Monday, January 16, 2017

নিশির ডাক

পরপর তিন রাত একই ঘটনা ঘটল।  লেকটাউন এর নতুন ঘড়িটার ঢং ঢং আওয়াজ বাঙুর অ্যাভিনিউয়ের এই ফ্ল্যাটবাড়ির সাত তলা থেকে পরিষ্কার শোনা যায়। তিনবার আওয়াজ করে শব্দটা বন্ধ হয়ে গেল। আওয়াজ টা পুরনো গির্জার ঘন্টার মতো।  আবার চারদিক নিশ্চুপ, মাঝে মাঝে ভি আই পি রোডের উপর নিস্তব্ধতা চিরে যাওয়া গাড়ির আওয়াজ আসে, একটা ঘোর মতো লেগে এসেছিল শৌভিকের , শৌভিক সেন, একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করে, একা থাকে। হঠাৎ একটা গাড়ি সজোরে ব্রেক কষে দাড়ানোর আওয়াজে সম্বিত ফিরে এল।

একটু জল খেয়ে কিছুক্ষন চোখ বুঁজে থাকার চেষ্টা করল। কম্বলটা ভারী নরম, এবারে কলকাতায় বেশ ঠান্ডা পড়েছে। না, বেশিক্ষণ এভাবে থাকা গেল না।  বারবার সেই একই কথা মনে পড়ছে, মনের ভেতর থেকে কেমন মোচর মতো দিচ্ছে।  যন্ত্রচালিতের মতো উঠে দাঁড়িয়ে শৌভিক চলতে শুরু করল, সেই একই জায়গায় এসে থামল, তারপর দুদিনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ....... 

একটু অন্যরকম গন্ধ নাকে এল। 

এইসব কথা কাউকে বলা যায় না, লোকে শুনলেও হাসবে।  পরদিন সকালে আয়নার সামনে মুখের বা পাশটার কাছে  কিছু একটা লেগে আছে মনে হল।  জোরে জোরে চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে নিজেকে বোঝালো, এইসবই মনের ভুল।

সারাদিনের অফিসের ব্যস্ততার মধ্যে গত রাতের কথা আর মনে  ছিল না। দুপুরে লাঞ্চ ব্রেকের সময় যখন কিছুক্ষন একা ছিল তখন মনের মধ্যে ঘটনাটা একবার ঝিলিক মেরে মিলিয়ে গেল। 

অফিস ফেরতা একটা ফিস কবিরাজি খেয়ে শৌভিক বাড়ি ঢুকেছিল । পাশের ফ্ল্যাটের তন্ময় এসেছিল।  শৌভিকের সমবয়সী।  দুজনের খুব বন্ধুত্ব। একবার তন্ময়কে বলবে ভেবেও শৌভিক পিছিয়ে এল। শেষে তন্ময়ও যদি...   না না, কিছুতেই বলা যাবে না।  

তন্ময় কফি খাবে কি না শুনে নিয়ে শৌভিক কিচেনে ঢুকল।  ভেতর থেকে আওয়াজ দিল 'চিনি কতটা?' উত্তর টা একটু পরে এল, তন্ময় কি তাহলে পাশের ঘরে?  ঝটকা দিয়ে বেডরুমে ঢুকতেই তন্ময় কেমন হকচকিয়ে গেল।  তারপর ঘরের মধ্যে একটু ঘোরাঘুরি করে 'আসছি' বলে চলে গেল।

এইভাবে তো কোনোদিন তন্ময়কে চলে যেতে দেখেনি।  যাই হোক আজ রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে হবে।  ঠান্ডাটা আজকেও জমিয়ে পড়েছে, বারান্দা থেকে ভি আই পি রোডটা দেখা যায়, আলো আবছায়ায় শহরের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া অন্য শহরের যাওয়ার পথটা কেমন থম মেরে পড়ে থাকে, এইদিকটায় এখনও কিছু গাছপালা বাকি আছে।

লেকটাউনের ঘড়ির আওয়াজ আবার কানে এল ঢং ঢং ঢং !  শীতের রাতে এইরকম একটা আওয়াজ কেমন যেন একটা গম্ভীর পরিবেশ তৈরি করে।  শৌভিক সেই অমোঘ হাতছানির দিকে পা বাড়ালো।  এই অন্ধকারেও পা গুনে যেতে কোনো অসুবিধে হয়না।  পাশের ঘরে ঢুকে দরজাটা একটু ফাঁক করতেই সেই মায়াবী  আলো, দরজাটা পুরো খুলেই বুকের ভেতরটা কেমন দপ করে উঠল!  এ কি!  শৌভিকের ভেতর থেকে কান্না দলা পাকিয়ে উঠছিল! 

এ কাজ ঐ হতচ্ছাড়া তন্ময়ের না হয়েই যায় না। কাল রাতেও ফ্রিজের মধ্যে প্যাকেটে তিন পিস হানি ডিউ সন্দেশ রাখা ছিল।  একদম হিসেব করে রাখা।  খোদ চূচূঁড়ার সন্ধ্যাশ্রী থেকে আনানো।  সন্ধ্যাশ্রী চেনেন না নাকি মশাই! হ্যান্ডক্রাফ্টেড হানিডিউ সন্দেশ এর আতুর ঘর। সামান্য কয়েকজন লোকই এর স্বাদ আস্বাদন করতে পারে। একদম গোনাগুন্তি মাল। প্রথম কামড়ে কিচ্ছুটি বুঝবেন না, কেমন একটা বোকাবোকা সেজে বসে থাকবে, যেই না আন্ডার এস্টিমেট করে দ্বিতীয় কামড় টা দিয়েছেন ব্যস ভেতর থেকে অমৃত বেরিয়ে আসবে, তারপর আপনার মুখের আশপাশ দিয়ে বইতে শুরু করবে। এবার পুরো জিভের খেলা, দাঁত তখন রেস্টে। 

ঐ হতচ্ছাড়া তন্ময়।  কপাল জোরে বিয়ে করে বেঁচে গিয়েছে, নইলে আজ রাতেই ওর উদ্ধার হত। কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে ওর খবর আছে।  গালাগালি গুলো আরও একবার শানিয়ে নিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে শৌভিক ঘুমোতে গেল।

— অভিষেক বোস

1 comment: