কয়েকদিন আগে রাতে আমার মাখনের গোলাটার খাওয়ার তৈরী করে আনতে একটু দেরী হয়ে গিয়েছিল, গোলা ততক্ষণে রাগের প্রথম পর্ব দেখানোর প্রস্তুতি নিতে শুরু করবে, আর ঠিক তখনই খাওয়ার হাজির। আমি 'আ গ্যায়া, আ গ্যায়া, হালুয়াবালা আ গ্যায়া' গানটা গাইতে গিয়ে বুঝতে পারলাম গানের লিরিক জানি না। এদিকে অখাদ্য কুখাদ্য সব গানের লিরিক মনে থাকলেও ছোট্ট বেলার এই গানের লিরিক আমি ভুলে যাইনি, জানিই না। ইউটিউব এ গানটা সার্চ করতে গিয়ে কমেন্ট এ দেখলাম সব রাশিয়ান এ লেখা ( কি করে বুঝলাম রাশিয়ান!? মালদাতে একবার সেকেন্ড ডিভিশন ফুটবলহ লীগে গোয়ার ডেম্পো স্পোর্ট ক্লাবের হয়ে কয়েকজন উজবেকিস্তানি ফুটবলার এসেছিল, তাদের মধ্যে মিকোলো শেভচেঙ্কো বলে একজনের সাথে বেশ দোস্তি হয়েছিল, ওর কাছ থেকেই আধো আধো শিখেছিলাম), লিরিক ভুলে গিয়ে ততক্ষণে আমি কমেন্ট ঘাটতে শুরু করেছি, পাঁচ-সাতটা নয়, সাতশো কমেন্টের বেশিরভাগ কমেন্টই রাশিয়ান, আর তাতে বারবার জিমি লেখা। সুতরাং কোনো রুশি ভুল করে কমেন্ট করেনি, আর আমাকে এবার জানতে হবে কেন
এতদিন জানতাম সোভিয়েত ইউনিয়নে সবথেকে বেশি জনপ্রিয় ভারতীয় রাজ কাপুর, কিন্তু জিমি তার থেকে অনেক এগিয়ে। ১৯৮২ তে ডিস্কো ডান্সার এর সময় থেকে জিমি মধ্যবিত্ত রাশিয়ানদের ঘরে পৌঁছে গেছে। ভারতীয়দের মিঠুন চক্রবর্তী, রাশিয়ানদের কাছে জিমি।
আশির দশকের শেষে ইউএসএসআর নেতা মিখাইল গর্বাচেভ যখন ভারত সফর করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী অমিতাভ বচ্চনকে দেখিয়ে বলেছিলেন ' ইনি ভারতের সবথেকে বড় সুপারস্টার', গর্বাচেভ জবাব দিয়েছিলেন: " আবার বৌ শুধু রাজ কাপুরকে চেনে আর আমার মেয়ে শুধু মিঠুনকে।"
ডিস্কো ডান্সার এর পরিচালক বি সুভাষ মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ডিস্কো ডান্সার স্ক্রিনিং নিয়ে খুব বেশি উৎসাহী ছিলেন না , তখন ফিল্ম ফেস্টিবভ্যালে ' দো বিঘা জমিনের মতো বাস্তববাদী আর সমান্তরাল সিনেমাগুলো যেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতো, সেখানে ডিস্কো ডান্সার নিয়ে স্মিতা পাতিল ও অস্বস্তি বোধ করছিল । বিকেল তিনটায় এক বিশাল অডিটোরিয়ামে স্ক্রিনিং শুরু হলো আর সন্ধ্যার মধ্যে জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী, জিমি ততক্ষণে সুপারহিরো, ঐ বছর সোভিয়েত ইউনিয়নের
highest grossing foreign film ।
প্রথম ছবি মৃগয়া তে জাতীয় পুরস্কার তারপরে একের পর এক সুপারহিট ফিল্ম এমনকি 'অগ্নিপথ' এ কৃষ্ণন আইয়ার এর মতো ছোট্ট পরিসরেও অমিতাভের সাথে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করার পর কেন যে খাজা-খাজা সিনেমা করতে শুরু করল কে জানে?
'মিলে সুর মেরা তুমহারা' র সময় মিঠুন চট্টবট্টি-র ফ্যান ছিলাম আমি, তখনো চক্রবর্তী বলতে শিখিনি। পরে অবশ্য পুকার-এ অমিতাভকে দেখে মিঠুন এর জায়গা নড়ে গেছিলো, সে সব অন্য গপ্পো। যাই হোক তখন বোধ হয় ক্লাস ফাইভ-সিক্সে পড়ি, মালদাতে মিঠুনের ফাংশন আর আমার বাড়িতে তিনটে ভিআইপি পাস আছে, টিকিট শেষ, এখন তিনটে টিকিটে কে কে যাবে? আমার মাসতুতো দিদি মালদাতে আছে, একটা পাস তার জুটল, একটা বোধহয় আমার মামা পেলো আর একটাতে কে যাবে? যদিও আমার বাড়িতে ভিসিপি-তে রোজ একটা সিনেমা দেখতাম, তাও সদ্য সিক্সে উঠেছি, তখনো এতো সিনেমা-টিভির ছুট ছিলনা, আমার ভাগ্যে কি একটা পাস জুটবে! এরকম সময়ে মা বলল ঐ পাসটা তে 'আমি' যাবো, আমার ছোট্টবেলার মিঠুন চট্টবট্টি, এইজন্যই বলে 'জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। এত কাছ থেকে টিভির পর্দার বাইরে নায়ককে দেখে ফিরে এসে সারারাত ধরে স্বপ্ন দেখলাম এই মিঠুন আমাকে হাতে ধরে বক্সিং শেখাচ্ছে, তো এই ডান্স শেখাচ্ছে।
এরপরের সুযোগটা এলো আরো বছর দুয়েক পরে, তখন যুবভারতীতে ফুটবল ক্যাম্পে প্র্যাক্টিস করি। মালদা ডি.এস.এ, থ্যালাসেমিয়া সোস্যাইটি আর যুবভারতী মিলে একটা প্রদর্শনী ম্যাচের আয়োজন করেছিল 'মালদা একাদশ বনাম মিঠুন একাদশ'। তখন থ্যালাসেমিয়ার নাম শুনলেই মিঠুন বিনে পয়সায় একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত দৌড়ে বেরাতো। মিঠুন ইলেভেন এর মিঠুন আর প্রাক্তন প্লেয়ারদের আমরা ফুলের তোড়া দিয়ে সম্বর্ধনা জানাবো, আমার ভাগ্যে পড়ল সুরজিৎ সেনগুপ্ত। এত বড় ফুটবলার কিন্তু' মিঠুন' তো নয়, আমি পনেরো টাকা দামের রেনল্ড এর জেটার পেন নিয়ে এসেছি, যাতে অটোগ্রাফ দিতে কোনো অসুবিধে না হয় আর আমার সাথে এতো বড় ধোঁকা। যাই হোক আগে থেকেই ঠিক করে নিলাম ' সুরজিৎ সেনগুপ্ত' কে ফুলের তোড়া দিয়ে সোজা এগিয়ে যাবো 'মিঠুন' এর দিকে। সম্বর্ধনা অনুষ্ঠান শুরু হতে হতেই সবাই নিজের নিজের জায়গা ছেড়ে ফুল হাতে এক্কেবারে মিঠুনের কাছে, এদিকে আমার প্ল্যান-এ পুরো জল। বাকি ফুটবলাররা দাঁড়িয়ে আছে, একবার মনে হলো আমিও দৌড়ে যায়, তারপরে সুরজিৎ সেনগুপ্তের হাতে ফুলের তোড়াটা ধরিয়ে, সবার পরে মিঠুনের কাছে পৌঁছলাম। ছ ফিটের লম্বা চেহারা, ব্যাকব্রাশ করা চুল আর হাই অ্যাঙ্কল বুট পড়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে 'মিঠুন', হাত মেলানোর পর অনেক কষ্টে বললাম 'অটোগ্রাফ', মিঠুনোচিতো স্টাইলে বলল 'আগে থ্যালাসেমিয়ার অনুষ্ঠানটা হয়ে যাক'।
অটোগ্রাফ আরে নেওয়া হয়নি, আমার বন্ধু কৌশিক একটা অটোগ্রাফ দেওয়া ফুটবল পেয়েছিল, ওটার উপর আমার বহুদিন চোখ ছিল, তারপরে আবার সুযোগ এসেছে, তখন অটোগ্রাফের দিন শেষ। তবে ছোটবেলার নায়ক এর সাথে হাত মেলানোর মূহুর্তের যে স্মৃতি সেটাই বা কম কিসে!
আজকে মিঠুন 'জিমি' চক্রবর্তী-র জন্মদিন।
-অভিষেক বোস
No comments:
Post a Comment