Friday, March 18, 2022

তিন হাজারি উপকথা

ফুলকপি যেমন শীতের শাহেনশাহ , সজনের ডাঁটা তেমনি বসন্তের বদ্যি। সজনের ডাঁটা না খেলে, ত্থুড়ি ভালো করে চিবিয়ে না খেলে 'বসন্ত ছুঁয়ে যাবে' মার্কা সাবধানবাণী শুনতে হতো। সাধারণত সজনের ডাঁটা, নিমপাতারা আসতো 'ট্রোজান হর্সের' মতো মাংসের জামবাটির সাথে। 

সজনের ডাঁটা, নিম-বেগুন, কোকিলের কুহু আর ফিনফিনে কুয়াশার চাঁদর সরিয়ে হোলিও আসতো। হ্যাঁ হোলি, দোল নয়। দোলের রঙীন দুপুর ফুরিয়ে যাওয়ার আরো একটা রাত অপেক্ষার পর উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় হোলি খেলা হয়। এই যেমন মালদাতে আজ 'দেব দোল'।  মানে আজ শুধু দেবতাদের মূর্তিতে আবির দেওয়া যেতে পারে। পাবলিকের গায়ে রঙ দিলে 'ফাউল'। খুব ছোটবেলায় একবার নিয়ম ভেঙ্গে উত্তম ক্যালানি খেয়েছিলাম।

(বেশ কিছু বছর আগে) শান্তিনিকেতনের বসন্ত উৎসব  তখনও ফরাক্কা ব্যারেজ পেরোয়নি। আর আমি যেহেতু একটু সংস্কারী গোছের তাই একদিন কলকাতায় রঙ খেলতাম আর একদিন মালদাতে।

এই প্রসঙ্গে আদালতের সামনে হলফনামা জমা দিয়ে বলছি যে, মালদাতে আমার হাফপ্যান্ট বেলায় আশেপাশে কাউকে 'ন্যাড়াপোড়া'-তে দেখিনি। যেমন আজ থেকে দশ বছর আগে কোনো ক্লাবকে খুঁটি পূজা করতেও দেখিনি। সেজেগুজে হলুদ পরিধান পরে, মোলায়েম সঙ্গীতের মূর্ছনার সাথে সমান্তরাল অথবা সমকৌণিক রঙের নরম  আঙুলের প্রলেপ আঁকা মুখপটও দেখিনি। এখন শুনেছি শহরের উদ্যানে চিত্রনাট্য মেনে জনগণ রঙ খেলছে। 

                        প্রাকস্ক্রিপ্টেড যুগে হোলির জন্য বরাদ্দ জামাকাপড়রা আকচার শেষবারের মতো আলমারির মুখ দেখতে পেতো। রে-রে করে একদঙ্গল ছেলে-মেয়ে দৌড়ে এসে 'হাজার পাওয়ারি' রঙ আর সোনালী রূপালি 'বার্ণিশ' ঘষে দিয়ে যেতো। যে পাঁচটি দলের মধ্যে খেলা হতো তাদের পরিচয় এরকম — হোলি খেলব না, রঙ খেলব না, আবির খেলব না, লোককে রঙ দিব কিন্তু নিজে নিব না আর সব খেলব। আর এর মধ্যেও কিছু মানুষ মুখে নারকেল তেল মেখে ঘুরে বেড়াতো । এদের মুখে সাধারণত কেউ রঙ মাখাতো না, দাঁতে ঘষে দিয়ে যেতো। শোলে আর সিলসিলার মতো কয়েকটা সিনেমার গান বাদ দিলে হোলির গান আসলে দুর্বোধ্য ।  সারারারা রারারারা ছাড়া আর কিস্যু বুঝতে পারতাম না ! 


মাইরি বলছি, যতই মনুষ্যেতর অথবা না-মানুষের মতো শোনাক — 'হোলি হ্যায়' বলে দৌড়ে গিয়ে কাউকে রঙ মাখিয়ে দেওয়া কিম্বা পিচকিরি দিয়ে রঙ ছুড়ে দেওয়ার মধ্যে যে উন্মাদনা আছে, সেটা বসন্ত এসে গেছে গাইতে গাইতে দু' পাঁক ঘুরে তিন আঙুল দিয়ে আলতো করে আবির মাখানোর মধ্যে কোনোদিনও খুঁজে পায়নি। আমাদের হাতের তালুর রঙ সপ্তাহ খানেক শোভাবর্ধন করতো।

দিনের বেলা জলরঙ খেলে বাড়ি ফিরে বাসন্তী পোলাও আর খাসির মাংসের সুরভি নাকে আসতো । স্নানের পরেও তাতে হাত লাগাতেই হাতের লাল রঙ সোজা পাতে। লাল হলুদ পোলাও খেয়ে ভিসিপি-তে আধা সিনেমা দেখে, আবার বিকেলবেলা থেকে আবির খেলা শুরু করে দিতাম।

সেই সময়ের কথা বলছি যখন পৃথিবীতে 'শুভেচ্ছা যুগ' নেমে আসেনি। তাই 'হ্যাপি হোলি' বলব নাকি 'শুভ দোল পূর্ণিমা' এই নিয়ে কোনো বিতর্ক ছিলনা। সন্ধ্যা একটু জমাট হলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বড়দের প্রণাম করে একটু সন্ধ্যাভোজ সেরে আসতাম। আজও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারবো পাড়ার কোন বাড়িতে পাঁঠার মাংসের ঘুগনি হয় l কোন বাড়িতে জালি মালপোয়া। প্রণাম পর্ব মিটে গেলে পাড়া জুড়ে আবার আবির খেলায় মেতে উঠতাম। আবির যত না গায়ে পড়তো তার থেকে বেশি বাতাসে উড়তো । সোডিয়াম ভেrপার লাইটের বাসন্তী আলোয় বসন্তের বাতাসে ভেসে যাওয়া রঙ-বেরঙের আবির আকাশে রঙীন ক্যানভাস এঁকে দিতো। এরপর রাত বাড়তে থাকতো । বেলাগাম একটা দিন একেবারে কিনারায় এসে পৌঁছতো । শেষে মাথা ঝাড়তে ঝাড়তে একটা সাদাকালো জীবনকে রঙীন করে বাড়ি ফেরার পথে দেখতাম সারাদিনের হুল্লোর কালো পিচ রাস্তার গায়ে লাল, সবুজ এঁকে রেখেছে। দোতলা বাড়ির যে বারান্দা থেকে খেউরি শুনতে হয়েছিলো, তার ঠিক নীচেই হাল্কা আসমানি দেওয়ালে বেগুনি আর গোলাপি রঙের দুটো বড় ছোঁপ লেগে রয়েছে। সারমেয়র দল একটু নিশ্চিন্তে কুন্ডলি পাঁকিয়ে শুয়ে আছে। বাতাস তখনও আবিরের সুবাসে ভারী হয়ে রয়েছে। সেই সুবাস বসন্তের সুবাসের থেকে একটু আলাদা, আবার অনেকটা একই রকম। ঠিক যেমন সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্রর থেকে একটু দূরের শহরগুলোর উৎসব, আনন্দ, উচ্ছ্বাস একটু আলাদা আবার অনেকটা একরকম। এইটুকু টিকে থাক,এই আলাদা টুকুই তো ঐ শহরগুলোর প্রাণভোমরা। সবকিছু একই ছাঁচে, একই মাপকাঠিতে হুবহু এক নাই বা হলো। হাজার হোক, তিন হাজার বছর পুরনো জনপদ বলে কথা। 

— অভিষেক বোস 

No comments:

Post a Comment