তখন সদ্য প্রোমোশন পেয়েছি, পাঁচ টাকা থেকে দশ টাকায় আর হাফ প্যান্ট থেকে সাময়িক ফুল-প্যান্টে। চুলে চিরুনি এখন আর সোজা চলে না আর টাকা পেছনের পকেটে থাকে। তখন দশ টাকায় কি কি পাওয়া যেতো ? দশ টাকায় একটা গোটা ইলিশ, পাঁচ - ছ'কিলো বাসমতি চাল, দু লিটার আগমার্কা সর্ষের তেল, আধা কিলো পোস্ত….. ইল্লি আর কি! একি গুপ্তযুগের গল্প !? এসব কিস্যু পাওয়া যেতো না। দশ টাকায় পাওয়া যেতো দু' প্লেট চপ ঘুগনি, ভাগাভাগি করে একটা এগরোল (কুমড়োর আর চালতার শস দেওয়া) আর মেলা থেকে ফেরার সময় একটা কুলফি ।
মেলা মানে রথের মেলা, আর রথ মানে ঐ পুঁচকে রথ না, রীতিমতো বড়সড় রথ। রথের মাথাটা মন্দিরের চূড়োর মতো আর রথের দোতলার সামনে দুটো প্রমাণ সাইজের কাঠের আধা ঘোড়া পা উঁচু করে। ঐ কাঠের ঘোড়ার খুড় ছুঁয়ে একটা খুড়বত্ প্রনাম না করলে কিসের কি! (গত কয়েক বছর ধরে ইস্ক নের যে রথের মতো দেখতে একটা ঝকঝকে ধাঁচা ত্রয়ীকে স্টিয়ারিং আর ইঞ্জিন লাগিয়ে সামনে 'কৃষ্ণনাম' করতে করতে নিয়ে যায়, সেটাকে আমি কিছুতেই রথের স্টেটাস দিবো না, আর তাছাড়া শ'য়ে শ'য়ে লোক দড়ি টেনে নিয়ে যায় না তাই ওটা রথ নয়, গাড়ি)। তো আমার সেই ঘোড়াওয়ালা রথের মেলা বসে আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে সামনে বড়রাস্তার উপরে , আর ঐখান থেকে আরো দেড় কিলোমিটার রাস্তাজুড়ে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমেই বন্ধুদের জুটিয়ে নিয়ে ভীড়ের মধ্যে সেদিয়ে যাওয়ার নামই মেলা যাওয়া , ভুলে গেলে চলবে না হিরোর পকেটে আছে দশটাকা, সাথে আছে আরো সাত - আটটা বন্ধু, তাদের সবার জটিল পকেটকে নিয়ে যদি সরল করা যায় তবে যোগ বিয়োগ করে ( কে কবে কাকে খাইয়েছিল, সেগুলো বিয়োগ হবে) মোটামোটি পঞ্চাশ টাকা হয়ে যাবে, এই টাকায় একটা আস্ত মেলা কিনে নেওয়া যায় তবে আমরা আপাততঃ চপ ঘুগনি কিনব। চপ ঘুগনি খেতে খেতে দেখলাম, গ্যাং এর অনেকেই 'ধাঁ' হয়ে গেছে, পাশের দুটো তখনো নাকের জলে, চোখের জলে নির্বিকারে খেয়ে যাচ্ছে আর মাঝে মাঝে লঙ্কা গুড়ো, পেঁয়াজ কুচি চেয়ে যাচ্ছে, ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম বাকিরা কোথায়?
— 'সব পালিয়েছে'
কোথায়?
—'কোথায় কে জানে, মেলার ভীড়ে আছে কোথাও,
আমরাও পালাবো, তুইও পালা'
প্লেটটা রাখতে গেলে ধরে নিবে যে?
— 'প্লেটটা নিয়ে পালা'
প্লেটটা নিয়ে আর পালাতে পারিনি, পকেট থেকে গচ্ছা দিয়ে, মাথা চুলকোতে চুলকোতে বেরোলাম। জানি জানি দশ টাকার হিসেব তো? ইনকামের কথা কি এত খোলাখুলি বলতে হয়! মা-বাবা ছাড়াও, দাদু-দিদা, ছোট মাসী' যত নাম, তত ইনকাম'। এছাড়া আরো কিছু 'আশরফি' আমাকে দেওয়া হতো, ফেরার সময় 'ছোট্ট ছোট্ট লালমোহন' কিনে আনার জন্য, নরম, তুলতুলে আর নিক্তিতে মাপা মিষ্টি, একটু কম-ও নয় আর বেশিও নয়, আর তার উপরে বোনাস এক্কেবারে 'হাতে গরম' । মেলার পাপড় ভাজা নিয়ে আমার কোনো কালেই আদিখ্যেতা নেই, বরং পাপড়টা দেখলেই কেমন শীর্নকায় খসখসে হলদে পাতা লাগতো যার সামনে গেলেই একটা তেলচিটে গন্ধ আসতো। ঐ পয়সায় আমি দুটো চপ মুখে চালান করে দিব, কেউ টেরটিও পাবে না। পাতার কথায় মনে পড়ল রথের সামনে পান-চিনি দেওয়ার রেওয়াজ আছে, একবার কায়দা মেরে রেওয়াজ পালন করতে গিয়ে দেখি কাঠাল পাতা মুড়ে দিয়ে দিচ্ছে, সবাই সেটাই ছুড়ে দিচ্ছে।আমি অত্যুতসাহী বালক, কাঠাল পাতা খুলে দেখি 'চিনি' টুকুও নেই, এত্তো বড় ধোঁকা! থাক, এর থেকে আমার খুড়বত্ প্রণামই ভালো, কোনো ফাঁকিবাজি নেই, তাছাড়া সামনে গিয়ে খুড় ছোঁয়ার জন্য লাফালাফি করলে আমার পায়ের 'স্প্রিং'- গুলোও ঠিক থাকবে।
আমার বিশ্বস্ত বন্ধুদ্বয়, যারা প্লেট সমেত পালিয়ে গেছিল, চপের দোকান থেকে বেরিয়ে একটু এগোতেই হাস্যমুখ অবতারে অবতীর্ণ হয়েছিল, এ-ওর কাঁধে হাত রেখে, এঁকেবেঁকে চলতে সব জায়গায় একটু একটু করে ঢুঁ মেরে যখন এই ফিরব ফিরব করছি, ঠিক তখনই ঝমঝম করে বৃষ্টি নেমে এলো। সামনেই একটা জিলিপির দোকান দিয়েছিল, মাথা বাঁচাতে ওখানেই ঢুকেছি, হঠাৎ করে কানের কাছে কে একটা জোরে পোঁ করে বাঁশি বাজিয়ে উঠল, পেছন ঘুরে কচিমনে দুটো কাঁচা গালি দিতে গিয়ে দেখি, গ্যাং এর বাকিরা দাঁড়িয়ে খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসছে। না, আর আটকে লাভ নেই, দিয়েই দিলাম 'দুটো' একটু নরম করে।
- 'জিলিপি খাবি…?' নরম গলায় জিজ্ঞেস করল
না, আমি জিলিপি খাই না
- 'আরে খেয়ে নে, হেব্বি খেতে। '
পয়সা ছিল তো পালালি কেন?
- 'ওটাই মজা'
জিলিপি টা সত্যি ভালো ছিলো, জানিনা মেলার জিলিপি বলে, নাকি বন্ধুদের সাথে একসাথে খেলাম বলে!
অনেক বছর পর, এবারে রথের দিন আবার আমার শহরেই আছি, সব ঠিক থাকলে মাফিন-কে নিয়ে ঘাড়ে চড়িয়ে মেলা দেখিয়ে নিয়ে আসতাম! আমার সব বেড়ে ওঠার ছোট্ট ছোট্ট ভালোলাগার দিনগুলোর সাথে মাফিনের বন্ধুত্ব করিয়ে দিতাম। সেসব আর কিচ্ছু হোলো না।
'চিনি না দেওয়া' কাঠালপাতা বিক্রি করা আধ ছেড়া চটি পড়া ছেলেটাকে অনেক দিন আগেই মাফ করে দিয়েছিলাম, হয়তো দেখা হলে আবার ওর মতো কারো কাছ থেকে পাতা কিনে ভিতরে কি আছে না দেখেই 'ঘোড়ার পায়ে' ছুড়ে দিতাম কিন্তু সবকিছু উলটপালট করে দেওয়া হালফিলের অনাহুত 'চিনি' - র জন্য কোনো ছাড় নেই।
— অভিষেক বোস
No comments:
Post a Comment