Saturday, April 1, 2023

বাড়ি থেকে পালিয়ে

তখন মনে হয় পাঁচ ক্লাসে পড়ি কিন্ত 'পড়া-শোনা' নিয়ে আমার উৎসাহ আরো অনেক আগে থেকে। পড়ার ফাঁকে (গল্প) শোনা আর পড়তে পড়তে গড়িয়ে পরায় আমার জুড়ি মেলা ভার। তবে সত্যি সত্যি পড়াও আমি প্রচুর পড়েছি । দ্বিস্তর বই নিয়ে আমার বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে। দ্বিস্তরে বাইরের স্তরে থাকত স্কুলের বই আর ভিতরের স্তরে গল্পের বই। বইয়ের গল্প আর গল্পের বইয়ের মধ্যে ফারাক কোথায়!?

তো সেইবার প্রথম কলকাতা বইমেলা গেলাম, ময়দানে। চারিদিকে শুধু বই আর বই । এত বড় বইমেলায় একটা পছন্দের বই না মেলার কোনো কারণ ছিল না বৈকি, তবু মিলল না! বিপ্লু মামা জিজ্ঞেস করল একটাও বই পছন্দ হলো না!? এদিক ওদিক মাথা ঘুরিয়ে একটা মোটা মতো বই নজরে এলো। প্রায় হাজার খানেক পাতা আর আমার ওজনের এক তৃতীয়াংশ ওজনের বেশ ওজনদার বই। বই নিলে এরকমই নেওয়া  উচিৎ। একটা ভারিক্কী ব্যাপার থাকে, কোনো হালকা চালের বই নয়। পড়তে পড়তে রীতিমতো কসরত করতে হয়। বেশি সময় ধরে থাকলে হাতের পেশী শক্ত হয়ে যায়। হ্যাঁ এরকমই একটা বই আমার চাই!

বিপ্লু মামা তথাস্ত বলে বইটা কিনে দিলো। বইয়ের উপরে লেখকের নামের পর লেখা আছে 'রচনা সমগ্র - অখণ্ড সংস্করণ '। আরো একবার নিশ্চিন্ত হলাম সমগ্র মানে পুরোটা, আধছাড়া নয়। পয়সা যখন দিচ্ছি (মানে বিপ্লু মামা দিচ্ছে) তখন পুরোটা নেওয়াই ভালো। 

আজ ২৫ বছর পরে আমি বলতে পারি এই হাজার পাতার যেকোনো পাতা খুলে, যেকোনো জায়গা থেকে হাজার বার পড়লেও আমার বিরক্তি আসে না।' রিনির প্রেমিকের' লেখা এই বইটা কিনে দেওয়ার জন্য আমি বিপ্লু মামার কাছে বিশেষভাবে ঋণী। 

স্বয়ং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন 

"আমার আন্তরিক বিশ্বাস  ........ এর যে কোনো রচনা পড়িয়াই কাহাকেও হতাশ হইতে হবে না।" 

অথচ সেইসময়ে অর্থকষ্টে ভুগতে থাকা লেখক, অমর কথাশিল্পীর ব্যবহারে মর্মাহতও হয়েছেন। দেনা পাওনার নাট্যরুপ দিয়েছিলেন। 'ষোঢ়শী' নামের সেই নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পর এসে দেখেছিলেন একাধিক দৃশ্যে শিশির ভাদুরি বাবু কিছু পরিবর্তন করেছেন । সেই নিয়ে লিখেছেন 

" যাই হোক, তার জন্য আমার কোনো মাথাব্যাথা ছিল না, নাট্যরুপের জন্য আমার নাম না থাকলেও নয় তেমনটা কিন্তু উক্ত প্রয়াসে আমার অংশ হেতু, কৃতিত্ব গৌরবের কিছুটা না হোক, আংশিক অর্থপ্রাপ্তির কিঞ্চিৎ প্রত্যাশা স্বভাবতই ছিল আমার।" 

শুনতে হয়েছিল " ওর আবার টাকার কি দরকার? মেসে থাকে, ঘর সংসার নেই, ও টাকা নিয়ে কি করবে? "

মালদার রাজপ্রাসাদ থেকে এসে ঐ মেসেই আজীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। বহুকাল আগে একবার এক ব্যাক্তি মেসের ঘরে জঞ্জাল আবর্জনা আর ধূলো দেখে জিজ্ঞেস করেছিলেন ঘরে একটা পাপোষ রাখতে পারেন তো, উত্তর পেয়েছিলেন 
"রাখব একটা পাপোষ। তবে সেটা ঘরের বাইরে নয়‚ ভেতরে। বাইরেটাই তো পরিস্কার‚ রোজ ঝাঁটপাট পড়ে। নোংরা তো ঘরের মধ্যে। তাই ঘর থেকে বেরোনোর সময় লোকজন সেই পাপোষে পা মুছে বাইরে চলে যাবে‚ যাতে বাইরেটা পরিস্কার থাকে।"

ঐ মেস ঘরেই একবার এক সাংবাদিক সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে ঘরের মধ্যে টায়ার, ভাঙা কাঠের টুকরোর জঞ্জাল দেখে বলেছিলেন এই অবস্থা কেন? উনি বলেছিলেন পরিস্কার করে রাখলে মেস মালিক এখানে আর একজনকে ঢুকিয়ে দিবে। নিজের একা থাকার বন্দোবস্ত কে জবরদস্ত করার জন্য এই ব্যবস্থা। মেস মালিক পরে জানতে পেরে বলেছিলেন 'ওঁনার মতো বিখ্যাত লেখক আমার মেসে থাকে এটাই আমার পরম সৌভাগ্য। ঐ ঘরে আমি আর কাউকে ঢুকাবো না।' 

প্রথম জীবনে কবিতা লিখতেন। তারপর গল্প লেখা শুরু। চরম আর্থিক কষ্টের মধ্যে থাকা সেইসব লেখার গল্প করতে গিয়ে লিখেছেন “ প্রেমেন আমার জন্য অনেক  করেছিল। পেষার জন্যই নিছক কলম পেশার দায় থেকে আমায় পুরোপুরি পেশাদার লেখকে দাঁড় করাতে দস্তুরমতো প্রয়াস ছিল তার। প্রেমেনের মতন মিত্র আর হয় না। " 

এই তো কিছুদিন আগে বিখ্যাত কার্টুনিস্ট শ্রী শৈল চক্রবর্তীর সাথে ওনার একটা সাক্ষাৎকার দেখছিলাম। সেখানে অকপটে টিভি চ্যানেলে বলেছেন 'আপনার আঁকা ছবিগুলোর জন্যই আমার একটু নামডাক হয়েছিল।' 

কখনো লিখেছেন তুলনাটা অশোভন হলেও রবীন্দ্রনাথের মতো তারও কাবুলিওয়ালার জন্যই সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ । এক কাবুলিওয়ালার ধার শোধ করতে গিয়েই তাকে রাত দিন লেখালেখি করতে হয়েছে। 

ভাগ্যিস ধার নিয়েছিলেন, নইলে বাংলা সাহিত্যের কত বড় ক্ষতি হয়ে যেতো! 

নিজেকে নিয়ে যা লিখেছেন তার কোনটা ব্যঙ্গ আর কোনটা সত্যি বোঝা মুশকিল। তবে বোঝার দরকার টাই বা কি? 

আমার পরম সৌভাগ্য, আমার প্রিয় লেখক ত্রয়ীরা হলেন সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখ্যোপাধ্যায় (দ্বিতীয় জনের সাথে একবার একটা সিটের পরে পাশাপাশি সিটে ফ্লাইটে এসেছি) আর তৃতীয় জন মুক্তারাম বাবু স্ট্রীটের মেসের আজীবন বাসিন্দা, যিনি 'বাড়ি থেকে পালিয়ে'  লিখেছিলেন। সেই 'বাড়ি' যেই জেলায় আমি সেখানেই জন্মেছি, বড় হয়েছি.... 

আজ শিব্রাম চকর্ বরতির প্রয়াণ দিবস। 

— অভিষেক বোস 

(আর একটা কথা না বললেই নয় ঐ রচনা সমগ্রটা মোটেও সমগ্র নয়। অগোছালো জীবনে যা কিছু লিখেছেন তার খোঁজ নিজেও রাখেননি। এমনকি আর্থিক দুরবস্থার জন্য প্রকাশকের কাছ থেকে পাওয়া নিজের কপিটাও বিক্রি করে দিয়েছেন। ওঁনার লেখার সমগ্র হয় না, হতে পারেও না। সমগ্র মানে তো শুরু থেকে শেষ। আর শিব্রাম চকরবরতির শুরু আছে শেষ নেই )

No comments:

Post a Comment