেপ নিয়েছে। প্রায় দুশো চোদ্দটা অ্যাপার্টমেন্ট এই কমপ্লেক্সে, বিভিন্ন মেডিক্যাল অ্যাডভাইসরি পড়ে আর আবাসিক ডাক্তারদের কাছ থেকে শুনে ও অনান্য ডাক্তারবাবুদের সাথে কথা বলে  সিকিউরিটি আর হাউসকিপিং-এর লোকেদের জন্য অ্যাওয়ারনেস সেশন করে চলেছে  । তাঁদের জানিয়েছেন , তাঁরা যেন নিজের নিজের বাড়িতে, নিজের পাড়ায়, সেসব কথা সব্বাইকে শোনান ।

আবাসনে তিনটে গেট । তিনটে গেটেই সাবান  জল রাখা হয়েছে। আজ 17 তারিখ থেকে আবাসনে ঢুকতে গেলে অন্ততঃ কুড়ি সেকেন্ড ধরে সাবান-জলে হাত ধুতেই হবে । আবাসনের বাসিন্দা, নিরাপত্তারক্ষী, আমাদের ডোমেস্টিক হেল্প, হাউস-কিপিং এর লোকজন এবং অবশ্যই বাইরে থেকে আসা যে কেউ, তাঁদের গাড়ির চালক এই নিয়ম সবার জন্যই প্রযোজ্য। এছাড়াও বাচ্চাদের Hand Wash Protocol শেখানো, অকারনে মাস্ক না পরার জন্য ছোট ছোট ভিডিও শুট করে Group এ পাঠানো হচ্ছে। উদ্দেশ্য আমাদের সাথে সাথে আমাদের আশপাশের মানুষগুলোও যেন সুস্থ থাকে। নইলে যেখান থেকে শুরু সেখানেই এসে মিশে যাবে।

(আবাসনের এই অংশটা আমি সঞ্জিত দার লেখা থেকেই ছোট্ট করে লিখে দিলাম)

আর উল্টো দিকে এমন মানুষের সাথেও দেখা হচ্ছে যারা বেশ উৎসাহের সাথে জানাচ্ছে এপ্রিল মাসে গরমটা পড়লেই করোনা ফরোনা সব শেষ হয়ে যাবে। এই গল্পটা কে বলল? World Health Organization কিন্তু অন্য কথা বলছে

"COVID-19 virus can be transmitted in areas with hot and humid climates

From the evidence so far, the COVID-19 virus can be transmitted in ALL AREAS, including areas with hot and humid weather. Regardless of climate..."

(link :https://www.who.int/emergencies/diseases/novel-coronavirus-2019/advice-for-public/myth-busters)

কোনটা গাঁজাখুরি আর কোনটা সত্যি এটা বোঝার জন্য বিরাট গবেষনা করতে হয় না, শুধু একটু সময় খরচা করে বিশ্বাসযোগ্য website এ ঢুঁ মেরে আসলেই হয়, বা একবার Cross Check করে দেখলেই হয়, তাও সম্ভব না হলে পরিচিত ডক্টর /বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বললেই চলে, এখন অনেক Fact Check Website ও আছে কিন্তু Fake News Virus আপনার Cellular level এ পৌঁছে গেছে তাই COVID-19 গরম  না পড়লেও একদিন বাসি খবর হয়ে যাবে তবে আপনার রোগটা এর থেকেও বেশি মারাত্মক।

যত্ন নিন নইলে জিনে ছড়িয়ে পড়বে।

- অভিষেক বোস

(কিছু ব্যাকরণগত ভুল রেখে দিলাম, Copy র Paste  করতে হলে শুধু আমার নামটা না, ভুলগুলোও ঠিক করে নিবেন)

No comments:

Post a Comment