Saturday, April 9, 2022

তারাদের কথা - ১


(ছায়াপথের ওপারে )

এরিক ফন্ দানিকেন (Erich von Däniken) এর নাম আমি সম্ভবতঃ ক্লাস এইটে প্রথম জানতে পেরেছিলাম। এমন কিছু জানার মতো করে নয়, ঐ সিলেবাসের বইয়ের এক দুটো লাইন, ব্যস। 'এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়ালদের' নিয়ে যেসব লেখকের লেখা 'গল্প' গোটা পৃথিবীতে হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলো 'এরিক' এর নাম তার প্রথম সারিতে থাকে । 

                      তারও অনেক আগে ঐ হাফপ্যান্ট বেলায় ছোটো মাসীর কাছে ই.টি -র গল্প শুনতাম (বঙ্কুবাবুর বন্ধু তখনো হাতে পায়নি)। কোনো একটা পেটমোটা পত্রিকাতে ই.টি-র গল্প ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ করা হতো। স্পিলবার্গের ই.টি প্রায় মানুষের মতো দ্বিপদ কিন্তু ছোটখাটো কিম্ভুতকিমাকার এক প্রাণী। এর পরেও যত কল্পবিজ্ঞানের গল্প পড়েছি, তাতে বারবার এরকম ধারণায় দেওয়া হয়েছে যে, ভিনগ্রহীরা মানুষের মামাতো ভাই। লম্বা গলা, বড় মাথা, গোল্লা-গোল্লা চোখ, বরফির মতো কান আর ঘর্ঘর সুরে কথা বলে, এই টুকুই যা তফাৎ । 

এইসবই কল্পবিজ্ঞান আর আষাঢ়ে গল্প ।  কিছু উটকো চিন্তা ভাবনার মানুষ ছাড়া আর কেউ ভিনগ্রহীদের অস্তিত্ব নিয়ে মাথা ঘামায় না। 

ভুলটা ভাঙলো দশ বছর আগে, যখন জানতে পারলাম উপরের উদাহরণগুলো মস্তিষ্কপ্রসূত গল্প হলেও পৃথিবীর একটা বড় সংখ্যক কসমোলজিস্ট, অ্যাস্ট্রোফিজিসিস্ট, অ্যাস্ট্রোবায়োলজিস্টরা প্রতিনিয়ত একটাই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছেন  'এই মহাবিশ্বে আমরা কি একা !?' 

এই যে মহাবিশ্বের কথা বলছি সেটা ঠিক কতো বড়? ফ্ল্যাট কিনতে যাওয়ার সময় আমার মাথায় ছিলো ঠিক কতো 'স্কোয়ার ফিট' জায়গা হলে ঠিকঠাক একটা ফ্ল্যাট হবে। ছোটবেলায় যে মালদা DSA-র মাঠে ফুটবল খেলতাম তার কাছে ফ্ল্যাটের ঐ জায়গাটুকু কোনো হিসেবের মধ্যেই আসবে না। একটা গোটা দেশের নিরিখে ঐ মাঠটার আয়তন কিস্যু না। এতো বড় দেশ ভারত, সেটাও নাকি পৃথিবীর ২.৫ শতাংশেরও কম ভূখন্ড। বিপুলা সেই পৃথিবীর মতো তেরো লক্ষ পৃথিবী (Volume) সূর্যের মধ্যে সেঁদিয়ে যাবে। 

সেই বিরাটবপু সূর্য নাকি আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির একটা মামুলি নক্ষত্র। এর থেকে কয়েক'শ গুণ বড়  (Diameter) নক্ষত্র আমাদের গ্যালাক্সির মধ্যেই রয়েছে। এরকম ছোট - বড় মিলিয়ে মিল্কিওয়েতে দশ হাজার কোটি নক্ষত্র থাকার সম্ভাবনা রয়েছে (খালি চোখে পরিস্কার আকাশে আমরা এই হাজার পাঁচেক তারা দেখতে পাই)। একেকটা নক্ষত্র থেকে প্রতিবেশি নক্ষত্র কত দূরে রয়েছে তার একটা উদাহরণ দিই। সূর্য থেকে নিকটতম নক্ষত্রের দূরত্ব চল্লিশ লক্ষ কোটি কিলোমিটারের বেশি ( 268,770 AU) । যেখান থেকে পৃথিবীর বুকে আলো এসে পৌঁছতে সময় লাগে 4.25 বছর। আর পুরো মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিটা ঠিক কতটা বড়? আলোর গতিতে মিল্কিওয়ের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে সময় লাগবে এক লক্ষ বছর! 

আমরা আছি মিল্কিওয়ের কেন্দ্র থেকে অনেকটা দূরে ঐ কলকাতার পাশে হরিণঘাটার মতো জায়গায়। ছোটবেলায় যে শেখানো হয়েছিলো, সূর্য একজন সুবোধ বালক যে একজায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেটা নেহাতই গপ্পো । সূর্য তার ছানা-পোনা পরিবার নিয়ে মিল্কিওয়ের কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে। এইভাবে একবার চক্কর কাটতে সূর্যের পঁচিশ কোটি বছর সময় লাগে (One Galactic year) । শেষবার যখন সৌরপরিবার গ্যালাক্সির এই জায়গায় ছিল যেখানে আজ রয়েছি তখন পৃথিবীর বুকে ডায়নোসর যুগ সদ্য হামাগুড়ি দিতে শুরু করেছে । মানুষ নামের দুপেয়ে দুর্বল প্রজাতিরা তখন কোথায়!? আরো প্রায় চব্বিশ কোটি বছর পর প্রথম মানুষের পূর্বসুরীরা পৃথিবীর মাটিতে জন্ম নিল। আবার যখন পঁচিশ কোটি বছর পর আরো একটা 'গ্যালাক্টিক' বছর পার হবে, কে জানে এই সভ্যতার কোনো চিহ্নও থাকবে কি না! হয়তো নতুন কোনো প্রাণের উদ্ভব হবে কিম্বা পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে প্রাণের শেষ চিহ্ন। প্রতিবার পৃথিবীর বুকে প্রাণ বিলুপ্তির ঘটনার পরই আরো উন্নততর প্রাণের উদ্ভব হয়েছে। 

এতো বড় মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি কিন্তু মহাবিশ্বের পরিবারে
একটা লাল পিঁপড়ের থেকে বেশি কিছু নয়। এর থেকে ছোট বড় মিলিয়ে দু লক্ষ কোটির বেশি গ্যালাক্সি রয়েছে (observable universe) । সাম্প্রতিক একটা গবেষণা বলছে  সম্ভবত আরো দশ গুন বেশি গ্যালাক্সির অস্তিত্ব রয়েছে। এর কোনো শেষ নেই, কোনো সীমা নেই, প্রতিমূহুর্তে এই সীমানা বেড়েই চলেছে। 

একটা সোডা স্ট্র চোখের সামনে নিয়ে আকাশের দিকে তাকালে যেটুকু আকাশ দেখা যায় সেইটুকু শূন্যের মধ্যে হাজার খানেক গ্যালাক্সি থাকতে পারে । এই অনন্তের অসীমের প্রান্তে আর কোথাও কোনো প্রাণের চিহ্ন নেই, কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর অস্তিত্ব নেই, কোনো দিনও ছিল না কিম্বা কোনোদিনও উন্নততর প্রাণের সৃষ্টি হবে না এমন দাবি আর যেই করুক মহাকাশ বিজ্ঞান কোনোদিনও করেনি। উল্টে NASA, ESA, JAXA র official website এ নিয়ে গভীর আলোচনা রয়েছে, পরবর্তী অভিযানের হদিস রয়েছে। প্রশ্নটা আদিম, উত্তরটা এখনো অধরা। এই এতো বড় মহাবিশ্বে শুধু আমরাই আছি, আর কেউ কোথাও নেই!? নাকি ওপারে নীল তারাদের দেশে কেউ অপেক্ষা করছে একই প্রশ্ন নিয়ে?...............(ক্রমশ) 

— অভিষেক বোস

No comments:

Post a Comment