Wednesday, December 30, 2015

শিউলি আর নলেন গুড়


ভোরের আলো ফোটার আগেই উঠে পড়ল নিতাই । নিতাই মন্ডল 'শিউলি' র কাজ করে । গাছে 'ছে' দেওয়ার পর থেকেই নিতাইয়ের চোখে ঘুম আসে না ।
ওহ্ আচ্ছা, বলতে ভুলে গেছি শিউলি হল গাছি দের নাম । খেজুর গাছে উঠে গাছ চেঁছে যারা রস সংগ্রহ করে তাদের 'শিউলি' বলে।
দখিনা বাতাস যেদিন মুখ ঘুরিয়ে উত্তর দিকে থেকে বইতে শুরু করল নিতাই আশায় বুক বাঁধতে শুরু করেছিল । বছরে এই তিন মাস শিউলির কাজ করলেও নিতাই আসলে খেতমজুর । গেল বছরের বর্ষাতে জমিটা গেল ভেসে ।মহাজনের কাছে মোটা টাকা দাদন নিয়ে নিতাই শীতের অপেক্ষা করছিল । হতচ্ছাড়া শীতটা এল দেরীতে । নিতাইয়ের দ্বিতীয় পক্ষের বৌ মালতী মশারির ভেতর থেকেই আওয়াজ দিল "কি গো জ্বর গা' য়ে বেরোবে ।" নিতাই মালতী কে ঘুমিয়ে থাকার ইশারা করে পা টিপে টিপে বেরিয়ে এল । আগের বোশেখে সুধা কে সাপে কাটার পর, পাড়া পড়শীর চাপে পড়ে নিতাই মালতীকে বিয়ে করে এনেছিল । সুধাকে নিতাই ভুলতে পারেনি, কিন্তু মা হারা বাচ্চাদের কথা চিন্তা করে তিন মাস আগে বিয়ে করেছে নিতাই শিউলি । বেরোবার আগে ছোট মেয়ে লক্ষীর দিকে একবার চেয়ে দেখল ।মেয়েটা এখনও রোজ রাতে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে ।না আর দাঁড়ালে চলেনা । মহাজনের টাকা শুধতে না পারলে বাচ্চা গুলোর মুখে কি তুলে দেবে । ছ' সাত হাড়ি রস জ্বাল দিলে আধা কেজি গুড় হয় । ভোরের আলো ফোটার আগেই রস নামিয়ে আনতে হয় । যত ঠান্ডা পড়বে তত ভালো গুড় হবে । ছেলে ছোকরা গুলো তাড়ির লোভে ঘুরে বেড়ায় । কে কখন হাড়ি খুলে নিয়ে চলে যায় ।
গাছ রোজ রোজ ছাঁচলে গুড় ভালো হয়না। তাই সপ্তাহে বার তিনেক রস নামায় এবং তিনদিন গাছকে বিশ্রাম দেয় । তিনদিন পর প্রথম দিনের রসকে বলে 'জিরেন গুড়'। তৃতীয় দিনের রস হল 'তে-কাট ।
কাঁটার থেকে গা বাঁচিয়ে গাছে উঠে জঞ্জাল সাফ করে 'ছে' দিতে হয় ।এত কষ্ট করে হাড়ি বেঁধে রসে কুয়াশা শিশির পড়লে রসের গুন থাকে না । মাথায় ফেটি বেঁধে, কোমরে নারকোল গাছা জড়িয়ে নিতাই গাছে উঠতে থাকে । উপরে উঠে মাথাটা হঠাৎ ঝিম মেরে ওঠে । দুদিন থেকেই গা টা ছ্যাক ছ্যাক করছিল, হাড়িটা নামাতে গিয়ে নিতাই চোখে অন্ধকার দেখল ।
নিতাই শিউলির অসার দেহটা কেঁপে কেঁপে উঠছিল ।রসের ভাঙ্গা হাড়িটা পাশেই পড়েছিল । মুখের রক্তের সাথে তাজা খেজুর রস মিশে গিয়ে বিস্বাদ লাগল । নিষ্প্রভ চোখটা একবার মহাজনের মুখ মনে করল । বায়োস্কোপের মত চোখের সামনে বাচ্চাগুলোর মুখ ভেসে আসছিল, সুধার মুখটা ভেসে উঠেই চোখটা বুজে এল ।
অবিকাশ মুখার্জি, বনেদি বড়লোক। এই শীতে ভালো নলেন গুড় না আনলে মুখে রোচে না । মুখার্জির ছোট ছেলে লন্ডন থেকে এসেছে । কলকাতার বিখ্যাত দোকান থেকে নলেন গুড়ের সন্দেশ, জলভরা, নলেন গুড়ের রসগোল্লা এসেছে । কলকাতায় এখন সারা বছর নলেন গুড়ের আইসক্রিম পাওয়া যায় । সেসব অবশ্য মুখার্জি চেখে দেখেনি । ছোটছেলে জানাল, খাস বিলেতেও এখন নলেন গুড়ের রমরমা । ওদেশেও এদেশের মতো ডিসেম্বরে লোকজন ফেসবুকে নলেন গুড়ের স্টেটাস দেয় । ছ পাউন্ডে টিনড গুড় পাওয়া যায় । একদম ফ্রেশ ।
— অভিষেক বোস

No comments:

Post a Comment