(চাঁদের দেশে)
কিশলয় বেলায় মনে হতো চাঁদ আমার সাথে চলছে। আমি থামলে থামছে। আমি চলতে শুরু করলে, আমার পিছু করছে।
___________________
পৃথিবীর মাটিতে দাঁড়িয়ে যা কিছু খালিচোখে দেখা যায়, চাঁদ তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চিত্তগ্রাহী।
বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে কেমন একটা ভাবুক বানিয়ে ছাড়ে। লোকে কবিতা-টবিতা লিখে ফেলে। গানের কলি গুনগুনিয়ে নেয়। তারপর একদিন জানতে পারে চাঁদের শুধু একটা দিকই আমরা দেখতে পেয়েছি!
গত সপ্তাহের রাতে আরো একবার বুঝলাম যে মানুষ আসলে
নরম-সরম মনের আবেগপ্রবণ প্রাণী । চাঁদের ঠিক নীচে শুক্র গ্রহকে দেখে সবাই কেমন অসময়ে খুশি হয়ে উঠল! পয়সা দিয়ে কিনতে হয় না এমন আনন্দ ছাড়া মানুষ সব খুশিকেই ভাগ করে নিতে চাই। হাজার হাজার লোক , ফেসবুকে কাঁপা কাঁপা হাতে তোলা অস্পষ্ট ফোটো পোস্ট করল। ফোন করে প্রিয়জনদের একবার ফাঁকা জায়গায় গিয়ে আকাশের দিকে তাকাতে বলল। সে'সব নিয়ে আরেকদল বলল — দ্যাখো, আমরা কিন্তু সবার থেকে আলাদা। আমরা আজ ফোটো পোষ্ট করিনি। আমরা Lunatic নই, চন্দ্রাহতও নই।
যাই হোক, দিনের শেষে চৈত্রের সন্ধ্যায় কিছু মানুষ অনেকদিন পর রাতের আকাশের দিকে চেয়ে থাকল। অল্প কিছুক্ষণের জন্য হলেও জাগতিক অভাব অভিযোগ সুখ দুঃখ ভুলে দুম করে খুশি হয়ে উঠল। এটাকেই বোধহয় মহাজাগতিক ঘটনা বলে!
____________
সবথেকে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব (বৈজ্ঞানিক অনুকল্প) অনুযায়ী, একটা অমঙ্গল, ত্থুড়ি মঙ্গলগ্রহের আকারের একটা গ্রহ সাড়ে চার হাজার কোটি বছর আগে পৃথিবীর উপর আছড়ে পড়ে। অনুকল্পিত 'থিয়া' নামের ঐ গ্রহের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষের পরে মহাকাশে ভাসমান অসংখ্য টুকরোগুলো একসময় জড়ো হয়েই আজকের চাঁদের চেহারা পায়। যদি না হতো!? না হলে হয়তো পৃথিবীটাই অন্যরকম হতো! রাতের আকাশের সবথেকে উজ্জল জ্যোতিস্ক চাঁদ, এই টালমাটাল পৃথিবীকে নিজের অক্ষের উপর থিতু হতে সাহায্য করেছে। ফলে পৃথিবীতে আপাত সুস্থিত জলবায়ু আছে। মাটির পৃথিবী আরো একটু বেশি জীবনের উপযোগী হয়ে উঠেছে।
আর এইরকম পরিবেশ পেয়েই হয়তো মানুষের মতো উন্নত প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে। তারপর সেই মানুষ চাঁদের ছবি এঁকেছে। কবিতা, গান লিখেছে। ফোটো তুলেছে, দূরবীন নিয়ে চেয়ে থেকেছে। এমনকি চাঁদের পাথুরে মাটিতে বিজয় পতাকা গেঁথে দিয়ে এসেছে। কিন্তু এখানেই থেমে থাকেনি। পৃথিবীর মতো মহাকাশের জন্যও লিখিত আইন থাকলেও ( Outer space treaty) সেসবের তোয়াক্কা না করে চাঁদের বুক থেকে Helium-3 তুলে আনার পরিকল্পনা করে চলেছে। পৃথিবীর সমস্ত জ্বালানির উপাদান পুড়িয়ে শেষ করে এবার ভবিষ্যতের জ্বালানির খোঁজে কয়েক দশক পরে আবার নতুন করে একের পর এক চন্দ্রাভিযান করে চলেছে।
চীন চাঁদের উপর নিজেদের একটা স্থায়ী আস্তানা গড়তে চাইছে (moon base) । ওদের দেশের স্পেস এজেন্সি কিছুদিন আগে রাশিয়ার সাথে এই পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। আমেরিকাও নিজেদের human base বানাতে চলেছে (Artemis Mission)। আগামী দিনে মহাকাশে আরো দূরে পাড়ি দেওয়ার পরিকাঠামো তৈরি হচ্ছে।
এই সব কিছুকে হার মানাবে এমন এক পরিকল্পনা, যেটা আমাদের ভাবনার সীমানা থেকেও আরো অনেএএক দূর। যতই বিপুলা পৃথিবী বলি না কেন, আসলে তো ব্রহ্মান্ডের ক্যানভাসে সামান্য একটা নীলচে বিন্দুর থেকে বেশি কিছু নয়। মহাকাশে নিয়মিত ঘটে চলা, একটা গামা রে বিস্ফোরণ পৃথিবীতে পৌঁছলে নিমেষে প্রাণের অস্তিত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে। একটা সামান্য গ্রহাণু পৃথিবীর বুক থেকে ডায়নোসরদের প্রজাতিকে বিলুপ্ত করে দিয়েছিল। ভবিষ্যতেও এরকম প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা প্রবল। এরকম কোনো মহাজাগতিক দুর্ঘটনা যে ঘটবেই সেটাই পৃথিবীর ভবিতব্য!
তাই আজ না হোক কাল এই দুনিয়ায় নরম মাটির মায়া কাটিয়ে কোনো অজানা পৃথিবীর পাথুরে মাটিতে পৌঁছে আমাদের মাল্টিপ্ল্যানেটারি স্পিসিস হয়ে উঠতে হবে। যাতে কোনো একটা দুনিয়ায় এরকম দুর্ঘটনা ঘটলেও, আরেকটি দুনিয়ায় মানুষ নামের অসহায় জীব বিলুপ্ত হওয়া থেকে বেঁচে যেতে পারে।
কিন্তু দ্বিতীয় দুনিয়া খুঁজে পাওয়ার আগেই যদি এরকম কোনো বিপদ নেমে আসে!? সেটা আন্দাজ করেই জীববৈচিত্র্যের মধ্যে ষাট লাখের বেশি প্রজাতির DNA পৃথিবীর বাইরে সংরক্ষণ করে রাখার কথা ভাবা হয়েছে। আর এই আধুনিক nohas ark এর ঠিকানার নাম 'চাঁদ' । চন্দ্রপৃষ্ঠের মধ্যে খুঁজে পাওয়া প্রায় দুশোর বেশি লাভা ট্যিউব নেটওয়ার্কে থাকবে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের আগামী দিনের ইনস্যুরেন্স। সোলার রেডিয়েশন, ক্ষুদ্র উল্কাপিন্ড, তাপমাত্রার তারতম্যের থেকে রক্ষা পাওয়ার উপযুক্ত, পৃথিবী থেকে অনেক দূরে, এই লাভা ট্যিউবে সোলার প্যানেলের সাহায্যে মাইনাস একশ আশি ডিগ্রির নীচের উষ্ণতায় সংরক্ষিত থাকবে ভবিষ্যতের প্রাণের ঘুমন্ত বীজ।
_______________
শহর থেকে অনেক দূরে যেখানে এখনো চোখ ঝলসানো আলোয় রাতের আকাশ দূষিত হয়ে যায়নি। যেখানে এখনো জোছনা রাতে নরম আলোয় গলি রাস্তা ভেসে যায়। যেখানে মা, ঠাকুমার কোল ঘেষে কিশলয় পাঠ শেষ করে শিশুমন চাঁদের বুড়ির গল্প শুনতে চায় আর রাতের আকাশে দিকে তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবে— 'এই বুঝি চাঁদ আমার সাথে সাথে চলছে, আমি থামলে থামছে। আমি চলতে শুরু করলে, আমার পিছু করছে।' সে শিশুও একদিন জানতে পারবে চাঁদ আমাদের সবার থেকে, এই পৃথিবীর থেকেও একটু একটু করে দূরে সরে যাচ্ছে। এইভাবেই সরে যেতে যেতেই একদিন এতো দূরে চলে যাবে যেদিন খালি চোখে আর চাঁদ দেখা যাবে না !
— অভিষেক বোস
1st April, 2023
No comments:
Post a Comment