Sunday, November 22, 2015

লোডশেডিং




রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের সাথে ছোটবেলায় বাড়ি ফেরার একটা অদ্ভুত সম্পর্ক ছিল । প্রায়ই শুনতে হত "রাস্তার লাইট  জ্বলে গেছে, এখন বাড়ি ঢুকছিস" কে বোঝাবে আজ পাড়া কাঁপানো পারফরমেন্স  দিয়েছি খেলার মাঠে , সুমন দা যাকে সবাই জন্টির ভাই মন্টি বলে ডাকে সে অব্দি হাততালি দিয়েছে । আর আমার বাড়িতে তুলকালাম রাস্তার লাইট জ্বলে গেছে! এইজন্য এই দেশের কিছু হল না! মুখরা ছেলে, তাই বলেই ফেললাম কথাটা রাস্তা র লাইট যদি না জ্বলে তাহলে কি আমার বাইরে থাকা চলবে? এরকম তর্ক বাগীশ এর সাথে তর্ক বৃথা অতএব আমার মা রণে ভঙ্গ দিল, কিন্তু ততক্ষণে আমি নিউটনের মোক্ষম সূত্র পেয়ে গেছি সন্ধ্যা বেলায় বাড়ি ফেরা রাস্তার লাইট জ্বলে ওঠার সাথে ইনভার্সলি প্রপর্সোনাল  । দু চারদিন ইট পাটকেল দিয়ে চেষ্টা  করলাম, যখনই হাতে ইট তুলি কেউ না কেউ দেখে ফেলে । অতএব লোডশেডিং এর শরণাপন্ন । লোডশেডিং হয়েছিল কিনা সে গল্প থাক কিন্তু আমি লোডশেডিং কে ভালোবেসে ফেললাম । ঐভাবে তাকানোর কিছু নেই আমি এখনও ভালোবাসি ।অনেক আগে লোডশেডিং মানেই পড়া থেকে ছুটি । এরপর জ্বলে উঠবে মোমবাতি, লণ্ঠন, ডিমলাইট, ইমার্জেন্সি লাইট , যার যেমন সঙ্গতি  । আমি যেখানে পড়তে যেতাম সেখানে ছিল ডিমলাইট, জ্বলে উঠলেই অনেকে গঙ্গাফড়িং ধরা প্র্যাকটিস  করত আর আমি নখের ডগায় জল নিয়ে দিতাম কাচের উপর ছিটিয়ে, ব্যস ডিমলাইটের ডিম নিমেষে চৌচির । আরও ছোটবেলায় গরম কালে রাতের বেলা আমরা মাঠে খেলতে যেতাম, দাদুরা বসে বসে গালগল্প করত আর আমরা মাঠ জুড়ে ছুটে বেড়াতাম, তারপর রাত য়খন আরও বাড়তো আর জাম গাছের পেঁচা ডেকে উঠতো তখন দূর থেকে “ গরম ভাজা... " শুনতে পেতাম । লোকটাকে কোনওদিন চোখে দেখিনি আর গরম ভাজা চেখে দেখিনি কিন্তু বড়দের কাছে শুনতাম ওদের ছোটবেলা থেকে নাকি লোকটা আসে, সুর টা এখনও মনে আছে ।
এরপর গরম পেড়িযে যেদিন প্রথম বৃষ্টি নামবে সেদিনও তার সাথে থাকত লোডশেডিং, আর তারপরে বর্ষার সময় লোডশেডিং আর ভুতের গল্প ছিল Deadly combo। অন্ধকারের মধ্যে যখন পেঁয়াজি ভাজার গন্ধ আসত কে জানে অজান্তে পুকুর পাড়ের ভুতও এসে জুটত কিনা ! এরপর যখন গল্প জমে উঠেছে ঠিক তখনই বেরসিকের মত কারেন্ট চলে আসত আর ছন্দ টা কেটে যেত ।

এরপরে কালীপুজোর রাতের অন্ধকার তো আমার সবচেয়ে বড় ফ্যান্টাসি .... দিওযালির রাতের অন্ধকারেই তো দূর হয়ে যায় সব কিছু অশুভ ।

শীতের রাতে যখন কোনও বিয়ে বাড়ি থেকে হেটে ফিরতাম আর লোডশেডিং হয়ে যেত তখনই জ্বলে উঠত তিন ব্যাটারির টর্চ, টর্চ জ্বালিয়ে রাখার মধ্যে কোনও শিল্প  নেই তাই সবার সামনে থাকা আমি ঠিক ঠিক জায়গায় টর্চ জ্বেলে রাস্তা দেখিয়ে দিতাম... টর্চ অন অফ  করতে করতে কখন যে হাতের টর্চ টা মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট  হয়ে গেছে ! তবে 
অন অফ  করার অভ্যেস টা এখনও যায়নি .......... 

পুনশ্চ : এখন লোডশেডিং না হলেও অনেক রাতে ফিরি, তবে বাড়িতে নয়, অন্য শহরের ফ্ল্যাট - এ আর ল্যাম্পপোস্ট  গুলো সারারাত জ্বলে থাকে..


-অভিষেক বোস

1 comment: