Friday, August 30, 2019

অ্যামাজন

এই কলকাতার গড়িয়াহাট থেকে যদি জল ছিটান তাহলে কি অ্যামাজনের আগুন নিভবে? তাহলে আপনি কি করতে পারেন! পোস্ট করুন 'এতবড় একটা পরিকল্পিত দুর্ঘটনা ঘটে গেল আর কোনো মিডিয়াতে কোনো খবর হলো না।' দেখবেন আস্তে আস্তে অ্যামাজনের আগুন নিভু নিভু হয়ে আসছে, WhatsApp এ লিখুন পৃথিবীর ফুসফুস জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে, দেখবেন কালো ধোঁয়া কমে আসছে। মিডিয়া খবরটাকে চেপে দিয়েছিল তো!? তাহলে কোন WhatsApp University থেকে আমরা জানতে পারলাম? ঠিক কবে জানতে পারলাম যে অ্যামাজনের জঙ্গল পৃথিবীর ফুসফুস? আচ্ছা ছাড়ুন, আশে পাশের খবর জানা আছে কিছু? ছোটনাগপুর মালভূমির খনিজ সমৃদ্ধ ১৭,০০০ হেক্টর বনভূমি আদানিকে দিয়ে দিয়েছে সরকার, ২০১৬ সালে উত্তরাখন্ড - হিমাচলের জঙ্গলে আগুন লেগে পুড়ে গেছে ৩৫০০ হেক্টর বনভূমি । কর্নাটক, মধ্যপ্রদেশ-মহারাষ্ট্রে যে দাবানলের ঘটনা ঘটেছে বা ঘটানো হয়েছে তাতে ফুসফুস না হোক কানের লতিকা, হাটু কিম্বা কনুই কোনো কিছু জ্বলেছে কি !!! ভারতে ২০০৩ থেকে ২০১৭ অব্দি যেখানে দাবানলের সংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ৪৬% গত দুবছরে সেটা বেড়ে হয়েছে ১২৫%। সবথেকে বেশি দাবানল ঘটেছে মধ্যপ্রদেশ (৪৭৮১), ওড়িশা (৪৪১৬) আর ছত্তিশগড়ে (৪৩৭৩)। তবে চিন্তার কোনো কারন নেই 'বাজেট টু ফাইট ফরেস্ট ফায়ার' এর বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে যাতে অর্থনীতি ঝড়ঝড়ে হয়ে ওঠে। যে বিপুল ৪৫-৫০ কোটি টাকা ফরেস্ট ফায়ার প্রিভেনশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট ফান্ডে রয়েছে সেটাও খরচ হয়নি। অ্যামাজনের ঘটনা যদি (! ) ঘটানো হয়ে থাকে তাহলে সেটাই হবে এই শতাব্দীর সবথেকে বর্বরোচিত কাজ, কিন্তু ফুসফুস বাঁচিয়ে রাখার দায় কি শুধু ব্রাজিলের? উন্নত বিশ্বের দেশগুলো গ্রিন হাউস গ্যাস বাড়িয়ে যাবে আর পরিবেশ রক্ষার দায় শুধু অ্যামাজনের আশে পাশের গরীবগুর্বো দেশগুলোর! প্রতি বছর Co2 এমিশনের হিসেবে প্রথম তিনটে সারির দেশগুলো হলো চায়না ১০.২ গিগাটন, ইউ এস ৫.৩ গিগাটন আর ভারত ২.৫ গিগাটন (source UNFCC, European Commission, UNFAO)। আপনি বা আপনার দেশ যত বেশি এগিয়েছেন তত বেশি কার্বন ফুটপ্রিন্ট পেছনে ছড়াতে ছড়াতে এসেছেন। ৭৫% কার্বন এমিশনের কারন ; বিদ্যুৎ উৎপাদন (২৫%) , চাষবাসের জন্য জঙ্গল সাফাই আর গবাদি পশু থেকে উদ্ভূত মিথেন গ্যাস (২৪%), নির্মান (২১%) (যেখানে শুধু সিমেন্ট আর স্টিল উৎপাদনের জন্য প্রচুর পরিমানে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রয়োজন ।এমনকি যদি ভবিষ্যতে zero carbon energy দিয়েও উৎপাদন শুরু হয়, তাতেও Chemical reaction এ Byproduct হিসেবে কার্বন নিঃস্বরন হবেই হবে ), পরিবহন (১৪%) । একটু পাশ কাটিয়ে চলে আসুন, কারন এগুলোর জন্য আমি আপনি কেউ দায়ী নই, এটা তো রাষ্ট্রের দায়, ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেই হলো ! আমরা শুধু AC আর ফ্রিজ চালিয়েছি আর একটু আধটু এই ধরে নিন ৬% গ্রিন হাউস গ্যাস বাড়িয়েছি, তার থেকে বেশি কিছুই না। তবে দায় কিন্তু শুধু ব্রাজিলের, কেননা ফুসফুস তো ওদের ভাগে পড়েছে। দায়িত্ব যখন পেয়েছে তখন ওদেরকেই সামলাতে হবে। গোটা পৃথিবীতে যখন সমস্যা কোথাও বেশি কোথাও কম তখন আমাদেরই প্রতিবেশী দেশ ভুটান অফিসিয়ালি কার্বন নেগেটিভ দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এক্কেবারে পুঁচকে, পৃথিবীর মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না, এরকম একটা গরীব দেশ এই স্বীকৃতি পেয়েছে। কার্বন নেগেটিভ মানে একটা দেশের কার্বন নিঃস্বরনের থেকে সেই দেশের সবুজ বনভূমির কার্বন শোষন ক্ষমতা যেখানে বেশি। ভুটানের কার্বন ফুটপ্রিন্ট ২.২ মিলিয়ন টন (ভারতের কার্বন ফুটপ্রিন্ট ১০০০ গুন আর চীনের ৫০০০ গুন বেশি) আর ভূটানের বিস্তীর্ণ বনভূমির কার্বন শোষনের ক্ষমতা ৬ মিলিয়ন টন (মানে উৎপাদিত কার্বনের তিনগুন বেশি শুষে নেওয়ার ক্ষমতা )। পৃথিবীর প্রত্যেকটা দেশ যখন কার্বন নিউট্রাল হতেই হিমশিম খাচ্ছে, তখন ভুটান কার্বন নেগেটিভ দেশ। বিশ্বের দু'দুটো বিরাট দেশ ভারত আর চীনের উন্নয়নের হাটুর মাঝে আটকে, আর দুটো দেশের কার্বন ফুটপ্রিন্টের শিকার হয়েও শুধু নিজেদের চেষ্টায় ভুটান Carbon Negative হতে পেরেছে, কেন জানেন ? ভুটানে উন্নতির মাপকাঠি বোঝাতে Gross National Product নয় Gross National Happiness এর প্রসঙ্গ আসে। ভুটানের নিয়ন্ত্রকরা শুধু বুলিতে নয় কিম্বা নির্বাচনের প্রচারে নয় , মন থেকে বিশ্বাস করে অর্থনৈতিক উন্নতির সার্থকতা তখনই যখন ভুটানের প্রত্যেকটা মানুষ তাতে খুশি হবে। সমীক্ষা বলছে ৯১ শতাংশ ভুটানি তাদের দেশে খুশিতে রয়েছে । শুধু Social Media বিজ্ঞাপনী স্লোগান নয় রীতিমতো আইন প্রনয়ন করে বনভূমি রক্ষা করেছে, কাঠের গুড়ি রপ্তানি বন্ধ করেছে, ছ'তলার ওপর যেকোনো রকম নির্মান বন্ধ করা হয়েছে , ইলেকট্রিক গাড়ি, জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উপর জোর দিয়েছে। আগামী লক্ষ্য সীমা ২০২০ র মধ্যে পুরোপুরি Organic Agricultur আর ২০৩০ এর মধ্যে Waste Free দেশ হওয়ার । Trillion Dollar Economy ছাড়ুন, ভুটানের GNP মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার। বোঝার জন্য শুধু এইটুকু জানুন ভারতের সবথেকে ধনী মানুষ মুকেশ আম্বানির সম্পত্তির পরিমান ১৮.৯ বিলিয়ন ডলার । তাই ভুটান গরিব সারির দেশগুলোর সাথেই থাকবে। তবে কোনোদিন যদি ভুটানও আমাদের মতো চালাক হয়ে যায়, আর দেশের অর্থনীতিকে প্রথম সারিতে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবুজ বন জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে বড় বড় কোম্পানির হাতে তুলে দেয় তখন ফেসবুকে পোস্ট দিতে ভুললে চলবে না 'ভারতের পাশে পৃথিবীর ছোট্ট কিডনি জ্বলছে আর মিডিয়া চুপ করে আছে।'

- অভিষেক বোস

No comments:

Post a Comment