Saturday, May 28, 2022

তারাদের কথা —৩


(লাল মাটির পৃথিবী) 

গৌড়ের সবুজ মাঠে পিকনিক করতে যেতাম আমরা। মাঠের সামনে মিনা করা স্থাপত্যগুলোর উপরে পা রেখে দাঁড়িয়ে মনে হতো, একদিন এখানেই রাজা-বাদশাহরা চলাফেরা করতো। আজ যেখানে সন্ধ্যা হলেই ঝুঁপ করে অন্ধকার ঘিরে ধরে, একসময় আলোতে ঝলমল করতো। তারপর একদিন সব মাটির গর্ভে চলে গেল। একটা পুরো জলজ্যান্ত নগরী ইতিহাসের পাতার তলায় চাঁপা পড়ে গেলো। 

সময়! 
আজ যেখানে ঝকঝকে শপিং মল, বহুতল বাড়ি, আর একটা সভ্যতা তার শিখরে আছে, হাজার বছর পেরিয়ে সেখানে হয়তো শুধু ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকবে। তারপর একদিন সেসব ধ্বংসাবশেষের শেষ চিহ্নও মুছে যাবে। তখন যদি কোনো আগামী সভ্যতা সেখানে পা রেখে দাঁড়ায়, কখনো কি তারা জানতে পারবে, 'হাজার বছর আগে এখানে জীবন কত চঞ্চল ছিলো !?' 

পৃথিবী নামের আগুনের গোলাটাও একদিন বরফে মুড়ে গিয়েছিল। তারপর একদিন বরফ সরে গিয়ে জীবন তার আজকের নীল সবুজ রঙ পেলো। বহির্বিশ্বে প্রানের সন্ধান করতে গিয়ে এই কথাগুলো মনে রাখতে হয়। 

নক্ষত্রের চারপাশে যে গ্রহগুলো ঘুরে চলেছে তাদের মধ্যে যারা এমন দূরত্বে রয়েছে, যেখানে না তো ভয়ঙ্কর গরম না অবিশ্বাস্য রকম ঠান্ডা, সেখানেই পাওয়া গেলেও পাওয়া যেতে পারে 'জলের অস্তিত্ব' । প্রাণের উপযোগী পরিবেশ। আর এই জায়গাকে বলা হয় Habitable Zone (Goldilocks zone)। হাজার কোটি গুণ বেশি ঔজ্জ্বল্যের নক্ষত্রের সামনে গ্রহের প্রতিফলিত আলো এতটাই ম্লান যে সরাসরি এক্সোপ্ল্যানেটের সনাক্তকরণ করা প্রায় দুঃসাধ্য কাজ। তাই Transit Method এর মতো পরোক্ষ পদ্ধতিগুলোর সাহায্য নেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে প্রদক্ষিণ করার সময় যখন কোনো গ্রহ, নক্ষত্রের ডিস্ক-এর সামনে চলে আসে তখন নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্য সামান্য কমে আসে। এই কমে আসার তারতম্য দেখে গ্রহের আকার সম্বন্ধেও একটা ধারণা পাওয়া যায়। পৃথিবীর তাবড় তাবড় স্পেস রিসার্চ ইন্সটিটিউট এক্সোপ্ল্যানেটের খোঁজে এইধরণের অসাধ্য সাধন করে  চলেছে। আর দূর থেকে দূরতম ছায়াপথের অজানা তথ্যকে জানার সাথে সাথে আমাদের প্রায় অচেনা প্রতিবেশী গ্রহদের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টাও করে চলেছে। 

দৃশ্যমান মহাবিশ্বে অন্ততঃ কয়েকশ কোটি গ্রহ রয়েছে যারা সম্ভবতঃ Goldilocks Zone এর মধ্যে প্রদক্ষিণ করছে আর আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী গ্রহ রয়েছে Habitable Zone এর বহিঃসীমারেখার সামান্য বাইরে। স্বভাবতই মহাকাশ বিজ্ঞানীদের চোখ গিয়ে পড়লো লাল মাটির পৃথিবীর দিকে। জল, অক্সিজেন, তাপমাত্রা ছাড়াও আরো একটা উপাদান রয়েছে যার অনুপস্থিতিতে মূহুর্তের মধ্যে প্রাণ নিশ্চিন্ন হয়ে যেতে পারে। 'চৌম্বক ক্ষেত্র' (Magnetic field) । 

চৌম্বকক্ষেত্র না থাকলে সৌরবায়ু ( stream of charge particle) পৃথিবীর বুক থেকে প্রাণের উপস্থিতি নিশ্চিহ্ন করে দিতো। লাল গ্রহেরও একসময় নিজস্ব চৌম্বকক্ষেত্র ছিলো। তারপর একদিন মঙ্গলগ্রহ তার 'ম্যাগনেটিক ফিল্ড' হারিয়ে ফেলল। সূর্য্যরশ্মি লাল গ্রহের বায়ুস্তরকে ছিন্নভিন্ন করে দিলো। বায়ুমন্ডলের ঘনত্ব কমতে শুরু করলো আর  বায়ুমন্ডল ক্ষীণ হওয়ার সাথে সাথে মঙ্গলপৃষ্ঠের জলও ধীরে ধীরে উধাও হয়ে গেল। লাল গ্রহের আজকের হিমশীতল, মরুভূমির মতো অনুর্বর, ধূলোঝড়ে ঘেরা চেহারার সাথে অতীতের কোনো মিল নেই। এখনো অব্দি যতটুকু তথ্য পাওয়া গেছে তাতে এতটুকু পরিস্কার সেদিনের মঙ্গলগ্রহ একটা অন্যরকম জগৎ ছিলো। প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক হ্রদ, বহমান জলখাত বারবার ইঙ্গিত দেয় একসময় এখানেও প্রাণের অনুকুল উষ্ণতা ছিল, বায়ুমন্ডল ছিল, নদীসদৃশ জলের প্রবাহ ছিল, চৌম্বকক্ষেত্র ছিল আর হয়তো এককোষী, বহুকোষী কিম্বা আরো উন্নত প্রাণ ছিল। আনুমাণিক চার হাজার কোটি বছর আগে প্রায় পঞ্চাশ কোটি বছর ধরে চলা অবক্ষয়ের পর সেসব ইতিহাসের হদিস অনেক নীচে চাপা পড়ে আছে। চার হাজা-আ-র কোটি বছর। মাত্র পঁচিশ কোটি বছর আগেও পৃথিবীর বুকে ডায়নোসরেরা হেঁটে বেড়াতো। আমাদের চেনা পরিচিত জগতে আমাদের কল্পনাতীত আদিম পরিবেশ ছিল। তারও আগে পৃথিবীর বুক থেকে ভয়াবহ দুর্যোগ একাধিকবার সামুদ্রিক আর ভূপৃষ্ঠের সমস্ত  জীবপ্রজাতিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। আবার নতুন করে প্রাণের উদ্ভব হয়েছে, বিকাশ হয়েছে।  একটা সামান্য গ্রহাণু পৃথিবীর বুক থেকে সবথেকে শক্তিশালী, সবথেকে বিশাল প্রাণীদের জীবাশ্মের তলায় পৌঁছে দিয়েছে। মাত্র পঁচিশ তিরিশ বছর আগেও আমাদের চারপাশের পরিবেশটা ছিল আজকের থেকে ভীষণরকম আলাদা । চার হাজার কোটি বছর আগে কতটা আলাদা ছিল তার অনুমাণ করাটাও অসম্ভব। মহাবিশ্বের সাপেক্ষে কয়েক কোটি বছর সময়টা তেমন কোনো বড় সংখ্যাই নয়। অথচ আগামী যেকোনো মূহুর্তে এরকম দুর্যোগ আবার নেমে আসতে পারে। সভ্যতার শেষ চিহ্নটুকু ধূলোকণায় মিশে যেতে পারে।  লালমাটির পৃথিবীর মতো আমাদের পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র হারিয়ে যেতে পারে। অন্তঃসলিলা নদীগুলো থেকে শুরু করে হিমবাহ অব্দি বিলোপ পেতে পারে। তারপর পাশাপাশি দুটো মরুভূমি সদৃশ, জীবনের অস্তিত্ব হীন শীতল গ্রহ, গভীর রাতের আকাশে শুধু অতীতের স্মৃতিভার নিয়ে অবিরত ঘুরে বেড়াবে। হয়তো সেদিন সৌরজগতের অন্য কোনো কোণায় প্রাণের উদ্ভব হবে।  তারপর একদিন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করে সেই জগতের প্রাণে বুদ্ধিমত্তা আর অনুভূতির বিকাশ হবে। সেদিন সেই দুনিয়ার একজোড়া অনুভূতিপ্রবণ প্রাণী যদি রাতের আকাশে পাশাপাশি দুটো লাল আর নীল গ্রহের দুনিয়ায় দিকে তাকিয়ে দেখে ভাবে " মহাবিশ্বে কোটি কোটি গ্রহ, উপগ্রহের মধ্যে শুধু আমাদের এই গ্রহতেই প্রাণের অস্তিত্ব ছিল, আছে আর থাকবে!!" 

— অভিষেক বোস

No comments:

Post a Comment