Sunday, December 12, 2021

লাস্ট লোকাল

ব্যস্ত হাওড়া স্টেশনের ভেতরেই আরেকটা স্টেশন আছে। নিশুত আঁধারে , ত্রিযামায় সেই অচেনা স্টেশন জানান দেয় তোমার মধ্যেই আমি আছি। সবাই সেই স্টেশন দেখতে পায় না। বিশ্বনাথ সামন্ত দেখতে পায়। এই দুটো স্টেশনের সাথেই ওর পরিচয় আছে। প্রথমবার না হলেও আজকে এই ফাঁকা স্টেশন চত্বরটা দেখে একটা অন্যরকম অনুভূতি হলো। ট্রেন আস্তে আস্তে স্টেশন ছেড়ে বেরোচ্ছে। আঁকাবাকা জটিল রেলপথ একটু পরেই সরল ,সমান্তরাল হয়ে যাবে। ব্যস্ত শহরটা পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে শান্ত পল্লীগ্রামের দিকে। যেখানে এখনও বুড়ো ছাতিম গাছের তলায় চায়ের দোকানে কাঠের বেঞ্চিতে মজলিশ বসে। পুকুর ধারে পরিত্যক্ত নৌকার ছইয়ের মধ্যে কিশোরদের আড্ডা জমে। বৃষ্টি শেষ হলে সোঁদা গন্ধ পাওয়া যায় আর সন্ধ্যা জমাট হলেই টিমটিমে হলদেটে আলো জ্বলে ওঠে। আবার সকাল হলে ঘরের ঘুলঘুলিতে চড়ুই পাখির আনাগোনা শুরু হয়। 

                      রাতে এই সময়ে ঘরফেরতা ট্রেনের সহযাত্রীরা সবাই সবাইকে চেনে। তবে ফেরার সময় কেউ কারো সাথে খোশগল্প করার অবস্থায় থাকে না। সবাই ক্লান্ত, সবার বাড়ি ফেরার তাড়া। শুধু টুকটাক কুশল বিনিময় হয়। সামন্ত অবশ্য গন্তব্য স্টেশনে নেমে কিছুক্ষণ বাল্যবন্ধু অবণী ঘোষের দোকানে আড্ডা মেরে তারপর বাড়ি ফিরবে। বহু বছরের অভ্যেস এখন নেশার মতো হয়ে গেছে।
                            
রাজচন্দ্রপুর পেরোনোর পর সামন্ত ট্রেনের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বুক পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে ফস্ করে জ্বালালো। দু-তিন টান দিতে দিতে ছোটোবেলায় ফিরে গেলো। টুকরো টুকরো সব ঘটনা, একান্নবর্তী বাড়ির উঠোন, উঠোনের মধ্যে একটা বেতের মোড়ায় খবর কাগজ হাতে নিয়ে কালো ফ্রেমওয়ালা চশমা পড়া বড় জেঠু আর তার চারপাশে গ্রহানুপুঞ্জের মতো ছুটে বেড়ানো বালখিল্যবাহিনী। বাল্যকাল কবে হারিয়ে গেছে। কৈশোর, যৌবন চলন্ত ট্রেনের পেছনের স্টেশনের মতো কবে পেরিয়ে গেছে টেরই পাওয়া যায়নি। এখন অন্তিম স্টেশনের অপেক্ষা। সামন্ত সুখটান দিতে গিয়ে খেয়াল করলো, হাতের বিড়ির আগুন কখন নিভে গেছে। চলন্ত ট্রেন, নিভে যাওয়া আগুন আর সামন্তর পেছনে ফেলে আসা সুখসময়, কি অদ্ভুত সমাপতন! 

আরেকটা স্টেশন পেরোলেই গন্তব্য। ওখান থেকে মিনিট পনেরো হাটলেই বাড়ি। রাস্তাটা এবড়ো খেবড়ো, আলো কম । তবে দু আঙুলের ফাঁকে বিড়ি থাকলে কোনো চিন্তা নেই। আরেকবার জামার পকেটে হাত ঢুকিয়ে টের পেলো অন্তিম বিড়িটি একটু আগেই ধোঁয়া হয়ে উড়ে গেছে।

স্টেশনে নেমে আনমনে হাঁটতে হাঁটতে বাল্যবন্ধুর দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মনেই কিসব বিড়বিড় করে বলতে শুরু করলো। আড্ডা বেশিক্ষণ জমলো না। একা একা আর কাঁহাতক কথা বলা যায়। সামনে আবার পনেরো মিনিটের খানাখন্দ ভরা রাস্তা।

               আদ্ধেক রাস্তা পেরোনোর পর সামন্তর মনে হলো আজ একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে। বাল্যবন্ধু কবে সংসারের মায়া কাটিয়ে চলে গেছে। আজ প্রায় তিন মাস হয়ে গেলো। দোকানটা তারপর থেকে বন্ধ হয়ে আছে। সরীসৃপ আর সারমেয়র দল ছাড়া আর কেউ ঐ বন্ধ দোকানের সামনে যায়না। সামন্ত ঐ আবছায়ার সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করছিলো — "অবণী বিড়ি আছে ?"
          
— অভিষেক বোস 

No comments:

Post a Comment