Sunday, August 14, 2016

স্বাধীনতার রঙ সবুজ আর সাদা কালো

না ভাই! কোনও স্বাধীনতা স্বাধীনতা অনুভূতি আসছে না।  না, অফিস নিয়ম মাফিক ছুটি রয়েছে, বাড়ির পাশের স্কুলে লতা মঙ্গেশকরের গান, ফেসবুকে স্বাধীনতা থিম, Happy Independence আর  same to you , আমরা কি সত্যিই স্বাধীন জাতীয় আলোচনা, এমনকি দুদিন আগে থাকতে টিভিতে 'তিরঙ্গা' টেলিভাইস হওয়ার নোটিশ অব্দি দিয়ে দিয়েছে।  ভি আই পি রোডে গাড়ির আওয়াজ কম, আমার নিজের কিচেন থেকে আর আশপাশের ফ্ল্যাট থেকে  ইলিশ আর মাংসের  গন্ধ মিলেমিশে একাকার। সব জায়গার জিনিষ জায়গায় তবু স্বাধীনতার দিন বড্ড স্বাদ হীন।  

আসলে গত  ২০ বছর ধরে ১৫ই অগাস্ট মানেই সবুজ মাঠ, সাদা কালো বল, সারাদিন ফুটবল টুর্নামেন্ট, অঝোরে বৃষ্টি আর সবুজ মাঠ থেকে  কাদা মাখা জার্সি গায়ে বাড়ি ফেরা। প্রথম প্রথম মাঠের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম আর ভাবতাম কবে যে মাঠের ভেতর থেকে এই বাইরের লোকদের দিকে তাকাব!  

গো-ও-ও-ল  আওয়াজের সাথে সাথে আদ্ধেক দর্শক মাঠে ঢুকে যেত, লাইন্সম্যান আর রেফারি আবার সবাইকে বাইরে বের করে খেলা শুরু করত তবে টাই ব্রেকারের সময় প্যারামিলিটারিরও ক্ষমতা থাকত না যে জনগনকে আটকে রাখবে।   

আমার অবশ্য গোল হওয়ার থেকে সেভ হওয়া দেখতে বেশি ভালো লাগতো। ভবিতব্য!  এরপর যুবভারতী ফুটবল ক্যাম্পে ভর্তি হয়ে বছর দুয়েকের মধ্যেই এমন লায়েক যে মাঠে নামতে আর তর সইছিল না।  কিন্তু ক্যাম্পের অলিখিত নিয়ম যে এইসব পাড়াতুতো টুর্নামেন্ট আর খেপ খেলা যাবে না, তবে আমাদের আক্ষেপ ছিল না, লুকিয়ে চুরিয়ে সংক্ষেপে ঠিক খেলে নিতাম।  ক্যাম্পে আমার প্রথম বন্ধু কৌশিক আর সিদ্ধার্থ (লালু ) (আমার চোখে দেখা তিনজন ভালো স্ট্রাইকারের মধ্যে লালু একজন,  যেমন স্পিড, তেমনি ড্রিবল আর তেমন স্কিল )। কৌশিক বছর খানেকের মধ্যে ক্যাম্প ছেড়ে দিল, থেকে গেলাম আমি আর লালু। 

এরকমই একটা ১৫ই অগাস্ট ওলাঙ্গা (ভালো নাম মনে নেই) এসে বলল বুড়াবুড়ি তলার মাঠে টুর্নামেন্ট আছে যাবে? আমি আর লালু একপায়ে রাজী।  নায়ার, তমাল, দুটো ট্রাইবাল স্টুডেন্ট আরও অনেকে হাত তুলল। স্কুলের ফার্স্ট বেঞ্চের মতই ক্যাম্পের সুবোধ বালকরা অবশ্য পিছিয়ে গেল।  

অতএব উক্ত ১৫ই অগাস্ট সকাল ৭.৩০ টার মধ্যে কিট্স আর বুট নিয়ে রেডি। সকাল থেকেই বৃষ্টি শুরু আর আকাশ কালো দেখে ভয় পেয়ে গেলাম, মোবাইল ফোন এর যুগ নয়, তাই সাইকেল নিয়ে সোজা লালুর বাড়ি, ওকে তুলে নিয়ে বাকি সবাইকে তুলতে তুলতে পৌঁছে গেলাম বুড়াবুড়ি তলার মাঠে। ততক্ষনে ভিজে চুপচুপে অবস্থা আর মাঠে গিয়ে দেখি ও হরি!  মাঠ কোথায় পাশের বিলের জলের সাথে মিশে পুরো জলাশয়, এক হাটু জল। 

ফুটবলের নিয়ম অনুযায়ী মাঠে বল ভাসলে খেলা বন্ধ হয়ে যায়, অতএব খেলা বন্ধ।  অন্য কোনো মাঠের সামনে গিয়ে দাঁড়ালে ঠিক কোনো না কোনো টিমে জায়গা হয়েই যাবে কিন্তু আমরা নাছোড়বান্দা এসেছি যখন খেলেই যাব।  এরপর এক হাটু জলে নেমে পড়লাম।  আমি আর লালু জায়গা বদলে নিলাম , লালু গোলকিপার আর আমি ফরোয়ার্ড। ৯০ মিনিট সাতার কাটার পর আর কোনো খেলা হল না।  টুর্নামেন্ট শেষ, আবার আমরা অন্য মাঠে ভালোমানুষের মতো দাঁড়িয়ে থাকতেই একটা ক্লাবের দাদা বলল কি রে খেলবি? 
খেলব না আবার!  আবার নেমে পড়লাম আর সন্ধ্যাবেলা কাদা মেখে হেরে বাড়ি ফিরলাম। 

এরপরে আমি আর লালু অনেক টুর্নামেন্ট খেলেছি, মালদার সব ভালো টুর্নামেন্ট, মালদার বাইরেও ডিস্ট্রিক্ট টিমের হয়ে কখনও কলকাতা কখনও কোচবিহার ।  কখনও এক টিমে আর কখনও অপোনেন্ট টিমে। আমার স্বাধীনতার রং সবসময় সবুজ আর সাদা কালো। বাড়ির বাইরে প্রথম যেদিন রাত কাটালাম সেটা পিকনিক এর জন্য নয় নাইট টুর্নামেন্ট খেলব বলে।  প্রথম বাড়ির লোক ছাড়া যেদিন কলকাতা যাওয়ার ট্রেনে উঠলাম  সেদিনও আমার সাথে ছিল আমার টিম আর লালু , এরপর একদিন কি জানি কেন মাঠছাড়া হয়ে গেলাম! সবুজ মাঠ কখন ধূসর হয়ে গেছে মনে নেই, কিন্তু ১৫ই অগাস্ট খেলার মাঠ  আর সাদা কালো বল এখনও হাতছানি দেয়।  

— অভিষেক বোস 


3 comments: