Friday, August 5, 2016

হাওয়া বদল

চার পাঁচ বছর আগে আমার এক বন্ধুর সাথে কথা হচ্ছিল।  পরদিন ওর বাড়ির অনুষ্ঠানে যাব কি না, আর একবার নিশ্চিত হতেই ফোন করেছে। বাইরের গেটটা খুলে বেরোতে বেরোতে কানে ফোন চাপা দিয়ে বললাম "99% আসছি"।  1% নয় কেন?  উত্তর দেওয়ার আগেই এক সারমেয় দিল ঘ্যাঁক করে পা'য়ে বসিয়ে।" আর আসতে পারব না " বলেই বসে পড়লাম, বেশ খানিকটা রক্ত বেরোচ্ছে কিন্তু তখনও মাথায় চলছে 1% নয় কেন?  মনে মনে বললাম " এই জন্য "। 

গত তরশু দিন আমার বোন জামাইকে দক্ষিণ কলকাতার এক হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে আনার সময় সবাইকে এইসব বেসরকারি হাসপাতালে ছুলে কেমন বিয়াল্লিশ ঘা হয় সবিস্তারে বুঝিয়ে দিচ্ছিলাম।  (শুধু কলকাতা কেন পূর্ব ভারতের যে কোনো বড় হসপিটালে আমার অবাধ যাতায়াত রয়েছে। )

সেই আমিই কপাল ফেরে পরদিন বিকেলে উত্তর কলকাতার এক নামী হসপিটালে ভর্তি (সৌজন্যে আমার অফিস মেডিক্লেম, না থাকলে এক্ষুনি করে রাখুন, দু দিনে ৮০ হাজার খসিয়ে দিয়েছে আরও খসাবে )।   প্রথমে এমার্জেন্সি, সেখানে এই ডাক্তার একে ওকে ফোন করছে আর কনসাল্ট করছে আর আমি বেশ রুগী রুগী সেজে শুয়ে আছি। প্রসঙ্গত বেডে শোবার পর থেকেই বেশ সুস্থ বোধ করতে শুরু করলাম।  আমার কলিগ যে সারাদিন ধরে আমাকে নিয়ে নাজেহাল বোধ করি ঔ সুস্থ বোধ করতে শুরু করে।  আমার বন্ধু ভাগ্য ইর্ষনীয়।  ততক্ষণে আমার  বন্ধুরাও এসে হাজির।  এরপরে ওয়ার্ডে শিফ্ট করার পর পরীক্ষা শুরু।  জীবনে অনেক পরীক্ষা দিয়েছি, কোনো কোনো পরীক্ষায় তো পাশ মার্কস নিশ্চিত বুঝলেই এক ঘন্টায় পেপার জোর করে জমা দিয়ে এসেছি।  কিন্তু এই পরীক্ষায় কোনো ছাড় নেই।  কর্মসূত্রে আমি একটা বহুজাতিক মেডিক্যাল ইক্যুইপমেন্ট কোম্পানির প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্টে আছি। Ultrasound, Echo Cardiography,  Pulse Oximeter,  ECG,  Aneasthesia Workstation যে সব বস্তুর সাথে আমি রোজ খেলি আজ তারাই আমার সাথে খেলতে শুরু করল। 

কর্পোরেট হাসপাতালের সব ভালো কিন্তু ব্যাটারা পাশবালিশ দেয় না আর কথা বলতে দেয় না। (আমি কিন্তু মিষ্টি মিষ্টি মুখ করে একটা এক্সট্রা নধর পিলো জোগাড় করে ফেললাম )

রাতে ডাক্তার এসে বলল অ্যাপেন্ডিক্স আছে কাল বিকেলে সার্জারি।  সকাল থেকে আমি দাবি জানিয়ে আসছি এরকম ব্যাথা আমার এর আগেও একবার একবছর আগেও হয়েছে, সকালে সে কথা জানিয়ে অন্য একটা ডক্টরের কাছে তিন তিন খানা পরিচিত ইঞ্জেকশন আদায় করে নিয়েছিলাম তাতে ব্যাথা বিন্দুমাত্র কমেনি দেখে বিকেলে নিজেকে হসপিটালে সপে দিলাম।

বুঝলাম অভিষেক তুমি ইক্যুইপমেন্ট বোঝ, অ্যাপ্লিকেশন বোঝ কিন্তু নিজের শরীর বুঝতে তোমার ঢের বাকি। ডাক্তারি টা তোমার কম্মো নয়।
(আপনারাও গুগল ডাক্তারি ছেড়ে দিন আর শরীর খারাপ হলে যতই ডাকাত ডাকাত মনে হোক ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করুন )

তাও বললাম Are you sure Doctor?

Ofcourse I'm sure. Still we will wait for the USG Confirmation.  Are you scared my Boy? 

Not at all.  I've attended hundreds of OT but in a different role.

অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন কি ভাবে?

বললাম Live OT তে Training দিতে অথবা Technical Evaluation এর জন্য প্রায়ই থিয়েটারে ঢুকতে হয়।

"See you tomorrow" বলে হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেলেন। 

কলকাতার প্রাচীন প্রবাদ,  এখানে থাকলে অন্তত একবার পক্স, ম্যালেরিয়া, জন্ডিস,  হসপিটালে প্রবেশ আর সার্জেন্ট এর কাছে গাড়ি নিয়ে  ধরা পড়তেই হবে (ঘাবরাবার কিছু নেই Any One of them, All of them নয়)

রাতে সিস্টার এসে বলল এখনই ঘুমোলে চলবে না আরও রক্ত দান করতে হবে। মনে মনে বললাম আপনি জানেন না ম্যাম আমার পূর্ব পুরুষ বাঁদর নয়, বাদুর)

বললাম ঠিকই কিন্তু খাসা ঘুমোলাম, একেবারে সকাল সাতটায় ঘুম ভাঙল। 

ফোন টা জোর করে রেখে দিয়েছিলাম।  আমার বন্ধুরা মোরাল সাপোর্ট জুগিয়ে চলেছিল।'  যেন প্রয়োজনে একসাথে ঢুকব, চিন্তা করিস না।  '

চিন্তা একটাই ছিল ওপেন সার্জারি যেন না হয় নইলে কাঁথা স্টিচ শিল্প কর্ম নিয়ে ঘুরতে হবে।  মাইক্রো সার্জারি টাই ভালো যাকে বলে গিয়ে সূক্ষ্ণ শিল্প কর্ম। 

দুপুর থেকেই আমার এত বছরের সঞ্চয়রা আসতে শুরু করল মানে আমার বন্ধু বান্ধব।  বোন এসে দাড়িয়ে রয়েছে আর অভয় দিয়ে যাচ্ছে। মা বাবা মালদা থেকে রওনা হয়ে গেছিল, অনেক পরে জানতে পারলাম। 

অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার আগে মা বাবা একবার দেখতে চাইছিল, বোঝানোর চেষ্টা করলাম এমন কিছু বড় ব্যাপার নয়। হাজার হোক মা বাবা।  এক স্টাফ এসে তাড়া দিল নিয়ে চলুন, এক সহৃদয় সিস্টার নরম সুরে বলল ওর মা বাবা আসছে একটু দাড়িয়ে যাও।  উল্টো দিক থেকে উত্তর এল একটু আগে আসতে পারল না?  আমি একটু গম্ভীর সুরে বললাম "ওনারা মালদা থেকে আসছেন" ।  সিস্টার এবার জিজ্ঞেস করল আর কিছু বলবেন?  ভদ্রলোক চুপ করে গেলেন। সার্জেন ভারী মিষ্টি লোক, বলল "তুমি একদম উত্তেজিত হয়ো না, যেরকম হাসি মুখে ছিলে ঐভাবেই থিয়েটারে ঢোকো। 

মা বাবার সাথেও দেখা হয়ে গেল। চারটের সময় লগ্ন ছিল পৌনে পাচটা বেজে গেল।  শেষে লগ্ন ভ্রস্টা না হয়ে যায়, চলুন বলে তাড়া লাগালাম।

আগেই বলেছিলাম অপারেশন থিয়েটারে শতবার এসেছি, কিন্তু স্ট্রেচারে চড়ে নয়।  মাথার উপর যখন LED OT লাইট জ্বলে উঠল, চেনা পরিবেশ অচেনা হয়ে গেল।  ডক্টর বলল এবার তোমাকে ECG ইলেকট্রোড লাগাব।  আমি উত্তর দিলাম Doctor I'm well aware of this set up..  Go ahead..  মাস্ক লাগিয়ে আস্তে আস্তে অক্সিজেন দিতে শুরু করল, ততক্ষণে আমার হাত পা বাঁধা পড়েছে।  এবারে সেভোফ্লোরেন এজেন্ট চার্জ করতেই নাকে গন্ধ এল, বুঝলাম এবার অজ্ঞান হওয়ার পালা।  আঙুল দিয়ে 10-9-8-7 ইশারা করছিলাম। 

মাথাটা ঝিম ঝিম করছিল সামনে মা বাবা বন্ধুদের আবছায়া মূর্তি দেখে বুঝলাম খেলা শেষ।  আমার কলিগদের সামনে আসতে দেখে জানালাম কিভাবে আমাদের কম্পিটিটর কোম্পানির ইক্যুইপমেন্টের কাছে আমি জ্ঞান হারালাম।  তখনও ঘোর কাটেনি তবে বেশ কানে আসল করে কম্ম গায়ে গতরে বেশ বড় হয়েছিল বেয়াদপটা একদিকে ফেটেই গেছিল আর দেরী করলে বড় বিপদ হত।  যাক সে সব কিছু হয়নি।  রাতে জেনারেল বেড এ দেওয়ার পর একটা পেশেন্টের মা ছিল, উনি জিজ্ঞেস করলেন তোমার সার্জারি হয়েছে না।  মাথা নাড়ালাম। উনি বাচ্চাটাকে বললেন দেখ দাদা টার অপারেশন হয়েছে বোঝায় যাচ্ছে না !! মানসিক প্রস্তুতি আর কি!   একটা চওড়া হাসি দিলাম।

ভর্তির দিন থেকে দু দিন আমার মুখ দিয়ে কোনও খাওয়ার ঢোকেনি জলও না।  শিরা উপশিরা গুলো কিন্তু বোতলের পর বোতল টেনে গেছে দু দিন দু রাত।  কিন্তু তাতে কি আর তেষ্টা মিটে? জিজ্ঞেস করলাম কাল টেংরি বেংরি পাওয়া যাবে কি না?  যা চোখ দেখাল মাথা নীচু করে একটু জল দাও না, একটু।   আবার উত্তর এল "না"।

কাল রাতটা বেশ বেগ দিয়েছে তবে আমার বন্ধুরা আর দাদা ভাই বোনরা অসাধারণ, একদম পাশে থেকেছে।  অন্তত বার পঞ্চাশেক বার হুমকি দিয়েছে WhatsApp এ ঘুমিয়ে পড়ার।  একবার তো বোন Facebook এ লিখেই দিল "ওরে তোর আজকেই অপারেশন হয়েছে একটু থাম।"

সব খারাপের একটা ভালো দিক থাকে, অনেককেই বলতে শুনি "বন্ধু একজন দু'জনই হয়, বাকি নাম কা ওয়াস্তে ।  ভুল। অন্তত আমি এত দুর্ভাগা নয়।

আরও একদিন এখানে।  তারপর কাল ছুটি। 

— অভিষেক বোস

No comments:

Post a Comment