Monday, December 28, 2015

বৃহন্নলা



ট্রেনে উঠে বৃহন্নলার হাতে একবারও হেনস্থা হয়নি, এরকম লোক নেই বললেই চলে । হাততালির শব্দ কানে আসলেই যাত্রী সাধারণ তটস্থ হয়ে পড়ে । যে যার মতো পকেটে হাত ঢুকিয়ে পাঁচ টাকা, দশ টাকা নিয়ে তৈরি থাকে । বৃহন্নলার দল সামনে আসলেই হাতে টাকা দিয়ে রেহাই । যাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা কম তারা দু'রাউন্ড গালাগালি খেয়ে টাকা বের করে আর যারা পোড় খাওয়া জনগন তারা বেশ স্বচ্ছন্দে আলাপ জমিয়ে নেয় । এতক্ষণ ধরে যারা ভাবছেন 'বৃহন্নলা' আমার পরিবর্ত শব্দ চয়ন, তাদেরকে বলি এরা বেশিরভাগই হিজড়ে নয়, আর দুটো শব্দের অর্থ আলাদা ।
এরকমই উত্তরবঙ্গ গামী এক স্বল্প পাল্লার ট্রেনে হাততালির আওয়াজ শুনেই আমি আর আমার সহযাত্রীরা হাতে টাকা নিয়ে তৈরি হয়ে গেলাম । সামনে আসতেই টাকা দিয়ে বেশ একটা নিশ্চিন্ত ভাব । কয়েকজন অল্পবয়সী ছেলের দল বেশ রোয়াব নিয়ে বলল "আমরা স্টুডেন্ট"
"তোমরা স্টুডেন্ট তো আমরা পেপসোডেন্ট, পয়সা দাও হিরো ।"
তারপর টাকা নিয়ে, বৃহন্নলার দল বলল " ঐ শাহরুখ সরো তো একটু বসি, বাকিরাও সলমন, ঋত্বিক, জনি লিভার কে সরিয়ে বসে পড়ল । মিনিট পনেরো পরে পরবর্তী স্টেশনে এক অশক্ত বৃদ্ধা মহিলা ভিক্ষার থলি নিয়ে এল। এবারে কেউ কোনও ভ্রূক্ষেপ করল না । বৃদ্ধার মুখে কোনও বুলি নেই, গালিও নেই । শুধু সামনে হাতটা বাড়িয়ে কাতর ভাবে একটা আর্জি । কেউ কোনো গা করল না, দু একজন পকেট থেকে দু টাকা, এক টাকার কয়েন ধরিয়ে দিল । এবারে যে দৃশ্যটা দেখলাম তার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিলনা । বৃদ্ধা, বৃহন্নলাদের সামনে হাত বাড়িয়ে ভিক্ষা চাইল । দলের একজন বলল “ কি গো, আমাদের কাছ থেকেও পয়সা নেবে নাকি গো? "
অশীতিপর বয়স্কা কি বুঝলেন কে জানে ! হাতটা সামনেই ধরে রেখে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন । আর মস্করা না করে দলের একজন একটা কুড়ি টাকার নোট বাড়িয়ে দিল। আর তারপর সবাইকে অবাক করে বাকি সাতজন বৃহন্নলা কেউ দশ, কেউ পঞ্চাশ, কেউ বিশ টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়ে ছলছল চোখে বৃদ্ধাকে বলল “ মাসি, আমাদের ভালোবাসবে তো? "
— অভিষেক বোস

1 comment: