এরকম জোরালো সওয়াল জবাব এই কোর্টরুম চত্বরে বহুদিন শোনা যায়নি। অন্তত পুরনো যারা আছে, তাদেরও মনে পড়ছে না। সরকার পক্ষের দুঁদে উকিল সুচরিত সামন্ত গলার পারদ চড়িয়ে শুরু করলেন 'ধর্মাবতার এ কোনো সাধারন মামলা নয় বরং সুপরিকল্পিত ভাবে এতদিনের বিশ্বাস আর সংস্কৃতির উপর আঘাত হানার চেষ্টা। শুধু তাই নয়, এই ধরনের সাংঘাতিক সংযোজন একটা সমাজ ব্যবস্থাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে পারে। আমার বিনীত অনুরোধ, এইধরনের অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের আবেদন কে নাকচ করে মহামান্য আদালত মানুষের বিশ্বাসের মর্যাদা রাখুক। '
আবেদনকারীর পক্ষে বিবাদী উকিল প্রতীক মুখার্জি আস্তে আস্তে চেয়ার থেকে উঠে এলেন। স্মিতহাস্য ভদ্রলোক চশমার কাঁচ মুছতে মুছতে সহজ অথচ জোরালো গলায় বলতে শুরু করলেন ' কোন বিশ্বাস আর সমাজ ব্যবস্থার কথা বলা হচ্ছে জজ সাহেব!? পৃথিবীর কোনো সভ্যজগতে এই ব্যবস্থা আর বৈষম্য নেই। একই জন কে ঘরের ভিতর সমাদর করে রাখা হয় আর আনন্দ অনুষ্ঠানে ব্রাত্য করে রাখা হয়! শুধু তাই নয়, একই শ্রেণীর বাকিদের প্রতি এরকম কোনো দ্বিচারিতা নেই! '
সামন্ত উত্তেজিত গলায় অবজেকশন জানাতে জানাতে বললেন 'তার কারন যুগের পর যুগ এই ব্যবস্থা পরম্পরার মজ্জায় মজ্জায় বসে গেছে আর আজ অবধি কেউ কোনোদিন এর প্রতিবাদ করেনি। '
মুখার্জি গলার স্বর উঁচু না করেই বলতে শুরু করলেন ' যুগ যুগ ধরে চলে আসা রীতি যুগপোযোগী কিনা, তা এবার ভাবার সময় এসেছে। আর কোন পরম্পরার কথা বলছেন মুখার্জি সাহেব!? ফি বছর যে ব্যবস্থায় নতুন নতুনদের জন্য জায়গা করে দেওয়া হচ্ছে, সেখানে কোন অপরাধে এক বিশেষ শ্রেণীকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে? আমি আদালতের কাছে আজ জানতে চাই যে আদালত সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে আমাদের সত্যিকারের সংস্কৃতি, কৃষ্টি কে জায়গা করে দিবে নাকি শুধু বিদেশীদের সংযোজনকে সুরক্ষিত করবে। আমরা বিদেশীদের বিরুদ্ধে নয় কিন্তু নিরপরাধের যোগ্য সম্মান আদায় করে দেওয়া আদালতের কর্তব্য। '
কথাগুলো শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আদালতে অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে। একটু ভাবুক দৃষ্টি দিয়ে বৃদ্ধ জজ সাহেব কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করে রাখেন। হয়তো স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন। চোখ খুলে দৃপ্ত কন্ঠে জানালেন 'বাদী বিবাদী দুপক্ষের সমস্ত বয়ান সহানুভূতির সাথে শোনার পর এই আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, যে দীর্ঘদিন চলে আসা নিয়ম সময়ের প্রয়োজনেই পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। আদালত আরো মনে করে এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই কোনো বিশ্বাস আর পরম্পরাকে আঘাত করে না বরং এইধরনের সংযোজন আমাদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে আরো মজবুত করে। ঘরের মধ্যে যাকে ভালোবাসা যায়, আনন্দ অনুষ্ঠানেও তাকে সাথে রাখা যায়। এই আদালত আজ থেকে আলু পোস্তকে বিয়েবাড়ির মেনুতে আইনতঃ স্বীকৃত বলে ঘোষনা করছে এবং সমস্ত বাঙালিদের এই আবেদন করছে আপনারা মেনুতে আলু পোস্ত রাখুন। লক্ষ্য রাখবেন যাতে আলু পরিমিত ভাজা হয় আর পোস্তর পরিমাণ যথেষ্ট হয়। কাঁচা শিল্পীর হাতে এই শিল্পকে ছেড়ে দিবেন না। মনে রাখবেন সামান্য কম বেশি জল, আলুপোস্তর সর্বনাশ করে দিতে পারে। আদালত মনে করে, বাঙালি বিয়েতে মাটন বিরিয়ানি আর হাক্কা নুডুল থাকুক কিন্তু ঝর্ণা ঘি সুরভিত আর আধ চেরা কাঁচা লঙ্কা শোভিত আলুপোস্তও যেন দূরে না থাকে। '
দূরে তখন কারা যেন বাজিয়ে দিয়েছে " ভাজল তোমার আলুর মেনু......."
- অভিষেক বোস
No comments:
Post a Comment