Friday, May 17, 2019

নির্বাচন

সকাল বেলায় একটা বেশ মজার মিম্ চোখে পড়ল " এত মারামারি, খুন খারাপি সবই নাকি দেশের একটু সেবা করার সুযোগ পাওয়ার জন্য। "

আহা রে!  সত্যিই তো এখানে তো কিছুই পাওয়ার নেই, শুধুই বিলিয়ে যাওয়া। তার জন্য দিন রাত এক করে খেটে যাওয়া।

আমার আবার পুরনো  কিছু কথা মনে পড়ে গেল। আমাদের বাড়ির একটু দূরেই টাউন স্কুলে নির্বাচনী বুথ হতো আর বুথ থেকে ৫০০ মিটার দূরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল অস্থায়ী ছাউনি করে দলীয় ব্যানার পতাকা সাজিয়ে, টেবিল চেয়ার নিয়ে বসে থাকত। আমি বিজেপির ছাউনিতে  বসতাম।

এই রে! আমি আমার রাজনৈতিক পরিচয় দিতেই ভুলে গেছি। জানিয়ে রাখি আমি ছোটবেলায় যখন  রাজনীতির বর্নপরিচয় শিখে উঠিনি তখন রাজীব গান্ধী (গাঁধী নয় ) কে পছন্দ করতাম। কেন, কি জন্য, তখনও বোঝার মতো বয়স হয়নি, তবে টিভির পর্দায় রাজীব গান্ধীর ব্যক্তিত্ব দারুণ লাগত। আশেপাশে কংগ্রেসের পরিবেশ ছিল অতএব আমি ঠিক করে নিলাম 'আমি কংগ্রেস' । এত তাড়াহুড়ো করবেন না, সবে তো প্রাইমারি স্কুল। এখন আমি  রাস্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (RSS) শিশু সদস্য। নিয়ম করে শাখার মাঠে যায়। বিশ্বাস করুন ওখানে খেলাধূলা ছাড়া আর ভালো ভালো কথা ছাড়া কোনোদিনও কোনো কথা শুনিনি শিখিওনি। কোনো রাজনৈতিক কচকচানি কোনোদিনও আলোচনা হয়নি। এদিকে হল কি বাবার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিজেপি থেকে বিধানসভা নির্বাচনে প্রার্থী হলো আর বাবাও বন্ধুর সাথে নেমে পড়ল। আমাদের বেশ কিছু আত্মীয়সম প্রতিবেশীরা বিজেপি করতো। এরা সবাই খুব ভালো মানুষ তাই একদিন আমি ঠিক করলাম 'আমি বিজেপি!'  তখন হুড খোলা জিপে নয়, পায়ে হেটে প্রচার চলতো, বড়দের প্রচার শেষ হয়ে গেলে আমিও দলবল জোগাড় করে ছোট ছোট 'কংগ্রেসের পতাকা' হাতে নিয়ে স্লোগান দিতাম "ভোট দিবেন কোনখানে? পদ্মফুলের মাঝখানে।"

তো যাই হোক আমি বিজেপির ছাউনি তে বসতাম, সামনে আর পাশাপাশি কংগ্রেসে আর সিপিএমের টেবিল থাকত। এইসব টেবিলের সামনে চা, জল, সরবতের ব্যবস্থা থাকতো। ভোট দিতে যাওয়ার আগে আমাদের পাড়ার ভোটাররা নিজেদের পছন্দ মতো ছাউনির সামনে হাসি বিনিময় করে স্লিপ নিয়ে বুথের দিকে রওনা দিতো। মাঝে মাঝে খবর আসতো কে কার ভোট দিয়ে পালিয়ে গেছে। এই নিয়ে ছোটখাটো কথা কাটাকাটির মাঝেই দুপুর গড়িয়ে আসতো। এইবারে খাবারের প্যকেট আসবে। মোটামুটি বিজেপির হলুদ পোলাও আর আলুর দম , কংগ্রেসের রুটি, মাংস আর সিপিএমের পোলাও মাংস এইরকম কিছু একটা মেনু হতো। আমি একটু খেতে ভালোবাসি আর এদিকে বিজেপির প্যাকেট তখনও রেডি হয়নি, কে একটা এসে খবর দিয়ে গেল প্যাকেট এখনও এক দেড় ঘন্টা দেরি। ধুস শালা! এইসব পার্টির উপর এইজন্য কোনো ভরসা করিনা। উল্টো দিকে তখন কংগ্রেসের রুটি মাংসের খোশবাই বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। আমি মনে মনে তখন  আবার কংগ্রেস। কিছুক্ষন পরে কংগ্রেস আর সিপিএমের লোকেরা একটা দুটো করে প্যাকেট বিজেপির কাছে দিয়ে গেল।  সিপিএমের পাড়াতুতো কাকু আমাদের ছোটদের হাতেও একটা একটা করে প্যাকেট ধরিয়ে দিল। একটু লোভী বটে তাই বলে নিজের রাজনৈতিক সত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়ে সিপিএমের খাওয়ার! ছ্যাঁ ছ্যাঁ!  গম্ভীর মুখে বললাম আমি বিজেপি করি। সিপিএম কাকু চোখটা পাকিয়ে বলল 'দিব একটা কানমলা, চুপচাপ খা'। বেলা বাড়তে থাকে আরো কিছু গন্ডগোলের খবর আসে। কার যেন একটা মাথা ফেটে যায়, একটা কংগ্রেস দিদা আর দাদু সিপিএমের ছাউনির সামনে এসে বাপ বাপান্ত করে যায়। আস্তে আস্তে বিকেল ঢলে পড়ে আর আলাদা আলাদা ছাউনির লোকগুলো আবার একসাথে ক্লাবে আড্ডা মারতে চলে যেতো, আর আমরা বালখিল্যবাহিনী সব দলের ফেস্টুন পতাকা ছিঁড়ে হাতে নিয়ে মহাজোট বানিয়ে আবার হুল্লোর শুরু করে দিতাম। কোনো সোশাল আনসোশাল মিডিয়াতে পতাকা ছিঁড়ার ফোটো ভাইরাল হতো না। সন্ধ্যাবেলায় কোনো চ্যানেলে আলোচনা সভা বসতো না "এই যে ছোট ছোট বাচ্চারা ভোট শেষ না হতেই বিজেপির পতাকা ছিঁড়ে দিল, এর পেছনে কোথাও কি কোনো দেশদ্রোহী কংগ্রেস অভিভাবকদের ভূমিকা নেই।"

মোদ্দা কথা ভোট শেষ হলেই আবার সব স্বাভাবিক। আসছে বছর আবার হবে আবার প্যকেট ভাগাভাগি। তাই বলে কি অশান্তি হতো না!? আলবাত হতো। অশান্তি হতো, মারামারি হতো, চুলোচুলিও হতো। কিন্তু সারা বছর ধরে বর্ষাকালের কোলা ব্যাঙের মতো আমার পার্টি ভালো, আমার নেতা ভালো আর তোর নেতা চোর গোছের ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ শুনতে হতো না।

আচ্ছা এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন আমি বিজেপি। এত তাড়াহুড়ো করবেন না। এখন তো সবে হাই স্কুলের গন্ডি পেরোবো। পাড়ায় পাড়ায় তখন সিপিএমের রমরমা। আমাদের ওয়ার্ডের Left Wing এর যুব শাখা DYFI এর নির্বাচন। পাড়ার দাদারা বলল চল আমাদের সাথে, অতএব আমি এখন বামফ্রন্ট।  মিটিং এ গিয়ে বারবার শুনছিলাম আমাদের এত সদস্য, আমাদের এত বড় সংগঠন। মিটিং এর উদ্যোক্তাদের মধ্যে একজন আমাকে ডেকে বলল 'তুই তো ভালো বলিস, তুই আমাদের নতুন সদস্য, তুই কিছু বল।' বললাম 'এই যে সংখ্যা সংখ্যা করছ, এক্ষুনি খাওয়ারের প্যাকেট গুলো বিলি করে দিলে ভীড় হালকা হয়ে যাবে, তার উপর আমার খুব সন্দেহ এখানে অর্ধেক লোক DYFI এর পুরো কথাটাও জানে কি না?'  এরকম ভাষনের জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলনা। যাইহোক সামলে উঠে একজন প্রবীন নেতা পার্টির উদ্দেশ্য বিধেয় বোঝাতে শুরু করল। আর আমি ততক্ষণে বুঝতে পেরেছি আমার উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন এবার বিদেয় নেওয়াই ভালো। অতএব এতক্ষণে আমার রাজনৈতিক পরিচয় নিশ্চয়ই জেনে ফেলেছেন। আহা রাগ করছেন কেন? আমি তৃণমূল ও করেছি।  এখন কিন্তু আমি চাকরি করি, একটা রাতে কেন তৃণমূল এর সরকার আসা উচিৎ এই নিয়ে আমার ফ্ল্যাটে এক কমরেড এর সাথে তুমুল তর্ক চলছে বক্তা দুজন আর শ্রোতা তিনজন। ভোর হয়ে আসছে, হঠাৎ করে চতুর্থ শ্রোতার গম্ভীর আওয়াজ কানে এল। পাশের বাড়ির পঙ্কজ'দার আওয়াজ "অভি, বন্ধ করো এই আলোচনা।" দেখলেন, কেমন জ্বালাময়ী ভাষন দিয়ে পাশের বাড়ির লোককে অব্দি জাগিয়ে রেখেছিলাম!?

কিন্তু কি আশ্চর্য পরদিন আবার কমরেড, তৃণমূল আর বিজেপির বন্ধুদের সাথে আড্ডা জমে যেতো। বিরূদ্ধ মতের জন্য কেউ কোনোদিন দেশবিরোধীও বলেনি বা আমিও কাউকে Urban Nuxal তকমা দেগে দিইনি। কোনদিনও  বলতে শুনিনি, অমুক নেতাকে সমর্থন করলে আমি দেশের সাথে নইলে দেশের বিপক্ষে। গনতন্ত্রে বিরুদ্ধ মত থাকবে না! প্রশ্ন করতে পারবেন না! তাহলে আর কিসের গনতন্ত্র? জেনে রাখুন আপনি আমিই দেশ, আমাদের নিয়েই দেশ। দেশের নেতা নেত্রীরা আমাদের নির্বাচিত সদস্য মাত্র । সাংসদরা কোনো দাদা দিদির নয়, আমার আপনার প্রতিনিধি। খারাপ লাগে যখন দেখি আমার আশে পাশের পরিচিতরা রাত দিন ভুয়ো খবর ছড়িয়ে চলেছে। প্রচার মাধ্যম কখন যে আমাকে, আপনাকেই প্রচারের মাধ্যম বানিয়ে ফেলেছে বুঝতেও পারিনি। অথচ কতটুকু সময় লাগে খবরটার সত্যতা পরখ করে নিতে!?  আপনার পছন্দের প্রার্থী যদি সত্যিই ভালো কাজ করে থাকে তাহলে এত প্রচারের প্রয়োজন কিসের? জানি বলবেন, প্রচার না করলে সাধারণ লোক তো জানতেই পারবে না। জেনে রাখুন ভালো কাজের ভালোটুকু যদি সাধারণ মানুষ অনুভবই না করতে পারে, যদি তথ্য আর তত্ত্ব দিয়ে আপনাকে বুঝিয়ে দিতে হয়, তাহলে সেটা কাগুজে ভালো কাজ। এই লোকসভা নির্বাচনের খরচা আনুমানিক পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা ( USA র থেকেও বেশি)। ভোটার পিছু খরচা প্রায় ৫৫০  টাকা যেখানে ৬০% এর বেশি লোকের দৈনিক আয় ২১০ টাকার ও কম। বিগত লোকসভায় খরচা ছিল আনুমানিক ২৫০ কোটি টাকা, এবছর ৫০,০০০  কোটি! ৮০০০ প্রার্থীর ভোট প্রচার, সারা বছর ধরে ইলেকট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া, Whatsapp, Facebook এ প্রচারের খরচাটা যোগ করলে অজুত নিযুত এর গুনতি ভুলে যাবেন। আর এইসবই কি জন্য? যাতে কিনা কিছু লোক দেশসেবা করার সুযোগটুকু পেতে পারেন। এই পরিমাণ টাকাটার সামান্য অংশ পেলেও দেশটার চেহারা বদলে যেতো, কোনো নেতার প্রয়োজন হতো না। যদি এই কথাটা মাথায় না ঢুকে, তাহলে আগের মতোই দিন রাত এক করে ফেসবুক whatsapp এ রাজনৈতিক জোকস, গুজব, ভুয়ো খবর ফরওয়ার্ড করতে থাকবেন।

আমি বরং আপনাদের থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখব, সিপিএম, বিজেপি, তৃণমূল, কংগ্রেস ছাউনিতে প্যাকেট ভাগ করে খাচ্ছে। আর ভোট শেষ হওয়ার পর কাধে হাত দিয়ে ক্লাবের আড্ডায় এক হয়ে যাচ্ছে।

অভিষেক বোস







No comments:

Post a Comment