আমাদের পাড়ার শেষ প্রান্তে একটা বাড়ি আছে । ভারী সুন্দর বাড়ি, আমরা বলতাম বাগান বাড়ি। ভারী সুন্দর বললাম ঠিকই কিন্তু পাড়ার লোকের জন্য কিন্তু অবাধ অবারিত প্রবেশ ছিল না। বাগান বাড়িতে অনেকগুলো পরিবার ছিল, আর ছিল তাদের অবোধ্য মেজাজ। কানাঘুষো ছিল পাশের পাড়ার সাথে নাকি বেশ মোলায়েম সম্পর্ক। আমাদের পাড়ার অনেকেই নাকি ও পাড়ার লোকদের কারনে অকারণে অহরহ আসতে দেখেছে। আগে অবশ্য দুটো নয় একটাই পাড়া ছিল, নতুন পৌরপ্রধান আসার পরে শহরের বুক দিয়ে একটা গভীর ড্রেন কাটা হয়, তারপর সেটাকে কংক্রিট দিয়ে ভালো করে বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঐ ড্রেনটাই এখন এ পাড়া ও পাড়ার সীমানা। ড্রেন নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি লেগেই থাকে, কে নিজের বাড়ি পরিস্কার করে ঐপারে ফেলে দিয়ে আসে, কে ড্রেনের কাদা নোংরা এপারে তুলে রেখে আসে, তবে যদ্দুর জানি ঐ পাড়ার লোকেরাই বেশির ভাগ সময়ে খাওয়ার পরে এঁটো নোংরা, প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভরে এপারে চালিয়ে ফেলে দেয়। এইসবে অবশ্য বাগান বাড়ি নোংরা হয় সব থেকে বেশি। বাগান বাড়িটা আগে এক জমিদারের বাড়ি ছিল, তবে জমিদারির আর কিছু বাকি ছিল না। একসময়ে একরকম বাধ্য হয়েই বাইরের কিছু অতিথিশালার মতো ঘরগুলোকে একটা সরকারি দপ্তরের হাতে লিজ্ দিয়ে দেয়। আর বাকি বাড়িতে পরিবারের নিকট দূর সম্পর্কের লোকেরা থাকতে শুরু করে। একবার বাড়িতে চরম গন্ডগোল হয় আর জমিদারের পরিবারের কিছু লোককে পরিবারের অন্য লোকেরা বের করে দেয়। বাগান বাড়িতে অশান্তি সারাবছর চলতেই থাকে তবে বাগান বাড়ির ভেতরে একটা পোড়ো শিবমন্দির আছে, বহু পুরনো মন্দির। এপাড়ার লোকেরা খুব মানে। শ্রাবনের প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করলে বাগান বাড়ির বাগানের মাটি নরম হতে শুরু করে আর বাগান বাড়ির মানুষদের মনও । শ্রাবন জুড়ে বাগান বাড়ির দরজা খোলা থাকে, যারা পুজো দিতে আসে বাগান বাড়ির লোকেরাই তাদের হাত ধরে মন্দির অব্দি নিয়ে যায়, তারপর শ্রাবন ফুরোলেই আবার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। একবার অবশ্য ভরা শ্রাবনের সময় যখন এপাড়ার লোকেরা দল বেঁধে পুজো দিতে যাচ্ছিল, তখন ওপাড়ার কিছু বেয়াদপ বাইরে থেকে ইট পাটকেল ছুড়তে শুরু। অনেকের মাথা ফেটে যায়, অনেকের চোট আঘাত লাগে, তবে ভক্তের দল তাতে থেমে যায় না, ফি বছর শ্রাবনে বাগান বাড়ির দরজা খুলে যায় আর এ পাড়ার লোকেরা দল বেঁধে বাগান বাড়িতে পুজো দিত যায়। তবে কিছু কিছু লোক অসময়ে বাগান বাড়িতে ঢুকে পড়ত। তাদের কাছেই শুনতে পাওয়া যেতো, যে বাগান বাড়িটা নাকি ছবির মতো সুন্দর আর বাগান বাড়ির মানুষজনও নাকি ভীষন আন্তরিক, কিছু লোকের অভিজ্ঞতা আবার অন্যরকম। এইরকমই চলছিল, বাগান বাড়ির অশান্তি আর অশান্তির গল্প ছিল পাড়ার লোকদের সবথেকে বেশি আলোচনার বিষয়। পাড়ার মাথারা মাঝে মধ্যে গন্ডগোল অশান্তি থামানোর চেষ্টা করলেও খুব বেশি কিছু করে উঠতে পারেনি। হাবুল মিত্র আর গোবিন্দ সাহা পাড়ার মাথা হওয়ার পর থেকে ক্লাবের ছেলেরা বলে দিয়ে আসল এই পাড়ায় থাকতে গেলে, এই পাড়ার মতো করে থাকতে হবে। বাগান বাড়ির কয়েকটা পরিবার তাতে সম্মতি জানালো, কয়েকজন আবার সামনাসামনি না বললেও জানালো আমরা ড্রেনের উপর একটা সিমেন্ট এর স্ল্যাব ফেলে দিয়ে ওপার দিয়ে যাতায়াত করব, তবে বাগান বাড়ির বেশির ভাগ লোকেরই দাবি 'না এ পাড়ার সাথে, না ও পাড়ার সাথে, আমরা নিজেদের মতো থাকতে চায়।' এইসব ছোটখাটো গন্ডগোল সামলাতে সাহা-র জুড়ি নেই। একদিন ক্লাবের ছেলেদের সাথে নিয়ে গোবিন্দ আর হাবুল ভেতরে ঢুকে গেল, আর ঢুকেই প্রথমে সদর দরজায় ভেতর থেকে তালা মেরে দিল। বাগান বাড়ির সদস্য যারা বাইরে বেরিয়েছিল তারাও আর ভেতরে ঢুকতে পারছিল না। ভেতরে কি চলছিল কেউ জানতে পারছিল না। সন্ধ্যাবেলা প্রথমে গোবিন্দ সাহা আর আরো গভীর রাতে হাবুল মিত্র জানালো 'বাগান বাড়ির সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। বাগান বাড়ির দোতলার লোকেরা আর সামনের সিড়ি দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে না, ওরা ব্যবহার করবে পেছনের সিড়ি আর বাগান বাড়ির একতলার লোকেরা আর দোতলার ছাদে উঠতে পারবে না, আশা করা হচ্ছে বাগান বাড়িতে আর কোনো ঝগড়া অশান্তি হবে না। বাগান বাড়ির বাগানের একটা অংশে ক্লাবের একটা অফিস হবে সাথে থাকবে ক্যারম বোর্ড আর ছোট্ট একটা লাইব্রেরি। তাতে পাড়ার ছেলে ছোকরারা পড়াশোনা করবে, বিকেলে একটু খেলাধূলা করবে, মনটা ভালো থাকবে। বাগান বাড়ির ছেলেরাও সেখানে আসা যাওয়া করতে পারবে। এতে করে মেলামেশা বাড়বে, পারস্পরিক ভুল বোঝাবোঝি কমবে। পাড়ার লোকেরা এইসব শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল 'যাক এতদিনে একটা কাজের কাজ হয়েছে।' কয়েকটা ফিচেল মনে মনে ভাবল এবারে বাগান বাড়িতে ঢুকতে পারলে ঐ বাড়ির মেয়েদের ঝাড়ি মারা যাবে, ওদের দেখলে অবশ্য খেদি পেঁচিরাও মুখ ঘুরিয়ে নেয়, তবু আশা। একজন জানালো বাগান বাড়ির জায়গা প্লট করে বিক্রি হলে দু'কাঠা জমি সে কিনবে, তার নিজের বাড়িটা অবশ্য গত বছর প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার টাকায় তৈরী। দু একজন জানালো ক্লাব সম্মতি দিলে, বাগানের পাশে লাইব্রেরির সামনে সে একটা রোলের দোকান খুলতে চায়। এত লোকজন বিকেল বেলায় আসবে, খুব একটা খারাপ ব্যবসা হবে না। ক্লাবেরই কারা সব বলল বাগানের একটা দিকের ঝোপঝাড়, গাছপালাগুলো কেটে দিয়ে এ বছর ওখানেই 'সাংশকিতিক পোতিযোগিতা' হবে। মোটের উপর বাগান বাড়ির অশান্তি শেষ হলো, গোটা পাড়ার লোক এখন খুশি । বাগান বাড়ির দরজা এখন সারা বছরের জন্য খোলা.....
— অভিষেক বোস
No comments:
Post a Comment