শহুরে বাঙালির গড়ে নয় খানা করে কার্ড থাকে । সর্বনিম্ন একটা ডেবিট একটা ক্রেডিট কার্ড, একটা ড্রাইভিং লাইসেন্স, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড, স্মার্ট কার্ড ,আধার কার্ড, আলোকিত কার্ড, প্যান্টালুন গ্রিন কার্ড, ওয়েস্টসাইড ফাইভ স্টার কার্ড ..... । একটা আর্বান চাকুরিজীবীর পকেট নিঁচরোলে আপনি এত কার্ড পাবেন! এত কার্ড ! যা দিয়ে এক সেট তাস বানানো যাবে ।
বছর বিশেক আগে কিন্তু ছিল দুটো বিবর্ন হলুদ কার্ড । একটা রেশন কার্ড আর একটা পোস্ট কার্ড ।
সপ্তাহান্তে তিন দিন বিকেলে লোক বালক মহিলা বর্গ দল বেঁধে রেশন দোকানে যেত ।চাল, ডাল, লাইন টানা খাতা আর কেরোসিন তেল তোলা ছাড়াও লাইনে দাঁড়িয়ে খোস গল্প ছিল রেশন দোকানের অবিচ্ছেদ্য অংশ ।
সপ্তাহান্তে তিন দিন বিকেলে লোক বালক মহিলা বর্গ দল বেঁধে রেশন দোকানে যেত ।চাল, ডাল, লাইন টানা খাতা আর কেরোসিন তেল তোলা ছাড়াও লাইনে দাঁড়িয়ে খোস গল্প ছিল রেশন দোকানের অবিচ্ছেদ্য অংশ ।
টুকটাক পরনিন্দা, সুখ-অসুখের গল্প, নতুন আলমারি, ছাতা, জুতো সবকিছু ।পাশের বাড়ির মেয়েটা কলেজ কেটে কোথায় যায়, পাত্র পাত্রী সম্বন্ধ, হরেক গল্প এক লাইন । তারপর একসাথে ফিরে আসা ।
বাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার থাকায় রেশন দোকানে আমাদের যাতায়াত ছিল না ঠিকই কিন্তু আশপাশের পাড়া প্রতিবেশীরা কার্ডটা ধার নিয়ে যেত । আর আমিও কোনও কোনও দিন পাড়াতুতো লোকদের সঙ্গে যেতাম । লাইনের মুখগুলো সব চেনা হয়ে গিয়েছিল । নামগুলো কোনোদিন জানা হয়নি । আমি যত বড় হচ্ছিলাম রেশন দোকানের লাইনগুলো তত ছোট হচ্ছিল ।
রেশন কার্ডের দূর সম্পর্কের কোনো আত্মীয় না হলেও রেশন কার্ড আর পোস্ট কার্ডের সহাবস্থান ছিল । পোস্ট আপিস থেকে পঁচিশ পয়সা দিয়ে হলুদ পোস্ট কার্ড পাওয়া যেত । একদিক পুরো ফাঁকা আর উল্টো দিকে অর্ধেক টা জুড়ে বাঘের মাথা আর প্রাপকের ঠিকানা লেখার জায়গা । লোকে নিয়ম করে চিঠি লিখত, সাধারণত বাড়ির বড়দের নামে চিঠি দেওয়া হত । শ্রীচরনেষু ইত্যাদি ইত্যাদি.....
পত্রের প্রথমেই আমার প্রনাম নিও.. আমরা সকলেই ভালো আছি, তারপর Cc. Bcc তে পিঙ্কু কে বল পরীক্ষার পর চলে আসতে, মামন কত বড় হল? দিয়ে এক্কেবারে পাশের বাড়ির রুনু পিসির পা ভেঙেছে সব খবরের ফর্দ । কোন এনক্রিপশন নেই, কোনো রাখঢাক নেই, এক্কেবারে খোলা চিঠি দায়িত্ব নিয়ে সপরিবারে পড়া হত । আমরা যারা নতুন নতুন চিঠি লিখতে শিখছি তাদের বিশেষ নজর থাকত বানান ভুলের দিকে । কোনও কোনও চিঠি পৌঁছবার আগে প্রেরক প্রাপকের দু বার দেখা হয়ে যেত ।
এক বিখ্যাত বিজনেস টাইকুনের স্বপ্ন ছিল পোস্ট কার্ডের থেকেও কম দামে মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ।স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে । এখন আমি গড়ে শ খানেক মেসেজ পড়ি।অঙ্ক সাহিত্যের যোগফল আর অজস্র বানান ভুলে ভরা f9
b8r 4m 2d মার্কা মেসেজ । এখন কেউ কারও মেল পড়ে না । উহুঃ ব্যাড এটিকেট । কেউ কারও খবর নেয় না।কোনো পোস্টম্যান বাড়ির সামনে ' চিঠি' বলে হাঁক দেয়না । তবু অকাজের চিঠিগুলো বাতাসে ভেসে বেড়ায় ।
আমার শহরে ফিরলে রেশন দোকানের ঐ নাম না জানা কিছু লোকের সাথে রাস্তায় এখনও কোনও কোনও দিন দেখা হয়ে যায় । রেশন কার্ডও নেই আর পোস্ট কার্ডও নেই, শুধু অজানা নামের চেনা হাসি গুলো রয়ে গেছে......
— অভিষেক বোস

No comments:
Post a Comment